গোষ্পদে প্রতিবিম্বিত সূর্য

রাজা ভট্টাচার্য

 



মান্না দে – নামক মানুষটিকে নিয়ে লিখতে গেলে আমার মানের যে-কোনো কলমচিকে যে প্রথম প্রবল বাধার সম্মুখীন হতে হয় – তা হল ‘দ্বিধা’। ছ-ইঞ্চির স্কেলে হিমালয় মাপতে গেলে যে দ্বিধা আসে – সেই রকম এক অপ্রতিরোধ্য, অনমনীয় দ্বিধা। শুরুর আগেই এই নামকরণটা আমার সেই বাধা কাটিয়ে দিল অনেকটাই। এর প্রয়োজন ছিল; কারণ এবার আমরা পরম শ্রদ্ধায় এমন একজন মানুষের মুখোমুখি হতে পারবো, যাঁর উচ্চতা হিমালয়প্রতিম; কিন্তু বিনয় তৃণাদপি সহজাত। যাঁর প্রতিভা অতলান্তিক, অথচ সহিষ্ণুতা তরোরিব। যিনি যে কোনো নূতনের উদ্বাহু অভ্যর্থনায় সদা-তৎপর, অথচ স্বয়ং শাস্ত্রের সম্রাট।

মান্না দে, এই নামটা উচ্চারিত হলেই আমার মনে একটি বিচিত্র স্মৃতির উদয় হয়। শীতকাল। পরীক্ষা হয়ে যাওয়ায় আমি এবং আমার বন্ধুরা মুক্ত বিহঙ্গ। বাড়ির সামনের মাঠে সেই প্রথম ‘ডিউস’ বল নেমেছে – আমরা ক্যাম্বিস পেরিয়ে সাবালক হচ্ছি। প্রথম বলটি কোনো এক বিশ্বাসঘাতক বোলারের নিক্ষিপ্ত শক্তিশেলের মত আমার ঠোঁট দু-ফাঁক করে দিল। রক্তারক্তি কাণ্ড – আমি আহত ও অবসৃত অবস্থায় মাঠের পাশে – বাড়ির উঠোনে মচ্ছিভঙ্গ হয়ে পড়ে আছি। মন ভারাক্রান্ত – মানে ওই বয়সে যতটা হতে পারে, ছুটির দিনে খেলতে না পারলে। আর ঠিক সেই সময় – যেন কোনো দৈববাণীর মতো পাড়ার কোনো বিয়ের প্যাণ্ডেল থেকে ভেসে এল একটা গান, “পৌষের কাছাকাছি রোদ-মাখা সেই দিন ফিরে আর আসবে কি কখনো?” সহসা আমার সমস্ত বিষণ্ণ অস্তিত্ব ধন্য করে ঝলমল করে উঠলো এক শীতের দুপুর, কমলা-রঙা রোদ, মাঠের খেলা, গাঁদা আর ডালিয়া। এক তীক্ষ্ণ গভীর দুঃখময় ভাললাগার মধ্য দিয়ে, এক শীতের নরম দুপুরে আমি বড় হয়ে গেলাম, ‘বালক’ থেকে ‘কিশোর’ হলাম। মান্না দে আমায় সাবালক করলেন।

তারপর থেকে তিনি আমার সঙ্গে থেকেছেন বরাবর। সবসময়, সব পরিস্থিতিতে। প্রথম প্রেমে তিনি আমায় শুধিয়েছেন – ‘কে প্রথম কাছে এসেছি?’ প্রথম প্রেম ঘুচে যাওয়ার যন্ত্রণায় তিনি সান্ত্বনা দিয়েছেন – ‘ক-ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ যে তুমি ভালবাসবে?’ বর্ষার একাকীত্বে তিনি জানিয়েছেন – ‘বড়ো একা লাগে এই আঁধারে, মেঘের খেলা আকাশ-পারে’। আর আজকের চল্লিশোত্তীর্ণ অন্ধকারে তিনিই মন্ত্রোচ্চারণ করে চলেন – ‘মাঝরাতে ঘুম ভেঙে যায়, মনে হয়, জীবণের কত কাজ সারা হতে গেল, আরও কত বাকি রয়ে গেল!” তিনি যেন মিশে আছেন ঘাসের মতো, ফড়িং-এর মতো, রোদের মতো সহজে – আমার প্রাণের অনুষঙ্গে। জানি, জানি। আমার মতো আপনাদেরও। অনেকেরই।

