শিউলি মাখা পুজোর গান

কেয়া মুখোপাধ্যায়

 




"আয় রে ছুটে আয় পুজোর গন্ধ এসেছে/ ঢ্যাম-কুরকুর ঢ্যাম-কুরাকুর বাদ্যি বেজেছে/ গাছে শিউলি ফুটেছে, কালো ভোমরা জুটেছে/ আজ পাল্লা দিয়ে আকাশে মেঘেরা ছুটেছে...।”
একটা ছোট্ট কালো গোল ই.পি. রেকর্ড ঘুরে চলেছে গ্রামোফোনে আর খুব মিষ্টি গলার এই গান, এই সুর ছড়িয়ে পড়ছে সারা ঘর জুড়ে। সেইসঙ্গে একটা ছোট্ট মেয়ে ওই সুর আর গানের তালে দুলে দুলে নাচছে। পুজোর স্মৃতি বললেই এই ছবিটা মনে পড়ে খুব। সেবার পুজোয় আমার কাকু উপহার দিয়েছিলেন ওই রেকর্ড। এটাই ছোটবেলার পুজোর সবচেয়ে পুরনো সোনালি স্মৃতি। পুজোর ক'দিন আগে থেকে শুরু হয়ে গোটা পুজো জুড়ে আর তারপরেও ওই গানের রেশ থেকে গিয়েছিল। আজও আছে।

আমার ছোটবেলা কেটেছে উত্তর কলকাতার শোভাবাজার অঞ্চলে। একান্নবর্তী পরিবার। বাড়ি-ভর্তি লোকজন, আত্মীয়-প্রতিবেশীর আনাগোনা লেগেই আছে- সব মিলিয়ে সারাবছরই একটা উৎসবের পরিবেশ। তবু শরৎকালটা ছিল একেবারে আলাদা, স্পেশ্যাল! কী করে বুঝতাম শরৎ এল? আকাশের ধূসর, গোমড়া মুখটা পাল্টে গিয়ে কি রকম ঝকঝকে নীল হয়ে উঠত। সেই নীল-জুড়ে ভিড় করত তুলোর মত সাদা মেঘেরা। রোদ্দুরটাও কেমন যেন মায়ামাখা, সোনা-রঙা। আর তার মধ্যে কোন এক শনিবার কাকু বলতেন, আজ বইগুলো সব রোদে দিতে হবে। কাকুর ঘরে দেয়ালজোড়া আলমারি আর তাতে অগুন্তি বই। তিনতলার ছাদে সব বই নিয়ে এসে রোদ খাওয়ানো চলত। নিজেই করতেন সব। আমি একটা বেতের গোল চেয়ারে বসে দুলে দুলে দেখতাম। আমার কাজ ছিল পাহারাদারির। কাক না আসে, বেড়াল না লাফায়- এইসব দেখা। কাকু দুর্দান্ত ছবি তুলতেন। সব বইয়ের পর, অনেক ছবিওলা অ্যালবাম আর রঙিন স্লাইডের বাক্স- তারাও গুটি গুটি আসত রোদ খেতে। সব রোদে দেওয়া হয়ে গেলে, আকাশের দিকে ভাল করে তাকিয়ে বলতেন –‘নাহ্, আর বৃষ্টি হবে না। শরৎ এসে গেছে।’ বাবাও এসে যোগ দিতেন এই কর্মকান্ডে। হঠাৎ আবৃত্তি করে উঠতেন,
‘তোমার ছুটির খেয়া বেয়ে
শরৎ এল মাঝি।
শিউলি-কানন সাজায় তোমার
শুভ্র ছুটির সাজি।’
আর অমনি ওই বইয়ের পাঁজা, ছবির অ্যালবাম আর রঙিন স্লাইডের বাক্স ছুঁয়ে ঝলমলে সোনা- রঙা রোদ আর একরাশ খুশি নিয়ে আমার মনেও হুটোপুটি করে এসে পড়ত শরৎ।

