সন্ত্রাস ও একটি শহর

ইন্দ্রনীল বক্সী

 



ঘটনা এরকম , বর্ধমান জেলার সদর শহর বর্ধমান । শহরের প্রান্তিক একটি অঞ্চল ,নাম ‘খাগড়াগড়’ , সেখানে দূর্গাপূজার মধ্যেই একটি বাড়ির দোতলায় একদিন একটি প্রচন্ড বিস্ফোরণ ঘটলো । আশেপাশের মানুষজন চমকে উঠলো সেই বিস্ফোরণের শব্দে । তারা প্রাথমিক হতচকিত অবস্থা কাটিয়ে প্রতিবেশীসুলভ উদ্বেগে ছুটে গেলো সেই বাড়িতে । বাড়ির দুই মহিলা তখন গেট আটকে দিয়ে তাদের ভিতরে ঢুকতে বাধা দিলো , হুমকি দিলো । বলল গ্যাস সিলিন্ডার ফেটেছে ,তাদের ব্যাপার তারাই বুঝে নেবে । প্রতিবেশীরা ফায়ার বিগ্রেডকে খবর দিলো । তাদেরকেও ঢুকতে বাধা দেওয়া হলো । সন্দেহ ঘনীভূত হতে লাগলো । পুলিশে খবর গেলো । এরমধ্যে স্থানীয় উৎসাহী কিছু যুবক লুকিয়ে দেখলো দুই মহিলা মেঝেতে পড়ে থাকা রক্ত পরিষ্কার করার চেষ্টা করছে । পুলিশও প্রাথমিক বাধা পাওয়ার পর ভেতরে ঢুকলো ।
এরপর যা ঘটেছে তা তখন ‘পুজোপরিক্রমা’ দেখাতে ব্যাস্ত বৈদুতিন মাধ্যম ও পুজোর ছুটিতে বন্ধ ছাপা সংবাদপত্র দু-তিন দিন পর থেকে নিরন্তর জানিয়ে চলেছে ,তাই ঘটনার বিশদে গিয়ে পুনরাবৃত্তি করা থেকে বিরত থাকছি । মোটামুটি সবাই জানেন ।
পুজোর হুল্লোর কেটে যেতেই বর্ধমান শহরবাসীর আলোচনার কেন্দ্রে ঘটনাটি । প্রাত্যহিক যাপনের
কল্লোলের মধ্যেই ধীরে ধীরে বাসা বাঁধতে লাগলো একটা চাপা উদ্বেগ । আপাত নিস্তরঙ্গ শহরে এরকম ঘটনা এই প্রথম । শহরের শান্ত ও সমৃদ্ধ আবহকে বেশ নাড়িয়ে দিলো এই ঘটনা । অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো আরও কিছু ঠিকানা ,যা এই শহর বর্ধমানেই । রাস্তার মোড়ে, চায়ের দোকানে , আড্ডায় , ক্লাবে...যেখানেই দু চারজন জড়ো হচ্ছে, শুরু হচ্ছে গুঞ্জন ।

ঐতিহাসিকভাবে এই শহরের জনসংখ্যায় মুসলমান ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সহাবস্থানের ঐতিহ্য বহু প্রাচীন । অনেক ঘাত-প্রতিঘাতে পরীক্ষিত । বহু প্রজন্মের তাদের এই সহাবস্থান সাংস্কৃতিক ও আর্থিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধ করে চলেছে প্রাচীনকাল থেকে । না:, এই শহরের মূল নাগরিক জনসংখ্যার সম্প্রদায় ভিত্তিক অনুপাত অবৈধ অনুপ্রবেশ নির্ভর নয় । এবারেও এরকম এক নতুন বিপদের মধ্যেও শহরবাসীর পারস্পরিক হৃদ্যতা ,বিশ্বাস ,সহযোগিতা অটুট স্বাভাবিক কারণেই। কিন্তু ঘটনার অভিঘাতে আমার চেনা এই শহরের পরিচিত নাগরিক সুর মনে হলো কোথায় যেন একটু বেসুরো বাজতে লাগলো ...