ব্যক্তিগত স্মৃতিবেদনার বাইরে গিয়ে এবার এই সুরের সম্রাটকে বৃহত্তর পরিসরে একবার দেখে নেওয়া যাক। আলোচনার শুরুতেই একটি স্পষ্ট কথা বুঝে নিই আমরা বরং। বাঙালি জাতি সম্পর্কে একটি সহেতুক প্রবাদ ভারত-বাজারে চালু আছে – তা হল, বাঙালি কবি-র জাত। সমস্ত বাঙালিই নাকি জীবনের কোনো-না-কোনো পর্যায়ে অন্তত একটা কবিতা লিখেছে। কথাটা বাড়িয়ে বলা হলেও একেবারে ভিত্তিহীন নয়। কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাসের দিকে আর একটু ঘনিষ্ট হয়ে তাকালে বোঝা যায়, বাঙালি আসলে কবি নয়, গীতিকারের জাতি। এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত প্রাচীনতম বাংলা বইটিকে আপনি যে নামেই চিনুন, ‘চর্যাচর্যবিনিশ্চয়’ বা ‘চর্যাপদ’ – এটি সর্বার্থেই একটি ‘গানের বই’। স্বরলিপিটুকুই যা দেওয়া নেই (বোধহয় তখনও ও বস্তুটি ছিল না), নইলে প্রত্যেকটি গানের উপরে রাগ এবং তাল উল্লেখ করা আছে। শ্রীকৃষ্ণকীর্তন আসলে এই সেদিন ‘প্রাক্তন’ হয়ে যাওয়া গান-ময় যাত্রার আদিরূপ। মঙ্গলকাব্যও গাওয়ার জন্যই লেখা - মুকুন্দ চক্রবর্তী তাঁর অসাধারণ ‘অভয়ামঙ্গল’কে ‘সঙ্গীত’-ই বলেছেন। মনসামঙ্গল তো এখনও সর্বত্র গাওয়াই হয়। তাবৎ বৈষ্ণব পদাবলি, যা খাঁটি লিরিক হিসাবে বিশ্বের যেকোনো ভাষার যে কোনো সাহিত্যকে বলে বলে পাঁচ গোল দিতে পারে – গীতিকাব্য নয়, গান। কত আর বলব – এই সেদিন রবীন্দ্রনাথ-ও তো গান লিখেই নোবেল পেলেন, মোটে একশ বছর আগে। বইটার নাম ‘Songs Offering’। গান, গান। বাঙালি চিরকাল গানই লিখে এসেছে – কবিতা নয়। তার রক্তে রক্তে তরঙ্গিত হয় সুর, গঙ্গা-পদ্মায়, পুকুরঘাটে, হিজলের ডালে, কড়ির স্তূপের মত বৈশাখি মেঘে, শেষ বিকেলের আলোয়, কিশোরীর নীলাভ কেশে, প্রেমে পড়ার জেগে-থাকা তারা-ভরা রাতে – গান আর সুর। সুর আর গান। মান্না দে বাঙালিকে সেই অনিঃশেষ সুরের যাত্রায় আরও কয়েক পা এগিয়ে দিয়ে গিয়েছেন।

