ঋতুপর্ণ ঘোষের পাঁচটা সিনেমা যেগুলি না দেখলে জীবন বৃথা

শবর মিত্র

 

  • rituparna ghosh
  • rituparna ghosh
  • rituparna ghosh
  • rituparna ghosh
  • rituparna ghosh

ঘটনা হল যারা মনে করে ঋতুপর্ণ ঘোষকে বিখ্যাত করেছে মীর, তারা ওনার কোন সিনেমাই দেখেনি। রিমেকের বাইরে তারা কিছু দেখেছে নাকি সেটা নিয়েও আমার ভীষণ সন্দেহ আছে। বস্তুত বাঙালি আজকাল যেভাবে রুচিহীনতার সাগরে ডুবে চলেছে, তাতে ঋতুপর্ণ ঘোষ না দেখলে তাদের বিশেষ ক্ষতি হবার কথা নয়। মারব এখানে লাশ পড়বে শ্মশানে শুনে নাল গড়ায়, দক্ষিণ ভারতীয় সিনেমার সেটে বাংলা ডায়লগ দেখে তাদের শীৎকার হয়... সব মিলিয়ে এই নিম্নমেধার বাঙালি দর্শকের কথা ভেবে যারা যারা সিনেমা বানাননি তাদের লিস্টে ঋতুপর্ণ খুব উপরের দিকে থাকবেন। বাংলা সিনেমাকে আন্তর্জাতিক করার ক্ষেত্রে সত্যজিৎ রায়ের পরে যদি ঋতুপর্ণ ঘোষের নাম নেওয়া যায় তাতে খুব একটা সমস্যা হবার কথা নয়। যাক গে এ সব কথা। আমার যেটা মনে হয়েছে সেটা সবার নাও মনে হতে পারে। সংস্কৃতির সংজ্ঞা আজকাল বদলে যাচ্ছে। তবে আমার ব্যক্তিগত পছন্দের হিসেবে ঋতুপর্ণের যে পাঁচটা সিনেমা না দেখলে জীবন বৃথা সেগুলি নিয়ে আলোচনা করা যাক...

১) চোখের বালি
রবি ঠাকুর নেকু পুষু- এই কনসেপ্ট থেকে বেরিয়েছে এক্কেবারে রকেটের গতিতে। আমাদের সিনেমায় নায়ক নায়িকারা পেচ্ছাপ পায়খানা করে না, তাদের পিরিয়ড হয় না। সেগুলি দেখালেই হই হই রব উঠে যায়। উনিশে এপ্রিলে প্রসেনজিতের পেচ্ছাপ করা দেখানো নিয়ে সিকিভাগ হই হই হয় নি যেটা বিনোদিনীর পিরিয়ড দেখানো নিয়ে হয়েছে। হলের মধ্যে অনেক মাসি পিসির ঈষৎ চাপা স্বরে “ঈশ একটু বেশি হয়ে যাচ্ছে না?” শুনে মজা লাগছিল। মূল গল্পটিকে নিজের মত করে ঢেলে সাজিয়েছেন ঋতুপর্ণ। চুম্বন দৃশ্যগুলি যদিও ভারতীয় মতে “ধরি মাছ না ছুই পানি” হয়ে গেছে তবুও বেশ সাহসী। টোটা রায়চৌধুরী যদিও বাকিদের পাঁচ গোলে হারিয়েছেন এই সিনেমায়। এরকম একজন সম্ভাবনাময় অভিনেতাকে কেন পরবর্তীকালে সেভাবে ব্যবহার করা হল না সেটা লাখ টাকার প্রশ্ন।