ঘটনাক্রম ১ : পাড়ার আড্ডায় ঘুরে ফিরে একই আলোচনা । আর কি কি ,কোথায় কোথায় , কারা কারা ধরা পড়বে ! কি দরকার ছিলো এসবের ? এ শহরেও আর শান্তি রইল না । নেতারাও জড়িত , ‘ব্যাটা’দের বড্ড মাথায় তুলছিলো , এবার বোঝো !...ইত্যাদি...
দূর থেকে আড্ডার অভিন্ন হৃদয় বন্ধু এগিয়ে আসায় সবাই হঠাৎ চুপ করে গেলো । কারণ হঠাৎ মনে পড়লো বন্ধুটি মুসলমান ! তার সামনে বলা ঠিক হবে না ।

ঘটনাক্রম ২ : একটি ছেলে । যে বর্ধমানে জন্মেছে , বড় হয়েছে । একটি প্যাথলজি ল্যাবে চাকরি করে । তার সঙ্গে যখন কথা হচ্ছে এই নিয়ে । সেই বলল “ এরা মাদ্রাসায় কত বড় বড় কথা বলে ! এখন কি হলো বলুনতো ! এদের জন্য সবার বদনাম ...” জানালো তার মা তাকে বলে দিয়েছে সন্ধ্যায় তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে , এবং জানালো যে শহরে সে জন্মেছে –বড় হয়েছে সেই শহরের রাস্তায় বেরোনোর জন্য আজকাল সে ‘আইডি কার্ড’ সঙ্গে নিয়ে ঘুরছে । যদি পাছে পুলিশ দেখতে চায় !...

ঘটনাক্রম ৩ : একটি বছর কুড়ির মেয়ে , যে নিজে একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মচারী । আলোচনায় জানালো তাদের পাড়ায় তারাই শুধু মুসলিম । বাকি সব হিন্দুঘর , কিন্তু তারা তাদের খুব ভালোবাসে । কিন্তু আজ কাজে আসার সময় যখন সে বিবেকানন্দ কলেজ মোড়ে দাঁড়িয়েছিলো , তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বোরখা পরিহিতা একজনকে কয়েকজন নানান তির্যক উক্তি ছুঁড়ে দিচ্ছিলো । জানিনা ...মেয়েটি এর আগে কোনোদিন শুনেছে কিনা ,তার পাড়ায় কঘর হিন্দু ,কঘর মুসলমান !

ঘটনাক্রম ৪ : যে এলাকায় ঘটনা ঘটেছে ,সেই এলাকায় প্রায় প্রত্যেকেই আই ডি কার্ড বহন করছে ইদানীং । দিন নেই রাত নেই পুলিশের গাড়ি , এন আই এর গাড়ি আসছে । অন্য শহরের বন্ধুরা মস্করা করছে এই বলে “ দেখিস ভাই ! তোদের সঙ্গে বুঝেশুনে কথা বলতে হবে এবার থেকে ,কখন রকেট লঞ্চার বের করবি তার ঠিক আছে ! ” ওই এলাকার বাসিন্দা একজন জানালো তার মা কে রাস্তায় তিনবার নাকি বোরখা তুলে দেখেছে পুলিশ ! অনেকেই নাকি দাড়ি কেটে ফেলেছে । বোরখা নেওয়া ছেড়ে দিয়েছে এ কদিনে !

ঘটনাক্রম ৫ : রাতের দিঘির পাড়ের বড় শান বাঁধানো ঘাটের আড্ডায় একজন বেশ উদ্বিগ্ন ভাবে বলল “ এই কিছুক্ষণ আগে একটা ‘মুচলমান’ ফ্যামিলিকে দেখলাম গলির ধারে বসে খাচ্ছে ! কে জানে শালা কি মতলবে এসছে ...! ” একজন বলল “ শালারা খাবে এখানে, গান গাইবে পাকিস্তানের (!)” একটু বেলায় সেখানেই এক ঝুল পাঞ্জাবী ,খাটো পায়জামা , মাথায় টুপি , গালে দাড়ি মানুষ এলো, ইতস্তত ঘুরতে লাগলো , হয়তো একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য বসার জায়গা খুঁজছিলো । সদর শহরের কয়েকটি জেলার মধ্যে সবচেয়ে বড় ও ব্যস্ত সদর হাসপাতালের কাছে হওয়ায় এ সব দৃশ্য এখানে খুব বিরল কিছু নয় যদিও...সবাই চুপ করে দেখতে লাগলো । একজন মস্করা করে নিজেদের মধ্যে ফিস ফিস করে বলল “ এইরে শালা ! এখানেও বোমা লাগাতে এসছে নাকি ! ” নাঃ ...সন্ত্রস্ত মুখে নয় , বেশ আমুদে অভিব্যক্তিতে...

