পাহাড়ের ছন্দা

পিয়ালী চক্রবর্ত্তী

 

দিনটা ১৮ই মে, ২০১৩। ভোর সাড়ে ছটায় এভারেস্টের চূড়ায় পা রাখল সেই মেয়েটি, পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ, উচ্চতা ৮৮৪৮ মিটার। আমরা অনেকেই কল্পনা করি কেমন হবে সেই দৃশ্য? পৃথিবীর সবচেয়ে উঁচু জায়গা থেকে কেমন লাগে নিচের পৃথিবীটা? হাওড়ার কোনা’র ছন্দা গায়েনের কাছে আরেকবার উত্তর পেল গোটা পৃথিবী। কিন্তু নিচের পৃথিবীটা যতখানি শান্ত, স্থির লাগে ওপর থেকে, বাস্তবে কি সত্যিই তাই? এভারেস্টের থেকেও বেশি চড়াই উতরাই পেরিয়ে স্বপ্ন দেখার লক্ষ্যে পৌঁছতে হয়েছে এই বাঙালী মেয়েটাকে । ওর অভিযানের খবর পড়তে পড়তে শিহরণ জেগেছে আমাদের মনে । মনে হয়েছে আবার, আবার কোন এক বাঙালী এই মধ্যবিত্ত বাঙ্গালীর জীবন চিত্রটায় নতুন রঙের প্রলেপ লাগিয়ে বুঝিয়ে দিয়েছে মধ্যবিত্ত প্রেম যেমন ‘ভীরু’ নয়, আশা আকাঙ্খা কিছুই আর চার দেওয়ালের গন্ডিবদ্ধ নয়। বছর দশেক আগে থেকে পাহাড় ভালবাসা জেদি মেয়েটা ছোটখাট পাহাড়ি অভিযান করতে করতেই ঠিক করেছিল, একদিন এভারেস্ট ছোঁবে । ২০০৬ সালে দার্জিলিং এর হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারিং ইন্সটিটিউট থেকে পর্বত অভিযানের প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে, মৌলালির ইন্সটিটিউট অফ এক্সপ্লোরেশনের পক্ষ থেকে হিমাচলের ফ্লুটেড শৃঙ্গ জয়ের পর হিমালয়ের যোগিন ১ ও ৩ শৃঙ্গ জয়ের সুযোগ মেলে। ৬০০০ মিটারের এর বেশি উঁচু শৃঙ্গজয়ের পর থেকে আরও বেশি করে হাতছানি দেয় ৮৮৪৮ মিটারের মায়াজাল। সেই মাউন্ট এভারেস্ট, যার উচ্চতা মেপেছিলেন আর এক বাঙালী রাধানাথ শিকদার, আর তাঁরই জন্মশতবর্ষে ছন্দার এভারেস্ট অভিযান। কিন্তু এসব ভাবতে, পড়তে যতটা রোমহর্ষক লাগে, বাস্তবে ভারতবর্ষের মাটিতে, এক সাধারণ মধ্যবিত্ত বাঙালী পরিবারের মেয়ে হয়ে এই স্বপ্ন দেখার মূল্য দিতে হয় অনেকখানি । এভারেস্ট যাত্রার খরচ ১৫ লক্ষ টাকা। ততদিনে গত হয়েছেন ছন্দার বাবা। বাবার ব্যবসা বাঁচিয়ে রাখার প্রাণপণ লড়াই চলছে ছন্দার। বাবার করে যাওয়া দোকানটিকে বাঁচাতে আরও মজবুত করতে এই মেয়ে শক্ত হাতে ধরেছে সংসারের হাল। পাশাপাশি মজবুত করেছে নিজের মনের, শরীরের জোরকেও। মার্শাল আর্টে পারদর্শী মেয়েটি পাড়ার কয়েকটি যুবকদেরও শিখিয়েছে, তার তাইকোন্ডু ক্লাসে ভিড় করেছে বিভিন্ন বয়সের ছেলে মেয়েরা। আত্মরক্ষার জন্য সবসময় প্রস্তুত এই মেয়ে । ওর সাহস হয়ে উঠেছে সকলের আদর্শ। কিন্তু এভারেস্ট যাবার খরচ মারফত সরকারি অনুদান মিলল পাঁচ লাখ টাকা। পুরো খরচের অর্ধেকও নয়। শুরু হল স্পন্সরশিপের জন্য হত্যে দেওয়া। ধার দেনা, বন্ধক। তুষার ঝড়ের চেয়েও কি কম দুঃসহ সেইসব ঝড়ের দিনগুলো? তবুও স্বপ্ন পূরণের অক্সিজেনের ঘাটতি হয়না। ২৮ শে মার্চ ২০১৩, যাত্রা শুরু করে ছন্দা, ১৮ই মে রচনা হয় ইতিহাস। শত শত বাঙালীর মনে জায়গা করে নেয় ছন্দা। এবিপি