অবরুদ্ধ কাশ্মীর

সুশোভন

 



খণ্ড চিত্র
৯৭-র অগাস্টের ‘ভূস্বর্গের’ সোনাঝরা সকাল। স্নিগ্ধ রৌদ্রকরোজ্জ্বল দিনের উত্তাপ গোটা গায়ে মেখে গবাদি পশু গুলোকে নিয়ে ঘাস খাওয়াতে বেরোলেন মোহাম্মদ আশরাফ। সঙ্গে চৌদ্দ বছরের ছেলে রিজওয়ান। এই চোখ জুড়িয়ে যাওয়া পরিবেশ, এই মাটির গন্ধ, এই নির্মল বাতাস তাঁদের বড্ড চেনা। তাঁদের বড় আপন। হঠাৎ এক বিস্ফোরণে নিমেষে বদলে গেলো জীবনটা। চারিদিকে পাথর উড়তে লাগলো। ঘটনার আকস্মিকতা কিছুটা কাটিয়ে একরাশ কালো ধোঁয়ার মাঝে এখনো বেঁচে আছেন এটা নিশ্চিত হয়ে আশরাফ যখন মাথা তুলে দেখলেন, ততক্ষণে তার গরুগুলোর সঙ্গে লাশ হয়ে পড়ে আছে রিজওয়ান !
১১-র শ্রীনগর শহরের স্বাভাবিক ব্যস্ত দিন। আরজা বেগম কে জম্মু কাশ্মীর হাইকোর্ট সরকারের পক্ষ থেকে ১০ লক্ষ ক্ষতিপূরণের রায় ঘোষণা করল। দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর মানসিক ভাবে ক্লান্ত আরজা বেগম তখন বলছেন, “আমি টাকা চাইনি, চেয়েছি ন্যায় বিচার !” ১৪ বছর আগের গভীর রাতে সন্ত্রাসবাদী সন্দেহে গ্রেপ্তার হয়েছিল তাঁর অটোড্রাইভার ছেলে মুস্তাক। তারপর থেকে আজ অবধি হন্যে হয়ে কাশ্মীরের প্রতিটি জেল, প্রতিটি কবর স্থান ঘুরেও আরজা বেগম নিজের ছেলের হদিশ পাননি !
১৪-র নভেম্বরের শীতের নিকষ রাত্রি ভেদ করে গাড়ি চালিয়ে বাড়ি ফিরছে বাদ্গাম জেলার ছাত্তাম গ্রামের তিন কিশোর। মেহরাজুদ্দিন , ফয়সল আর বাসিমহ। আর্মি চেকপোস্টের অফিসারের সংকেত বুঝে গাড়ির ব্রেক কষতে দেরি হওয়াতেই বুলেট ঝাঁঝরা হয়ে নিথর হয়ে গেলো দুই কিশোরের তরতাজা জীবন !
৯৯-র সকাল। “যুদ্ধের খবর পাবলিক দারুণ খাচ্ছে।প্রায় প্রতিটি পত্রিকারই বিক্রি বেড়ে চলেছে হু-হু করে।এই সময় অন্য খাবার খাওয়ানো মুশকিল”।নিজ পত্রিকা দপ্তরে বসে বলছিলেন কলকাতা থেকে প্রকাশিত একটি দৈনিক পত্রিকার সহ-সম্পাদক। কার্গিলে যুদ্ধের রমরমা বাজারে প্রচার মাধ্যমগুলোর কাছে মৃত সেনারা তখন পণ্য। মৃত কাশ্মীরির দাম মরা হাতির থেকেও তখন বেশি !

