গানের জলসাঘরে

কেয়া মুখোপাধ্যায়

 




১৯৫৩ সাল। পুজোয় নিজের সুরে প্রথম বাংলা আধুনিক গানের রেকর্ড করলেন এক শিল্পী। লং প্লেয়িং রেকর্ডে দুটি গান- 'কত দুরে আর নিয়ে যাবে বল' এবং 'হায় হায় গো রাত যায় গো'। বাকিটা ইতিহাস। বাংলা গানের এক লিজেন্ডের সূচনা দেখল সেবারের পুজো। মান্না দে। বাংলা রোম্যান্টিক গানের জগতের মুকুটহীন সম্রাট। সে বছরটা বাংলা গানের ইতিহাসে এক মাইলস্টোন হয়ে রইল।



১৯৫৩ তে প্রথম বাংলা গান গাইতে এলেও মান্না দে-র গানের সূচনা কিন্তু হয়েছিল অনেক আগেই বম্বেতে। স্কটিশ চার্চ কলেজের ক্যান্টিনে টেবল বাজিয়ে গানের পাশাপাশি চলত কাকা কৃষ্ণচন্দ্র দে-র কাছে নিয়মিত তালিম। কাকার সহকারী হিসেবে পাড়ি দিয়েছিলেন বম্বেতে। ‘তমান্না’ ছবিতে সুরাইয়ার সঙ্গে ডুয়েট এবং শঙ্কর রাও ব্যাসের সুরে ‘রামরাজ্য’ ছবিতে একক কণ্ঠে প্রথম প্লেব্যাক করলেন। খুব একটা ভরসার জায়গা তৈরি হল না। কিন্তু বাংলায় ফিরে না এসে মান্না দে রয়ে গেলেন বম্বেতে। ১৯৫০-এ, শচীন দেববর্মনের সুরে ‘মশাল’ ছবিতে গাইলেন ‘উপর গগন বিশাল’। এই গানটিই যেন তাঁর ভবিষ্যতের দিগদর্শন করে দিল। সার্থক হল বম্বেতে থেকে যাওয়া।



বম্বেতে তখন দাপটে কাজ করছেন রফি, মুকেশ, হেমন্তকুমার, তালাত মাহমুদ, কিশোরকুমার। সেই প্লে-ব্যাক বৃত্তে নায়ক বা প্রধান চরিত্রের লিপে খুব একটা জায়গা হয়নি তাঁর। নায়কোচিত কণ্ঠ বলতে তখন যা বোঝাত, সুরকারদের মতে সেটা তাঁর ছিল না বলেই হয়তো। মূলত পৌরাণিক কি ধর্মমূলক ছবিতেই ডাক পেতেন মান্না দে। তবে শঙ্কর জয়কিষণ, শচীন দেববর্মন, সলিল চৌধুরী এবং পরবর্তীকালে রাহুল দেববর্মন মান্না দে-র গায়কী অনুযায়ী তাঁর কণ্ঠে তুলে দিয়েছেন কিছু অসামান্য কিছু গান। আর সেই সব গানে নিজের সেরাটা দিতে গিয়ে নিজেকে বারবার ভেঙেছেন মান্না দে। সলিল চৌধুরীর ‘অ্যায় মেরে প্যায়ারে ওয়াতন’-এর মান্না, ‘পেয়ার হুয়া ইকরার হুয়া’-র মান্না আর ‘আও টুইস্ট করে’র মান্নার মধ্যে অনেক তফাৎ। শহুরে পল্লিতে গভীর রাতে পড়শিদের অসুবিধে না-করে এক কাবুলিওয়ালা চাপা স্বরে গাইছে ‘অ্যায় মেরে প্যায়ারে ওয়াতন’। সেই গান গাইতে গিয়ে মান্না দে কি অনায়াসে তাঁর গলার ‘টোনাল টেক্সচার’ বা চরিত্রই পাল্টে ফেললেন।