আনন্দের ২০১৩র ‘সেরা আবিষ্কার’ তখন ছন্দা। সত্যিই তো তাই। যাকে বলে ‘প্যাশন’, হৃদয়ের অন্তঃস্থলে এক অদ্ভুত ইচ্ছে, আর তাকে সম্বল করে স্বপ্নপূরণের দুর্গম পাড়ি, এমন মানুষ কমই মেলে । প্রথম অসামরিক মহিলা হিসেবে ছন্দার এভারেস্ট জয় । মতি নন্দীর সেই ‘কোনি’ পড়েই তো বড় হয়েছি আমরা বাঙালী মেয়েরা। স্বপ্ন দেখতে শিখেছি। কোনি কি শুধু গল্পের চরিত্র? বাস্তবের কোনিরাও কি নেই? পিটি ঊষা, মালেশ্বরী থেকে মেরি কম, তার সাথে আর এক মেয়ে, আমাদেরই বাংলার ছন্দা।
কিন্তু পাহাড় চড়ার সাধ কি পূর্ণ হওয়ার? এভারেস্ট থেকে ফিরেই ছন্দার এবারের লক্ষ্য তৈরী হয়ে গেল । কাঞ্চনজঙ্ঘা । কিন্তু সে যতই তুষার সুন্দরী হোক, তার টানে যতই ছুটে আসুক পর্যটকেরা, আজ পর্যন্ত এভারেস্টের তুলনায় অনেক কম অভিযান হয়েছে কাঞ্চনজঙ্ঘায় । কারণ এই সুন্দর বড় বেশি ভয়ঙ্কর । খাড়াই পথের দুর্গমতায় বিশ্বের বিপজ্জনক শৃঙ্গগুলির অন্যতম হিমালয়ের এই পর্বত। কিন্তু যত দুর্গম, তাকে আবিষ্কার করার আনন্দ ততই বেশি । কিন্তু এভারেস্টের থেকে প্রতিকূলতা অনেক বেশি। তার সবচেয়ে প্রধাণ কারণ এখানকার আবহাওয়া। কখন তুষার ঝড়, কখন ধস, কোন ঠিক নেই । এভারেস্টে আগে থেকে পরিকল্পনার জায়গা থাকে। পথশ্রমে ক্লান্ত হয়ে পড়লে থাকে বিশ্রামের জায়গা । কিন্তু কাঞ্চনজঙ্ঘায় এর কোন সুবিধাই নেই । ধর্মীয় কারণে শৃঙ্গে পা রাখেন না অভিযাত্রীরা, কয়েক ফুট নিচে তৈরী হয় সামিট। সেই সামিট ছুঁয়ে আসার স্বপ্ন তখন ছন্দার চোখে। পাশে পেলেন আর এক ‘কোনি’ টুসি দাস কে। দরিদ্র পরিবারের মেয়ে টুসি, ডিমের দোকান চালাতে চালাতে দেখত পাহাড় চড়ার স্বপ্ন। জুটত না ভাল খাবারও। নিজেদের দোকানে বিক্রি না হওয়া ভাঙ্গা ডিম খেয়েই টুসির অনুশীলন শুরু। কিন্তু এবারে খরচ যে আকাশ ছোঁয়া। প্রায় ৩৫ লক্ষ। সরকারি তরফে কিছু ভরসা পাবার কোন উপায় নেই। শুরু হল এই দুই কন্যার যুদ্ধ। বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থার কাছে আবেদন, হত্যে দিয়ে পড়ে থাকা দিনের পর দিন। সারাদিনের দৌড়ঝাঁপের পর বিকেলের অনুশীলনের সময়টুকুও মিলত না। তবু হাল ছাড়তে মানা । পয়সা মিলল না। যা মিলল তাও নামমাত্র। আবার ধার, দেনা বন্ধক করে ছন্দা যোগাড় করল ১৮ লক্ষ টাকা। টুসি বিক্রি করে দিল ওর বিয়ের জন্য বানানো গয়না, সাথে নিল জমানো যতসামান্য টাকা । টুসির তো নাম বাদ যাচ্ছিল পয়সার অভাবে, তবুও কোনরকমে শেষরক্ষা হল। আবারও যাত্রা, চরম বিপদসঙ্কুল পথ পেরিয়ে ২০শে মে’২০১৪ ছন্দা, টুসি, দীপঙ্কর, রাজীব কাঞ্চনজঙ্ঘা সামিটে রাখল পা। কাঞ্চনজঙ্ঘায় উড়ল প্রথম দুই ভারতীয় কন্যার বিজয় নিশান । শ্রান্ত, ক্লান্ত হয়ে বেস ক্যাম্পে ফেরা। কিন্তু ছন্দা আর রাজীবের তো এখানে থামার কথাই নয়, তারা আবারও যাবে কাঞ্চনজঙ্ঘা কিন্তু এবার যাবে সবচেয়ে বিপজ্জনক পথে। ইয়ালুং কাং, কাঞ্চনজঙ্ঘার পশ্চিম শৃঙ্গ জয়ের পথে। আরও