উৎসব তোর ‘ধুতি কোথায়’?

সরোজ দরবার

 

‘চাদর তো ঠিক আছে, কিন্তু ধুতি কোথায়?’
কৌতুকের মেশানো মন্দ্র স্বরে সে কথা শুনে গোটা নেতাজী ইন্ডোর হেসে কলকল তানে খলখল করে হাততালি দিয়ে গড়াগড়ি। এ ওর গায়ে গড়িয়ে পড়তে পড়তে এক জন, দ’জন করে বলতে শুরু করলেন ‘ধুতি কোথায়?’।
বাহাত্তুরে স্মার্ট লম্বা চেহারাটি তখন ফিরে গেছে নিজের আসনে। ক্রিকেট মাঠে যা কখনও করতে পারেননি অমিতাভ বচ্চন, তাইই আন্তর্জাতিক কলকাতা উৎসবের উদ্বোধনে এসে করে ফেলেছেন- হ্যাটট্রিক। গতবার বাংলায় কথা বলে বাজিমাত করেছিলেন। কিন্তু এবার আবার খোদ বাংলার ব্র্যান্ড অ্যাম্ব্যাসাডার বাংলায় কথা বলবেন জানিয়েছিলেন। তাই ও চমকে যে আর চিড়ে ভিজবে না জানতেন। শেষমেশ কিন্তু ‘ফ্ল্যামবয়েন্ট’ (শাহরুখ উবাচ), ‘ফ্যামিলি ফাংশন’ (জয়াজি বলেছেন) উদ্বোধন অনুষ্ঠানে সবথেকে বেশি হাততালি কুড়িয়ে নিয়ে গেলেন ফ্যামিলির ফার্স্ট পার্সনই। বক্তব্যের শেষের দিকে বলছিলেন একটা গল্প। এক বাঙালি বাবু রোজই বাইজি বাড়ি যায় আর চাদর হারিয়ে আসে। একদিন তার বউ তাকে আলটিমেটাম দিল যে, এই শেষ। বাবু চাদর সামলে নিশিযাপন শেষে এসে বউকে বলল, দেখো আজ আর চাদর হারাইনি। বউ বলল, চাদর তো ঠিক আছে, কিন্তু ধুতি কোথায়?
প্রশ্ন হল, ধুতিটা সত্যিই গেল কোথায়? ঝকঝকে ব্লেজারের উপর সম্মানীয় উত্তরীয়ের ঐতিহ্য চাপিয়ে আন্তর্জাতিক হয়ে ওঠার এই প্রবল বাসনার মধ্যে চাদর রক্ষিত হল ঠিকই, কিন্তু ধুতি মিসিং। বাঙালি স্বভাবদোষে নাকি সবকিছুরই চলন বাঁকা দেখে। ভালো কিছু কাউকে করতে দেখলে তার নাকি চোখে জয়বাংলা(পড়ুন কনজাংটিভাইটিস) হয়। এ অভ্যেস মোটেও শোভন সুন্দর নয়। তাই বলে দুনিয়ার যে যেখান থেকে এসে আধো আধো বোলে ন- মো- স- কা- র- র বললেই বাঙালিয়ানার বিপুল তরঙ্গ হিল্লোলিয়া উঠিবে সেই বা কাঁহাতক চলবে? বাঙালিদের বরং ভেবে দেখা উচিৎ মিষ্টি দই, রসগোল্লার বাইরে আদৌ তাদের অস্তিত্ব আছে কি না। কারণ বাংলা বলয়ের বাইরের লোকেরা এর বেশি বাঙালিয়ানা খুঁজতে নারাজ। স্বয়ং ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডরও বিদেশী অভ্যাগতদের বললেন, এসব না খেয়ে যেন বাংলা না ছাড়েন। অন্যদিকে উদ্বোধনের মঞ্চে বসা অষ্ট্রেলিয় পরিচালক পল কক্স বলছিলেন, সিনেমা যে কী শক্তিশালী মাধ্যম তা বলে বোঝানো যাবে না। বেচারি খাওয়া দাওয়ার বদলে বোধহয় সিনেমা দেখার নেমন্তন্ন পেলেই খুশি হতেন। কোন প্রদেশের মানুষ যে নিজের ভাষাকে ভালোবাসে না, কিংবা নিজেদের খাবার খেতে ভালোবাসে না, কিংবা নিজেদের উৎসবে মাতোয়ারা হন না, ঈশ্বর জানেন। ঈশ্বরই জানেন, কেন শুধু কটা খাবারের নাম,ট্রাম,হাওড়া ব্রিজকেই বাঙালি নিজস্ব আয়না করে রেখে নিজের ছবি দেখেই আনন্দে লাফালাফি শুরু করে। বাকিরা জানেন, বাঙালি শো জিতে নেওয়া যাবে স্রেফ একটি নমস্কারে প্রভু, একটি নমস্কারে।
