মান্না দে: একটি অরূপকথা

রঞ্জন ঘোষাল

 



এক ছিলেন মান্না দেব। জন্মেছিলেন অবিভক্ত নেপালে ১৯১১ সালে। বাবা মিলিটারিতে জেনারেল ছিলেন। মা ছিলেন এক ইংরেজ মহিলা এবং ডাকসাঁইটে শিক্ষিকা, যিনি পরে বৈরাগ্যজনিত কারণে প্রথমে তারাপীঠে তারপর সাধনোচিত ধামে প্রস্থান করেছিলে্ন।
কাকা কৃষ্ণদাস কলকাতায় চলে আসেন। অর্থের অভাব ছিল না, তিনি ছিলেন ঘোর বৈষ্ণব। ট্রেনে ট্রেনে মাধুকরী করে বেড়াতেন। ওঁর হাত ধরে ছোট্ট মান্না। তখন অবশ্য নাম ছিল মান্তু। মান্তুকে অন্ধ কাকার হাত ধরে মেইন লাইন কর্ড লাইনে চরে বেড়াতে হত। ফলে শিশু মান্নার প্রাতিষ্ঠানিক লেখাপড়া একেবারে কিছু হয় নি। পরে অবশ্য দেরাদুনের বিখ্যাত দুন স্কুলে উনি ভর্তি হয়ে যশস্বী হন।
একদিন কাকার গলায় মারাত্মক ল্যারিঞ্জাইটিস। উনি একটা ভিক্সের লজেন্স চুষতে চুষতে বললেন, মান্তু, আমি যে আর পারি নে ! ছোট্টো মান্তু ইশারায় ইঙ্গিতে বলল, তাহলে কাকা, চলো ফিরে যাই। কাকা ফ্যাঁস্‌ফেঁসে গলায় বললেন, তুই হাতের ইশারায় কথা বলছিস ফের? ওরে বোকা, গলা তো খারাপ হয়েছে আমার। তা ছাড়া ইশারাই যদি বুঝবো তাহলে আমাকে আর কানা বলেছে কেন?
মান্তু লজ্জা পেয়ে বলল, তা-ও ঠিক। তবে চলো এই লোকালে উঠে পড়ি। কোন গানটা গাইবো, কাকা? সাগরপারের গানটা? কাকা কৃষ্ণদাস দেব সন্দিগ্ধ কণ্ঠে বললেন, তুই পারবি? মান্তু বলল, দ্যাখো না... বলে রিন্‌রিনে কণ্ঠে গেয়ে উঠল, “ঐ মহাসিন্ধুর ওপার হতে কী সঙ্গীত ভেসে আসে”। ট্রেনে আর উঠতে হল না। প্ল্যাটফর্মের ওপরেই ঝুরঝুর করে পয়সা পড়তে লাগল। সেই পয়সা কুড়োতে কুড়োতেই বালক মান্তু একদিন মান্না দেব হয়ে ওঠেন। ওঁর গানে খুশি হয়ে সুরকার শচীন মল্লিক ওঁকে একশো টাকা পুরস্কার দিতে চেয়েছিলেন। টাকাটা হাতে ধরাতে যেতেই যুবক মান্না বলে ওঠেন, হম স্রিফ ফেকা হুয়া পয়সা লেতে হেঁ, ইয়ে হমারী খানদানি আদত হ্যায়। শচীন কর্তা লজ্জা পেয়ে টাকাটা মান্নার সামনে পেতে রাখা ছেঁড়া চাদরের ওপর ছুঁড়ে দেন।
সেই তিল কুড়িয়ে কুড়িয়েই বেল। মান্নার বিখ্যাত গান “ও বাবু, ও যানেওয়ালে বাবু, এক পয়সা দে দে” এই গান উনি শুরু করেন শহীদ মিনারের পাদদেশে। বলা বাহুল্য, কাকার মত উনি সত্যিকারের অন্ধ ছিলেন না। কিন্তু চোখ বুজে গান করতেন বলে ওঁকে ভারতবাসী চিরদিন অন্ধ ভেবে আহা রে বেচারী, আহা রে বেচারী করে এসেছে।