খাড়াই, বিপজ্জনক আবহাওয়ায় কেমন করে যাবে এরা? শরীর বইবে? কিন্তু ছন্দাতো এসব ভাবছেই না। ছারিদিকে শুধু পাহাড়, জীবন বাজি রাখা পাহাড়ের হাতছানি, ইয়ালুং কাং সেই শৃঙ্গ যে পথে শেষ অভিযান হয়েছে ১৮ বছর আগে। ছন্দাকে আটকান গেল না। তিনশেরপা আর রাজীবকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল সে। মাঝপথে ফিরে এল রাজীব। কিন্তু হাল ছাড়েনি ছন্দা। কিন্তু কে জানত ইয়ালুং কাং এর সামিটে পৌঁছনোর আগেই অপেক্ষা করছে সেই ভয়, যার কাছে সব তুচ্ছ। ছন্দাদের ওপর নেমে এল তুষার ধস। একজন শেরপা বাদে, হারিয়ে গেল বাকি তিনজন। প্রায় ৭০০০ মিটার বরফ ধসের মধ্যে হারিয়ে গেল ছন্দার স্বপ্ন, হারিয়ে গেল দুই শেরপা দাওয়া আর মিংমা পেমবা। আজ পর্যন্ত খোঁজ নেই ছন্দার। খারাপ আবহাওয়ার কারণে এখনও ঠিক মত শুরু করা যায়নি উদ্ধার কাজ। বুকে পাথর রেখে বসে আছি আমরা, বসে আছেন ছন্দার মা। হয়ত, হয়ত কোনভাবে বেঁচে আছে, মিরাকল তো ঘটেই কত।
ছন্দা একটু সাহায্যের আশায় কিভাবে ঘুরেছে, রোদে, জলে, বৃষ্টিতে। আজ তার বাড়িভর্তি মানুষ, প্রতিশ্রুতির বন্যা, অথচ ছন্দা নেই। আজ সে সংবাদের শিরোনামে, অথচ যাত্রা শুরুর দিনে কজন এসেছিলেন তাকে অভ্যর্থনা জানাতে? না এসব প্রশ্নের উত্তরে মন খারাপ করব না, বরং ভাবি আসুন ছন্দা সেই মেয়ে যে বদলে দিয়েছে ‘মধ্যবিত্ত বাঙ্গালী’র সংজ্ঞাটা। ওই অফিসের ৯টা-৬টার চাকরি, গদি আঁটা চেয়ারে সুখের দুপুর যাপন, আহারবিলাসী, ছুটির দিনে দিবানিদ্রাবিলাসী আর বছরে পালা করে কটা নাটক, নাচ, গানে অংশ নেওয়া, খাদ্যরসিক, আড্ডাপ্রিয়, সিনেমা- গল্পের বই যাদের নিত্যসঙ্গী । ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে পাহাড়- সমুদ্র তোলপাড় করে ফেলা, মানে জীবনের যে যে জায়গায় ‘ঝুঁকি’ নামক জিনিষটা বিদ্যমান, সেখানে নাকি বাঙ্গালীর ‘নো এন্ট্রি’। না এমন নয়, ইচ্ছা থাকলে, মনের জোর থাকলে সম্ভব, সব সম্ভব।
জানি না ছন্দাকে আর ফিরে পাবেন কিনা বাংলার মানুষ, ফিরে পাবেন কিনা তার স্বজনেরা। তবুও ছন্দা থাকবে, এতখানি লড়াইয়ের পর কেউ কি ইতিহাস হয়ে যায়? বরং জ্বলজ্বল করে বেঁচে থাকে, তার দিকে তাকিয়ে সৃষ্টি হয় আরও অনেক ইতিহাস। মনে হয় ক্লান্ত শরীরে আর ঝুঁকি নাই বা নিত ছন্দা? কিন্তু তাহলে যে অধরা থেকে যেত তার ইচ্ছা, দ্বিতীয়বার ফিরে আসার জন্য আবারও তো সেই তুমুল সংগ্রাম নিচের পৃথিবীতে। নিজের ‘প্যাশন’ কে বাঁচাতে তার পাড়ি, প্যাশন কে বাঁচিয়ে রেখেই ওর হারিয়ে যাওয়া।
‘তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় নাকো কভু’ , ছন্দাও হারাবে না, আসুন অসম্ভব জেনেও আশা করে যাই ‘মিরাকল’ এর। সামনে থাকুক এই পরিসংখ্যান
কাঞ্চনজঙ্ঘা শীর্ষে মেয়েরাঃ ১৯৯৮ - জিনেট হ্যারিসন (ব্রিটেন)
২০০৬ – গারলিন্ড কাল্টেনব্রুনার (অস্ট্রিয়া)
২০১৪ – ছন্দা গায়েন, টুসি দাস (ভারত)


ছবি ঋণঃ টেলিগ্রাফ ইন্ডিয়া

আপনার মতামত জানান