২) দোসর
সাদাকালো। রঙিন নয় মোটেও। সম্পর্ক আর সেগুলিকে ঘিরে সাপের মত জড়িয়ে যাওয়া মানুষের গল্প। পরিণত বললে কম বলা হবে। প্রসেনজিত চট্টোপাধ্যায়ের চিরাচরিত ইমেজ ছেড়ে বেরিয়ে আসা, যার কৃতিত্ব পুরোটাই বোধহয় প্রাপ্য ঋতুপর্ণ ঘোষের। কঙ্কনার নীরব অভিনয়।অথবা না-অভিনয়। একেকটা সম্পর্ক কিংবা সম্পর্ক থেকে সম্পর্কে বিচরণ, বিশ্বাসহীনতা... একটা আকস্মিক দুর্ঘটনার পরে সব যখন ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে শুরু করে, কি হয় তখন এক একটা পরিবারে? স্ত্রী অন্য পুরুষের সাথে হোটেলে রাত কাটাচ্ছে, পুরুষত্বহীন পৌরুষত্ব সেটা কিভাবে নেবে? শঙ্কর চক্রবর্তী যথাযথ দেখিয়েছেন। ঋতুপর্ণ সহজ করে বলতে পারতেন জটিল সম্পর্কের কথা। শুনতে সহজ, দেখতে সহজ, অথচ আঘাতটা লাগত অতলে।

৩) তিতলি
ওই যে বললাম। লোকটি মানব সম্পর্ক যেভাবে দেখিয়েছেন অত সহজ নয় ব্যাপারটা। অথচ শুরুটা হয়েছিল কি চমৎকার ভাবে। শেষটাও হল চমৎকার। কিন্তু কখন যেন কতকিছু বলে গেল। “মন খারাপ হলে কুয়াশা হয়, ব্যাকুল হলে তিস্তা”... অপর্ণা-কঙ্কণার একটা অদ্ভুত বৈপরীত্য আছে এই সিনেমায়। মা-মেয়েকে এক ফ্রেমে এনে যেভাবে ঋতুপর্ণ তাঁদের ব্যবহার করেছেন তা অনবদ্য। তবে আর সব কিছুর মত এই ছবিও সম্পর্কের পরিণত গল্প বলেছে। সুতোর ওপরে হেঁটে গিয়েও অনায়াসে ভারসাম্য রক্ষা করেছেন পরিচালক।

৪) শুভ মহরত
শর্মিলা ঠাকুর, রাখি, নন্দিতা দাস। শুধু এই তিনজনের জন্য সিনেমাটা বারবার দেখা যায়। গল্পের বাঁক, রহস্য গল্প বলে যাওয়া... সব কিছুর উপরে। ঋতুপর্ণের ছবিতে মেয়েদের গভীরতা, তাদের মনোবিশ্লেষণ যেভাবে দেখা যায় সেটা আলাদা করে উল্লেখের দাবী রাখে। আগাথা ক্রিস্টির “দ্য মিরর ক্রাকড ফ্রম সাইড টু সাইড” গল্পকে তাঁর নিজের মত করে বলেছেন। গল্পের সাথে যুক্ত হয়েছে মল্লিকা সেনের (নন্দিতা দাস) নারী মন,পদ্মিনী চৌধুরী শর্মিলার রহস্যে ঘেরা উপস্থিতি আর সারাদিন উল বুনে যাওয়া মিস মারপল নীরব কিন্তু বাঙময় রাখি।

৫) আরেকটি প্রেমের গল্প
সিনেমাটি ঋতুপর্ণ ঘোষের নয়। কৌশিক গাঙ্গুলির। কিন্তু ঋতুপর্ণ ঘোষের পাঁচটি সিনেমা যেগুলি না দেখলে জীবন বৃথা সেই তালিকায় এই সিনেমাটি না থাকলে যে তালিকাটি সম্পূর্ণ হবার নয়! একটা অদ্ভুত গল্প আর তার সাথে কি ব্যক্তিত্বপূর্ণ উপস্থিতি ঋতুপর্ণর। কৌশিক গাঙ্গুলি এই সিনেমায় ঋতুপর্ণের স্টান্স নিয়েছেন। এবং অবলীলায় ছক্কা মেরেছেন সে কথা বলাই বাহুল্য।
পরিশেষে- কি হল? চশমার নীচ দিয়ে তাকিয়ে বলছেন “সব চরিত্র কাল্পনিক”, “অন্তরমহল”, “রেইনকোট”, “হীরের আংটি”, “চিত্রাঙ্গদা”, “আবহমান”-এর কথা কে বলবে? বাহ... যাক, আশ্বস্ত হলুম বাঙালি এখনও বেঁচে আছে ভেবে। আবার তামিল রিমেকের পেছনে ছোটার আগে এগুলি আরেকবার দেখে নিন দাদারা...

আপনার মতামত জানান