দুনিয়া ডট কম

চৈতালি চট্টোপাধ্যায়

 

মুম্বাই থেকে কলকাতা রেলযাত্রা, নুন্যতম সময় লাগেপ্রায় ২৮ঘণ্টা, কখনও কখনও তার চেয়েও বেশি।তবে এই রেলযাত্রার মধ্যে কিন্তু অন্য এক রোমাঞ্চ আছে, বিভিন্ন প্রদেশের গ্রাম, চাষের জমি, পাহাড়, নদী ছুটে চলে চোখের সামনে,সন্ধ্যের সময় ঘন অন্ধকারকে ধর্ষণ করে যায় ছুটন্ত ট্রেন।রাজধানী বা দুরন্ত এক্সপ্রেস হলে এইসব অপরূপ শোভা দেখতে দেখতেইসময়মত আপনার সামনে খাবারও চলে আসবে,তার মাঝেই আবার হকারদের হাঁকও শুনতে পাওয়া যায়“খারাব সে খারাব চায়” অথবা “রামবিহারীর চায়”।খেয়ে দেয়ে পেট মোটা করে বার্থে উঠে ঘুম,সেই ঘুমের স্বাদই আলাদা,ট্রেনের দুলুনি অনেকটা মায়ের কোলের দোল খাওয়ার মত। সব মিলিয়ে ভারতীয় রেল যাত্রা এক আজব অভিজ্ঞতা।অঢেল সময়।মুম্বাই থেকে রায়পুর পৌঁছাতেই সময় লেগে যায় ১৭:৩০ ঘণ্টা, পাশের রাজ্যেই যাব১৭ ঘণ্টা সময় লাগবে, সত্যি আমাদের কত বড় দেশ!ভারতে এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তে যাতায়াত করার কথা মাথায় এলেই মনে হত ওরে বাব্বা কত্তদূর!! তবে হ্যাঁ ভারতীয় রেলযাত্রা চমকপ্রদ তখনই যখন মানুষের কোন তাড়া থাকবে না, বিশেষ করে পূজার ছুটিতে কলকাতা ভ্রমণে সময় খুব মূল্যবান, যাতায়াতেই যদি ৩ দিন লেগে যায়তবে জামা কিনবে কবে আর ঠাকুর দেখবে কবে? অগত্যা উড়োজাহাজের সাহায্য নিতেই হবে, তাতেও কিন্তু ২:৩০ ঘণ্টা সময় লেগে যায়।
মুম্বাই থেকে ইতালিতে গিয়ে দেখি সে কি সুন্দর ছোটো দেশ। উড়োজাহাজে ১:৩০ ঘন্টাতেই অন্য একটি দেশে চলে যাওয়া যায়, ভিন্ন দেশে যাওয়ার রেলের ব্যবস্থাও আছে।কিন্তু আমাদের রেলমাতৃক দেশ ভারতে অন্য দেশ তো দূরের কথা অন্য একটি রাজ্যে পৌঁছাতেই কত সময় লাগে, বিশেষ করে ভারতের পূর্ব (কলকাতা ব্যতিত)আর উত্তর পূর্ব প্রান্তের যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই করুণ। ইউরোপের দেশ গুলি আয়তনে এতই ছোট যে ভারতের মত বড় দেশ থেকে গিয়ে সব শহরকেই ছোট বলে মনে হত, ফ্লোরেন্স বা ব্রাসেলসের শহরাঞ্চল শুধুমাত্র পায়ে হেঁটেই ঘুরে ফেলেছিলাম।তার ওপর আবার ইউরোপের বিভিন্ন দেশের মধ্যে যাতায়াতে বেশীরভাগ দেশেই ভিসা লাগে না, একটা সস্তার ফ্লাইটের টিকিট আর হোটেল বুক করলেই অন্য দেশ ফুড়ুৎ খুব সহজ ব্যাপার।