১৯৪৭-র স্বাধীনতা আর পর থেকে সময় এগিয়েছে নিজের নিয়মে। সমাজ বদলেছে। বদলেছে রাজ্যপাটও। লালকেল্লার রঙ্গমঞ্চের ভাষণবাজ কুশীলবদের নাম-ঠিকানাও বদলেছে নয় নয় করে ১৬ বার। সার্ক থেকে শুরু করে রাষ্ট্রসংঘে, দ্বি-পাক্ষিক, ত্রি-পাক্ষিক বৈঠকে জলঘোলাও হয়েছে বিস্তর। সেই ঘোলা জলে মাছ ধরতে নেমেছে, কখন ‘আমরা’ কখনও ‘ওঁরা’। সমাধানের আশায় বুক বেঁধেছে সাধারন মানুষও। কিন্তু কাশ্মীর রয়ে গেছে কাশ্মীরেই। ব্যাহত হয়েছে সেখানকার পর্যটন শিল্প। বেড়েছে বেকার, হয়নি শিল্প। বারবার জাতিদাঙ্গা কাশ্মীরকে উন্নতির মুখ দেখাতে পারেনি। সাধারন ভারতবাসী, পাকিস্থানবাসী, কাশ্মীরবাসী কি চান তার মূল্যায়নও হয়নি। ভারত বা পাকিস্থানের রাষ্ট্রক্ষমতায় যেই এসেছে, দেশপ্রেম আর জাতীয়তাবাদ, ধর্মের জিগির উসকে দিয়ে কাশ্মীর সমস্যা সেই তিমিরেই রেখে দিয়েছেন। বাস্তবের কঠিন মাটিতে দুই দেশের রাজনৈতিক জাঁতাকলে আর কূটনৈতিক তরজার চোরাস্রোতে সাধের ভূস্বর্গ কিন্তু রয়ে গেছে ‘অবরুদ্ধ কাশ্মীর’ হয়েই। আজও।

ফিরে দেখা
কাশ্মীর বলতে, কাশ্মীর উপত্যকা (জনসংখ্যা প্রায় ৫৫ লক্ষ), জম্মু ( প্রায় ৪৫ লক্ষ) এবং লাদাখ (প্রায় ৩ লক্ষ) রয়েছে। আবার পাকিস্তান শাসিত গিলগিট, বালতিস্তান ও আজাদ কাশ্মীর রয়েছে তার পৃথক অস্তিত্ব নিয়ে। অন্যদিকে গণপ্রজাতন্ত্রী চীনের মধ্যে রয়েছে আকসাই চীন। সময়ানুক্রমিক ভাবে কাশ্মীরে হিন্দু, বৌদ্ধ এবং পরবর্তী সময় শৈবধর্মের উত্থান হয়। ১৩৪৯ সালে শাহ মীরের সময়ে মুসলিম এবং তারপরে ১৫২৬ থেকে ১৭৭১ সাল অবধি কাশ্মীর ছিল মোগল সাম্রাজ্যের অধীনে। ১৮২০ সালে রণজিত সিংহের নেতৃত্বে শিখরা অধিকার করার আগে দীর্ঘ সময় কাশ্মীরের রাজ্যপাটে ছিল আফগান দুররানি সাম্রাজ্যও। ১৮২০-র পর ডোগরা রাজপুত বংশের গোলাব সিং কমান্ডার নিযুক্ত হন। বৃটিশ শাসকদের সঙ্গে অমৃতসর চুক্তি’র ভিতর দিয়ে ১৮৪৬ সালে জম্মু ও কাশ্মীর ৭৫ লক্ষ টাকার বিনিময়ে গোলাব সিং কিনে নেন। ১৯২৫ সালে হরি সিং হন কাশ্মীরের রাজা। ব্রিটিশ রাজত্বে তখন দুটো ভাগ, ব্রিটিশ ইন্ডিয়া এবং ৫৬৫ টি করদ রাজ্য (Princely State) । ১৯৪৭ সালে দেশভাগের সময় বৃটিশ সরকার জানায় কাশ্মীর ও করদ রাজ্যগুলো স্বাধীন হয়ে যাবে। কিন্তু নেহেরু ঘোষণা করেন, ‘রাজাকে ক্ষমতাচ্যূত করে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। হয় ইন্ডিয়ায় যেতে হবে, নয় পাকিস্তানে যেতে হবে। স্বাধীন থাকতে পারবে না।’ কিন্তু রাজা হরি সিং তৎকালীন সময়ে ভারতবর্ষের সাথে অন্তর্ভুক্তিতে অনিচ্ছুক থাকায় দেশভাগের সময়ে কোন ঐক্যমত্য সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায়নি। অন্যদিকে শেখ আবদুল্লার নেতৃত্বে ‘ন্যাশনাল কনফারেন্সের’ রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় কাশ্মীরবাসী ( হিন্দু, মুসলমান এবং শিখ) তখন রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্য তীব্র ধর্মনিরপেক্ষ শ্রেণী সংগ্রামে লিপ্ত। সেই সময় নেহেরু কাশ্মীরে গিয়ে শেখ আবদুল্লার দেখা করলে ‘ন্যাশানাল কনফারেন্স’ বিভাজিত হয়ে, জম্মুর মুসলমান নেতা গোলাম আব্বাস আলাদা ‘মুসলিম কনফারেন্স’ গঠন করেন। তাকে জিন্না সমর্থনও দেন।