পেশোয়ার কত দূর ?

সুশোভন

 



উপহাস ও রসিকতা ...
কোন আদর্শ, কোন মতবাদ, কোন লড়াই, কোন জেহাদ, কোন দাবী, কোন যুক্তি, কোন ব্যাখ্যা, কোন ধর্মাচরণের পরিধি আর ব্যাপ্তিই ১৩২ টি শিশুর রক্তঝরা কবর আগলে রাখার জন্য যথেষ্ট নয়। একদম নয়।
নতুন নয় বরং আরও কত শত ১৬-ই ডিসেম্বরের রক্তাক্ত ইতিহাস লুকিয়ে আছে পাকিস্তানের চোরাগলিতে। কত শত কবরের শীতলতা ধর্মের নামে অনুরূপ নৃশংসতার সাক্ষ্য বয়ে বেড়াচ্ছে। আজ লাহোর, কাল ইসলামাবাদ পরশু মুলতান। না এখানেই শেষ না, পাকিস্তানে সীমাবদ্ধও না, বরং বৃত্তটা ক্রমশ বাড়ছে। গাজা থেকে সিরিয়া, গুজরাট থেকে চট্টগ্রাম, শ্রীলঙ্কার কালুতারা থেকে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি, আমার আপনার উপেক্ষার, অবজ্ঞার আড়ালে আবডালে ক্রমশ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে ‘ধর্মকারার’ দল। নিজেকে বড্ড বিভ্রান্ত লাগে যখন এই লেখা লিখতে গিয়ে খুঁজে পাই তালিবান শব্দের মানে ‘ছাত্র’ , আর পেশোয়ার শহরের অপর নাম ‘ফুলের শহর’। অথচ তালিবানরা রক্ত দিয়ে হোলি খেলার জন্য এই শহরের ছাত্রদেরই বেছে নিলো৷ কি বলবেন ধর্মাচরণ ? জেহাদ ? না নির্লজ্জ উপহাস ? নির্মম রসিকতা ?


বুমেরাং
এই তালিবান আর তালিবান পন্থীরা, যারা কথায় কথায় ইসলাম কপচান, পাকিস্তান শরিয়ত্পন্থী রাষ্ট্র করে তুলতে চান, ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপ -র তথ্যানুসারে,গত পাঁচ বছরে তারাই অন্তত ১০০০টি স্কুলে হামলা চালিয়েছে৷ গত বছর সেপ্টেম্বর মাসে এই পেশোয়ার শহরেরই অল -সেন্ট্স চার্চ-এর উপর হামলার দায় নিয়েছিল তেহরিক -ই -তালিবান-র একটি গোষ্ঠী৷ সে হামলায় মারা গিয়েছিলেন ১২০ জনেরও বেশি৷ ঐ হামলার ঠিক এক সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই পেশাওয়ারের সব থেকে পুরোনো বিখ্যাত কিসসা খোয়ানি বাজারে বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ৪০ জনকে হত্যা করা হয়৷ বর্তমানে পাকিস্তান সরকার সারা বিশ্বে নিজেদের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধারের স্বার্থেই, ২০১৪ -র জুন মাস থেকে তেহরিক -ই -তালিবান সহ অন্যান্য উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে উত্তর ওয়াজিরিস্তানে অপারেশন ‘জারব -ই -আজব’ অভিযান চালাচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের ধারনা , এই অপারেশন শুরু করার পরে এ ধরণের হামলা কমেছে৷ অর্থাৎ সে অপারেশনে কিছুটা কাজ হচ্ছে নিশ্চয়ই৷ সংখ্যার নিরিখে এই দাবির সত্যতাও রয়েছে৷ উগ্রপন্থীদের ডেরায় ক্রমাগত আক্রমণের ফলে তেহরিক -ই -তালিবান -র হামলা চালানোর ক্ষমতা কমেছে৷ কিন্তু তাঁদের মেরুদণ্ড এখনও সম্পূর্ণ ভেঙে দেওয়া যায়নি৷ নভেম্বর মাসের ওয়াগা সীমান্তে হামলা আর তার পর পেশোয়ারের এই আর্মি পাবলিক স্কুলের মর্মান্তিক আক্রমণ তারই প্রমাণ। তেহরিক-ই-তালিবান (পাকিস্তান ) মুখপাত্র মহম্মদ ওমর খোরাসানি, পেশোয়ারের নৃশংসতার পরে বলেছেন পাকিস্তানের আর্মি অপারেশনের নামে তাদের পরিবার কে দেওয়া যন্ত্রণা ‘ফিরিয়ে দিতেই’ আর্মি স্কুলে এই নৃশংসতা। আসলে গত চার দশক ধরে আফগানিস্তান ও ভারতে ছায়াযুদ্ধ চালানোর জন্য বহু সংখ্যক জঙ্গি সংগঠন তৈরি করার অভিযোগ উঠেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে৷ গণতন্ত্রের স্বঘোষিত অভিভাবক আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রও ঐতিহাসিক ভাবে যার দায় এড়াতে পারে না। মুম্বই বিস্ফোরণ ও কান্দাহারে বিমান অপহরণ ঘটনার মূল অভিযুক্ত দাউদ ইব্রাহিম ও হাফিজ সইদকে আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে৷ তবু পরিবর্তন হয়নি জঙ্গি সংগঠন নিয়ে পাক প্রশাসনের নীতির৷ আর তাই ঘরের ঢেঁকির কুমির হওয়ার ‘ বুমেরাং’ চলছেই ।