1919 সালের পয়লা মে জন্মেছিলেন তিনি। প্রায় সমাপতন হিসাবেই মনে পড়ে – পরবর্তীকালে সলিল চৌধুরীর প্রভাবে তিনি যোগ দিয়েছিলেন মুম্বাইতে গড়ে ওঠা IPTA–তে। আরও অনেক পরে - 1971-এ তিনি রেকর্ড করেছিলেন বিখ্যাত গণসঙ্গীত – ‘মানবো না বন্ধনে’, কিম্বা ধরুন ‘ও আলোর পথযাত্রী’। ‘পয়লা মে’ তারিখটার অঞ্জলি যেন বা। তা পরের কথা পরে। এ কথা আজ বিশ্বশুদ্ধু লোক জানে, শিবচন্দ্র দে মশায়ের সিমলে পাড়ার বাড়িতে জন্মানো প্রথম দেশ-কাঁপানো সঙ্গীতশিল্পী মান্না দে নন। সে কৃতিত্ব যাঁর প্রাপ্য, তাঁর নাম কৃষ্ণচন্দ্র দে। এখনো ভাবলে অসম্ভব বিরক্ত লাগে, তেরো বছর বয়সে অন্ধ হয়ে গিয়েও ..বিশ্বজয় করা . এই মহান সঙ্গীতশিল্পী তথা সুরকার সেকালে বিখ্যাত ছিলেন ‘কানাকেষ্ট’ – এই হীনার্থক বিশ্রী নামটিতে। সম্মান দিতে আমাদের এত আপত্তি বলেই বোধহয় আমরা সম্মান পাই না।

কিন্তু সম্মান দিয়েছেন তাঁর ভাইপো – মান্না দে। মান্নার আত্মজীবনী – ‘জীবনের জলসাঘরে’-র প্রথম পর্বের ছত্রে ছত্রে চোখে পড়ছে সেই অতলান্ত শ্রদ্ধা, নতজানু প্রণাম। বাংলা গানের একটি যুগকে নিজের নাম দিয়েছেন এই কৃষ্ণচন্দ্র, আর দিয়ে গেছেন একজন যোগ্যতম উত্তরসূরীকে। তাঁর শ্রেষ্ঠ ছাত্র, তাঁর সহ-সঙ্গীত পরিচালক - মান্না দে কে। আর এই ছাত্র শব্দটা ব্যবহার করতে গিয়ে একটা মজার তথ্য মনে পড়ছে। মান্না দে’র প্রথম যৌবনের স্বপ্ন ছিল – আগে না, সঙ্গীতশিল্পী নয় – খেলোয়ার হবেন। অথবা কুস্তিগীর। সেকালের কিংবদন্তী কুস্তিগীর গোবরবাবুর কাছে নিয়মিত শিক্ষা নিচ্ছিলেন। বন্ধুদের নির্বন্ধাতিশজ্যে স্কটিশ চার্চ কলেজে পড়াকালীন নাম দিতে হল ‘ইন্টারকলেজ মিউজিক কম্পিটিশনে’। বিখ্যাত কাকার ভাইপো তখন কলেজ ক্যান্টিনে টেবিল বাজিয়ে গান গেয়ে রীতিমত গায়ক। এই প্রথম তাঁর মাথায় এলো, তিনি গান জানেন না। বহু কষ্টে কাকাকে রাজী করিয়ে শুরু হল রীতিমাফিক গান শেখা। দু মাস। ফলাফল? প্রায় প্রতিটি বিভাগেই ফার্স্ট। ভাবছেন নিশ্চই, এই না হলে আর মান্না দে? বলে রাখি, দুটি বিভাগে তিনি সেকণ্ড হয়েছলেন। তার একটা ঠুমরি। অপরটা – মুচ্ছো যাবেন না যেন – বাংলা আধুনিক গান!! যিনি প্রথম হয়েছিলেন – তিনিও পরবর্তীকালের এর এক বিখ্যাত গায়ক – সত্য চৌধুরী। ‘পৃথিবী আমারে চায়/ রেখো না বেঁধে আমায়’ – মনে আছে তো? নিজের ওপর মহা খাপ্পা হয়ে পরের বার আবার নাম দিয়েছিলেন কম্পিটিশনে। এবার অবশ্য সবকটাতেই ফার্স্ট। ‘অল বেঙ্গল মিউজিক কম্পিটিশান’- এ একই রেজাল্ট। আর হ্যাঁ, এবার যিনি দ্বিতীয় হলেন, তাকেও আমরা সবাই চিনি। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য। একটা ‘সময়’ বটে!