এরকম অবাঞ্ছিত রাজনৈতিক অস্থিরতার সুযোগ নিয়ে পাকিস্থানের হানাদাররা উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ থেকে কাশ্মীর আক্রমণ করে প্রায় শ্রীনগর পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বাধ্য হয়ে হরি সিং ভারতবর্ষের সাথে ‘অন্তর্ভুক্তি চুক্তি’ সাক্ষর করেন। ভারতীয় সৈন্য এবং ‘ন্যাশনাল কনফারেন্সের’ নেতৃত্বে সাধারন কাশ্মীরবাসী লড়াইয়ে পাকিস্থানের হানাদারদের পিছু হটতে বাধ্য হয়। এই রাজনৈতিক পরিসরে জম্মু কাশ্মীরে আরোপিত হয় বহুলচর্চিত Article 370। পরবর্তী সময় ১৯৫২-র দিল্লী চুক্তির মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সরকার জম্মু কাশ্মীরের জন্য আরও কিছু বিশেষ সুযোগ সুবিধা দেবার কথা ঘোষণা করে। সাধারন কাশ্মীরবাসী তখন শেখ আবদুল্লার ভূমি সংস্কার সহ একাধিক জনমুখী দৃষ্টিভঙ্গির জন্য ‘ন্যাশনাল কনফারেন্সের’ কে সার্বিক সমর্থন জানিয়েছে। ১৯৫৩-র পরে শেখ আবদুল্লার সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের সম্পর্ক খারাপ হয় এবং তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে দীর্ঘ ১১ বছর জেলবন্দী করেও রাখা হয়। জম্মু তে তখন প্রজা পরিষদ কাশ্মীরের সম্পূর্ণ ভারতে অন্তর্ভুক্তির দাবীতে সোচ্চার হচ্ছে। সাম্প্রদায়িক বিভাজনের প্রথম ইঙ্গিত। অন্যদিকে কখনও ভারত, কখনও পাকিস্থান, কখন আবার রাষ্ট্রসংঘের শর্ত পাল্টা শর্ত আর আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতির দোলাচলে স্বাধীনতার এবং পার্টিশনের অস্থির সময়ে কাশ্মীরের মালিকানা ঠিক করতে ‘গণ ভোটের’ প্রসঙ্গ তখনও বিশবাঁও জলে। জম্মু কাশ্মীরের পরবর্তী ইতিহাস বঞ্চনার, যন্ত্রণার এবং বিভাজনের। ১৯৯০ –রএর আগে তিন দশক ধরে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার তাগিদে কেন্দ্রীয় সরকার একাধিক বার তাঁদের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে, স্বায়ত্তশাসন কে শক্তিশালী করার নামে Article 370-র উপর ৪২ খানা সংশোধনী এনেছে, যা বকলমে কাশ্মীর কে সাধারন রাজ্য গুলির সাধারন সুযোগ সুবিধা গুলি থেকেও বঞ্চিত করেছে। স্বায়ত্তশাসনের দাবি যত দ্রুত ক্ষয়ীভূত হয়েছে ততোধিক দ্রুত কাশ্মীর জুড়ে বেড়েছে গনতন্ত্রের অবমাননা। ৮০-র দশকে একধিক নির্বাচনের নামে প্রহসন ও তার সাথে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘হাতের পুতুল’ রাজ্য সরকারের সাধারন কাশ্মীরবাসীর মৌলিক চাহিদার অবমাননা কাশ্মীর কে দ্রুত অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেয়। অপরদিকে উপত্যকা অঞ্চলে হিন্দু কাশ্মীরি পণ্ডিতদের উপর অকথ্য অত্যাচারের প্রেক্ষাপটে ধর্মীয় মেরুকরনের পথ প্রশস্ত করে। ফলস্বরূপ ৯০-র শুরুতে দ্রুত উত্থান ঘটে পাকিস্থানের মদতপুষ্ট JKLF , হিজাবুল মুজাহিদিন, লস্করই-তৈবা, হারকাত-উল-আনসারের মত মৌলবাদী এবং বিচ্ছিন্নতাবাদী শক্তি গুলির। উত্তাল হয়ে ওঠে ভূস্বর্গ। ‘আজাদি-র’ শ্লোগানের গগনভেদী চিৎকারে কাশ্মীর তখন বিপন্ন।প্রতিবর্ত ক্রিয়া স্বরূপ আরোপিত হয় ভয়ঙ্কর AFSPA।