কর্মজীবন : মান্না দেব প্রথম যৌবনেই দিল্লীতে চলে যান। ঐতিহাসিক লালকেল্লার সামনে তাঁবু ফেলেন। সেখানে আর এক ভাগ্যান্বেষিণীর সঙ্গে ওঁর আলাপ হয়। তিনি খটখটি বাজিয়ে গান করতেন। নাম সুনয়নী। রতনে রতন চেনে। ওঁরা একসঙ্গে জীবন অতিবাহিত করার সাধু সংকল্প নেন। তখনও ব্রিটিশের অধীনে ছিল ভারতবর্ষ। একদিন একজন সাহেব এসে বলেন, “টোমরা ব্রিটিশ গাভমেন্টের প্রশংসা করিয়া স্বদেশী আন্‌ডোলনের বিরুদ্ধে গান করিবে? টাহা হইলে আমরা টোমাডের বহুৎ টাকা পয়সা ডিব”। মান্না ও সুনয়নী রাজী হলেন না। মান্না গান ধরলেন, “ছেড়ে দাও রেশমী চুড়ি, বঙ্গ নারী, কভু হাতে আর পোরো না, জাগো গো ও জননী, ও ভগিনী, মোহের ঘুমে আর থেকো না”। দেখতে না দেখতে পিছনে নারী-পুরুষের শোভাযাত্রা শুরু হয়ে গেল। বস্তুতঃ এইভাবেই মান্না দেব-এর মিউজিকাল কেরিয়ারের প্রকৃত শুরুয়াৎ। ওঁর অমোঘ বাণী “মূর্খ, দরিদ্র ভারতবাসী আমারই ভাই বোন” এখনো লোকের মুখে মুখে ফেরে। “তোমরা আমাকে রক্ত দাও, আমি তোমাদের স্বাধীনতা এনে দেবো”, “যত মত, তত পথ” এবং “আমার জীবনই আমার বাণী” এই সব কালজয়ী উক্তি উনি করে গেছেন, এবং ফলে দেশ স্বাধীন হয়েছে।
এর পরের ঘটনা তো ইতিহাস। বাকিঙ্ঘ্যাম প্যালেসে সভাগায়ক হিসেবে নিমন্ত্রণ ও সেখানে প্রতিদিন প্রাতে ও সন্ধ্যায় গান গাইতে হত এই দুজনকে। শর্ত ছিল একটাই - ছেঁড়া তালিমারা ভিক্ষুকের পোষাকে প্যালেসের সামনে ফুটপাথে বসে গানগুলি গাইতে হবে ওঁদের। ভারতের মর্মবাণীটি একমাত্র এই দীনদরিদ্র রূপেই পরিস্ফুট করা যায়, এ কথা কুইন নিজে বলে গেছিলেন। দর্শকেরা প্যালাও দিয়েছে প্রচুর। ট্যুরিস্টরা বাকিঙ্ঘ্যামের চেঞ্জ অভ গার্ড দেখার পরেই খটখটি (খরতাল) ও ভাঙ্গা হারমনিয়াম সহযোগে মান্না দেব ও সুনয়নী দেবীর গাওয়া “একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি” শুনতে আসত। [ সিং মি ফেয়ারওয়েল, মাদার, আাই উইল রিটার্ণ সুন। স্মাইলিংলি আই উইল ওয়্যার দ্য নুজ অ্যারাউণ্ড মাই নেক অ্যান্ড দ্য ওয়ার্ল্ড উইল কীপ ওয়চিং।]
বিপ্লবী পুঁটিরাম নিজে এই গানটি শুনে প্রীত হয়ে, ফঁসি যাওয়ার পূর্বমুহূর্তে মান্না দেবকে ডেকে বলেছিলেন, আর আমার কোনো দুঃখ নেই, মান্না। মরতে তো একদিন হবেই ভাই, কিন্তু এই গান শুনে বেঁচে থাকার চেয়ে মরণও ভালো। মরণ রে, তুঁহু মম শ্যামসমান।
আগুনে লাফ দিয়ে পুড়ে মরেছিলেন, রাণী পদ্মিনী। সেই কাহিনী নিয়েও মান্নার গান আছে, ‘আগুন ! লেগেছে লেগেছে লেগেছে লেগেছে আ-গুন! যাক, জ্বলে পুড়ে যাক্‌ যাক!’ বীর রাজপুতেরা সেই গান শুনে এখনও চোখের জল ফেলেন।
মান্না দেব যখন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সাংগীতিক সম্মান গ্র্যামি অ্যাওয়ার্ড নিতে লস এঞ্জেলেসে যান, তাঁরা একটি মানপত্র দিয়েছিলেন। মানপত্রের কাগজটি উনি সবিনয়ে প্রত্যাখ্যান করে বলেন, যদি কাগজে লেখো নাম, সে নাম ছিঁড়ে যাবে, একমাত্র উপায় হচ্ছে, যদি হৃদয়ে লেখো নাম, কেবলমাত্র সে নামটিই রয়ে যাবে, হনুমানের হৃদয়ে যেভাবে অঙ্কিত থেকেছে রাম ও সীতার নাম, লায়লার হৃদয়ে মজনু’র, পারোর হৃদয়ে দেবদাসের, ইত্যাদি।
