উৎসব শেষ, শেষ?

সরোজ দরবার

 


ফটো- বিক্রমাদিত্য গুহ রায়


১। ‘সামলে সামলে...দেখ উপরে গাছের ডাল আছে...মুকুটে লাগছে...বাঁদিকটা...বাঁদি কটা দেখ, ওদিকে ঝুঁকে আছে...সাবধানে...’
২। ‘ছোটগুলো একজায়গায়...ওদিকটায়...সব কাঠামো উপর উপর রাখ...খড় পাশে...সব একদিকে...’
ব্যবধান মোটে দিন কয়েকের। ১ আর ২-এর মাঝখান দিয়ে কখন যেন ফুড়ুৎ করে উড়ে গেছে বাঙালির পুজোনির্ঘণ্ট। চাঁদা চুকানো বিল দাদার পকেট থেকে দলা পাকিয়ে ডাস্টবিনের দিকে গড়িয়ে যাওয়ার দিন থেকেই দৈনিক মজুরীতে পাট পাট করে খোলা হচ্ছে মণ্ডপ। শিল্প ও শিল্পীর খেল খতম। শারদ সম্মানের মায়া-মোহ ক্লাবঘরে তালাবন্ধ হয়ে গেলে পড়ে থাকে নিছক কয়েকটা বাঁশ। সেগুলোই সরে যাচ্ছে এক এক করে(ডিকনস্ট্রাকসন?!)। রাস্তার দু’ধার থেকে হাসি হাসি শুভ-শ্রী উধাও।ঢাউস ফ্রেমগুলো এখনও কয়েকটা হাটখোলা জানলার মতো হাঁ করে আছে। রেস্তরাঁর মেনুকার্ড গুলো পুজো স্পেশাল থেকে সব নর্ম্যালের পথে। হাতে গোণা যে কটা ‘পুজোয় ইন’ পোশাক এখনও দোকানের শোকেসে রয়ে গেছে, সেগুলো আপাতত ভাতৃদ্বিতীয়ার র্যা পারে মুড়ে তুলে রাখা। রিক্সা-অটো ভাড়া দশ থেকে আবার আটে। খাটের উপর পুজোসংখ্যারা সব ঈষৎ অবিন্যস্ত অবস্থায় এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে। কোনটা হাফ কমপ্লিট, কোনটায় চোখ বুলনো হয়েছে। এর মধ্যেই বিকেলে শোলার কদমফুলের আহ্বানে স্টিকারে স্টিকারে চরণচিহ্ন রেখে লক্ষ্মীদেবীও ঘুরে গেলেন। প্যাকেটে পড়ে থাকা দু’একটা খইয়ের মোয়ার প্রতি পিঁপড়েদের অভিসার দেখতে দেখতে বাঙালি বুঝে যায়, আর টেনে নিয়ে লাভ নেই, পুজোখানা এবারের মতো সত্যি শেষ।
সত্যি, সহজে কি শেষ করে দিতে মন চায়। এমন সর্বংসহা দিন, না চাহিলে যারে পাওয়া যায়, তারে সহজে ছেড়েই বা দেব কোন দুঃখে? বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের চণ্ডীপাঠেই তো বাঙালি মনে মনে পুজোর ফিতে কাটে। ‘ধরণীর বহিরাকাশে অন্তর্হিত মেঘমালা’ শুনলেই ধমনীর ভিতর পুজো আসছে পুজো আসছে ঝিঙ্গালালা। তারপর ওই দিন চারেক তো প্রায় কাল্পনিক স্তরের। ভোর অবধি মাইকের আওয়াজ কানে লাগে না, ভিড়ের ধাক্কা গায়ে লাগে না, ফোস্কার জ্বালা পায়ে লাগে না... এমনকী সিরিয়ালের পুজো স্পেশালে শাশুড়ি-বউয়ে ঝগড়া লাগে না দেখে শেষমেশ নবমীর একডালিয়ার উল্টোদিকে যেন থ’ মেরে বসে পড়ল মার্কেজের ম্যাজিক রিয়ালিজমও। এই কি কলকাতা? পিলপিল করে লোক, এ ওর কাঁধে হাত দিয়ে রাস্তা পেরোচ্ছে সিংহি পার্কে ঢুকবে বলে। অথচ বাসের পিছনের সিটে পাঁচজন না ছ’জন সে নিয়ে এদের মধ্যেই কেউ কেউ ক’দিন আগেও বেদম তক্কো করেছে। হীরের গয়না দেখতে গিয়ে মন্ডপের পার্কিংয়ে দুই বাবুর গাড়িতে যে একটু ঠোকাঠুকি হয়ে গেল, তার প্রতিক্রিয়ায় একটা গালাগালিও বেরোল না। বরং একটু চোখাচুখিতে হাসি হাসি মিটে গেল ঝামেলা। নেতারাও কয়েকজন এই যোগে অভিযোগ ভুলে টুলে উদ্যোক্তার লক্ষ্য নিয়ে পক্ষ-প্রতিপক্ষ সকলকেই সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। বিরিয়ানির কোয়ালিটি ঝাড় খেলেও, রেস্টুরেন্টে ঝাড়বাতির আলোচনাতেই সব চাপা পড়ে যাচ্ছে। বিরক্তি নেই। ঝুট ঝামেলা নেই। মামলা নেই। রায় নেই। ছেলে ঢুকিয়ে দেওয়া নেই। ম্যাডক্স থেকে আইকন, ‘১৩ পার্বণ’ থেকে ‘চতুষ্কোণ’ যেন অলীক সুখের ঠিকানা।এহেন ম্যাজিক মোমেন্টকে তো আরও কিছুদিন তারিয়ে তারিয়ে মাখা কতবেলের মতো চাখতে পারলে ভালোই হত। কিন্তু এ তো রোজকার জীবনের বাস্তবতা নয়। উৎসবে যা বাস্তব, বাস্তবে তা শুধুই উৎসব। সুতরাং উৎসব ফুরোলে আবার ঘাম-গরমে ভ্যাপসা জীবনের জোয়াল টানা শুরু।