গত পয়লা নভেম্বর লন্ডনের দি গার্ডিয়ান পত্রিকায় চিত্রা রামাস্বামী লিখেছেন যে “the daily drip-drip of tragedies, brutalities and shocks of a conflict that, since 1989, has claimed the lives of 70,000 people. Kashmir is now the most militarised zone in the world, and Waheed captures the lives of a traumatised people forced to live alongside ever growing numbers of Indian armed forces fighting ever growing numbers of Pakistan-sponsored insurgents.” অসংখ্য গুলি আর প্রাণের বিনিময়ে, রক্ত ভেজা রাস্তায় সওয়ার হয়ে বিগত দশকে কিছুটা পরিবর্তন হয়েছে পরিস্থিতির। ফিরে এসেছে আপাত স্বাভাবিকতা। কিন্তু রয়ে গেছে AFSPA। আর আজও তার কড়া মাশুল গুনতে হয়েছে কাশ্মীর কে। AFSPA-র অপপ্রয়োগে অসীম ক্ষমতাশালী আর্মিদের বিরুদ্ধে গনধর্ষণ, ঘর-গ্রাম লুট, হেনস্থা আর অবাধে বুলেট খরচার অভিযোগ কান পাতলেই শোনা যায়। গোটা কাশ্মীর জুড়ে বেড়েছে অবৈধ কবরের সংখ্যা। ফলস্বরূপ কাশ্মীরের বিভ্রান্ত এবং জীবনের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত সাধারন মানুষ যেমন দ্রুত মানসিকভাবে বিচ্ছিন্ন হয়েছে ভারতরাষ্ট্র থেকে অন্যদিকে একটি অংশের মধ্যে বেড়েছে বিচ্ছিন্নতাবাদীর শক্তির প্রতি সহানুভূতি। বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন ও কিছু রাজনৈতিক দলের AFSPA-র লঘুকরনের বা তুলে নেওয়ার দীর্ঘ এবং ধারাবাহিক দাবি সত্ত্বেও কেন্দ্রীয় সরকার নির্বিকার। তাই ৭ লক্ষ ভারতীয় সেনার প্রতিদিনের চোখ রাঙ্গানি আর দেশের প্রতিরক্ষা বাজেটের ৭০% খরচার বিলাসিতায় কাশ্মীর এখনও অথৈ জলে। কাশ্মীর এখনো অবরুদ্ধই।

সম্ভাবনা ও এগিয়ে চলা
কাশ্মীরের সমস্যার কোন একমাত্রিক সমাধান নেই। স্থিতিশীল অবস্থার মাধ্যমে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে সবপক্ষের সার্বিক উদ্যোগের প্রয়োজন। ২০০০-র পরবর্তী সময়ে ভারত-পাকিস্থানের কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে কিছু ইতিবাচক এবং সাহসী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ২০০৮-র মুম্বাইয়ে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণের পর পুনরায় দু-দেশের সম্পর্কের দ্রুত অবনতি হয়। পাকিস্থান সরকার যতদিন না তৎপর হয়ে বিশ্ব মহলে নিজেদের ‘সন্ত্রাসবাদের আঁতুড়ঘর’ তকমার কালো দাগ মুছে ফেলতে উদ্যোগী হচ্ছে, ততদিন তাঁদের সঙ্গে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করা নিতান্তই দুষ্কর। কিন্তু বাস্তবে দু-দেশের সুস্থ রাজনৈতিক সম্পর্কই কাশ্মীর সমস্যা সমাধানের প্রাথমিক এবং গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। অন্যদিকে বর্তমানে সময়ে সরকারি ভাবেই যখন বিচ্ছিন্নতাবাদী এবং জঙ্গি কার্যকলাপ কমে যাবার কথা স্বীকার করে নেওয়া হচ্ছে তখন সেনাবাহিনীর লঘুকরন এবং পুনঃসংস্থাপনের মাধ্যমে জম্মু কাশ্মীরের গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার বিষয়ে ইতিবাচক আলোচনার শুরু করা কেন্দ্রীয় সরকারের অন্যতম জুরুরি কর্তব্য। সেনাবাহিনীর জওয়ানদের একাধিক মাবাধিকার ভঙ্গের অভিযোগ গুলিকে গুরুত্ব সহকারে তদন্তের আওতায় এনে