গানের মধ্যে মার্গসঙ্গীতের সহজ-সরল উপস্থাপনাই মান্না দে-র ঘরানার বৈশিষ্ট। মার্গসঙ্গীতের জগতে যে সুরের এত রূপ হতে পারে, সেটা চলচ্চিত্র দুনিয়াকে শিখিয়ে গিয়েছেন মান্না দে। ধ্রুপদী ঘরানা ধরে রেখেই অবলীলায় কখনও কমেডি গান, কখনও রোম্যান্টিক গান, কখনও বা ভক্তির গান গেয়েছেন। আর একের পর এক কঠিন গান এত সহজ ভাবে গেয়েছেন যে, রাগাশ্রয়ী জেনেও সাধারণ শ্রোতা সে গান গুনগুন করে গাওয়ার চেষ্টা করেছেন। আওয়ারা, পরিণীতা, দো বিঘা জমিন পেরিয়ে শ্রী ৪২০ ছবিতে বিপুল জনপ্রিয়তা পেয়েছেন তিনি। ‘আনন্দ’ ছবির ‘জিন্দেগি ক্যায়সি হ্যায় পহেলি’ রেকর্ড গড়েছে। শোলে, পড়োসন, জঞ্জীর-এর মতো ছবিতে কিশোরকুমারের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে জনপ্রিয় হয়েছেন মান্না। ‘বসন্ত বাহার’ ছবিতে ভীমসেন জোশীজির সঙ্গে ডুয়েটে কী অনায়াসে গেয়ে দিয়েছেন তানগুলো! ‘লগা চুনরি মে দাগ’, ‘লপট ঝপট’, ‘ফুল গেঁন্দওয়া না মারো’র মতো গানগুলি গুনগুন করাও খুব কঠিন। আর আহির ভৈরোঁ রাগে ‘পুছো না ক্যায়সে ম্যায়নে রয়েন বিতায়ি’ শুনে মনে হয় যেন হৃদয় নিংড়ে গানটি গেয়েছেন। আবার ‘পড়োসন’-এ তাঁর সেমি-ক্ল্যাসিক্যালের কি অসামান্য রসিক ব্যবহার! ‘রে মন সুর মে গা’, ‘তুম বিন জীবন’, ‘দূর হ্যায় কিনারা’, ‘ভয় ভঞ্জনা বন্দনা’, ‘মেরা সব কুছ মেরা গীত রে’- কি অসাধারণ সব গান! কোনটা ছেড়ে কোনটা বলি! সবথেকে উল্লেখযোগ্য ব্যাপার হল নায়কের লিপে গান পান নি তো কি হয়েছে! বৃদ্ধ, ভিখারী, মাতাল, কিংবা ফেরিওয়ালার অনামী মুখে গেয়েছেন; এক্সট্রাদের লিপে গান গেয়ে সুপারহিট করিয়েছেন। অনেক ফ্লপ সিনেমার নাম লোকে মনে রেখেছে শুধু মান্না দে-র গানের জন্যে। আসলে মান্না দে গানগুলোকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে পারতেন একটাই কারণে। ওঁর ভেতরে একজন অভিনেতা ছিল। যাঁর অভিনয়ের জন্য মঞ্চ বা ক্যামেরার দরকার হত না। শুধু সুর আর কথাই যথেষ্ট। কন্ঠ দিয়ে অভিনয় করতে পারতেন। যে গানটাই গাইবেন, সেটা যেন তার থেকে বেশি জীবন্ত হতেই পারে না!



বাংলা ছবির প্লেব্যাকে মান্না দে-র গান যেন একটা নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছিল। তাঁর গায়কীর মাধ্যমে একটা অন্য ধারা সঞ্চারিত হয়েছিল রুপোলি পরদায়। কিন্তু বাংলা ছবির প্লেব্যাকে তাঁর প্রবেশটা খুব মসৃণ হয়নি। অন্য এক শিল্পীর প্রত্যাখানের সূত্র ধরেই বাংলা গানে প্রথম কণ্ঠ দিতে হয়েছিল মান্না দে-কে। যে মান্না দে পরবর্তীকালে প্রেমে-ফুটবলে-বিরহে-কফ িহাউসে বাঙালির প্রাণের শিল্পী, তাঁকেও অপেক্ষা করতে হয়েছে ভালো গানের জন্যে। ডাবল ভার্শন ‘অমর ভূপালী’ ছবিতে বসন্ত দেশাইয়ের সুরে মান্না দের প্রথম বাংলা ছবির গান ‘ঘনশ্যাম সুন্দর’। এরপর ‘একদিন রাত্রে’ ছবির ‘এই দুনিয়ায় ভাই সবই হয়’ তাঁর প্রথম ব্রেক। ডাকহরকরা ছবির ‘তোমার শেষ বিচারের আশায়’ বাংলা সিনেমায় মান্না দে-র অবস্থানকে সুনিশ্চিত ঘোষণা করেছিল। আর উত্তমকুমারের লিপে ‘শঙ্খবেলা’ ছবির ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ এবং ‘আমি আগন্তুক’ তাঁকে বাঙালির হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা দিল। ‘অ্যান্টনি ফিরিঙ্গি’ উত্তম-মান্না জুটিকে দিল সেরার শিরোপা। চৌরঙ্গী, বিলম্বিত লয়, নিশিপদ্ম, ছদ্মবেশী থেকে স্ত্রী- মৌচাক- সন্ন্যাসী রাজা বাংলা সিনেমার গানে তৈরি করে দিল মান্না- যুগ। উত্তমকুমারের লিপে ‘স্ত্রী’, ‘নিশিপদ্ম’ সন্ন্যাসী রাজা’, ‘ছদ্মবেশী’, ‘শঙ্খবেলা’র গান সমকালীনতার গন্ডি ছাপিয়ে চিরকালীন হয়ে উঠল। বাংলা ছবির গানের অন্যতম দুটো সেরা রোম্যান্টিক গানের মধ্যে অবশ্যই আসবে মান্না-উত্তমের ‘কে প্রথম কাছে এসেছি’ আর মান্না-সৌমিত্রর ‘হয়তো তোমারি জন্য।’ সুধীন দাশগুপ্তর সুরে ‘তিন ভুবনের পারে’-র ‘জীবনে কী পাব না’ গানটা ভাবুন! গানটার মধ্যে রিদম, উচ্ছ্বাস, ফ্ল্যামবয়েন্সের যে অবিশ্বাস্য ককটেল- তার আবেদন চিরকালীন। ২০০৯ সালে নব্বই বছর বয়সে আমেরিকার বিভিন্ন শহরে গান গেয়ে গেছেন মান্না দে! সেবারই বিদেশে তাঁর শেষ অনুষ্ঠান। অস্টিনে তাঁর অনুষ্ঠান শুনতে গেছি। তখনও কি অসম্ভব ভাইব্র্যান্ট উপস্থাপনায় শুনিয়েছেন এই গানটা!