শরৎ মানেই শিউলির গন্ধ আর আলো মাখা মহালয়ার ভোরে আলোর বেণুতে দুগ্গা ঠাকুরের আবাহন- ‘অন্তরে যা লুকিয়ে রাজে/ অরুণ বীণায় সে সুর বাজে/ এই আনন্দযজ্ঞে সবার মধুর আমন্ত্রণ।’ শরৎ মানে পুজোর ধূপ, ধুনো আর কর্পূরের গন্ধ, ফুলের গন্ধ, দূর থেকে ভেসে আসা ভোগ রান্নার গন্ধ, অঞ্জলি, সন্ধিপুজোর ঝলমলিয়ে ওঠা একশো আট প্রদীপের আলো আর সেই আলো আর ধুনোর গন্ধ মেখে চোখ মেলা একশো আট কমলমুকুলদল। শরৎ মানে উৎসব, উৎসব মানে পুজো আর পুজো মানেই পুজোর গান।

শারদোৎসবই বাংলা গান প্রকাশনার সবচেয়ে বড় পর্ব। পুজোর নতুন জামা-জুতোর মতই পুজোর বাজারের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল পুজোর গানের রেকর্ড কেনা। শ্রোতারা বিশেষ আগ্রহ নিয়ে অপেক্ষা করতেন শারদ-সংগীতের জন্য৷ শিল্পীরাও তাঁদের সেরা গানটা পুজোতেই গাইতে চাইতেন। বাড়িতে আর পাড়ার মন্ডপে মন্ডপে বাজত পুজোর গান৷ পুজোর নতুন গান নিয়ে সেই উৎসাহ-উদ্দীপনা এখন অনেকটাই যেন স্তিমিত। তবে বাঙালি কিন্তু এখনও নস্ট্যালজিক শারদোৎসবের গান নিয়ে। আর এ ব্যাপারে ২০১৪-র আলাদা একটা গুরুত্ব আছে। এ বছর পুজোর গানের একশো বছর।

সেটা ১৯০১ সালের জুলাই মাস। কলকাতা তখন ভারতের রাজধানী। গ্রামোফোন অ্যান্ড টাইপরাইটার কোম্পানির জন ওয়াটসান হড ভারতে এলেন। উদ্দেশ্য, এ দেশে গানের বাজার তৈরির সম্ভাবনা খতিয়ে দেখা। বিচক্ষণ হড সাহেব ভারতে এসেই বুঝলেন এ দেশে গানের বাজার তৈরির একটা বিপুল সম্ভাবনা আছে। বিলেতের কোম্পানীকে বললেন, কলকাতায় একটা অফিস খোলা দরকার। তিনি বিলেত থেকে ডেকে নিলেন রেকর্ডিংয়ের কারিগর ফ্রেড গেইসবার্গকে। নভেম্বরে কলকাতায় খোলা হল অফিস। সে কালে বাবুরা গান শুনতে যেতেন হয় থিয়েটারে, নয়তো বাঈজি বাড়িতে। ঘরে বসে গান শোনার উপায় ছিল না। সেইসব গান রেকর্ড করে বিত্তবান বাঙালিদের বাড়িতে পৌঁছে দিতে তৎপর হলেন হড আর গেইসবার্গ। স্থানীয় শিল্পীদের যোগাযোগ করতে সাহায্য করলেন ক্লাসিক থিয়েটারের অমরেন্দ্রনাথ দত্ত। ১৯০২-এর ৮ই নভেম্বর প্রথম রেকর্ডিং হল। গ্রামোফোন কোম্পানির ব্যবসার মোক্ষম ক্যাচলাইন- 'সুখি গৃহকোণ, শোভে গ্রামোফোন।' আস্তে আস্তে সম্পন্ন বাঙালি পরিবারের নতুন আসবাব হয়ে উঠল গ্রামোফোন, আর রেকর্ড।

