ইডেনের নয়

তন্ময় মুখার্জী

 

১।
নাইট-ভায়াদের খেলা রাত আটটা থেকে। সাড়ে ছটা থেকে এসপ্ল্যানেড টু ইডেন চোক্ড। আধ-বেগুনী জামার ছড়াছড়ি। আমি এমনিতে ফেসবুক আড্ডায় টেস্ট ভক্ত হলেও, ফ্রি টিকিট পেলে আই-পি-এলো কে মাথায় তুলে, গামছা পরে, কোমর দুলিয়ে নাচতে পারি। আমাদের কৃষ্টি-ফ্রিষ্টি স্ট্র্যাটেজিক টাইম আউট নিয়ে ফ্রুট জুস খাচ্ছে। এখন হাভাতেপনার সময়।

২।
মরা হাতি লাখ টাকা কি না কে জানে, তবে ইডেনে স্টেডিয়াম এলাকাতে মরা এগরোলের দাম চল্লিশ টাকা। আমরা বেওকুফ জাতি; যেখানে সেখানে থুতু ফেলি। বুক চিতিয়ে রাস্তা জুড়ে ছোট ছড়াই। অতএব আমাদের খাওয়ার-দাওয়ার নিয়ে স্টেডিয়ামে ঢোকা বারণ। কিন্তু আনতাবড়ি শট দেখতে দেখতে কুচুর-মুচুর করে কিছু চেবাবো না তা কি করে হয়। তাই এগরোলের মর্গ আর মিয়ানো পপকর্নের মজলিস সাজানো আমাদের জন্যে; অ্যাট পাঁচগুণ বেশি দাম। উদ্যোগী বাঙ্গালির ইন্ডাস্ট্রি না থাক; আই পি এল আছে।

৩।
মেক্কা অফ ক্রিকেট ইন ইন্ডিয়া। ইডেন। মেজাজটাই এখানে আসল রাজা। গোটা খেলা শুধু সামনের মেজাজি-দঙ্গল কে কাকুতি করে কাটিয়ে গেলেন পাশের মাঝবয়েসী ভদ্রলোক। “ ভাইরা প্লিজ একটু বসুন, পিছন থেকে কিছু দেখা যাচ্ছে না যে আপনারা দাঁড়িয়ে থাকলে”।
খেলা একটু জমে ওঠার পরে ভদ্রলোকের অনূরোধের ডাইমেনসন পাল্টে গেল “ দাদারা,প্লিজ চেয়ারের ওপরে দাঁড়িয়ে খেলা দেখবেন না। নিচে দাঁড়িয়ে দেখুন। আমি যে এখন দাঁড়িয়েও কিছু দেখতে পারছি না”।


৪।
ছাতা ছাড়া নলবনে যারা প্রেম করতে যান আর খিস্তি-শীল-মনন ছাড়া মাঠে যারা খেলা দেখতে আসেন; সরকার তাদের এইবেলা বাড়তি ট্যাক্স দিতে বাধ্য করুন। প্লিজ।

৫।
খেলা শুরু। ব্যাকগ্রাউন্ডে থেকে ঘন ঘন করবো-লড়বো-জিতবো বেজে উঠছে। জনগণ-মন পানসে হয়ে আসছে ক্রমশ। বাঙালি একসময় নেতাজীর অপেক্ষায় বর্মা বর্ডারের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে ছিল; আমরা রক্ত দেব-তিনি স্বাধীনতা দিলেও দিতে পারেন। এখন ইডেনময় বাঙালির নজর ক্রিকেট টপকে ভি-আই-পি বক্সের দিকে আটকে থাকে; শাহরুখ খানের আবির্ভাবের অপেক্ষায়; আমরা তাঁকে টিকিট কিনে রেভিনিউ দেব-তিনি কলকাতাকে কলকত্তা বলে উড়ন্ত চুমু ছুঁড়বেন। আমাদের স্বপ্ন না থাক; হুজুগ আছে।

৬।
উই আর সেকিউলার। উই আর পজিটিভ থিঙ্কারস। ন্যারো চিন্তাভাবনার আশেপাশে এলেই আমাদের দেহের কোথায় যেন জ্বালা ধরে। আমদের কণ্ঠস্বর রবীন্দ্রসঙ্গীতে আপনা থেকেই ভরাট হয়ে আসে; আবেগ যুক্ত ট্র্যাডিশনে। আমরা লিবারাল। আমরা কাফকা, নেরুদার নিচে কথা বলি না। এবং ইউসুফ পাঠান ক্যাচ ফেললে “মোল্লাটা ক্যাচ ফেললো রে” বলে আঁতকে উঠি। এবং ইউসুফ পাঠান ছক্কা হাঁকালে আমারা গরু-খোরের রিস্টের বেদম ক্ষমতা টের পেয়ে আপ্লুত হই।

৭।
হুগলী থেকে মাঝে মধ্যেই হাওয়া এসে ইডেন গ্যালারির প্রাণ জুড়িয়ে দিয়ে যায়। আর ভেসে যায় কাব্যিক সব মন্তব্য।
“ মাঠে এসে খেলা দেখার সব চেয়ে ভালো ব্যাপার হল; সিধু আর রামিজ রাজার কমেন্ট্রি শুনতে হয় না”

৮।
মন জুড়ানো মাঠ। মায়াবী সাদা আলো। গমগমে উত্তেজনা। হই হই করা, লড়া, জেতাজিতির আস্ফালন চারিদিকে। এ সব কিছুর মাঝে এক দাদু তাঁর নাতিয়ে সমানে শিখিয়ে চলেছেন
“ এইটেকে বলে কভার ড্রাইভ”
“ ওই পজিশনটাকে বলে থার্ড ম্যান”
“ও কেন ক্যাচ ফেললো বুঝতে পারছ দাদুভাই ? ওর বডি ব্যাল্যান্স ঠিক ছিল না। এই ভাবে হাতের পজিশন রাখতে হবে”
একদিন এই দাদু থাকবেন না। ইডেন থাকবে। এই নাতিটি তখনও মাঠে আসবে এবং তার মনে পড়বে তার দাদুর বলে যাওয়া দড়কচা মারা অথচ মন খারাপ করা কথাগুলো “স্পোর্টস ইজ নট অনলি অ্যাবাউট টেকনিক দাদু। ইট ইজ মোর অ্যাবাউট স্পিরিট”

৯।
সৌরভ নেই। সচিন নেই। ইডেন আছে। থাকবে। ক্রিকেট আছে। থাকবে। শুধু একদল বেয়াড়া ছেলেপিলের মনে একটা বিকট স্লোগান একটানা বেজে চলে “দাদা, সচিন ছাড়া মোচ্ছব হতে পারে, ক্রিকেট হয় না”।
জেনারেশন গ্যাপ; শব্দটিতে বেশ রগরগে প্রেম প্রেম ব্যাপার রয়েছে।

আপনার মতামত জানান