মোটামুটি এই সময় থেকে সেদিনের সেই ‘প্রবোধচন্দ্র’-এর মান্না দে হয়ে ওঠার শুরু। শুরু হল নিয়মিত শিক্ষা, দস্তুর মতো, ওস্তাদদের কাছে। ঘটনা চক্রেই প্রথম গুরু – অবশ্যই কাকার পরে – হয়ে উঠলেন সেকালের বিখ্যাত ওস্তাদ দবীর খাঁ। তিনি এসেছিলেন কৃষ্ণচন্দ্রকে শিক্ষা দিতে। কৃষ্ণচন্দ্র তখন চলেছেন মুম্বাই – সঙ্গীত পরিচালনার কাজ নিয়ে, দু-মাসের জন্য। এই সুযোগে মান্না’র শিক্ষারম্ভ হল তাঁর কাছে। অবিশ্যি, খুব ভালো লাগে নি, বরং দু-মাস পর ‘বাবুকাকা’ ফিরে এসে আবার শিক্ষার ভার নিজের হাতে তুলে নিলে স্বস্তি পেয়েছিলেন। এর কিছুদিন পরেই শুরু হল কৃষ্ণচন্দ্রর সঙ্গে স্টুডিও-পাড়ায় যাতায়াত, এবং কাকার ‘সেকণ্ড অ্যাসিস্টেণ্ট’-এর পদ লাভ। কলকাতাতে আর খুব বেশিদিন থাকা হয়নি অবশ্য। মুম্বাই-এর ফিল্ম ইণ্ডাস্ট্রি তখন ফুলে উঠছে। ’৪২ সালে কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে এলো সাগরপাড়ের স্বপ্ননগরীর আহ্বান – আর সেই সঙ্গেই প্রথমবারের জন্য সেদিনের ‘বম্বে’ নিয়ে গেল কলকাতার ছেলেটিকে। ২৩ বছরের মান্না আর কখনও স্থায়ীভাবে ফেরেন নি কলকাতায়। সেই থেকেই তিনি প্রবাসী। অথচ কী নিবিড় বাঙালি!

এখানে একটা কথা স্পষ্ট করে নেওয়া দরকার। এই বছরই মান্না’র প্রথম প্লে ব্যাক – ‘তামান্না’ ছবিতে, কাকার সঙ্গীত পরিচালনায়। কিন্তু সাফল্য তখনও বহুদূর। ওই একই চলচ্চিত্রে, একই গানে সঙ্গীতজীবন শুরু করেছিলেন আরও এক কিংবদন্তী শিল্পী – সুরাইয়া। তিনি যখন দস্তুরমতো স্টার, মান্না তখনও প্রধানত অ্যাসিস্ট্যান্ট মিউজিক ডিরেক্টর, কখনও কাকার, কখনও ক্ষেমচাঁদ প্রকাশের, কখনও অনিল বিশ্বাসের (এঁর প্রভাবেই - কেউ কেউ বলেন – মুকেশ এবং কিশোরকুমার বেরিয়ে এসেছিলেন কে এল সায়গলের ছায়াবৃত্ত থেকে।) এবং সর্বোপরি, স্বয়ং এস ডি বর্মনের। অতিখ্যাত কৃষ্ণচন্দ্রের ভাইপো হওয়া সত্ত্বেও কারো চাইতে তাঁকে কম স্ট্রাগ্‌ল করতে হয় নি। নিজেই বলেছেন – “নাচে মন মেরা মগন ধিগ না ধিগিধিগি – গানটি শচীনকর্তা তৈরি করে জানিয়ে দেন – এ গান মান্নাই গাইবেন। উল্লসিত শিল্পী যখন বাড়িতে বসে গানটির স্বরলিপি তৈরি করতে ব্যস্ত, তখনও শচীনকর্তা খুব অনায়াসেই জানিয়ে দেন – গানটি রফি ইতিমধ্যেই রেকর্ড করেছেন; অপূর্ব হয়েছে সেই রেকর্ড। এই রকম ঘটনা অজস্র অগণ্যবার ঘটে গেছে তাঁর জীবনে। প্রলম্বিত হয়েছে তাঁর সংগ্রাম; অবশ্য – তিনি নিজেই তো বারবার বলতেন – সময় না হলে কিছুই হয় না।