সেসময় সেপ্টেম্বর কি অক্টোবর মাসেই সাধারনত রেকর্ডের গানগুলি বেরোতো। হয়তো শারদোৎসবের কথা মাথায় রেখেই। কিন্তু 'পুজোর গান' বলা হত না তখনও। ১৯১৪ সালের সেপ্টেম্বরে প্রথম শারদ উৎসব উপলক্ষে গ্রামোফোন কোম্পানি প্রকাশ করল সতেরোটি রেকর্ডে বাইশটি বাংলা গান, সেই সঙ্গে দুটি কমিক। সেই প্রথম বিজ্ঞাপনে লেখা হয় 'শারদীয়া পূজা উপলক্ষে।' হাফটোন ব্লকে ছাপা বিজ্ঞাপনটির একদিকে সেই বিখ্যাত গ্রামফোনের সামনে প্রভুভক্ত কুকুরের লোগো, তার নিচে লেখা- ‘নূতন ১০ ইঞ্চি ডবল-সাইডেড ভায়োলেট (ধূমলবর্ণ)লেবেলযুক্ত বাঙ্গালা গ্রামোফোন রেকর্ড, প্রতিটির মূল্য ৩ টাকা ১২ আনা। 'শারদীয়া পূজা উপলক্ষে' প্রকাশিত গানগুলি ছিল মূলত আগমনী গান, ভক্তিগীতি বা কীর্তন। সেইসব গানে প্রতিফলিত হল বাংলা গানের তৎকালীন অভিমুখ। প্রথম বছরের শিল্পীরা ছিলেন- মানদাসুন্দরী দাসী, নারায়ণচন্দ্র মুখার্জী, কে মল্লিক, কৃষ্ণভামিনী, চণ্ডীচরণ বন্দোপাধ্যায়, শশীভূষণ দে আর বেদানাদাসী। অভয়াপদ চট্টোপাধ্যায় করেছিলেন হাসির গানের রেকর্ড। কে মল্লিকের কণ্ঠে আগমনী গান— ‘গিরি এ কি তব বিবেচনা’ আর ‘কি হবে কি হবে উমা চলে যাবে’ পরবর্তীকালে রেকর্ড করেছেন রামকুমার চট্টোপাধ্যায়। পুজোর সময় রেডিও বা টিভিতে আজও এই গান বাজে। বেদানাদাসীর গাওয়া ‘গয়লা দিদি লো’ আর ‘আমি এসেছি এসেছি বঁধু হে’, অথবা চণ্ডীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘যেওনা যেওনা ব্রজেরি ললনা’ — সেসময়ে খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। সম্ভ্রান্ত পরিবারের মহিলাদের মধ্যে দেশবন্ধু চিওরঞ্জন দাশের বোন অমলা দাশ প্রথম রেকর্ডে গান করেন। ১৯১৪-র পুজোতে তিনি রেকর্ড করেন রবীন্দ্রনাথের ‘হে মোর দেবতা’ আর ‘প্রতিদিন আমি হে জীবনস্বামী।’ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের বছরগুলোতেও শারদীয় গান প্রকাশ অব্যাহত ছিল। এভাবেই শরতের সোনা রোদ মেখে শুরু হল শারদ-গানের সম্ভারের পথ চলা। সে গান শুনতে শুনতে বড় হয়ে উঠল কয়েক প্রজন্মের বাঙালি। তাদের হাসি-কান্নায়, হৃদয়ের তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে অনুরণিত হতে থাকল সেইসব গান।

বাংলা গানের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি পালাবদলের সাক্ষী বিশ শতক। বিশ শতকের প্রথম দশকে এলেন গ্রামোফোনে রেকর্ডে পুজোর গান করতে এলেন গোপেশ্বর বন্দোপাধ্যায়, গওহর জান, লালচাঁদ বড়ালের মত প্রবাদ-প্রতিম শিল্পীরা। এর পরের দশকে কন্ঠের সম্পদ নিয়ে পুজোর গানে এলেন আশ্চর্যময়ী দাসী, এম এন ঘোষ (মন্তা বাবু), আঙ্গুরবালা, ইন্দুবালা, কৃষ্ণচন্দ্র দে, পঙ্কজকুমার মল্লিক, কমলা ঝরিয়া, ধীরেন্দ্র নাথ, দিলীপকুমার রায় প্রমুখ। এ যেন ছিল বাংলা গানের জগতের রেনেঁসা।
প্রাণের গানে যেমন আমাদের ভালোবাসার প্রকাশ, তেমনি প্রতিবাদেরও। তাই দেশে যখন স্বাধীনতা আন্দোলন ক্রমশ তীব্রতর, তার জোয়ার এসে লাগলো পুজোর গানে। ১৯২২ সালে পুজোর গানের অনেকগুলিই ছিল স্বদেশচেতনার গান। সমবেত কন্ঠে রেকর্ড হল- ডি এল রায়ের ' বঙ্গ আমার জননী আমার,’ হরেন্দ্রনাথ দত্ত রেকর্ড করলেন- ‘বন্দে মাতরম’ আর রবি ঠাকুরের ‘দেশ দেশ নন্দিত করি।’ ১৯২৫ সালের পুজোয় প্রথম প্রকাশিত হল কাজি নজরুলের গানের রেকর্ড, হরেন্দ্র নাথ দত্তের কন্ঠে- ‘জাতের নামে বজ্জাতি।’ এর পরে বিভিন্ন শিল্পীর কন্ঠে গাওয়া নজরুলের অনেক গানই পুজোর সময় প্রকাশিত হয়।

