মওলিংনং- এশিয়ার পরিচ্ছন্নতম গ্রাম

অভীক দত্ত

 




মওলিংনং। এশিয়ার সব থেকে পরিচ্ছন্ন গ্রাম। শিলং থেকে প্রায় নব্বই কিলোমিটার দূরে এই গ্রাম। এমনিতেও মেঘালয়ের রাস্তাঘাট- দেওয়াল ট্যুরিস্ট বাদ দিলে কেউ পানের পিকে রক্তাক্ত করে না। মওলিংনং তবুও আলাদা বাকি আর সব্বার থেকে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা তো এক জিনিস। কিন্তু নিজের সৌন্দর্যেও মওলিংনং অনেক এগিয়ে থাকবে। তামাবিলের রাস্তাটা যখন বাঁক নিয়ে বেতগাছে ভরা জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিল তখনও আলাদা করে কিছু বোঝা যায় নি। প্রথমে রুট ব্রিজের কাছের গ্রাম রাওয়াইতে এসেই মুগ্ধ হয়েছিলাম খাসীদের পরিচ্ছন্নতা দেখে। শুধু পরিচ্ছন্নতাই বলব কেন, মেঘালয়ের ট্যুরিজম পশ্চিমবঙ্গকে বলে বলে দশ গোল দেবে।
আমাদের একটা সাধারন ধারণাই থাকে “আহা রে, নর্থ ইষ্ট হল কত অবহেলিত একটা জায়গা”। সেই গানটার মত “যখন অনাদরে চাইনি মুখে ভেবেছিলেম দুঃখিনী মা, আছে ভাঙা ঘরে একলা পড়ে, দুখের বুঝি নাইকো সীমা”। কিন্তু ব্যাপারটা যে আসলে “ কোথা সে তোর দরিদ্র বেশ, কোথা সে তোর মলিন হাসি—” তা গিয়ে মালুম হয়। প্রথমত রাস্তা। শিলং থেকে এতটা পাহাড়ি রাস্তা এত ঝকঝকে যে মাঝে মাঝে ধন্দে পড়ে যেতে হয় ভারতে আছি কিনা। মাঝে মাঝে একটু আধটু খারাপ রাস্তা থাকলেও সেটাও আন্ডার কন্সট্রাকশন। দ্বিতীয়ত এদের প্ল্যানিং। মেঘালয়ে প্রকৃতিকে অত্যন্ত সুন্দর ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। যেখানে প্রাকৃতিক সিড়ি আছে সেখানে আলাদা করে কংক্রিটের সিড়ি করার দিকে যায় নি । আগের দিন মওসমাই (mawsmai) গুহা দেখেও তাক লেগে গিয়েছিল। প্রাকৃতিক গুহাকে কিছুই না, সামান্য কিছু আলোকসজ্জা করে এবং আগমন প্রস্থানের পথে আলাদা করে রাস্তা তৈরি করে দিয়েই বাজিমাত করা হয়েছে। গুহার ভিতরে পর্যাপ্ত আলো কিন্তু কোথাও খোদার ওপর খোদকারি নেই। এমনকী পাপ্পু লাভস পাপিয়া টাইপ কোন অত্যাধুনিক গুহা চিত্র দেখার সৌভাগ্যও এখানে হবে না।
রাওয়াই গ্রামের মধ্যে দিয়েই রুট ব্রিজে যাওয়ার রাস্তা। খাসী উপজাতিরা এক ধরণের রবার গাছের মূল দিয়ে তৈরি করেছে এই ব্রিজটিকে। নাহ, ভয়ের কোন কারণ নেই, এক একটি ব্রিজ পঞ্চাশ জন কিংবা তারও বেশি লোকের ভার বহনে সক্ষম, এতটাই এদের ক্ষমতা। এক একটি গাছ একশো ফুটেরও বেশি লম্বা হয়।