অবশেষে সময় হলো। বেশ আশ্চর্যজনক ভাবেই, সেই শচীন দেববর্মনই তাঁকে দিয়ে গাওয়ালেন – “উপর গগন বিশাল”। ১৯৫০ সালে ‘মশাল’ ছায়াছবির এই একটি গানই মান্নাকে প্রায় রাতারাতি ভারতবিখ্যাত করে দিল। শচীন দেব বর্মনের সঙ্গে মান্নার পরিচয় সেই কলকাতার দিনগুলোতে। তিনি আসতেন কৃষ্ণচন্দ্রের কাছে গান শিখতে। স্বভাবতই, তাঁরই অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে দিনের পর দিন রফি - তালাত মামুদ - কিশোর কুমারকে অপূর্ব সব সুর তুলে দিতে দিতে মান্নার অভিমান হতো খুব। এই অভাবনীয় সাফল্য অবশ্য সেই অভিমান কমিয়ে দিয়েছিল পুরোপুরি। পরের বছরই, ১৯৫১-এ শংকর জয়কিষেণের অপার্থিব সুরে ‘আওয়ারা’ ছায়াছবিতে লতা গাইলেন সেই বিখ্যাত ডুয়েট – ‘তেরে বিনা আগ ইয়ে চাঁদনি’। নবজন্ম হল মান্না’র। আর ধর্মমূলক বা পৌরানিক ছবির প্লেব্যাক নয়। জন্ম নিল রোমান্টিক গানের এক নতুন সম্রাট। বস্তুত, হিন্দী বলয়ে মান্নার যে অবিশ্বাস্য জনপ্রিয়তা ছয় দশক পার করেও অম্লান – তার অর্ধেক কৃতিত্ব শুধু এই জুটিই দাবী করতে পারেন। চেনা গানের তালিকা লম্বা করে লাভ নেই – কারণ এর প্রত্যেকটি গান আপনাদেরও আমার মতই মুখস্থ। শুধু মনে করিয়ে দিই, কিংবদন্তী সেই গান – ‘প্যায়ার হুয়া ইকরার হুয়া’ থেকে জাতীয় পুরস্কার-জয়ী ‘এ ভাই, জরা দেখকে চলো’; পরম রোম্যান্টিক ‘ইয়ে রাত ভিগি ভিগি’ থেকে বিশুদ্ধ ফোক – ‘চলত মুসাফির’ – সবেরই পেছনে এই যুগলবন্দী। একবার ভাবুন তো তখনকার মুম্বাই ইণ্ডাস্ট্রির অবস্থা! একই সঙ্গে গাইছেন রফি – তালাত – কিশোর – মুকেশ – হেমন্ত – মহেন্দ্র কাপুর... এবং আরও কতজন স্বর্ণকণ্ঠ পুরুষ প্লে-ব্যাক সঙ্গীতশিল্পী! এ কথা অবশ্যই সত্য, খুব সচেতন ভাবেই মান্না দে হয়ে উঠেছিলেন ক্লাসিকাল গানের বিশেষজ্ঞ। কিন্তু সেটা ছাড়াও যে তিনি কতটা বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী, তা শংকর-জয়কিষণ সুযোগ না দিলে আমরা বুঝতেও পারতাম না। অপরজন অবশ্যই রাহুল দেব বর্মন – আর ডি দ্য গ্রেট। তিনিই তো গাওয়ালেন – ‘আও টুইস্ট করে’। হিন্দী সিনেমার প্রথম র‍্যাপ। আবার তিনিই গাইয়েছেন ‘গোরি তোরি প্যায়জনিয়া’।