ইউরোপ ভ্রমণের পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্যস্থল দক্ষিণ কোরিয়া, সেও খুব ছোট, একেবারে পুচকি, গোটা কোরিয়া যাও বা বড় নিজেদের মধ্যে পারস্পারিক ঝামেলার ফলে তারা এখন বিচ্ছিন্ন,নিজেরা ক্ষুদে ক্ষুদে হয়ে বসে আছে।যদিও এর পিছনে অনেক রাজনৈতিক গল্প আছে, শুনেছি দক্ষিণের লোকেদের নাকি উত্তরে যাওয়ার কোন অধিকারই নেই, তবে ট্যুরিস্টদের জন্য ছাড় আছে। দক্ষিণের থেকে উত্তর কোরিয়া আরও ছোট।দক্ষিণ কোরিয়ার যোগাযোগ ব্যবস্থার তুলনা হয়না,রাজধানী সোল আর অর্থনৈতিক শহর বুসানের মধ্যে অফুরন্ত সুপারফাস্ট ট্রেন, ট্রেনের জানলা দিয়ে সোঁ সোঁ করে কি বেড়িয়ে যায় তা প্রায় চোখে ধরাই পড়ে না,ট্রেনের মধ্যে টিভি ইন্টারনেট সব আছে, এই উঠলুম ট্রেনে আর এর মধ্যেই পৌঁছে গেলুম?ভারতীয় অভ্যেসের মত, এতো ভালো ট্রেনে আরও কিছুক্ষণ থাকলে বেশ মজাই হত। স্বল্প দামের ধীর গতি ট্রেনও আছে, সড়কপথে বাসের চলাচল বা উড়োজাহাজ সব কিছু দিয়েই দেশকে তারা সুপারফাস্ট করে রেখেছে।হু হু করে কাজ করা কাকে বলে দক্ষিণ কোরিয়াতে গিয়ে বুঝেছিলাম।সোল শহর, যা আয়তনে আমাদের মুম্বাইয়ের মত, সেইখানে ১৯ টি মেট্রো লাইন আর অসংখ্য বাস দিয়ে সারা শহরটা মোড়া। বলা হয়, সোলের যেকোনো প্রান্ত থেকে ১০মিনিট হাঁটলেই একটা মেট্রো ষ্টেশন পাওয়া যাবে, মাটির নীচে এ যেন অন্য একটা জগৎ।সত্যি কথা বলতে সোলের মত সর্বচ্চমানের যোগাযোগ ব্যবস্থা পৃথিবীর খুব কম দেশেই দেখেছি।

রইল না, রইল না সেই যে আমার নানা দেশের দিনগুলো। চীনে সাংহাই শহরে পা রেখেই টের পেয়ে গেলাম ভারতের থেকেও আয়তনে বড় দেশে থাকার অসুবিধা।চীনে থাকলে কিমি এর পর কিমি হাঁটা কোনই ব্যাপার নয়। অসংখ্য বাস আর ১৪টি মেট্রো লাইন থাকলেও তারা অনেক জায়গায় পৌঁছাতে পারে না। নিকটবর্তী মেট্রো ষ্টেশনে যেতে গেলেও প্রায় ২ কিমি হাঁটতে হয়, ট্যাক্সি নেব তারও উপায় নেই, কিছুটা হলেও কলকাতার মত ব্যাপার ৩-৪ কিমি এর জন্য ট্যাক্সিও যেতে চায় না তাই সেই হাঁটাই একমাত্র উপায়। সাংহাইতে প্রায় প্রত্যেকেরই বাইক আছে, ধীর গতিতে ভোওওও করে বাইকের চলনটাই এই শহরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য, বাইক বা সাইকেল ছাড়া জীবনযাপন অসম্ভব। চীনে হাঁটার এই অভ্যাসটা ধরে রাখতে চেয়েছিলাম যাতে কলকাতায় এসে কোন অসুবিধা না হয়, রিক্সা বা অটোতে লাইন??তো কোই বাত নেহি, পায়দল চলো!স্বীকার করতে বাধ্য হচ্ছি,কলকাতায় এসে এই অনেক হাঁটার অভ্যেস আমার খুব উপকারে লেগেছিল এমনকি দেহের মেদও কিছুটা ঝরে গিয়েছিল।