আগে একবার ভেবেছিলাম, এমনটাও বাস্তব হতে পারে- ধরা যাক গরীব ব্রাহ্মণ হরিহর ফিরে যাচ্ছে তার গ্রামে। শহরের নামী পুজোয় পৌরোহিত্যের দৌলতে বেশ কিছু অর্থ এসেছে হাতে। পুজোর আগে ধার দেনা করে যে জামাকাপড়গুলো কেনা হয়েছিল, বাড়ি ফিরেই নগদে সে সব চুকিয়ে দিয়েছেন। ভালো মন্দ রান্নার গন্ধ ভাসছে তার ছোট্ট একচিলতে ঘরে। ওই গ্রামের ঢাকি সত্যর ও চোখে মুখে খুশি খেলছে। না, শুধু টাকার জন্য নয়। জন্ম থেকেই সে ঢাকে কাঠি দেয়। কিন্তু তাই বলে তো তাকে কেউ কখনও শিল্পী বলে না। কিন্তু শহরের পুজোর বিচারক তালবাদ্যের নামী শিল্পী তার ঢাক শুনে থমকে দাঁড়িয়েছেন, পিঠে হাত রেখে বলেছেন, কেয়া-বাত! এ আনন্দ হরিহর ঠিক বুঝবে না, তবে বুঝেছে ভিনগ্রামের একদল ছেলে। এই ক’মাস তারা শিয়ালদা স্টেশনের পাশে একটা ঘুপচি ঘরে ঠাসাঠাসি করে রাত কাটাত। আর সকাল হলেই লেগে পড়ত প্যান্ডেলের কাজে। তাদের নাম অবিশ্যি কোথাও নেই, তা হোকগে, যে আর্টিস্টের ভাবনায় তারা কাজ করছে, তার মনে ধরেছে এদের কাজ। পরের পুজোর জন্য ওই আর্টিস্টের দলে তারা বুকড। হাতে দুটো পয়সাও আছে। আমাদের ডাকাবুকো ইন্দ্রনাথ গঙ্গার বুক থেকে পাঁচটা প্রতিমার কাঠামো টেনে তুলেছে। বিক্রি হলে কিছু টাকা আসবে। না হলে জ্বালানি। যাই হোক না কেন, অন্নদা দিদির তো সুরাহা হবে খানিকটা। এদিকে সেই ঋণগ্রস্ত বাড়ির মেয়ে কালিও জল থেকে কুড়িয়ে এনেছে প্রতিমার জামাকাপড়। তার সেজদি ললিতা সেগুলো মেলে দিয়ে এসেছে শেখরদার ছাদের বারান্দায়। কালির পুতুলের বিয়েতে ওগুলোই মস্ত কাজের জিনিস। মনটা একটু খারাপ ছিল বনপলাশীর উদাসের। সে গ্রাম তো আর নেই। তাই পালাও হল না। তাতে কি! গান পাগলা লোক সে। শহর থেকে আশা গাইয়েদের হোল নাইট ফাংশনের গান একবার শুনেই সে তুলে নিয়েছে। নতুন সুর গাইতে গাইতে দিব্যি এবড়ো খেবড়ো রাস্তা দিয়ে তার পক্ষিরাজ বাস ড্রাইভ করছে।