স্বল্প পরিসরে সবটুকু ছোঁয়া সম্ভব নয়। তারই মধ্যে বিশেষ উল্লেখযোগ্য, চল্লিশের দশক থেকেই পুজোর গানের জন্য শ্রোতারা উন্মুখ হয়ে উঠলেন। পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে এই উন্মাদনা একেবারে তুঙ্গ স্পর্শ করল। শুরু হল বাংলা আধুনিক গানের স্বর্ণযুগ। হিরণ্ময় কন্ঠ নিয়ে এলেন গায়ক-গায়িকারা, আর তাঁদের সঙ্গে যোগ দিলেন অসামান্য প্রতিভাময় সুরকার ও গীতিকাররা।

১৯৩৭ নিঃসন্দেহে এক মাইলস্টোন। এবছরই পুজোর গানে আত্মপ্রকাশ হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের, 'জানিতে যদি গো তুমি' আর 'বল গো বল' এই দুটি গান গেয়ে। বাকিটা ইতিহাস। পরের চার দশক ধরে তিনি আপামর বাঙালির অপরিহার্য শিল্পী, পেলেন অফুরান ভালোবাসা। ১৯৪০-এর পুজোয় সুরসাগর হিমাংশু দত্তের সুরে প্রকাশিত হল 'ছিল চাঁদ মেঘের পারে'। গেয়েছিলেন গীতা দাশ। এই গান পরে রিমেকও হয়েছে। ১৯৪২-র পুজো মাতিয়ে দিল জগন্ময় মিত্রের বিখ্যাত নস্ট্যালজিক গান 'চিঠি।' ১৯৪৯-র শারদ উৎসবে সলিল চৌধুরীর সুরে হেমন্ত মুখোপাধ্যায় গাইলেন ‘গাঁয়ের বধূ’, ১৯৫০-এ অবাক পৃথিবী। জগন্ময় মিত্র গাইলেন ‘আমি দুরন্ত বৈশাখী ঝড়’, আর প্রবীর মজুমদারের সুরে ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের কণ্ঠে অমর হলো— ‘মাটিতে জন্ম নিলাম মাটি তাই রক্তে মিশেছে’। ১৯৫০-এই পুজোতে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় গাইলেন 'ওগো মোর গীতিময়।' ১৯৫২ সালের পুজোয় সুধীরলাল চক্রবর্তীর সুরে 'স্মৃতি তুমি বেদনা' গেয়ে বাঙালি হৃদয়ে নিজের জায়গা করে নিলেন শ্যামল মিত্র। পুজোর বাংলা গানে আর এক মাইলস্টোন ১৯৫৩। এই বছর পুজোয় প্রথম বাংলা আধুনিক গানের রেকর্ড করলেন মান্না দে। বাংলা গানের আর এক লিজেন্ডের সূচনা দেখল সেবারের পুজো। নিজের সুরে তিনি গাইলেন- 'কত দুরে আর' এবং 'হায় হায় গো'। ১৯৫৬-র পুজোতে শচীন দেববর্মনের গাওয়া 'মন দিল না বঁধু’ মন কেড়ে নিল; আর ১৯৫৭-র পুজোয় আপামর বাঙালিকে ভাসিয়ে নিয়ে গেলেন মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়- 'আমি এত যে তোমায় ভালোবেসেছি' গেয়ে।