সারা বছরই মেঘ বৃষ্টির খেলা লেগেই থাকে এখানে। অতি বৃষ্টি জনিত কারণে গাছপালার বৃদ্ধিও বেশি। গ্রামের মধ্যে দিয়ে বেশ খানিকটা রাস্তা হাঁটার সময় এই গ্রামের অন্দরমহলে ঢুকে পড়া যাবে। কোথাও বাচ্চারা খেলছে দৌড়চ্ছে, কোথাও এদের পশুপালন দেখতে পাওয়া যাবে, কিন্তু সর্বোপরি যেটা চোখে পড়বে সেটা হল এদের পরিচ্ছন্নতা এবং নাম না জানা ফুলের সমাহার। রুট ব্রিজে যাওয়ার পথটা সুগম নয়। আগেই বলেছি সিড়িটা প্রাকৃতিক। অতিবৃষ্টিজনিত কারণে সেই প্রাকৃতিক পাথুরে সিড়িতে শ্যাওলাও আছে। স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় না দেখে সিড়ি দিয়ে ওঠা নামা করলে পড়ে যাওয়ার ভয় রয়েছে। কিন্তু একেবার ওই সিড়ি বেয়ে নামতে পারলে দেখা যাবে প্রকৃতি এক অনবদ্য দৃশ্য সাজিয়ে বসে আছে। পাহাড়ি নদীর ওপরে তৈরি এই প্রাকৃতিক ব্রিজ পেরিয়ে ওপারে গেলে দেখা যাবে স্বচ্ছ পরিষ্কার জলে গাছের ছায়া। একটু শারীরিক কসরত অবশ্য হয় এতটা নেমে আসার সময়ে। কিন্তু সেটা একেবারেই গায়ে লাগে না এই প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মাঝে। প্রকৃতি তথাকথিত উন্নত বিশ্বকে এখানে তার সর্বগ্রাসী হাত বাড়াতে দেয় নি বলেই যেন এর সৌন্দর্য অনেক বেশি মনে হয়।

এবং এর পরেই আসে মওলিংনঙ। মওলিংনঙের আরেকটা পরিচয় এখান থেকে বাংলাদেশ দেখতে পাওয়া যায় যেহেতু এখান থেকে বাংলাদেশ বর্ডার খুব বেশি দূরে নয়। বড় বড় গাছ ও বেতগাছের জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে সরু অথচ পরিষ্কার রাস্তার মধ্যে দিয়ে যখন আমাদের গাড়ি এই গ্রামে প্রবেশ করল তখন বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হওয়া ছাড়া আর কিছু করার রইল না। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতাটা দূরে সরিয়ে রেখে আগে বলি এত সুন্দর যে কোন গ্রাম হতে পারে সেটাই ধারণায় ছিলাম না। গ্রামে প্রবেশের মুখেই বাংলাদেশ দেখার জন্য একটা ট্রি হাউস করা হয়েছে। গাছের ওপর থেকে বাংলাদেশ দেখতে পাওয়া গেলেও গাছের ওপর ওঠার পরে বাংলাদেশের থেকেও চোখ বেশি চলে যায় বরং এই গ্রামের দিকেই। গ্রামের সর্বত্র বেতের হাতে তৈরি ডাস্টবিন, প্রত্যেক বাড়িতে ফুলের গাছ, গোটা গ্রামটায় ফুলে ফুলে সাজানো, কোথাও এক চিলতে প্লাস্টিক তো দূরে থাক কাগজের ঠোঙাও পড়ে থাকতে দেখা যাবে না। বৃষ্টির জল কোথাও দাঁড়ায় না। একজন খাসী বাচ্চাকে একটা লজেন্স দিয়ে দেখা গেল বাচ্চাটি লজেন্সের আবরণটি সেই ডাস্টবিনেই ফেলল। তাদের পরিচ্ছন্নতা দেখে লজ্জায় পড়তে হয়। এগ্রামের অধিবাসীরা প্রত্যক্ষ পরোক্ষ, সচেতন অবচেতন সব দিক দিয়েই পরিষ্কার। শিক্ষার হার একশো শতাংশ। একটা স্যাঁতস্যাঁতে অতি বৃষ্টিপ্রবন এলাকা যে এত ঝকঝকে হতে পারে তা না দেখলে বিশ্বাস করা কষ্ট। মেঘালয়ে বাঙালিদের ঘুরতে কোন অসুবিধা হবার কথা নয়, সর্বত্রই ভাত পাওয়া যায়। শিলং থেকে এতটা পাহাড়ি রাস্তা আসা এবং রুট ব্রিজের পথ শ্রমে ক্লান্ত হবার পরে মওলিংনঙে পৌঁছেই ভাত পেয়ে গেলাম। ধোঁয়া ওঠা গরম ভাত, পেপের তরকারি, একটা ভাজা আর ঝাল ঝাল মুরগীর মাংস। দেড়শো টাকা মিল। যা চাই ভাত। দেড়শো টাকায় দু পিস মাংস আবার ডিম খেলেও ওই একই দাম। ভেজ মিল ৮০ টাকা। তাদের গ্রামের মত খাসীদের রান্নাও অপূর্ব। উত্তর পূর্বের অন্যান্য সমস্ত রাজ্যের মত মেঘালয়ও মাতৃতান্ত্রিক দেশ। সে কারণেই হয়ত এদের আতিথেয়তা এবং পরিচ্ছন্নতা এত বেশি।