তবে এই বড় দেশ হওয়ার কিছু পসিটিভ দিকও আছে, একই দেশেরমধ্যে অনেক বৈচিত্র্য থাকে,এক এক রাজ্যের বিবিধ সংস্কৃতি বা ভিন্ন ধর্মীয় মানুষের মিশ্রণ দেখা দেয়, যেমন আমরা শুনেছি কুং পাও চিকেন, হুনান প্রন বা ভেজ মাঞ্চুরিয়ান, এই সবগুলোই চীনের এক একটা রাজ্যের নামে, তাদের মধ্যেও একটা চাপা প্রতিযোগিতা আছে, কাদের রান্না সবচেয়ে ভালো ? তবে ঝগড়াঝাঁটি আমাদের দেশের থেকে অনেক কম।

চিনের পরবর্তী গন্তব্য ব্রাজিল। তিনি আবার আয়তনে চিনের থেকে ছোট কিন্তু ভারতের প্রায় আড়াই গুণ। আমাদের এক ব্রাজিলিয়ান বন্ধু আর তার আর্মেনিয়ান বান্ধবীর মজার কথোপকথনের কথা মনে পড়ে গেল...
ব্রাজিলিয়ান বন্ধুটি : গাড়ি করে ১৫০-২০০ কিমি পাশের একটা শহরে গেলেই ও বলে এটা কি অন্য কোন দেশ? আসলে আর্মেনিয়া আর তার আশপাশের দেশ আয়তনে এতই ছোট যে একটু দূরে গেলেই ও এই কথা বলে (তার বান্ধবীর উদ্দেশ্যে), ঐটুকু দেশ দিয়ে তোমাদের কি করে চলে গো?
আর্মেনিয়ান বান্ধবী: আমার ছোট দেশই ভালো। আর তোমাদের ব্রাজিলের অর্ধেক অংশই তো জঙ্গলে ঢাকা।
হ্যাঁ, সত্যি ব্রাজিলের অধিকাংশ এলাকাই আমাজন দখল করে রেখেছে। আমাজন জঙ্গলের ৬০ শতাংশ ব্রাজিলের অন্তর্ভুক্ত আর সেই আমাজনের আয়তন ভারতের থেকেও বড়, ভাবা যায়! ঠিক কোন একটা জায়গা নির্দিষ্ট করে বাছা খুব কঠিন, কাজ।যদিও ব্রাজিলিয়ানরা বলে ভালো করে পশু পাখি দেখতে চাইলে পান্তালান নামে জঙ্গল নাকি আরও ভালো।আসলে ব্রাজিলের সবকিছুই আয়তনে বড়,বিখ্যাত ইগুয়াসু ফলস সাধারণ মানুষের কাছে এই নামটা উপেক্ষিত থাকলেও আয়তনে আমেরিকার নায়াগ্রা ফলসের থেকে চারগুণ বড়, আমেরিকার প্রেসিডেন্ট রুসভেল্ট ইগুয়াসু পর্যবেক্ষণ করার পর বলেছিলেন “ইগুয়াসুর তুলনায় নায়াগ্রা আমার কাছে এখন বাথরুমের বাথটবের মত লাগছে”।
“আমরা পাঞ্জাবীদের পাইয়া বলি মাড়োয়ারি মাওড়া”- হ্যাঁ ব্রাজিলেও ভিন রাজ্যের মানুষদের বিভিন্ন নাম আছে, রিওর অধিবাসীদের ক্যারিওকান আর সাওপালোওর লোকদের পাউলিস্তান বলা হয়। এই নামকরণের পিছনে অনেক ইতিহাস আছে। ব্রাজিলিয়ানদের জাতীয় রান্না ফেইজুয়াদার (আমাদের রাজমা ডালের মত) উৎপত্তিস্থল বাহিয়া, যেখানে গেলে এখনও আফ্রিকান সভ্যতার অনেক নিদর্শন পাওয়া যায়, তবে বাহিয়ান,ক্যারিওকান বা পাউলিস্তানদের মধ্যে আমাদের মত বাঙাল ঘটি বাটি এই জাতীয় বাগবিতণ্ডা নেই।সকলের ভাষাই এক শুধু ভিন রাজ্যে একটু অন্যরকম ভাবে বলা হয়।তবে এইসব রাজ্যের মধ্যে সংযোগ ব্যবস্থা বলতে শুধু উড়োজাহাজ এবং বাস। আমাদের মত সুন্দর ট্রেন ব্যবস্থা নেই, ট্রেনের দুলুনিও নেই,বাসে যাতায়াতে অনেক সময় লাগে আর বড় শহর না হলে উড়োজাহাজের টিকিটও খুব দামী, ব্রাজিল থেকে আমাজন যেতে যা খরচ লাগে তাই দিয়ে ব্রাজিল থেকে দিল্লী চলে যাওয়া যায়।ব্যাতিক্রম হল রিও আর সাওপাওলোর মধ্যে যোগাযোগ ব্যবস্থা,প্রতি আধ ঘণ্টা অন্তর ফ্লাইট চলাচল করে এছাড়া সড়কপথে বাসেও প্রায় ৪ ঘণ্টা সময় লাগে।

“ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল”- ভারতীয় জনগণ বিশেষ করে প্রিয় কলকাতাবাসীরপ্রতি অনুরোধ নিজের দেশের মধ্যে এদিক থেকে ওদিক চলাচলে পেচ্যুরদূর পেচ্যুর সময় লাগবে বলে চিল্লামেল্লি করবেন না, পৃথিবীতে আপনাদের থেকেও অনেক বড় সাইজের দেশ আছে।


ব্রাজিলের আয়তন বড় হওয়ার প্রধান অসুবিধা হল চুরি ছিনতাই ডাকাতি।জনঘনত্ব খুব কম।গল্প করে জানতে পেরেছি যে ব্রাজিলিয়ান এমন কেউ নেই যে যাদের কখনও কোনদিনও কিছু চুরি হয়নি, আমাদের ভারতীয় কিছু বন্ধু মজা করে বলে যে কাসাভ যদি এইখানে কোথাও বোম রেখে যায়, তাহলে সেটাও কেউ চুরি করে নেবে।
চিনের পরেই ছিল ব্রাজিল যাত্রা। ভাবতাম কলকাতা থেকে কতদূর!!সাংহাই থেকে কলকাতা অনেক কাছে কিন্তু ব্রাজিল? একেই দক্ষিণ গোলার্ধ, সময়ের কত ব্যবধান!পরে বুঝলাম, শুধুমাত্র আকাশপথে চলাচলের সময়েই এই দুরত্ব অনুভূত হয় এছাড়া সবই তো এক, সে সাংহাই হোক বা সাওপাওলো। সাংহাই থেকে অন্য কোথাও ভ্রমণে গেলেও যেমন বলতাম কখন বাড়ি ফিরব ঠিক এখনও সাওপাওলো থেকে অন্য কোন শহরে ঘুরতে গেলেও বলি কখন বাড়ি ফিরব? এই বাড়ি বলতে আমার দেশের বাড়ি নয়, কলকাতার বাড়ি নয়, আমার বর্তমান বাসস্থান সাওপাওলোর বাড়ি। ঘর অথবা দেশ, সবই তোআমাদের মনে।



ছবি- রাজু রায়চৌধুরী

আপনার মতামত জানান