আর বাংলা আধুনিক বা বেসিক গান? সেখানেও ‘ও আমার মনযমুনার অঙ্গে অঙ্গে’ কিংবা ‘এই কূলে আমি’র যুগ পেরিয়ে ‘সে আমার ছোট বোন’, ‘কফি হাউস’ বা ‘ফুটবল খেলা’ পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে মান্না দে-র কণ্ঠ আবেগময় বাঙালি জীবনের অপরিহার্য অঙ্গ। কোন গান ছেড়ে যে কোনটার কথা বলি! ‘যখন কেউ আমাকে পাগল বলে’, কিংবা, ‘আমি নিরালায় বসে বেঁধেছি আমার স্মরণবীণ’, কিংবা ‘ও আমার মন-যমুনার অঙ্গে অঙ্গে’, অথবা ‘হৃদয়ের গান শিখে তো’, ‘রঙ্গিনী কত মন’, ‘এ কী অপূর্ব প্রেম’ খ্যাতির চূড়ায় পৌঁছে দিয়েছিল তাকে। মান্না দে-র দুটি অ্যালবাম, ‘সারা জীবনের গান’ আর ‘সারা বছরের গান’ বাংলা গানের অতুলনীয় সম্পদ।

আমার খুব মনে হয় প্রেমের গান যেন মান্না দে-র মত করে আর কেউ গাইতে পারেন না! মান্না দে-র গাওয়া কিছু গানের অন্তরা, সঞ্চারী কি স্থায়ীর এক একটা লাইন যেন বাঙালির প্রেমে আর বিরহে জেগে থাকবে চিরকাল! ‘হৃদয় আছে যার সেই তো ভালবাসে, প্রতিটি মানুষেরই জীবনে প্রেম আসে,’ ‘ক’ফোঁটা চোখের জল ফেলেছ যে তুমি ভালবাসবে?’, ‘জানি তোমার প্রেমের যোগ্য আমি তো নই, পাছে ভালবেসে ফেল তাই দূরে দূরে রই,’ ‘খুব জানতে ইচ্ছে করে তুমি কি সেই আগের মতই আছ’- এক একটা লাইন মান্না দে-র গায়কীতে যেন হৃদয়ে গেঁথে গেছে। আসলে স্মার্টনেস, নাটকীয়তা, সেইসঙ্গে গল্পের মত করে, ছবির মত করে কথাকে উপস্থাপনা করা- এই মুন্সিয়ানাগুলোতে মান্না দে অপ্রতিরোধ্য। গানের কথাকে আত্মস্থ করে শুধুমাত্র গলার জাদুতে, স্বরক্ষেপণে প্রেম ফুটিয়ে তুলতে একমাত্র মান্না দে-ই পারতেন। হীরের টুকরোর মত এক একটি কম্পোজিশনে প্রাণ দিয়েছে মান্নার কণ্ঠ, আর হীরের দ্যুতি ছড়িয়ে পড়েছে শ্রোতার মনে।