বাংলা গানে এই খাঁটি বাঙালি গায়কের প্রবেশ একটু বিচিত্র ভাবে। ‘অমর ভূপালি’ ছায়াছবিতে বসন্ত দেশাই গাওয়ালেন – ‘ঘনশ্যাম সুন্দর’। ছবি, এবং স্বাভবতই গান – দুটোই ডাব্‌ল্‌ ভার্সান। সে অর্থে বলতে গেলে, এর দু’বছর পরে গাওয়া ‘গৃহপ্রবেশ’–এর গানগুলিই তাঁর প্রথম প্লেব্যাক – সেটা ’৫৪-এর কথা। আর বাংলা সিনেমার মান্না-যুগ শুরু হবে বহু পরে – ’৬৬তে – এক আশ্চর্য ভেলা – ভেসে যাওয়া – জল – সমর্পন – মাখামাখি হয়ে, স্বয়ং মহানায়কের কণ্ঠে – “কে প্রথম কাছে এসেছি”। আশ্চর্য ব্যাপার হলো – এর মধ্যে তিনি কতগুলো বেসিক রেকর্ড করেছেন – তার বেশিরভাগ আজও, শতাব্দী পাড়ি দিয়েও অমর, প্রবাদ। এর শুরু সেই ’৫৩তে – বেরিয়েছিল “কত দূরে আর” এবং “হায় হায় গো”। নাঃ, এর পরের গান থেকে ‘কয়েকটা’ উল্লেখ করা আমার পক্ষে অসম্ভব। রত্নাকর থেকে ‘কয়েকটা’ রত্ন আলাদা করা মহাপুরুষের কাজ। এই ধরুন, গত কয়েকদিনে আপনি যে-কটা বাংলা গান গুনগুন করেছেন, তার বারো-আনাই মান্না দে গেয়েছেন মোটামুটি ’৮৫ সালের মধ্যে। তার পরেও গেয়েছেন অজস্র অপূর্ব গান – তবু – এই প্রথম পঁয়ত্রিশ বছর তাঁর এবং বাংলা আধুনিক গানের সোনার সময় – সর্বার্থেই। আমরা শুধু মনে রাখবো, ছেষট্টি বছর বয়সেও তিনি রেখেছেন অপ্রতিরোধ্য প্রশ্ন – “বলো, রাধা হতে পারে কজনে?”

প্রশ্নটা সহজ, উত্তরও তো জানা – খুব কম শিল্পীই পারেন মান্না দে হয়ে উঠতে। আমরা নিছক বিন্দুতে সিন্ধু দর্শন করেছি – বলেছি তাঁর হিন্দি-বাংলা প্লেব্যাক আর আধুনিক গানের কথা। বাকী রয়ে গেল তাঁর গীত, গজল, ভজন, সঙ্গীত পরিচালনা, শ্যামাসঙ্গীত, রবীন্দ্রসঙ্গীত – কত কী! সব কথা কি বলা যায় নাকি? এত বড় একজন শিল্পীর কথা শেষ হয়ে যায় নাকি কখনও? ‘শেষ’ শব্দটা কি আদৌ খাটে মান্না দে সম্পর্কে? কিংবা ‘মৃত্যু’ শব্দটা? আমরা, যারা গান শুনি, যারা সুরের মহৈশ্বর্যময় ভুবনের অপ্রমেয় ভিক্ষুক – তারা জানি – তিনি আছেন। মুকুট পড়েই আছেন। মান্নাকণ্ঠীতে যতই ভরে যাক পাড়ার স্টেজ – ‘মান্নার মতো’ বলে কিছু হয় না। ওই যে তিনি! পরণে পরিচিত বুশ শার্ট, মাথায় সেই টুপি – এক্ষুণি গেয়ে উঠবেন... আপনিই ভাবুন – কোন গানটা??

আপনার মতামত জানান