রক্ত মাখো চোখ

সরোজ দরবার

 


pic courtesy: bbc

‘এই দেখ নখ-দাঁত-মুখ রাষ্ট্র মনে থাকে যেন।’
ব্রেকিং নিউজ মাখামাখি, এত রক্ত কেন?


‘মাগো, এত রক্ত কেন?’
জ্বরের ঘোরে বারবার প্রশ্ন করছিল হাসি। আবদুল্লাকে হাসি হওয়ারও সময় দিল না ঠাণ্ডা হিসেবের কালাশনিকভ। শাহরুখ কি জানত, ছিন্নভিন্ন শরীর নিয়ে বন্ধু তৌফিকের নিষ্প্রাণ দেহটা তার উপর এসে পড়ে তাকে প্রাণে বাঁচিয়ে দিয়ে যাবে! ইরফান আর দানিয়েলও তো দিদিমণির কথায় বিশ্বাস করে ভেবেছিল, সেনাদের মহড়া থেকেই গুলির আওয়াজ আসছে। সহপাঠীদের লাশ তখন একে একে জমা হচ্ছে তালিবানি প্রতিহিংসার সামনে। ২০০ মিটার দূরে স্কুলের পিছনের গেট। প্রাণপণে দৌড়চ্ছে দুই বন্ধু। পিছন থেকে সাঁই সাঁই করে ছুটে আসছে দু’টো বুলেট। আক্রোশ লক্ষভ্রস্ট হল বলে দু’জনে প্রাণে বেঁচে গেল। আবদুল্লা জামাল তো শুধু শিখছিল কী করে চোট আঘাত লাগলে প্রাথমিক চিকিৎসা করতে হয়। বাচ্চাদের শরীরে শরীরে বিঁধে যাওয়া তিন-চারটে করে বুলেটের ক্ষত সারিয়ে তোলার চিকিৎসা তো তার জানা নেই! কার জানা আছে? এ মহান মানব সভ্যতাও কি জানে আবদুল্লার ঠান্ডা শরীরে প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়ার সঞ্জিবনীর খোঁজ? জানে তার বাবা তাহের আলির স্বপ্নকে কফিনবন্দি করে রাখা ক্ষত সারিয়ে তোলার উপায়?
১৭ ডিসেম্বর সকালে শিশুমেধের খবরবাহী কাগজ অনেকে মুড়ে পাশে সরিয়ে রেখেছিলেন। আগেরদিন টিভি চ্যানেলের সুইচ থেকে থেকেই অনেকে ঘুরিয়ে দিয়েছেন। মানুষ হয়ে এ কী চোখে দেখা যায়! এত রক্ত মেখেও চোখ তবু অন্ধ হয় না। কোথায় পালাবে, নখ তো বিঁধে আছে আমাদের বল্কলে। এইই তো নাকি আমাদের সেই বহু সুকৃতির মানুষজন্ম, দু’চোখে নিয়ম করে যা মাখিয়ে দিচ্ছে শিশুহত্যারক্ত।
যুগে যুগে সন্তান হত্যাই প্রতিশোধের সেরা উপায়। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের শেষ দিন। পরাজিত দুর্যোধন মৃতপ্রায়। রাত নেমেছে। এক পেঁচার হাতে কাকের ছানাদের নিধনযজ্ঞ দেখে অশ্বত্থামা চলল ঘুমন্ত পাণ্ডব শিবিরের দিকে। নির্বিচারে চালাল হত্যালীলা। দ্রৌপদীর পাঁচ ঘুমন্ত পুত্রেরই শিরশ্ছেদ করল অশ্বত্থামা। তাতে দোষ হল? কেন, পান্ডবরা তাঁর বাবাকে হত্যা করতে গিয়ে অসৎ উপায় অবলম্বন করেনি? ‘অশ্বত্থামা হত ইতি গজ’ বলে ঠকাননি ধর্মপুত্র? তাহলে কীসের দোষ। হত্যার সাফাই যখন হত্যা তখন মানবিকতার ছেঁদো যুক্তি নেহাতই উপহাস। কৃপাচার্যের যুক্তি সেদিন তাই ধোপি টিকল না। তেহরিক-ই-তালিবান পাকিস্তানের জঙ্গিরাও বলছে, সেনা যখন তাদের নির্মূল করার চেষ্টা করে সন্তান-সন্ততি, মহিলাদের হত্যা করেছিল তখন বোঝেনি। এখন দেখুক প্রিয় রক্তের যন্ত্রণা কাকে বলে! সেনা স্কুল তো ইচ্ছে করেই বেছে নিয়েছে তারা, শিশুহত্যা তো সুপরিকল্পিত। যাতে বুকের সবথেকে কোমল জায়গায় দাগাটা লাগে। সেনাদের সন্ততিদেরই বলি চড়ানো হচ্ছে, অথচ তাঁরা প্রতিরক্ষা দিয়ে উঠতে পারছেন না, চক্কর খাচ্ছে হেলিকপ্টার আর অসহায় আর্তনাদগুলো একে একে নিথর হয়ে পড়ছে- রাষ্ট্রের শক্তিশালী অংশকে মানসিক ভাগে ভেঙে দেওয়ার জন্য এর থেকে সেরা উপায় আর কী হতে পারে! অশ্বত্থামা তো ব্রহ্মশির অস্ত্রের ব্যবহার জানত, তবু পাণ্ডব শিবিরের উপর তা প্রয়োগ করেনি। তারিয়ে তারিয়ে উপপাণ্ডবদের গলা