ঘটনাক্রম ৬ : পাড়ার স্থানীয় মসজিদের রয়েছে মুসাফিরখানা । দূর দূরান্ত থেকে আসা রুগীর বাড়ির লোকদের থাকার নাম মাত্র মূল্যে রাত গুজরানের ব্যবস্থা । বাইরে ফলক ঝুলছে , “নামাজি মুসলমান ছাড়া থাকতে দেওয়া হয়না ” । এক যুবক ঘুর ঘুর করছিলো মসজিদের সামনে যদি থাকার জায়গা পাওয়া যায় । সামনে মণিভাইকে দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করে “ ভাই , এখানে থাকার একটা ব্যবস্থা হবে ? ” মনিভাই বললেন “ দাঁড়াও দাঁড়াও ...আগে মসজিদের মাতওয়ালিকে জিজ্ঞেস করতে হবে !” মাতওয়ালি জানালেন উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আপাতত মুসাফিরখানায় কিছুদিন বোর্ডার নেওয়া বন্ধ রাখা হয়েছে । সাবধানের মার নেই... !!

এসব শুনে , দেখে কেমন মন খারাপ হয়ে যাচ্ছে । মনে হচ্ছে দেখার ভুল, শোনার ভুল , বোঝার ভুল । তাই যেন হয় । চারিধারে কানে আসছে চরম সব মতামত । যাদের আলাদা করে কোনোদিন চিহ্নিত করার কথা কখনও মনে হয়নি , সেই তারাই যেন কুন্ঠিত , লজ্জিত , উদ্বিগ্ন । কারণ ঘটনায় মৃত , আপাতজড়িতরা একটি সম্প্রদায়ের , ঘটনার পিছনে পিছনে আবিষ্কার হয়েছে ‘সন্ত্রাসের সূতিকাগার’ যার নাম ‘মাদ্রাসা’ ! ...এবং তাই তার দায় বর্তাচ্ছে নাকি এই শহরের একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের উপরেই । এ তাদেরও লজ্জা !
দেখে –শুনে মনে হচ্ছে শহরবাসী যত না সন্ত্রস্ত , তার থেকে বেশী আমোদ পাচ্ছে একটা নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে হীন প্রতিপন্ন করার যাবতীয় শাব্দিক আচরণে । না: এ শহরে তারা অন্তত ‘সংখ্যালঘু’ নয় , হলে কি এই আচরণ আরও তীব্র হতো ? ...আশঙ্কা হয় ।

না: , এদেশ কাদের , মাদ্রাসার আসল উদ্দেশ্য কি ! ‘আতঙ্কবাদী’ আঁকতে দিলে আমার ছেলে দাড়িওয়ালা – টুপি পড়া একজনকে আঁকবে কিনা – যেমন একসময় কালো পাগড়ি দেখলেই ‘উগ্রপন্থী’ বলে শিখদের পিছনে লাগতো অশিখরা , তেমন হাঁটুঝুল পাঞ্জাবী ,দাড়ি-টুপি মানেই ‘সন্ত্রাসবাদী’দের ইউনিফর্ম কিনা – শহরের শুধু একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়েরই লজ্জিত-শঙ্কিত হওয়াই উচিত কিনা – এসব ভাবছিনা , ভাববোনা ... শুধু বুঝছি আমার চেনা শহরটির ঘুস ঘুসে জ্বর এসছে...চিন্তা নেই , সেরে যাবে কদিনেই – জ্বরতো কোনো রোগ নয় ...রোগের উপসর্গ মাত্র !

আপনার মতামত জানান