আমরাও ‘টিটওয়াল কা কুত্তা’

সরোজ দরবার

 


কুকুরটার কোনও দোষ ছিল না। কিন্তু কুকুরটাকে মরতে হয়েছিল।
১৯৫১ এর অক্টোবরে সাদাত হাসান মান্টো সাহেব লিখে গিয়েছিলেন টিটোয়ালের কুত্তার নিয়তি। বস্তুত তিনি চাইলেও তো কুকুরটাকে বাঁচাতে পারতেন না। কেননা ইতিহাসের লিখনই তাকে মেরে রেখেছিল, যাকে বলে ‘কুত্তে কি মউত’।
তবু কপট ইতিহাসের অদ্ভুত পরিহাস এমনই যে, কুত্তাটা মরেও মরে না। বারবার তাকে মরতে হয়। মরিয়া প্রমাণ করতে হয় যে সে বেঁচে ছিল।
ঘটনা হল সেদিন নির্মেঘ আকাশের দিকে তাকিয়ে হরনাম সিংয়ের মনে হচ্ছিল, ‘আকাশে নক্ষত্রখচিত জুতো ঝিলমিল করছে’। এরকম মনে হওয়া আজও প্রায়ই দেখা যায়। শুধু ওই নক্ষত্রখচিত জুতোর জায়গায় কারও ‘মরূদ্যান’ মনে হয়, কারও মনে হয় সব কিছু বুঝি হাসছে। নির্মল শান্তির বাতাবরণ। ঠিক সেদিন যেমন ছিল। এমন সময় হরনাম সিংয়ের কানে গেল এক কুকুরের ডাক। বনতা সিং তার নাম দিয়ে দিল ‘চাপ্পড় ঝুন ঝুন’। বনতা যতই বলুন যে চাপ্পড় ঝুন ঝুন হিন্দুস্থানি, শেষমেশ ‘শরণার্থী’ বলতে তবে হরনাম সিংয়ের মন গলল।
তা সেদিন হরনাম যেমন চাইতেন, কুকুরকেও হিন্দুস্তানি বা পাকিস্তানি হতে হবে, আজও অনেকেই চান, কুকুরকে(পড়ুন পাবলিককে) পক্ষে নতুবা বিপক্ষে হতে হবে। হ্যাঁ, আর এক দল থেকে এ দলে এলে খানিকটা শরণার্থী স্ট্যাটাস, ছটাক সমবেদনা। তাকে অবিশ্যি নামও দেওয়া, ইনামও। কুকুরটাও তো পেয়েছিল। ‘সকালের খাবার থেকে সব জওয়ানই একটু একটু করে কুকুরটিকে দিল, সে খেলোও পেট ভরে।’ কিন্তু নিয়তির নিশি ডাক যাকে টেনে নিয়ে যায় তাকে বাঁচাবে সাধ্য কার। দল ভেঙে আজ কোন্দল হয়, দুই দলে দলাদলি হয়, সেও তো ওই নিশিডাকই। মান্টো সাহেব তাই তো কুকুরটিকে এবার দেখলেন সুবেদার হিম্মৎ খানের কাছে। সে ততোক্ষণে ট্যাগড হয়ে গেছে। তার গলায় লেখা, ‘চাপ্পড় ঝুন ঝুন, এটি একটি হিন্দুস্তানি কুত্তা’। কুকুরের আর কুকুর থাকার জো রইল না।
পাশাপাশি দুই পড়শিরই কি আজ আর স্রেফ ভাই-ভাই থাকার প্রতিবেশ আছে নাকি। তাকে কোনও না কোনও ভাবে ট্যাগড হতেই হবে। হয় তুমি এর, নয় ওর। মানুষ বলে কিছু নেই, প্রশ্ন হল, তুমি কোন দলের মানুষ? এরা তোমাকে ওদের থেকে দূরে রাখবে, ওরা তোমাকে নিজেদের করে নিতে চাইবে। তুমি ওদের হলে এরা তোমাকে মারবে, তুমি এরাই থেকে গেলে ওরা তোমাকে মারবে। কিংবা দরকার হলে দুজনেই তোমাকে মারবে।
কুকুরটাও এবার হিন্দুস্তানি থেকে পাকিস্তানি বনে গেল। মানে সুবেদার হিম্মৎ খানই তাকে পাকিস্তানি করে তুলল। তার নতুন নাম হল, ‘সুপড় সুন সুন’ এবং সেটি হয়ে গেল একটি পাকিস্তানি কুত্তা। তবু কুত্তা যদি রাজনীতি বুঝত তাহলে হয়তো মৃত্যু এড়াতে পারত। আসলে রাজনীতি এমনই এক তাসের জুয়া যা সকলেই বোঝেন না। বোঝেন অল্প কিছু সংখ্যক লোক, চাল দেন তারাই, লাভ লোকসান হয় তাঁরই। মাঝখানে এসে পড়ে রাজনীতি না বোঝা কিছু মানুষ, যারা মনে করেন, বা তাদের মনে করানো হয় যে তাঁরাও রাজনীতির অংশীদারি।