মান্না দে নিজে বলতেন, ‘আমি বাঙালি থাকতে চাই। কিন্তু গায়ক হতে চাই সর্বভারতীয়।’ প্রকৃত অর্থেই তিনি সর্বভারতীয় গায়ক। কোন ভাষায় গান করেননি তিনি? হিন্দি-বাংলা বাদ দিলেও গুজরাতি, মারাঠি, মালয়ালাম, কন্নড়, ওড়িয়া, অসমিয়া, ভোজপুরি, নেপালি, মৈথিলি, পাঞ্জাবি, উর্দু...! সুদীর্ঘ তালিকা। কিশোরকুমারকে বাদ দিলে, ভারতীয় লঘু সঙ্গীতের সেরা বাঙালি গায়কও বলা যেতে পারে তাঁকে, যাঁর ভার্সেটিলিটি কল্পনাতীত।



মান্না দে-কে একবার জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, তিনি সঙ্গীত সমালোচক হলে কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন গায়ক মান্না দে-র প্লাস পয়েন্ট আর মাইনাস পয়েন্ট। একটুও না ভেবে মান্না দে বলেছিলেন, “মান্না দে-র প্লাস পয়েন্ট, সবসময় পরীক্ষা-নিরীক্ষায় বিশ্বাস করে। সুর করার সময় নমনীয় থাকার চেষ্টা করে। আর মাইনাস পয়েন্ট বা সবচেয়ে বড় দুর্বলতা, সে কিছুতেই তৃপ্ত হয় না।” এই পরীক্ষা-নিরীক্ষা মানে অনেক কিছু। গানে নাটকীয়তা। স্বরপ্রক্ষেপণ। সুর নিয়ে খেলা করা, আবার পরিমিতি বোধ। বিস্তৃতি। তাই হিন্দি গানের সর্বশ্রেষ্ঠ ক্ল্যাসিকাল গায়ক হয়েও অনায়াসে গেয়ে দেন ‘আও ট্যুইস্ট করে।’



কোন একটামাত্র বিশেষণে চিহ্নিত করা যায় না তাঁকে। প্রবোধ দে থেকে মান্না দে-তে উত্তরণের ইতিহাসে মিশে আছে অনেক উপেক্ষা পেরিয়ে নিজেকে প্রামাণ করে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে ওঠার গল্প। হিন্দি আর বাংলায়, মান্না দে ছাড়া আর কে গেয়েছেন এত রকম, এত ধরণের বৈচিত্র্যময় গান? ক্ল্যাসিকাল গানকে মুহূর্তে করে দিয়েছেন কমেডি, বিরহের গান গাইতে গাইতে চলে গেছেন পপ-গানে, মাতালের গান গাইতে গাইতে পর মুহূর্তে গেয়ে উঠেছেন অপূর্ব ঐশ্বরিক ভজন। অনেক বিশেষজ্ঞের মতে বৈচিত্র্যে সর্বকালের সেরা গায়ক মান্না দে। সমসাময়িক শিল্পীদের অনেক পরে বাংলা গান গাইতে এসে নিজেই হয়ে উঠেছেন একটা যুগ।



মান্না দে সুরের সাগর, বাংলা প্রেমের গানের অবিসংবাদিত সম্রাট। ভারতীয় গানের চর্চা যত দিন থাকবে, তত দিন বাঁচবে মান্না দে-র অতুলনীয় স্টাইল। আধুনিক গানে ধ্রুপদী সঙ্গীতের অসামান্য ব্যবহারের উপমা তিনি নিজেই। ধ্রুপদী সুরকে কী ভাবে জনপ্রিয় গানে সঞ্চারিত করতে হয়, তার অনবদ্য দৃষ্টান্ত ছড়িয়ে আছে তাঁর অজস্র গানে। একটা ঘরানা এক দিনে তৈরি হয় না। দীর্ঘ সময় লাগে। কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে অমরত্ব পায় শিল্পীর নিজস্ব শৈলী। আর সেই শৈলীর ওপর ভিত্তি করে নিজস্বতায় এগিয়ে চলেন পরবর্তী প্রজন্মের শিল্পীরা। এই প্রজন্মের অনেক শিল্পী মান্না দে-র ঘরানার অনুসারী। নতুন প্রজন্মকেও তাঁর গানের মণিমুক্তোর কাছে ফিরতে হবে, সে সব গান কণ্ঠে তুলে নিতে হবে। মুকুটটা ফেলে রেখে রাজা চলে গেছেন। কিন্তু সেই রাজার গান কোথাও না কোথাও বেজে চলেছে, ‘মেরা সব কুছ মেরা গীত রে/ গীত বিনা কৌন মেরা মিত রে?’ জীবনের জলসাঘর থেকে বিদায় নিলেও ভারতীয় গানের জলসাঘর চিরকালই উজ্জ্বল হয়ে থাকবে মান্না দে-র অনন্য প্রতিভায়।

আপনার মতামত জানান