শারদোৎসব বাঙ্গালির প্রাণের উৎসব। কিন্তু মাতৃভাষা বাংলা না হলেও পুজোর গানে শামিল হয়ে মাতিয়ে দিয়েছেন লতা মঙ্গেশকর-আশা ভোঁসলে। ১৯৫৮-তে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে লতা মঙ্গেশকর গাইলেন 'প্রেম একবারই এসেছিল জীবনে' আর তার পরের দু’বছর সলিল চৌধুরির সুরে- 'না যেওনা,' এবং ' ওগো আর কিছুই তো নাই। আশা ভোঁসলে ১৯৫৯-তে প্রথমবার মান্না দের সুরে পুজোয় রেকর্ড করলেন- ‘আমায় তুমি যে ভালো বেসেছো/ জীবনে যে তাই দোলা লাগলো।’

ষাটের দশকেও এইসব স্বর্ণকন্ঠের গায়ক-গায়িকারা প্রত্যেক বছর মাতিয়ে রাখলেন নিজেদের পুজোর গানের সম্ভার দিয়ে। অবিস্মরণীয়, কালজয়ী সেসব গান। পেলাম কিশোরকুমারকে। আজও ‘আমার পূজার ফুল’ বাজে মন্ডপে মন্ডপে। সেইসঙ্গে আমরা পেলাম আরও কয়েকজন অসামান্য শিল্পীকে- ইলা বসু, মাধুরী চট্টোপাধ্যায়, আল্পনা বন্দোপাধ্যায়, সবিতা চৌধুরি, গায়ত্রী বসু, নির্মলা মিশ্র, আরতি মুখোপাধ্যায়, সুবীর সেন, ভুপেন হাজারিকা, পিন্টু ভট্টাচার্য, নির্মলেন্দু চৌধুরি, দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, অখিল বন্ধু ঘোষ, মৃণাল চক্রবর্তী, তরুণ বন্দ্যোপাধ্যায় এবং আরও অনেকে। সত্তরের দশকে প্রযুক্তির কল্যাণে সাউন্ড রেকর্ডিং-এর দুনিয়াতে এল বৈপ্লবিক পরিবর্তন। গালার চাকতিকে সরিয়ে চলে এল অডিও ক্যাসেট। গান রেকর্ডিং অনেক সহজ হয়ে গেল। একটি ক্যাসেটে দশ-বারোটি গান অনায়াসে ধরে যায়। শুরু হল পুজোর গানের অ্যালবামের যুগ।

১৯৬৮ সালে প্রকাশিত হল রাহুল দেববর্মনের সুরে গৌরীপ্রসন্ন মজুমদারের কথায় আশা ভোঁসলের প্রথম পুজোর গান "এই এদিকে এসো, এসো না"। ওই বছরেই একই সাথে প্রকাশ হয় "যাবো কি যাবো না ভেবে ভেবে হায় রে"। শচীন ভৌমিকের কথায় ও নিজেরই সুরে রাহুল দেব বর্মনের প্রথম পুজোর গান- "মনে পড়ে রুবি রায়" প্রকাশিত হয় ১৯৬৯ সালে, আর তার সঙ্গে "ফিরে এসো অনুরাধা ভেঙ্গে দিয়ে সব বাধা"। দুটোই অসম্ভব জনপ্রিয় হয়।

