ভিনগ্রহী ফ্লাইং সসার

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

গৌতম চট্টোপাধ্যায় আসলে একজন উপকথা। মানুষ হবার গতানুগতিকতায় সামিল হওয়া যাঁর পক্ষে নিতান্ত অসম্ভব।
ফুলবেলপাতা হবার সমস্ত সম্ভাবনায় পরিপূর্ণ উপরের ওপেনিং সেন্টেন্সটি পরে যদি ‘আরো একটি শহীদস্মরণ’ ভেবে থাকেন – তবে সে দোষ আপনার নয়। এই গদ্যলেখক গৌতম চট্টোপাধ্যায়কে প্রায় চলমান অশরীরী জ্ঞানে ভক্তি করে। কিন্তু তার সাথে নিতান্ত ক্ষোভের সাথে দেখতে থাকে – যে আইকনপ্রিয়তায় আচ্ছন্ন বাঙালি শতচেষ্টাতেও অন্ধের হস্তিদর্শনের বেশি এগোতে পারলো না – তাও এমন একজন – অথবা এমন কয়েকজন মানুষকে নিয়ে যাঁরা বাঙলা গানকে আইকনাচ্ছন্নতার বাইরে থেকেই দেখেছিলো।
মহীনের ঘোড়াগুলিকে আমরা জেনারেশান এক্স, বড্ডো এবং বড্ডো বেশি গৌতম চট্টোপাধ্যায়ের চশমায় দেখতে শিখেছি। তার প্রধান কারণ সম্ভবতঃ নব্বইয়ের দশকের রিবুট – যখন ব্যাপারটা প্রায় একটা ফোরামের চেহারা নিয়েছিলো। সেখানে সবাই জায়গা পেতো। একটা ইংরিজি গানের দল দুম করে আলোকবর্ষ দূরের গান গাইলো – এবং ক্রসউইন্ডস হয়ে গেলো। একজন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ নিতান্ত মনের কথা বলতে গিয়ে নীল দেওয়াল এবং স্বপ্নবেলোয়াড়ির সুর বাঁধলেন – দিব্য মুখোপাধ্যায়ের সেই অবাক সাররিয়ালিজমের হদিশ এখনো জানা যাচ্ছেনা। লক্ষীছাড়া প্রায় জন্মইস্তক এই ফোরামে – পড়াশোনায় জলাঞ্জলি দিয়েছিলো কিনা জানা নেই।
কিন্তু এর আগের গল্পে আরো অনেক কিছু বলা হয়নি।
‘গিটার, বাঁশি, ভায়োলিন, চিঁড়েগুড়’ সম্বল একটা দল ছিলো। যেখানে প্রদীপ (বুলা) চট্টোপাধ্যায় শীর্ষাসনে বাঁশি বাজাতেন – জনমানসে। তখনো অক্সফোর্ড মিশনের ছাত্র এব্রাহাম মজুমদার পিয়ানোর দিকে এগোচ্ছেন। যাদবপুরের ইলেক্ট্রিকালের ছাত্র রঞ্জন ঘোষাল তখনো না দেখা ঋত্বিক ঘটকের ‘সুবর্ণরেখা’সম একটা পরিত্যক্ত রানওয়ের ছবি দেখতে পাচ্ছেন – কয়েকটা সদ্য লেখা লাইনে।
বেহালার পঞ্চাননতলায় তখন আগুন খাওয়াই দস্তুর। প্রেসিডেন্সির গন্ডি ডিঙিয়ে পুণে ফিল্ম ইন্সটিটিউটে পাড়ি না দিয়ে মানিক চট্টোপাধ্যায়, তখন রেডবুক সম্বল না করে থাকতে পারলেন না।
তাপস দাস সাথেই ছিলেন।