নাই মামা ও কানা মামা
Institute for Economics and Peace (IEP) ২০১৪ তে, ২২টি মাপকাঠির উপর ভিত্তি করে বিভিন্ন দেশের Global Peace Index-র একটি তালিকা প্রকাশ করেছে। সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে ওয়াশিংটনের IntelCenter সংস্থাও Country Threat Index-র ভিত্তি তে পৃথকভাবে ১০ টি ভয়ংকর দেশের তালিকা প্রকাশ করেছে। দুটি তালিকাতে প্রকাশিত শেষ কয়েকটি দেশের সম্মিলিত তালিকা নিম্নরূপ-
১. সিরিয়া ২. আফগানিস্থান ৩. দক্ষিন সুদান ৪. ইরাক ৫. সোমালিয়া ৬. সুদান ৭. মধ্য আফ্রিকা ৮. কঙ্গো ৯. পাকিস্তান ১০.নর্থ কোরিয়া ১১. নাইজেরিয়া ১২. ইয়েমেন ১৩. কেনিয়া ১৪.লিবিয়া ১৫. মিশর।
লক্ষণীয় বিষয় দুটি, উপরোক্ত দু-একটি দেশ ছাড়া বাকি সবগুলিই, এক, মুসলিম সংখ্যাগুরু। দুই, ঘোষিত ভাবেই ধর্মনিরপেক্ষ কমপক্ষে নয়। তাদের রাষ্ট্রের নীতি নির্ধারণে ধর্মীয় অনুশাসনের প্রভাবও দুর্ভাগ্যজনক ভাবেই অত্যন্ত উচ্চমার্গের। কিন্তু সমস্ত মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশের একইরকম দুরবস্থা , এরকম সমীকরণে নিজেকে ঋদ্ধ করলে তা হবে নিতান্তই অপ্রতুল ও অতিসরলীকৃত। মরক্কো, তিউনেশিয়া, জর্ডন, সেনেগাল এরকম একাধিক মুসলিম সংখ্যাগুরু দেশ Global Peace Index-র তালিকাতে তুলনামূলক সন্তোষজনক অবস্থানে রয়েছে। অন্যদিকে Global Peace Index-র তালিকার প্রথম ১০টি দেশ ১.আইসল্যান্ড (৬০%), ২. ডেনমার্ক (৮৩%) ৩.অস্ট্রিয়া (৫১%) ৪. নিউজিল্যান্ড (৬৭%), ৫. সুইজারল্যান্ড ( ৫৭%), ৬. ফিনল্যান্ড (৬৯%) ৭. কানাডা ( ৬১%) ৮. জাপান (৭১%) ৯. বেলজিয়াম (৬৮%) ১০.নরওয়ে (৭৮%)। ধর্মানুরাগী মানুষ-জন শুনলে হয়ত খুশি হবেন না, কিন্তু বাস্তব এটাই যে Gallup সংস্থার ( এছাড়াও আরও দুটি সংস্থার সমীক্ষাতেও সংখ্যাগুলি একই রকম) একটি সমীক্ষা অনুসারে, সার্বিকভাবে এই দেশে গুলিতে 'Irreligious' (ধর্মহীন, অধার্মিক, নাস্তিক , ধর্মবিরুদ্ধ বা ধর্মদ্রোহী যাই বলুন না কেন অসুবিধা নেই) মানুষের বিপুল সংখ্যাধিক্য (শতকরা হিসেব প্রতিটি দেশের পাশে উল্লেখ করলাম)।
