১৬ তারিখের রাতে

দীপ্তি গুহ রায়

 

কি যে বলব। নমো জেতার পর এত এত রিঅ্যাকশান দেখে আমার মজা লাগছিল। আমি আর আমার বয়ফ্রেন্ড স্যাবি দুজনেই নমোর ফ্যান। প্রথমে অবশ্য অরবিন্দ কেজরিওয়ালের ছিলাম। দিল্লিতে যেভাবে জিতেছিলেন বেশ ইম্প্রেসিভ লেগেছিল। কিন্তু পরে দেখা গেল ভদ্রলোক বেজায় মিডিয়াচাটা। কথায় কথায় ধর্না করে শেষের দিকে ভরসা হারিয়ে ফেললেন। স্যাবি বা সব্যসাচী অবশ্য শুরু থেকেই মোদীর ভক্ত। গুজরাটে নাকি দারুন কাজ হচ্ছে এটসেট্রা। ও আগে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের ফ্যান ছিল। কিন্তু একই ব্যাপার। ভদ্রলোক হঠাৎ কখন যেন ঝিমিয়ে পড়লেন। হারিয়ে গেলেন। আজকাল দেখলে কার্টুন ক্যারেক্টার লাগে। আর নমো জেতার পর আমরা পার্টি করেছি।স্যাবি, সৌম্য, তিয়াসা, পিয়ালি আমাদের ব্যাচের প্রায় সবাই। মনে হচ্ছে আমরাই জিতেছি। বেশ রাত হয়ে গেছিল ফিরতে সেদিন। বাবা খুব একটা চাপ নেয় না। বাবার সাথে স্যাবির বন্ধুত্বের সম্পর্ক। তবে মা খুব রেগে যায়। বেশি রাত কেন, আর বার বার কানের কাছে একটা কথা সাবধানে থাকবি তুই মেয়ে।
আরে! মেয়ে হয়েছি তো কি হয়েছে। মা কিছুতেই আমাদের জেনারেশনটাকে বুঝতে চায় না। আর একজন আছে আমাদের ফ্যামিলিতে। আমার বড়মামা। আমাদের বাড়িতেই থাকেন। বিয়ে করেননি। কমিউনিস্ট পার্টি করতেন।
স্যাবি আমাকে বাড়ির সাথে নামিয়ে বলল “বড় মামাকে বলে দিস, এবার হাইবারনেশনে যাবার সময়”। আমি কিছু বললাম না। পার্টির হ্যাংওভার তখনও কাটে নি। আবার ঝগড়া আর ভাল লাগে না। তার উপর পার্টির মধ্যেই জিডিপি, গ্রোথ রেট থেকে ডাউ জোন্স এত এত আলোচনা হয়েছিল যে তখনও সেটাই ঘুরপাক খেয়ে যাচ্ছিল।
কলিং বেলটা টেপার পরে মামাই খুলল দরজাটা। আমাকে দেখে বলল “তোদের পার্টি কেমন হল?”
আমি জুতো খুলে ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললাম “দারুণ।”।
মামা কিছু বলল না। তালা দিয়ে ঘরে ঢুকল। আমার কেন জানি না ভীষণ রাগ হল। মনে হল মামার সাথে একটু ঝগড়া করি। এই লোকটা এত নেগেটিভ মাইন্ডেড কেন? এদের দলটা রাজ্যটাকে শেষ করেছে, নন্দীগ্রাম করেছে, নেতাই করেছে এবং সব থেকে বড় কথা সারাজীবন বিয়ে থা না করে শেষে কি হল? পার্টিবিরোধী কাজকর্মের জন্য বহিষ্কৃত হল। বিরোধী লবির লোকজনে বলেছে বিধানসভার সময় নাকি মামা তৃণমূলকে জেতাতে সাহায্য করেছে তাই বহিষ্কার। বহিষ্কারের দিন কিন্তু মামাকে এত ম্রিয়মান দেখায় নি যেটা আজকে লাগছে।
আমি দুমদুম করে মামার ঘরে ঢুকলাম।বাবা মা দোতলায় থাকে। মামা নিচের তলায়। ঠিক করলাম ঝগড়া করে উপরে যাব। মামার ঘরে কিছুই থাকে না। আমাদের বাড়ির তুলনায় বেমানান। তবে ছিমছাম। পরিষ্কার।
আমি ঢুকেই বললাম “কি হল কমরেড? দুখানা শেষে? কি যেন বলে? মানুষ ছুঁড়ে ফেলেছে তো?”
মামা আমার দিকে তাকিয়ে হেসে বলল “ফেলেছে তো দেখছি”।
আমি বললাম “তাহলে?”
মামা হেলান দিয়ে বসল “অপ্রাসঙ্গিক হয়ে গেলাম”।
আমি বললাম “বিজেপি জয়েন করে যাও, সারাজীবন তো পুজো আচ্চা করলে না, এবার না হয় একটু ঠাকুর ভক্ত হলে, মার্কেটে খুব চলছে। লাল সেলাম থেকে জয় শ্রীরাম। এবার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেলে তোমরা”।
মামা হেসে ফেলল। কয়েক সেকেন্ড চুপ করে মেরুদণ্ড সোজা করে বসে বলল “ভারি কথা শিখেছিস তুই।মজার মজার। যা এবার ঘরে যা”।
আমি রেগেমেগে নিজের ঘরের দিকে চললাম। যেতে যেতে রাগটা আরও বাড়ছিল। কি বাজে লোক রে বাবা!

আপনার মতামত জানান