কেটেছিল। জানত, পাণ্ডব আর কৃষ্ণকে বাগে আনার এর থেকে সেরা উপায় আর হতে পারে না। তারপর মৃতপ্রায় দুর্যোধনের কাছে গিয়ে গল্প করেছিল সব। শুনে নাকি শান্তিতে মরতে পেরেছিল দুর্যোধন। নাকি দুর্যোধন মরেই গিয়েছিল, অশ্বত্থামা মৃতদেহের সামনে এই গল্প করে মৃতের আত্মাকে শান্তি দিতে চেয়েছিল। সেই শান্তি, যা নারকীয় নিস্তব্ধতায় রাজত্ব করে। সাদা পায়রা টায়রা ফালতু, নিছক প্রতীকি, শ্মশানের আছে নিজস্ব শান্তির দখলদারি। মানুষের জন্য শান্তিকামনা মানুষের দুনিয়ায় ক্রমশ অসম্ভব, অবাস্তব হয়ে উঠেছে, তাই মৃতের আত্মার জন্যই শুধু থাকতে পারে শান্তিকামনা।
শান্তিতে নোবেলজয়ী মালালার কথা ঘুরে ফিরেই এসেছে। ইতিহাসের কী মর্মান্তিক উপহাস! কে মালালা?-পুরস্কার ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে এই প্রশ্ন তুলেছিলেন অনেকে। শুধু টুইটারে তালিবানরা কেন, কবিতা লেখেন, পড়াশোনা করেন, নিয়মিত সংস্কৃতির ফুল ফোটান এমন অনেকেই পশ্চিমী কৌশলের অবদান ছাড়া তাঁকে অন্য কিছু ভাবতে পারেননি। বলা ভালো ভাবতে চাননি। কেননা স্কুলবাসে তাঁর উপর যে বুলেট দেগে দেওয়া হয়েছিল তা গোলাপের পাপড়ি দিয়ে তৈরি ছিল কি না। সোয়াট উপত্যকায় নিজের স্কুল তালিবানি আক্রমণে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর মালালা নিজের কথা যেভাবে জানিয়েছিলেন, সেরকম কতশত কথাই তো অনুভবী তথাকথিত সেকুলার মানবসন্তানরা ইনিয়ে বিনিয়ে লিখে দিতে পারেন। সুতরাং কে মালালা? যদি মেনেও নিই এ প্রশ্ন, তবু প্রশ্ন জাগে, কেন এই প্রশ্ন? শুধু মালালাকে অস্বীকার তো নয়, এর পিছনে কাজ করে অন্য বিদ্বেষ। গলদ বোধহয় সেখানেই। অজস্র বিদ্বেষ, চাপা আক্রোশ পোষা থাকতে থাকতে একদিন তার নখ-দাঁত নিয়ে সামনে হাজির হয়। সন্ত্রাস, মৌলবাদ, বিশ্বশান্তি ইত্যাদি নিয়ে গুরুগম্ভীর ভাষ্য রচনা করে, সহানুভূতি আর সেন্টিমেন্টের বান জাগিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতার ঢেঁকুর তোলার আগে মনে হয় এই মীমাংসাই বড় জরুরি। কেননা কান টানলে মাথা এলে নিজেদের মাথাগুলোর দিকে তাকিয়েই আমরা হয়তো চমকে যাব যে, কত ছোটখাটো উপায়ে আমরাও মৌলবাদকে প্রশ্রয় দিই। আশ্রয় দিই সন্ত্রাসকে। পরিসর ছোট, কিন্তু বিষ একইরকম ঝাঁঝালো।
বিশ্বের তাবড় কূটনীতিবিদরা শিশুনিধন ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন। বলেছেন, পাশে আছি, সঙ্গে আছি এই ধরনের কথাবার্তা। কিন্তু তাতে কি সত্যিই কিছু এসে যায়! অমুখ শুধু জানলেন তমুখ তাঁর সঙ্গে আছেন কি না। কুটনীতির চাল যেদিন চালা হয় সেদিন তো ভাবা হয় না আবদুল্লা, শাহরুখদের কথা। বিদেশনীতি যেদিন সেদিন ঠিক হয়ে আসে আমরা শুধু হাসি হাসি মুখ দুই প্রতিনিধির গলাগলি ছবি দেখি। কিন্তু তারপর? কোন ব্যবসার ইন্ধন, কার আঁতাত কাকে গোপনে মারছে আমরা তার বিন্দুবিসর্গও জানি না। স্কুলব্যাগে টিফিন ভরে এইমাত্র যে মা তাঁর সন্তানকে বাসে তুলে দিলেন, কূটনীতির পাশাখেলা নিশ্চিত তার কথা ভেবে অপেক্ষা করে না। কৃষ্ণের মন্ত্রণা নিয়ে ধর্মপুত্রও যেদিন অসাধুতার আশ্রয় নিয়েছিলেন তিনিও কি ভেবেছিলেন উপপান্ডবদের পরিণতির কথা? সুতরাং সমবেদনা, নিন্দার ফুলের তোড়া দিয়ে কফিনের রক্তদাগ ঢাকতে যাওয়া হাস্যকর। এই জঙ্গিদের মাথা তুলে দাঁড়ানোয় গোয়েন্দা সংস্থার কতখানি মদত ছিল, এখন কীই বা হবে, কোন দেশের বৈদেশিক নীতি এবার কোন খাতে এগোবে- এ নিয়ে দিস্তে দিস্তে গবেষণা করবেন সমালোচকরা। কিন্তু তাহের আলির ‘স্বপ্ন’কে আর কোনওদিনই কফিনের বাইরে আনতে পারবেন না তাঁরা।