কুকুরটাও এসে পড়ল এই মাঝখানে। পাকদন্ডীতে। যেখান থেকে সুবেদারও তাকে দেখতে পাচ্ছে। আর জমাদার তো কুত্তার পেটে ঘি হজম না হওয়ার রাগে ততোক্ষণে প্রথম গুলিটা চালিয়েই ফেলেছেন। ঘি হজম না হওয়াটা বড় ব্যাধি। নাম, ইনাম সব যাকে দেওয়া হল, অন্তত দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হল, সে হজম করবে নাই বা কেন? হজম করাটাই তো উপরচালাক গণতন্ত্রের ধর্ম। তার অন্যথা হলে গুলি চালালে কি অন্যায়? ন্যায়-অন্যায় কিছুই বুঝে উঠতে পারল না কুকুরটা। শুধু জমাদারের গুলির আওয়াজে ভয় পেয়ে সে উলটো দিকে পালিয়ে গেল। উলটো দিক তাকে নিল না। নেবে না সেই তো স্বাভাবিক। সে তো বোড়ে হিসেবেই তাকে চায়। যে তুমি নিজের দল ছেড়ে আজ নতুন দলে যোগ দিয়েছ, সে তুমি আদৌ কি জানো নতুন দলের ‘মঞ্জিল’ ঠিক কোথায়? তুমি তো তাকে দরদী ভেবেছ। ভেবেছ আশ্রয়দাতা। কিন্তু বোড়ের জন্য রাজা খোয়াবে এমন খেলুড়েও কেউ হয় নাকি? সুতরাং উল্টোদিক থেকেও কুকুরটাকে ফিরিয়ে দেওয়া হল। ভয় পাওয়ানোর জন্য একটা ফায়ারও করা হল। কুকুরটা আবার জমাদারের দিকে দৌড়ল। এবার জমাদার বেশ নিশানা করে যে ফায়ার করল তার গুলি গিয়ে লাগল কুকুরটার পায়ে। ল্যাংড়াতে ল্যাংড়াতে সে সুবেদারের দিকে ঘুরতেই আবার তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হল। ‘ কুকুরটা শেষবারের মতো অন্যদিকে ফিরল। ওর একটা পা একেবারেই অকেজো হয়ে গিয়েছিল, অন্য তিনটে পায়ের সাহায্যে কয়েক পা ওদিক হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে এগোল। জমাদার হরনাম সিং-এর তাক করা নিশানা থেকে আসা গুলিগুলো এবার ওকে ওখানেই ধূলিসাৎ করে দিল’।
সুবেদার মুখে চ্চু চ্চু শব্দ করে বললেন ‘শহীদ হয়ে গেছে বেচারা’। এখনও তো কতজনে মুখে চ্চু চ্চু শব্দ করছেন। টিভি স্টুডিওর বাতানুকূল পরিসরে দাঁড়িয়ে উপলব্ধি করছেন, দল-মত নয়, মরেছে মানুষ। লাশ হয়ে যাওয়া কর্মীদেরকে এখনও তো কতজন শহীদের সম্মান দিচ্ছেন। দেবেনই তো। শহীদের বিনিময়মূল্য আছে। মরা হাতিই তো শুধু লাখটাকা নয়।
সুতরাং একই কায়দায় গ্রামদখল হবে। একই কায়দায় মুখ ঢাকা থাকবে গণতন্ত্রের। একই প্রক্রিয়ায় বোমা-বারুদ মজুত করে পেট ফুটো করে দেওয়া হবে। আর আমাদের মনে পড়তে থাকবে টিটওয়ালের সেই কুত্তাটার কথা। মান্টো সাহেব জানতেন সে মরবেই। মান্টো সাহেব এও কি জানতেন সে এরকম বারবার করে মরবে।
আমরা তো আজ এখনও হরনাম সিং-এর সেই হিসহিসে গলার স্বর শুনতে পাচ্ছি। কারা যেন ন্যাকা কান্না কেঁদে বোঝাতে চাইছেন, বল, সন্তান মরেছে মোর মা’র। আর হরনাম বন্দুকের গরম নলে হাত দিয়ে সেদিনও বলেছেন, মাঝেও বলেছেন, আজও বলছেন, ‘একটা কুত্তার যেভাবে মরা উচিত, সেভাবেই মরেছে’।

আপনার মতামত জানান