ইরফান খান তো বলেই ফেললেন, তিনি বলতে এসেছেন বলে এত হাততালি নাকি নিখাদ বাংলায় ‘ধন্যবাদ’ বলেছেন বলেই এত হাততালি। হাততালির ফোয়ারা দেখে নিজের নামটাই ‘ধন্যবাদ’ করে দেবে বললেন তিনি। বেচারি ইরফান!হাততালির উৎস যে কোথায় তিনি কী করে জানবেন? হাততালি তুমি কোথা হইতে আসিতেছ? না, নায়ক দেখার বাসনাপর্বত হইতে। ইরফান তো আর দেখতে পাননি মঞ্চে শাহরুখ ওঠার সময় অল্পবয়সি দু’চারটে মেয়ে সিট ছেড়ে লাফালাফি শুরু করে পিছনের দর্শকের ধমক খেয়ে হতোদ্যম হয়ে বসে পড়েছিল। কিন্তু ইরফান নিশ্চয়ই শুনেছেন, ডানদিকের গ্যালারি থেকে এক নারীকন্ঠ আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললেন তারস্বরে, শাহরুখ একবার এদিকে তাকাও। নায়ক কথা বলতে বলতে তাকালেন, বললেন, বেশ আজ রাতে তোমার সঙ্গেই বাড়ি ফিরব, আর হলজুড়ে কী সিটি সিটি। হাততালি তুমি কোথা হইতে আসিতেছ, না, মেইনস্ট্রিম মশালার শিখর হইতে। অমিতাভ তাই বলতে উঠতেই বেদন ‘অগ্নিপথ’ ‘অগ্নিপথ’ চ্যাঁচানি। চক্ষুলজ্জায় পাশের ভদ্রলোকরাই অতি উৎসাহীকে থামিয়ে দিলেন। গতবার থেকেই বাঁধাধরা হয়ে গেছে যে, অমিতাভ একখানা মিনি রিসার্চ পেপার শুনিয়ে যাবেন। তা এবারও তিনি হতাশ করেননি। ভারতীয় সিনেমায় মেয়েদের অবস্থান থেকে নায়িকাদের অবস্থান নিয়ে নাতিদীর্ঘ বক্তৃতায় অনেক কিছুই ছুঁয়ে গেলেন। সিনেমায় নারীদের অবস্থান আর নারীকেন্দ্রিক সিনেমার মাঝামাঝি একটা রাস্তা দিয়ে তিনি অনেকটা হাঁটলেন। আর মঞ্চের দু’পাশে ছবিতে আলোছায়ার মধ্যে হাসি হাসি মুখ করে থাকলেন সুচিত্রা সেন। সত্যিই তো কানন দেবীর ছেড়ে যাওয়া নায়িকাদের মোরামের রাস্তা যে কী করে পিচঢালা হয়ে উঠল সে খবর কি আর প্রদর্শনী রাখে! তাও গতবারের হীরালাল সেনের মতো এবার যদি কানন দেবীর নাম কানের ভিতর দিয়ে মরমে পশে তবে মন্দ কী!
মনে পড়ছিল, বাংলা ছবিতে নায়িকাদের অবস্থান নিয়ে সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় ‘মাংসের পুতুল থেকে আলোর প্রতিমা’ নামে একটি প্রবন্ধ লিখেছিলেন। সেখানে এই কটা লাইনও তিনি লিখেছিলেন, ‘আমাদের অনেক অনেক ত্রুটির মধ্যে একটি হল নিজেকেই ছলনা করা। ফলে, আমাদের বুদ্ধিজীবিরা সিনেমা বলতে যতটা সত্যজিৎ বা আন্তোনিওনি বোঝেন, ততোটাই সোফিয়া লরেন বা শর্মিলা ঠাকুরকে না বোঝার ভান করেন।’ সেই ছলনার কথাই অমিতাভ যখন শোনাচ্ছিলেন, মনে হচ্ছিল আর এক ছলনার কথা। যে ছলনায় ‘পাতালের চিরকুট’রা কোনওদিন স্বর্গের কাছে পৌঁছয় না। উৎসবও ‘অনভিজাতের অপেরা’ হয়ে ওঠার সৌভাগ্য পায় না।
বরং ব্যপক সিটির মধ্যে সিটি অফ জয়ে একটু আধটু পাঠাশালার ডোজই যথেষ্ট। অ্যাম্বাসাডরজি যেমন বললেন, অর্থাৎ সিনেমা আইডেন্টিটির বাধা টপকে সকলকে এক স্ক্রিনের সামনে সামিল করে, সিনেমা সামাজিক ইস্যুকে তুলে ধরতে ভয় পায় না ইত্যাদি ইত্যাদি মোটামুটি সিনে পড়াশোনার গোড়ার অধ্যায়ের দিকেই থাকে। শুরুটা গোড়া থেকেই হওয়া ভালো মনে হয়। এরপর ১০০ বছরের ইতিহাস পড়ে আছে। কুড়িতে বুড়িয়ে গেলে চলবে কেন!
আর এরকম চলন বাঁকা দোষই বা রেয়াত করা চলবে কেন। সিনেমা তো নিজের গুণেই জনতার দরবারে পৌঁছতে ভালোবাসে। জনতা যত সিটিতে বিস্ফোরিত হবেন, ততোই সকলে বুঝবেন বাঙালি দর্শকের মতো প্রতিক্রিয়া আর কে দিতে পারে! আগামি সাতদিন যেন সে কথা অন্য অর্থে না বোঝে। আসুন বরং মুলতুবি রেখে মেলা বকাবকি, আমরা কিছু ভালো ‘বই’ দেখি।

আপনার মতামত জানান