এবারে ভাবছি বাস্তবটা এরকম হলেই বা মন্দ কী হত- যদি চাইল্ড ট্রাফিকিং রুখে দেওয়া ‘রাকা’ পুজোসংখ্যা থেকে বেরিয়ে সত্যি শহরের দৌরাত্ম্য বন্ধ করত। কিংবা ‘তৃতীয় বিশ্বের ইস্টুজিস্টু’র জাঁতাকলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে আসতে পারত ‘রতন ঘোষ’। বা ঝিল বোজানোর বিরুদ্ধে আন্দোলন করতে গিয়ে ট্রাকের চাকায় পিষে যাওয়া ‘মুকুট’ যদি তার ‘মৌলি’কে সঙ্গে নিয়ে এসে বলত- হোক কলরব।
অথচ এ সব কিছুই হওয়ার নয়। দিনের হিসেব মিলিয়ে উৎসব শেষ করে ফেলেছি আমরা। এবার কি তবে ভেদাভেদ? অভেদাবলীর সূত্র বাঙালির আয়ত্তে নেই বলে পুজোর আগে তো প্রায় ডিসক্লেমার দিয়ে বলা হত-আসুন ভেদাভেদ ভুলে আমরা মিলনের উৎসবে সামিল হই। সে উৎসবকে আমরা বিদেয় দিয়েছি। প্রাণে খুশির তুফানকে ধরে রাখার মতো হিম্মত আমাদের নেই। সুতরাং আবার কি সেই কূটকাচালি আর রাজনীতির পাঁচালি? আবার কি সেই অ্যাসিড ছোঁড়া আর শ্লীলতাহানি? আবার কি সেই দিনদুপুরে গরীবদের উপর রাহাজানি?
ভাবলে বিষণ্ণতা আসে বইকি। ভাঙা মন্ডপ দেখে নয়, যতটা নিজেদের ভাঙাচোরা অবস্থার কথা মনে করে। যে দিনগুলোকে অলীক বাস্তব বলে মনে হয়, তাকেও সম্ভব করে তুলেছিলাম তো আমরাই। পৌত্তলিকতা কি এখনও ততোবড়ো আশ্রয়? মনটাও কি অদ্ভুত এক ক্ষমতায় নিজেরাই পালটে ফেলতে পারিনি? তাহলে সেটাকেই বা কোন আদিগঙ্গায় বিসর্জন দিলাম? খাগড়াগড়ের আতঙ্ক থেকে শুরু করে নিজেদের মধ্যেই কলকাঠি নাড়াগুলো বন্ধ রাখলে উৎসবেরও কি অকালবোধন হয় না?
মনে হয়, হয় না। কিছুই বদলায় না। সব রঙ ফিকে হয়ে গেলে পড়ে থাকে একরাশ ভনিতা। উৎসব নামের মুখোশ ঝুলে থাকে সময়ের দেওয়ালে, আমাদের মুখগুলো শুরু করে দেয় তাদের নিজস্ব খেলা। আলো নেভে। কাঁধের উপর থেকে সরে যায় অচেনা হাতের বন্ধুতা। কোথায় যেন হারিয়ে যায় হারমোনিয়াম, হারিয়ে যায় গানের খাতা। আবার আমাদের নিজস্ব ঘরগুলো ‘জনমানবশূন্য’ হয়ে ওঠে। এক এবং একাকীর সমস্ত কামনা-বাসনা-উদ্দেশ্য-ল ক্ষ্য-স্বার্থ গুলোকে নিয়ে উৎসব থেকে ক্রমশ দূরে সরতে সরতে আমরা বুঝতে পারি-
‘জনমানব শূন্য ঘরে
ছড়িয়ে আছে পাকুড়পাতা
কোথায় তোমার হারমোনিয়াম
কোথায় তোমার গানের খাতা?

উচ্ছেগাছে কাঁপছে ফিঙে
ধানের মাঠে বৃষ্টি পড়ে
ভুতের মতো চাঁদ উঠেছে
জনমানবশূন্য ঘরে।’ (শ্যামলকান্তি দাশ)

আপনার মতামত জানান