প্রত্যাখ্যানের কিন্তু চমকপ্রদ আরো কিছু কাহিনি আছে। একবার বৃন্দাবনের একটি গোষ্ঠী মান্না দেবকে অনুষ্ঠানের জন্য ডেকেছিলেন। উদ্যোক্তারা বেশিরভাগই গোশালা বা তবেলার মালিক। এঁরা গোচারণের জন্য আগে শুধু বাঁশি ব্যাবহার করতেন, আজকাল অন্যান্য বাদ্যভাণ্ডও ব্যবহার করেন বলে জানা গেছে। ওঁরা একটি বীণা মানা দেবকে উপহার দিতে গিয়েছিলেন। মান্না দেব ওটি নিয়ে একটু পিড়িং পিড়িং করেই বস্তুটি ওঁদের হাতে ফিরিয়ে দেন। বলেন, দেখুব ভাই সকল, এটা আমি গ্রহণ করতে পারছি না, এই গো-বীণাটি বেসুরো, বাজে মাল। পরে এটি নিয়ে উনি একটি গানও রচনা করেন – বাজে গো-বীণা।
মান্না দেব ছিলেন অনন্য, অননুকরণীয়। ওঁর মৃত্যুতে দিল্লীর রাজপথে যে শোকযাত্রা হয়েছিল, তার রৌণক এখনো লোকের চোখে লেগে আছে। জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত থেকেছে সাত দিন। প্রধানমন্ত্রী থেকে সঙ্গীত জগতের যতো নামী ও দামী তারকা খালি পায়ে পদযাত্রায় সামিল হয়েছিলেন, সেই জনসমুদ্র শান্তচিত্তে নগর পরিক্রমা করেছিল, সমস্ত টিভি চ্যানেলে সারাদিন বেজেছিল, “ক ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ যে তুমি ভালোবাসবে?”
মিলিটারি ব্যাণ্ড আট মাত্রার তালে মার্চিং সং বাজানোর মুহূর্তে প্রয়াত মান্না দেবের কণ্ঠে স্পষ্ট তিরস্কার শোনা গেছে, কাহারবা নয়, দাদরা বাজাও, উল্টোপাল্টা মারছো চাঁটি...।
রাজঘাটের বিশাল শেষকৃত্য সমারোহে তাঁর চিতার লেলিহান আগুন যখন আকাশ স্পর্শ করেছে, কোটি জনগনের কণ্ঠে রণিত হয়েছে, “আবার হবে তো দেখা, এ দেখাই শেষ দেখা নয় তো !’

তা ইনি তো রূপকথার মান্না দেব।

অন্য একটি সমান্তরাল বিশ্বে বড়ো করুণ, অগীতভাবে চলে গেলেন আর একটি মানুষ, যাঁর নাম ছিল মান্না দে। বড়ো ভালো গাইতেন মানুষটা। অনেক হৃদয়ে দোলা দিয়ে গেছেন। মারা গেলেন, মাত্র জনা কুড়ি মানুষ জমায়েত হয়েছিল বেঙ্গালুরুর একটি অখ্যাত শ্মশানে। সেখানে তাঁর মরদেহ নিয়ে যাওয়া হয়েছিল একটি অপরিসর টেম্পোয়। শবানুগমন ছিল না। সাড়ে তিনলক্ষ বাঙ্গালির ব্যাঙ্গালোরে বড়ো নিঃশব্দে নিরঞ্জন হয়ে গেল মানুষটির।
কিন্তু সে তো অন্য ব্রহ্মাণ্ডের গল্প।
আমরা লজ্জা পেতেও শিখি নি।



ব্যাঙ্গালোর ২০১৩।


*মান্না দের মৃত্যুর দু তিন দিন পরে এই লেখাটি লেখেন রঞ্জন ঘোষাল।

আপনার মতামত জানান