' কেউ কথা রাখে নি '......'সন্তানদল ' অনাথ হল

কৌশিক রায়

 

১)
ছোটবেলায় মামার বাড়ি যাওয়ার সময় ষ্টেশনের দেওয়ালে লেখা থাকত "নেতাজী ফিরে আসবেন "।কোনো অজ্ঞাত বৈধ বা অবৈধ সন্তানদল রাতের অন্ধকারে লিখে চলে যেত আর আমিও বাবার কাছে নেতাজীর বীরত্বের কাহিনী শুনে বিশ্বাস করতাম যে তিনি ফিরে আসবেন। কতকাল সেই স্বপ্নে বিভোর থেকেছি আজ ভুলেই গেছি। তারপর সন্তানদল আগ্রহ হারালো, নেতাজী গুপ্তরোগের পোস্টারে আবার আত্মগোপন করলেন। তিনি কথা রাখলেন কই?

২)
আস্তে আস্তে কৈশোরে পদার্পন করতে না করতেই টিভিতে একটি চকলেটের বিজ্ঞাপন দেখে ভাবতাম , আমিও এমনি করেই লাস্ট বলে ছয় মেরে ম্যাচ জিতাব,আর একটি সুন্দরী মেয়ে চকলেট নিয়ে আমার দিকে ছুটে এসে জড়িয়ে ধরে খাইয়ে দেবে। মা -বাবাকে ইচ্ছের কথা জানাতে বলেছিল যে আমাকে নিশ্চয়ই ক্রিকেটার বানানো হবে। সে কথা মা -বাবার সত্যি হয়েছে বটে, আমি বুক -ক্রিকেটে পারদর্শী হয়ে উঠলাম।
বয়ঃসন্ধিকালে লাস্ট বেঞ্চে বসে কোকাকোলার বোতলের সাথে শিক্ষিকার দৈহিক অধঃভঙ্গের মিল খুঁজতে খুঁজতে শ্রেণীর একটি মেয়ের প্রেম পড়লাম। প্রথাসিদ্ধ ভাবে যথারীতি শুভ কাজে দেরী করতে নেই, আমিও করলাম না। মেয়েটি জানালো, যদি কোনোদিন আমি লাস্ট বেঞ্চের মায়া ত্যাগ করতে পারি তাহলে সে ভেবে দেখবে। তখনো ' সম্ভবনা তত্ত্ব (Probability Theory)' কি জিনিস আমি জানিনা, তাই রাতারাতি স্বপ্নে ভর করে লাস্ট বেঞ্চের মায়া ত্যাগ করে ফার্স্ট বেঞ্চে এসে পড়লাম। কিন্তুু ততদিনে মেয়েটি আমার প্রতি আগ্রহ হারিয়ে "পরের ঘরের সুখের চাবি "। ফলে শৈশবের 'সন্তানদল'-এর মতই আমার স্বপ্নের 'সন্তানদল'ও অনাথ হল, পার্থক্য শৈশবে পিতৃহারা হয়েছিল, বয়ঃসন্ধিতে মাতৃহারা।

৩)
যৌবনটা সত্যিই আমার ভীষণ রঙিন। নবযৌবন প্রাপ্তির পর "নীল রঙ " সত্যিই ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠল। শৈশবে আঁকা শিখতে গিয়ে জেনেছি মৌলিক রঙ নাকি তিনটি -লাল,নীল আর হলুদ। কিন্তুু যৌবনে দেশ গঠনের স্বপ্নে বিভোর আমি জানলাম লাল আর সবুজ এই দুটি রঙ-ই শুধু একে অন্যের সাথে মেশে না,বাকি হলুদ, কমলা,নীল সব রঙেই লাল অথবা সবুজ দ্রবীভূত হয়।
এই বয়সে সব ছাত্র-ই যেমন গভীরে অধ্যবসায়ে জীবনবিজ্ঞানের একটি বিশেষ চ্যাপটারের প্রতি আগ্রহী হয়, আমিও ব্যাতিক্রমী নয়।তাই আমিও বয়সের ধর্ম মেনে পাশে বসা সহপাঠীর থেকেই 'হোমো ' ও 'হেটারো ' জ্ঞান লাভ করলাম।কলেজে পড়তে গিয়ে আরও কিছু বুদ্ধত্ব লাভ করা সহপাঠীদের থেকে জানলাম 'হেটারো ' এর রঙ 'রামধনু'। তারপর সদ্য আঠারো পেরানো যুবক জানলো রামধনু রঙ আর নিষিদ্ধ নয়,জানলো বর্ণময় 'ঋতুরাজ '-কে। যুবকটির গভীর বিশ্বাস ছিল, একদিন এই একরঙা পৃথিবীতে ঋতুরাজ স্বপ্নের সব রঙকে ওড়ার স্বাধীনতা এনে দেবে। কিন্তুু প্রকৃতির ছয় ঋতুর থেকেও বেশী রঙিন রামধনুকে আশ্রয় করে বাঁচাতে চাওয়া 'সন্তানদল' অনাথ হল। এবার কি পিতৃহারা নাকি মাতৃহারা শোক? জানিনা, শুধু জানি রামধনু দলের সবচেয়ে শক্তিশালী কন্ঠটিও তাঁর কথা রাখেনি।

আপনার মতামত জানান