পঞ্চাশ থেকে সত্তর, এমনকি আশির দশক পর্যন্তও পুজো উপলক্ষেই প্রকাশিত হত একরাশ নতুন গান। আর তার অধিকাংশই বাংলা গানের ইতিহাসে এখনও স্মরণীয়তম। তারপরে ছবিটা পাল্টে গেল। রবীন্দ্র-নজরুলসহ পঞ্চকবির স্রোত পেরিয়ে আধুনিক গানের স্বর্ণযুগ আর তার অবক্ষয়েরও সাক্ষী বিশ শতক। তবে নব্বইয়ের দশকে নতুন করে ভাবার আর ফিরে তাকাবার সঙ্কেতও এল। বাংলা গানের এই দারুণ খরার সময় ঝড় তুললো ‘তোমাকে চাই’। সুমন চট্টোপাধ্যায়ের ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু’, ‘মন খারাপ করা বিকেল’, ‘তিনি বৃদ্ধ হলেন’, গানওলা, ঘুমোও বাউণ্ডুলে সেই সময় আরো বেশ কিছু শিল্পীদের নতুন গান তৈরিতে প্রেরণা দিল। জীবনমুখী গান, পুরোন গানের রিমেক, রিমিক্স, কবিতার গান, বাংলা ব্যান্ডের গান- এইসব নানা আঙ্গিকে, নানা রূপে কখনো কখনো আমরা মুগ্ধ হলাম বাংলা গানের জাদু-কাঠির ছোঁয়ায়। আর এইসব পালা বদলের অন্যতম সাক্ষী শারদোৎসবের বা পুজোর গান। পুজোর গান এই বিশ শতকেই দেখেছে গ্রামোফোন থেকে সিডি সিস্টেম-এ বদল। গালার রেকর্ড থেকে কম্প্যাক্ট ডিস্ক হয়ে ভিসিডি। দেখেছে বাদ্যযন্ত্রের বিবর্তন, শব্দধারণের নতুনতর প্রযুক্তি, শিল্পীদের পাল্টে যাওয়া গায়কী, সেই সঙ্গে গান‍‌ নির্মাণের পালাবদলও।

কারোর শিশিরভেজা শরতের ছেলেবেলা জুড়ে আছে মান্না দে-হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গান, কারোর কাছে পুজোর গান মানে লতা-আশা-কিশোরকুমার, কেউ শিউলি-কুড়োনো ভোর খুঁজে পান সন্ধ্যা-আরতির গানে, আবার কারও কাছে পুজোর গান মানে সুমন-নচিকেতা। এ এক অপার বিস্ময়ের জগৎ। এভাবেই পুজোর গানের আয়নায় ধরা আছে আধুনিক বাংলা গানের বিবর্তনের এক অসামান্য চালচিত্র।

কয়েক বছর আগেও বাংলা পুজোর গানের বাজারে ছিল এক নেই-রাজ্য। নতুন গান প্রায় তৈরিই হচ্ছিল না, অধিকাংশ ছিল রিমেক। তবে এ বছর আবার অনেক নতুন পুজোর গান তৈরি হল। এ বছর সলিল চৌধুরির কিছু পুরনো গান গেয়েছেন লতা মঙ্গেশকর, সঙ্গে কিছু নতুন গানও। পঞ্চমকে মনে রেখে রাহুল দেববর্মনের সুর করা পুরনো কিছু গান আর নতুন গান গাইলেন আশা ভোঁসলে। প্রকাশ পেয়েছে মান্না দে-র প্রতি স্বাগতালক্ষ্মী দাশগুপ্তের শ্রদ্ধার্ঘ্য। সেইসঙ্গে এ বারের পুজোর গানে বহু দিন পরে ঢাকের কাঠি ছাপিয়ে ভেসে আসছে লোকগানের সুর। প্রতি বছর আধুনিক ও রবীন্দ্রসঙ্গীতের সংকলন নিয়ে শ্রোতাদের দরবারে যাচ্ছিলেন যে নামী শিল্পীরা, এ বার সেই নিয়ম ভাঙতে তাঁরা কয়েকজন লোকগীতির হাত ধরেছেন। এটুকু বাদ দিলে, শ্রীকান্ত আচার্য, নচিকেতা, বাবুল সুপ্রিয়, কুমার শানু- সকলেই বেসিক গান নয়, আশ্রয় নিয়েছেন রবীন্দ্রনাথের গানে। সময়ই বলবে কেমন হল এ বছরের পুজোর নতুন গান।