যে কোন ধর্মই মৌলবাদীদের রাস্তা প্রশস্ত করে কিনা সে প্রশ্ন আরও গভীর। কিন্তু রাষ্ট্রীয় নীতি এবং রাজনীতির পরিসরে ধর্মের ব্যবহার যে ক্রমশ এই ধরনের চূড়ান্ত অনভিপ্রেত ঘটনার মুখ্য কারণ হয়ে উঠছে সে বিষয়ে সন্দেহ প্রকাশ করা নিতান্তই অবিবেচকের কাজ হবে। বরং তথ্যাভিজ্ঞ মহলের মত অনুসারে যেকোনো ধর্মীয় মেরুকরণ ও সঙ্কীর্ণতা অন্য ধর্মীয় মৌলবাদীদের রাস্তাই মসৃণ করে।
১৯৪১ সালে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল শতকরা ২৮ ভাগ। ২০০১ সালে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল শতকরা ৯.৬ ভাগ।বর্তমানে বাংলাদেশে হিন্দু জনসংখ্যা প্রায় ৮ ভাগের কাছাকাছি। ১৯৪৭ সালের আগে পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যা ছিল ২৫ ভাগের কাছাকাছি। পাকিস্তান সৃষ্টির পরে সেটা এসে দাঁড়ায় ১৫ ভাগে। কমতে কমতে বর্তমানে পাকিস্তানে হিন্দু জনসংখ্যা হচ্ছে ১.৬ ভাগ। অপরদিকে ১৯৫১ সালে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা ছিল শতকরা ৯.৯৩ ভাগ।২০১১ সালে ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা শতকরা ১৪.৬০ ভাগ। তথ্যানুসারে একথা সহজেই বলা যায় যে আমাদের দেশের সংখ্যালঘুদের অবস্থা নিশ্চিত ভাবেই বাংলাদেশ বা পাকিস্তানের সংখ্যালঘুদের থেকে অনেকটাই ভালো ( অবশ্যই যথেষ্ট নয়) । এমনকি সাম্প্রতিক পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বহু দেশ যুদ্ধ বিধ্বস্ত মুসলিম দেশগুলো থেকে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীকে ইউরোপে বিভিন্ন দেশ আশ্রয় দিচ্ছে। পুরো ইউরোপে বর্তমানে লক্ষ লক্ষ মসজিদ, সেখানে মুসলমানগণ মোটামুটি নির্বিঘ্নেই নিজ ধর্ম পালনের অধিকার পায়। সে সব সভ্য দেশে ধর্ম, বর্ণ সকলের অধিকার সাংবিধানিক ভাবেই সমান।আর এখানেই জড়িয়ে সাংবিধানিক ভাবে 'ধর্মনিরপেক্ষ' থাকার প্রশ্নটি। এই সব দেশের বাস্তব পরিসরে 'ধর্মনিরপেক্ষতা' শতকরা একশোভাগ অনুশীলিত হয় এমন অমূলক দাবি আমি করছি না কিন্তু শক্তিশালী গণতন্ত্রের প্রাক শর্তের মধ্যেই ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রীয় নীতিতে নির্দিষ্ট ধর্মীয় অনুশাসন বর্জন করা অপরিহার্য এবং আবশ্যিক। ঐ যে কথায় বলে নাই আমার থেকে কানা মামা ভালো।