বস্তুত আমরা নিজেরাও কি কখনও ভেবে থাকি ছোট একটা মন্তব্য বা একেপেশেমি, ছোট স্বার্থের নিরিখে কোনও এক সামিয়ানার খুঁট ধরে ঝুলে থাকা আসলে কতটা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে? আমার ভালো থাকার বিনিময়ে, আমার ধর্ম রক্ষার পরিবর্তে, আমার রাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষার খাতিরে আর এক জন খারাপ না থাকুক, শুধু একটু সংশয়ে, একটু ভয়ে ভয়েই বা থাকবে কেন? দুধকলা দিয়ে পোষা সাপই আজ কালসর্পের রূপ নিয়েছে, কিন্তু তা শুধু প্রতিবেশী দেশের নিয়তিই নয়। অথচ দুধ-কলা যোগান দেওয়ার আমোদ থেকে আমরা কিছুতেই নিজেদের সরিয়ে রাখতে পারছি না। নাহ কোনও গোষ্ঠীকে মদতের কথা নয়, প্রশ্নচিহ্ন আমাদের ধর্মনিরপেক্ষতা এবং মানবিকতার মুখোশগুলো নিয়ে। খেয়াল করলে হয়তো দেখা যাবে, আমাদের ঘৃণাও কীরকম ব্যক্তিগত স্বার্থে স্বীকার-অস্বীকারের মাপে সাজানো। অথচ এই প্রকৃতিই তো এক বিরাট নেটওয়ার্ক, যার প্রতিটি উপাদান একে অন্যের সঙ্গে আন্তসম্পর্কযুক্ত। তা জারি রাখে এমন এক সাম্যবস্থা, যার ভিতরেই অহরহ পরিবর্তন আছে, তবু তা সার্বিক সাম্যে অটল। অথচ আমাদের হাঁটা যেন বিপ্রতীপে। আমরা এই পরস্পর সম্পর্কের সূত্রকেই অস্বীকার করে এককে ছিন্ন করে আর একের ধারণাকে জোরদার করি। ফলত যে সার্বিকতার দিকে আমাদের যাত্রা ছিল তা কিছু খণ্ডিত অসাম্যের অধ্যায়ে ভাগ হয়ে যায়। আমাদের প্রতিপাদ্য ছিল মানুষ, অথচ স্বাধীনতাকে শিরোধার্য মেনেই এই যে এত মতপ্রকাশ, তা কি মানুষকে আদৌ কোনও বড় আকাশের খোঁজ দিচ্ছে, নাকি সে আকাশও কাটছাঁট হয়ে যাচ্ছে নিজস্ব পাঁজরের মাপে? তারপর একদিন ২০১২-এর ডিসেম্বরের মর্মান্তিকতা যেমন গা-সওয়া হয়ে গেছে, ২০১৪-র ১৬ ডিসেম্বরও হয়তো সেই নিয়তির দিকে এগোবে। লিখতে অস্বস্তি হলেও, এ কথাও অস্বীকার করা যায় না, এত সব কিছুর মধ্যেও আমাদের মানবিকতা প্রাত্যহিক আহা-উহুর পর প্রায়শই তো লুকোচুরি খেলতে গেছে রেস্তরাঁর কাঁটা চামচের সঙ্গে। সেটাই দস্তুর। শিশুমেধ সাইড স্টোরি হতে শুরু করলেই আমরা ফের ঢুকে পড়ব পূণ্য সারদাতীর্থে। তবে কি মানবিকতার এক নকল গড় আমারা সাজিয়ে রেখেছি? রেখেছি বলেই, তার আড়ালে সন্ত্রাসই তার সমস্তরকমের হিংস্রতা নিয়ে সত্যি হয়ে উঠছে। মানুষ সত্যিই কতখানি সন্ত্রাসের বিরোধী, আর কতখানি সন্ত্রাস বিরোধিতার নামে নিজস্ব মতামত বা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য চাপিয়ে দিতে আগ্রহী তার প্রতিতুলনা বোধহয় এ মুহূর্তে বড় প্রয়োজন। এরপর হয়তো সেনা অভিযান হবে। সন্ত্রাসকে সাময়িক গুঁড়িয়ে দেবে রাষ্ট্র। কিন্তু রক্তবীজের ঝাড়ের আসল ঠিকানা তো অন্যত্র। ধর্ম বলতে মানুষ যে শুধু মানুষ বোঝে না এটাই নিত্যসত্য। সেই না-বোঝার বাসভূমি থেকে মাথা তুলে আবার প্রত্যাঘাত হানবে সে। বদলা নেবে। আক্রোশ উড়ে যাবে আত্মঘাতী বোমায়। ঘৃণা করতে গিয়েও আমরা জেনে, না জেনে টেনে আনি ধর্মীয় প্রসঙ্গ। অথচ ছোট্ট একটা প্রজাপতির ডানা ঝাপটানাতেও নাকি টর্ণেডো হতে পারে কোথাও।