বেশ কয়েকবছরের ব্যবধানে গতবছর পুজো কেটেছিল কলকাতায়। সে ছিল বৃষ্টিস্নাত শরতের বৃষ্টিস্নাত পুজো। পুজোকে ঘিরে অনেক প্রতিযোগিতা, অনেক পুরস্কার এখন। পুজো প্রাঙ্গণগুলো ঘরোয়া ইমেজ ছেড়ে যেন হয়ে উঠেছে এক একটা আর্ট গ্যালারি। ‘থিম পুজোর’ প্রস্তুতি শুরু কয়েক মাস আগে থেকেই। আজও বাৎসরিক স্বপ্ন নিয়ে মানুষ ভিড় করে দোকানে-দোকানে উৎসবের নতুন সাজে। কিন্তু পছন্দের দোকান এখন সব ঠান্ডা শপিং মলগুলোতে। বদলে গেছি আমরাও। পুরনো রেস্তোরাঁর বদলে পছন্দের তালিকায় এখন জায়গা করে নিয়েছে নতুন রেস্তোরাঁ। ভাবছিলাম, এই ভুবনীকরণের দুনিয়ায়, ফেসবুক-টুইটারের কলকাতায় কি পুজোর গান নিয়ে আলাদা কোন উন্মাদনা আর আছে এখন? সিসিডি, বরিস্তা কি ফাইভ-স্টার কফিশপের চলতি- হাওয়ার-পন্থী কলকাতা কি পুজোর গান কেনে আজও? সাউথ সিটি, রাসবিহারী কি এসপ্ল্যানেডের নামী মিউজিকের বিপণীগুলোতে পুজোর নতুন গানের সেরকম কোন চাহিদা দেখিনি। তাঁরা বললেন, আজও পুজোর গানের মধ্যে সব থেকে বেশি চাহিদা পুরনো দিনের বিভিন্ন গানের সংকলন। লতা, আশা, কিশোর, হেমন্ত, মান্না থেকে ঢাকের বাদ্যি এখনও দখল করে আছে প্রথম পছন্দের স্থানটি। আজও বাঙালি আবিষ্ট পুরনো গানে। আসলে ‘এ কলকাতার মধ্যে আছে আরেকটা কলকাতা,’ আর সেখানকার বাসিন্দা ফেসবুক-টুইটারের বাঙালিরাও সেই জাদু থেকে মুখ ফেরাতে পারেননি।

এই প্রথম পুজোতে মান্না দে নেই। হেমন্ত মুখোপাধ্যায় প্রয়াত হয়েছেন পঁচিশ বছর হল। তবু সারেগামা ইন্ডিয়ার কর্ণধারের কথায়, এঁরা আজও সঙ্গীত-অনুরাগী আপামর বাঙালির কাছে ‘অমূল্য কোহিনুর।’ তাই এ বছর পুজোর গানের শতবর্ষকে মনে রেখে যে স্মারক অ্যালবাম প্রকাশ করা হবে, সেখানেও উজ্জ্বল উপস্থিতি থাকবে পুরনো গানের, আর পুরনো শিল্পীদের।

শিউলির গন্ধ মাখা ভোরবেলা যখন শরৎ এসে কড়া নাড়ে মনের দরজায়, তখন স্মৃতির পর্দা সরিয়ে এক ঝাঁক গান পুজোর গান এসে ভিড় করে বুকে, আজও। ৫৭ বছর আগের পুজোতে রেকর্ড করা ‘আকাশ প্রদীপ জ্বলে দূরের তারার পানে চেয়ে’-র সুর আজও মনে দোলা দিয়ে যায়। বাঙালির প্রতিদিনের জীর্ণ যাপনে শরৎ আর এইসব শারদীয়া গান যেন এক আশ্চর্য স্বপ্ন আর মায়াবি আলো নিয়ে আসে। আমাদের উৎসবে আর আনন্দে, নিঃসঙ্গ জীবনে অথবা আন্তরিক ভালোবাসায় পুজোর গানের এই অর্ঘ্য চিরকালীন উষ্ণতায় উজ্জ্বল।
------------------------------------------------------------
তথ্য সহায়তাঃ এইচএমভি শারদ-অর্ঘ্য, এস.এফ. করিম (সারেগামা ইন্ডিয়া), সতীনাথ মুখোপাধ্যায়

আপনার মতামত জানান