খেয়ে দেয়ে উঠে গ্রাম দেখতে বেরলাম। ফুল, প্রজাপতি আর পরিচ্ছন্নতা দেখে মাঝে মাঝে স্বপ্ন দেখছি কিনা অথবা স্বর্গে আছি কিনা ভেবে ভ্রম হতে পারে। কাঠের তৈরি বাড়ি, একশো বছরেরও পুরনো গির্জা, অর্কিডের স্বর্গরাজ্যে কিছুক্ষণ থাকলে ঘোর লেগে যায়। আগাছা অমিল। কুড়ি টাকার টিকেট কেটে ট্রি হাউসে ওঠা গেল। প্রথম প্রথম নড়বড়ে লাগলেও ভয়ে ভয়ে উঠে পড়লাম উপরে। বাংলাদেশ দেখে খানিকক্ষণ দীর্ঘশ্বাস ফেলে গ্রামের দিকে চোখ পড়তেই দেখলাম হাসিমুখে গ্রাম আমাদের সে দুঃখ ভুলিয়ে দিল। গাছ থেকে নেমে যখন আবার শিলংয়ের পথে রওনা হলাম মনে হচ্ছিল সারাটাজীবন এখানে থেকে গেলেই ভাল হত।

এরপর মন খারাপ থাকলে চোখ বন্ধ করে মওলিংনঙের কথা ভাবলেই মন ভাল হয়ে যাবে।

যাবেন কি করে- গৌহাটি পৌঁছে ওখান থেকে হেলিকপ্টারে শিলং পৌঁছনো যায়। অথবা বাসে কিংবা গাড়ি ভাড়া করে শিলং পৌঁছে সেখান থেকে প্রচুর গাড়ি মওলিংনং সাইট সিন করায়। তবে একই দিনে চেরাপুঞ্জি আর মওলিংনং রাখবেন না। দুটি ভিন্ন রুট হওয়ায় শিলং ফিরতে সন্ধ্যে হয়ে যায়।
থাকবেন- শিলংয়ে থাকবেন। তবে মওলিংনঙে হোম স্টে অপশন পাবেন। রাত্তির হলে গা ছমছমে অভিজ্ঞতাটা নিয়ে নিতেই পারেন।
সতর্কতা- রুট ব্রিজ যাবার পথে যথেষ্ট শারীরিক কসরত করতে হয়, শরীর ফিট না থাকলে যাবেন না। মওলিংনঙে অবশ্য সে ভয় নেই। হাঁটা পথেই গোটা গ্রাম দেখে নেওয়া যাবে

আপনার মতামত জানান