ঘুঁটে পোড়ে গোবর হাসে
আজ আমাদের দেশের হিন্দুধর্মের হর্তা- কত্তা- বিধাতাদের সংগঠন যদি পেশোয়ারের নৃশংসতায় নিজেদের পালে হাওয়া ধরতে চায় তাহলে তাদের বিনীত ভাবে ১৯৯৯ সালের ওড়িশার কেওনঝড় জেলায় গ্রাহাম স্টেইন্সের নিষ্পাপ দুই শিশু কে ঘুমন্ত অবস্থায় হত্যায় বজরং দলের ভূমিকা অবগত হওয়ার জন্য ইতিহাসের শরণাপন্ন হবার অনুরোধ জানাই। তাদের বিনীত ভাবে মনে করিয়ে দিতে চাই যে কিছুদিন আগেও গাজায় ইজরাইলের গণহত্যার নৃশংসতা পেশোয়ারের তুলনায় কোন অংশে কম ছিলনা। শিশু মৃত্যুর সংখ্যাও ছিল তুল্যমুল্য বিচারে অনেকটাই এগিয়ে। তখন কিন্তু এই ধর্মীয় উগ্রবাদের অনুশাসনে পুষ্ট এই সুদিনের সরকারই সে বিষয়ে সংসদে বিরোধীদের আলোচনা করার প্রস্তাব খারিজ করে দিয়েছিলো। ইজরাইলের বিরুদ্ধাচরণের সরকারী বিবৃতি তো অনেক দূরের কথা। হ্যাঁ, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কথা মাথায় রেখেই বলছি গাজার বুকে ইজরাইলের আগ্রাসন একই ভাবে নিন্দনীয় ছিল, আছে, থাকবেও। অবশ্যই ধর্মানুরাগী মানুষের নিজেদের মতামত থাকতে পারে, নিজেদের ধর্মচর্চা ও অনুশীলনের স্বাধীনতাও সাংবিধানিক ভাবেই স্বীকৃত। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে রাষ্ট্রীয় নীতি নির্ধারণে যখন কোন নির্দিষ্ট ধর্ম কে গুরুত্ব দেওয়ার চেষ্টা করা হয় তখনই পেশোয়ারের আকাশে সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পেতে হয়। যখন ধর্মীয় সংগঠকের ভাষণ সরকারী চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত হয়, যখন কেন্দ্রীয়মন্ত্রী রামজাদে আর হারামজাদের নতুন সমীকরণ শেখান, যখন শাসক দলের ছত্র ছায়ায় কোন ধর্মীয় সংগঠনের প্রধান ২০২১-র মধ্যে ভারতবর্ষ কে “মুসলিম ও খ্রিষ্টান” মুক্ত করার প্রকাশ্যে হুমকি দেন, যখন দিল্লির লালকেল্লা ময়দানে ‘গীতা উৎসব’ পালন করে গীতাকে জাতীয় ধর্মগ্রন্থ করার দাবি জানান কেন্দ্রীয় মন্ত্রীসভার গুরুত্বপূর্ণ সদস্যা তখন বড্ড নিরাপত্তাহীনতায় ভুগি, তখন ঐ বহুল চর্চিত ধর্মের বহিরাঙ্গে কোন সহনশীলতার পরিচয় খুঁজে পাই না। আসলে ধর্মীয় অনুশাসনের রাজনীতির শরশয্যায় চিত হয়ে শুয়ে অন্য ধর্মের মৌলবাদের দিকে থুতু ছুঁড়লে তা নিজের গায়েই ফিরে আসতে বাধ্য। আমাদের দেশেও ধর্মীয় মৌলবাদের বীজ বপন করা হচ্ছে। আর তা ক্রমশ অঙ্কুরিতও হচ্ছে। তার প্রমাণ বহন করছে Global Peace Index-র ক্রমাঙ্কে ১৬২ দেশের মধ্যে আমাদের দেশের ১৪৪ তম অবস্থান। তাই পেশোয়ারের নৃশংসতায় অন্য ধর্মবিশ্বাসী রাষ্ট্রনায়করা যদি কৃতিত্ব দাবী করেন, পেশোয়ারের নৃশংসতায় যদি আমরা নিরাপদ বোধ করি, পেশোয়ারের নৃশংসতায় যদি অন্য ধর্মের মৌলবাদীরা পায়ের তলায় মাটি খুঁজে পায় তাহলে বলতেই হয় ঘুঁটে পোড়ে আর গোবর হাসে। বাস্তবে সচেতন, সুস্থ, ধর্মনিরপেক্ষ মানুষের প্রতিরোধ ছাড়া পেশোয়ার কিন্তু খুব একটা দূরে নয়।

আপনার মতামত জানান