তাহলে কী হবে শাহরুখ, তৌফিকদের? কীই বা করার ছিল দ্রৌপদীর পাঁচ পুত্রের। সেদিন অশ্বত্থামার হিসেব মতো পাণ্ডবরা ছুটেও এসেছিল। ব্রহ্মশির অস্ত্রের প্রয়োগ করল অশ্বত্থামা। কৃষ্ণের পরামর্শে অর্জুনও করলেন একই প্রয়োগ। কিন্তু অর্জুন অস্ত্র ফেরাবার মন্ত্র জানেন। অশ্বত্থামা জানে না। আরও ক্রোধবশত সেই অস্ত্র সে ছুঁড়ে দিল উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানের প্রতি। পরে কৃষ্ণ বাঁচিয়ে দিয়েছিলেন উত্তরার সন্তানকে। কিন্তু এই দুঃসময়ে কে বাঁচাবেন? কে গ্যারান্টি দেবেন ‘ওদের’ মতো ‘আমাদের’ যে ছেলেরা বাসে করে ইস্কুলে গেল, তারা আবার বিকেলে ফিরে ঘরে হুটোপাটি করবে? কেইবা স্থির বিশ্বাসে জানাবেন, কোটি কোটি উত্তরার গর্ভস্থ সন্তানদের সন্ত্রাসের ভয়াবহতাকে সঙ্গী করে জন্ম নিতে হবে না আর। নাহ কেউ জানাবেন না। রাষ্ট্র পারে না, বিদেশনীতি পারে না। পারলে আমরাই পারব। ব্যক্তিগত ছোট ছোট বিষের কৌটোগুলো, মেকি মানবিকতার ছদ্মবেশগুলো, ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশগুলোকে যদি তাহের আলির স্বপ্নের সঙ্গেই কবরস্থ করা সম্ভব হয়, তবে হয়তো একদিন শ্মশানের হাত থেকে শান্তির দখলদারি আবার ফিরতে পারে মানুষের কাছেই।

আপনার মতামত জানান