গৌতম বা মানিক চট্টোপাধ্যায় ছোটোবেলায় খুব ভালো তবলচি ছিলেন। মহীনের ঘোড়াগুলি হবার পিছনে এই তবলার প্রচন্ড অবদান। কারণ খুব শিগগিরি উনি বুঝলেন তবলচির নাম ওই ‘অলসো র্যাবন’ সরণীতেই। তারপর যা হয় – নিজের চেষ্টায় প্রচুর ইন্সট্র্যুমেন্ট শিখলেন আর সবক’টাতেই সহজাত অধীশ্বর হলেন – আর্জ বলে একটা বিদেশী ব্যান্ডে বাজাতেন কিছুদিন।
এসবের মধ্যে বাদ সাধলো নকশাল আন্দোলন। জড়ালেন, জেলে গেলেন, কিছুদিনের জন্য ভূপালে যেতে হলো, মেয়াদ কাটিয়ে ফিরে দেখলেন – আকন্ঠ স্নেহে আর বেদম শাসনে যে ভাইবেরাদরদের ছেড়ে গিয়েছিলেন – তাদেরও কানে এবং প্রাণে সুর ভালোই ঢুকেছে।
‘চল আমরা সবাই মিলে একটা বিটলসের মতো ব্যান্ড করি’ – এই সাজেশন বা আদেশের তাৎপর্য ভূমি, চন্দ্রবিন্দুত্তোর সময়ে দাঁড়িয়ে বোঝা একটু মুশকিল।
উদাহরণ দেওয়া যাক – সেসময় মান্না দের একটা রেকর্ড বেরিয়েছিলো যার কভারে পাঁচপাঁচটা মান্না দের ছবি। আর আতিপাতি করে খুঁজেও সেই ‘পাঁচমুখো মান্না’র সাথে যারা সঙ্গত করেছে তাদের কোনো উল্লেখ নেই।
ব্যান্ড, গানের দল যাই বলা হোক – মহীনের ঘোড়াগুলির সর্বপ্রথম কৃতিত্ব আর সবকিছুর মতো গান গাওয়াটাও যে একটা দলগত প্রচেষ্টা সেটা বাঙালির মাথায় ঢোকাবার দুর্দম প্রচেষ্টা দেখাবার সাহস।
সেই সাহসে ভর করে নিজেরাই নিজেদের বুকলেট ডিজাইন (প্রযত্নে চিত্রাংশু বলে একটি আর্ট সোসাইটি। রঞ্জন ঘোষাল, প্রদীপ চট্টোপাধ্যায় সস্ত্রীক সেখানে আঁকাজোখা শিখেছেন)। সেই সাহসে ভর করে বেহেড দর্শকদের গান না শোনাবার অঙ্গীকার করে যোগেশ মাইমে গান থামিয়ে দেওয়া। সেই সাহসে ভর করে বাঙলা গানে প্রথমবার সমবেত হারমোনির ব্যবহার আর সেই সাহসের আগুন বুকে করে নিজেরাই নব্বইয়ের দশকে প্রৌড় বয়সে বইমেলায় ‘আবার বছর কুড়ি পরে’ নিয়ে ঘুরে বেড়ানো।
গৌতম চট্টোপাধ্যায় অতিমানব ছিলেন সেটা বলার অপেক্ষা রাখেনা। কিন্তু তার কারণ তিনি একঝাঁক বাঙালির স্কেলে প্রায় অন্যগ্রহের স্তরের প্রতিভাধরের অধিনায়ক ছিলেন।
মহীনের ঘোড়াগুলি এই পোড়াদেশে সফল বা বিফল হতে হয়নি। হঠাৎ হয়ে গেছিলো – হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাবার মতো।
‘শোনো সুধীজন’ – এখনো যখন কোনো একক গায়কের গান শোনার লোভে একটা ব্যান্ডকে শোতে ডাকা হয়, এখনো যখন লিড সিঙ্গারের লোভে আহাউহুর মধ্যে বেস গিটারবাদকের নাম ভুলে যেতে তোমাদের ক্ষণকাল লাগে, এখনো যখন ফুলফলনামদেশ গানে উদ্বাহু হয়ে পরের দিন গানটার লিরিসিস্টের নাম ভুলে যেতে চাও– তখন যতোবারই পয়লা জুন আসুক – গৌতম চট্টোপাধ্যায় এবং বৃহত্তর অর্থে মহীনের ঘোড়াগুলি অধরা থেকে যায়।
তাঁদের অন্য কাজ আছে – কারণ এখনো মরে যাওয়া মিউজিক ওয়ার্ল্ডের জায়গায় যে ফরাসী খাবারের দোকানটা হয়েছে, সেখান থেকে একটা হাওয়া দেয়, সেই হাওয়ায় চারপাঁচ তরুণতরুণী আনমনে গান লিখে ফেলে – গীটারে সদ্যশেখা আলেয়ার জন্ম দেয়। ড্রামস, লিড, বেস আর কিবোর্ড সম্বলে স্টেজে ওঠার সাহস জন্মায় – সেই প্রথম প্রোগ্রামের দিকে মুখ করে ‘কুয়াশাগলিতে মাখা’ রাস্তায় নামেন – গৌতম, বিশু, বাপি, এব্রাহাম, ভানু, বুলা, রঞ্জন। সত্তরের শহরে জ্যোৎস্না আসে।
‘মহীনের ঘোড়াগুলি খেলা করে কার্তিকের জ্যোৎস্নার প্রান্তরে’।
পুনশ্চঃ সম্পাদকের মূর্খামি আমাকে গৌতম চট্টোপাধ্যায় নিয়ে লিখতে দেবার। আকন্ঠ অবসেশন নিয়ে আর যাই হোক – অ্যানালিসিস হয়না।


(01/06/14)

আপনার মতামত জানান