এবং সঠিক পর্যালোচনা করেই সাধারন মানুষের ন্যায় বিচারের দাবি মেনেই তাঁদের কে ভারতবর্ষের প্রতি সহানুভূতিশীল করা সম্ভব। সাথে সাথে কাশ্মীরের মানুষের অর্থনৈতিক, কর্মসংস্থানের সমস্যা সমাধানের জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহনের প্রয়োজন। প্রয়োজন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির যা ওতপ্রোত ভাবে জড়িয়ে আছে কাশ্মীর হিন্দু পণ্ডিতদের প্রত্যাবর্তন ও পুন:প্রতিষ্ঠার প্রশ্ন। কিন্তু মনে রাখা প্রয়োজন কাশ্মীর সমস্যার রাজনৈতিক সমস্যার বীজ লুকিয়ে আছে Article 370-র মধ্যেই। বর্তমান কূটনৈতিক পরিস্থিতি, ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট, সাধারন কাশ্মীর বাসীর আবেগের আলোকে এ বিষয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিকস্তরে ইঙ্গিতবাহী, প্রত্যয়ী, গুনগত এবং ইতিবাচক আলোচনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহনের প্রয়োজন। কেন্দ্রীয় ক্ষমতায় আসীন হিন্দুবাদী দলের উপলব্ধি করার প্রয়োজন দু নৌকায় পা দিয়ে চলার নোংরা রাজনীতির সহজ সমীকরণে আদপে জম্মু কাশ্মীরের সমস্যা কঠিনতর হবে। আসলে পক্ষপাতহীন ভাবে কাশ্মীরের আলোচনার আজ জরুরি। হিন্দু-মুসলিম ধর্মীয় মেরুকরনের সরলীকরণের অপচেষ্টায় কাশ্মীর সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। গণতন্ত্রের পরিসর দরকার। ‘দেশদ্রোহী’ আর ‘জাতিয়তাবাদের’ হিড়িকে কাশ্মীর কে সীমাবদ্ধ করলে সমাধানও হবে অপর্যাপ্ত। সেদেশের সেনা মরলে এদেশের মানুষ উল্লাসে ফেটে পড়ছে। এদেশের সেনা মরলে ওদেশের মানুষের বাজি পোড়াচ্ছে। এরাই কি তাহলে প্রকৃত দেশপ্রেমিক ? দেশপ্রেম মানে কি তাহলে ক্ষমতার প্রশ্নাতীত আনুগত্য ? আর মাত্রাহীন পদলেহনে অপারদর্শী হলেই সে দেশদ্রোহী? ‘জাতীয়তাবাদী’ ও ’দেশদ্রোহী’ ঠিক করে করবে কারা ? আপাদমস্তক ধান্দাবাজী আর হাওলা, গাওলা তহলেকা থেকে শুরু করে কয়লা কেলেঙ্কারিতে ডুবে থাকা আমাদের রাজনীতিবিদরা ? স্বাধীনতার ৬৭ বছর পরও যে দেশের শতকরা পঞ্চাশভাগ মানুষের ঘরে পানযোগ্য জল নেই , পেটে না আছে শিক্ষা না আছে দু মুঠো ভাত, মাথার উপর না আছে চাল, চিকিৎসার সুযোগ সরকারে কাছ থেকে পাওয়ার কথা স্বপ্নেও ভাবেনা, যেদেশের শহরের ট্রাফিক সিগন্যাল ভরে থাকে ক্ষুধার্ত শিশুর ভিক্ষা চাওয়া হতে , সে দেশের মানুষ যদি “ভাত দে হারামজাদী,নাইলে মানচিত্র ছিঁড়ে খাবো”---তবে তারা কি দেশদ্রোহী ? পেটে খিদে নিয়ে কজন আর বোঝে কার্গিল খায়, না মাথায় মাখে। এই বঞ্চিত শোষিত মানুষদের অধিকার অর্জনের লড়াইকে আমরা কি দেশদ্রোহিতা বলবো? আর যারা দারিদ্রসীমার নীচের বঞ্চিত মানুষগুলোকে মিথ্যে আশার বাণীতে ভুলিয়ে শোষণ প্রক্রিয়াকে গতিশীল রেখেছে, সেই দুর্নীতির পাঁকে গলা পর্যন্ত ডুবে থাকা রাজনীতিকরাই কি তাহলে ‘দেশপ্রেমিক’? উত্তর আমাদেরই খুঁজতে হবে। সময় হয়েছে। অনেকে হয়েছে। গণতন্ত্র আর ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষার স্বার্থেই দেশপ্রেম আর দেশদ্রোহীর একমাত্র বিতর্ক থেকে বেরিয়ে এসে কাশ্মীর সমস্যার বহুমাত্রিক ও দ্রুত সমাধান খোঁজা প্রয়োজন।

আপনার মতামত জানান