হ্যাপি হ্যাপি জামাই DAY

সরোজ দরবার

 

যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে...আরে মশাই...জষ্ঠি মাসে জামাইষষ্ঠী এমনিই আসে। অত ডাকের তোয়াক্কা করে না। বাঙালি রাজা-বাদশা হবে এমন আশা করা ভুল, কিন্তু রাজার জামাই হবে এহেন বাসনা বজায় আছে বিলকুল। অতএব সেই যেদিন চিরনতুনেরে দিল ডাক, কবিগুরুর ২৫ শে বৈশাখ, সেদিন থেকেই ঘেমে নেয়ে একসা তাবৎ শ্বশুরকুল। আমলকি বনের পাতা খসানোর ঢের দেরি, কিন্তু পকেটের টাকা খসানোর যে সময় এসে গেছে, দুরুদুরু বুকে সে কথা বুঝে ফেলেন তাঁরা। কিন্তু যতই পুরুষতন্ত্রের রমরমা থাক, এই একটা দিন শাশুড়িদেরিই বাজার বিগ। আর শাশুড়িতন্ত্রের একটাই মন্ত্র, সোনা চেনাতে পাথর কষ্টি, আদর চেনাতে জামাই ষষ্ঠী। আর আদর হবে নাই বা কেন? প্রথম প্রথম মেয়ে যখন ফোনে গুজুর গুজুর করত তখন বাপ - মা একটু সন্দেহের চোখে দেখত ঠিকই, কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই তো করিৎকর্মা মেয়ে এক বিশ্বকর্মার শিষ্যকে গলার টাই ধরে ড্রয়িংরুমের সোফায় এনে ফেলল। পেশায় আইটি, স্যালারির অঙ্কটা খাঁটি। এক ধাক্কায় পিতৃকুলের বুকের ছাতি যে জামাই চওড়া করে দিল, তার আদরটাও তো জমকালো হতে হবে।
জমকালো বলতে জাম কালো আর মন্টে কার্লোয় মন তো ছিলই, কিন্তু শাশুড়ি চান ইউনিক কিছু। দু’একবার জামাই বরণে পাঞ্জামি পাজামাই হিট ছিল, কিন্তু আব কি বার অন্য কিছু দরকার। সপ্তাহখানেক ধরেই সকাল সকাল সেদ্ধভাতে রান্নাগরের পাঠ চুকিয়ে শাশুড়িকুল চষে ফেলছেন বুটিকগুলো। কার এথনিক, কতখানি ইউনিক, তাতেই জমবে টেক্কা। তো শেষমেশ তেমন একটা নামী নয় বুটিকেই পছন্দের জিনিস মিলল। বহুদিন পর নিজের এটিএমকার্ডটা ব্যাগের তলা থেকে বের করে আত্মতৃপ্তির ঢেকুর তুলে বেরোবার মুখেই হঠাৎ এক বুমধারী তণ্বীর আগমন। শাশুড়ি তারিয়ে তারিয়ে বললেন, কী কিনলেন, কী রাঁধবেন। গৃহিণী জানতেন না, আসলে কাস্টমার এসেছে দেখে, বুটিক মালিকই বন্ধু সাংবাদিককে ফোন করেছিলেন। শাশুড়ি-জামাইয়ের দোহাই...পাবলিসিটি তো একটু চাই নাকি? এদিকে মাছবাজারে গিয়ে বিপদে পড়লেন কর্তামশাই। সেখানে অবশ্য পেশার তাগিদেই আর এক বুমধারীর আবির্ভাব। সেই একই প্রশ্ন, কী কিনলেন, বাজারের দাম কতটা আগুন? প্রথমে মনে হল বলেন, যা আগুন তার খানিকটা মুখে দিয়ে দিলেই হয়, কিন্তু মুখে হাসি টেনে বললেন, এই একটু ইলিশ, পাবদা,পমফ্রেট,চিংড়ি ... এবার মাংসের দোকানে যাব ...। ক্যামেরার লোকটা চটপট মাছের ঝুড়ির দিকে লেন্স তাক করল। সেইফাঁকে ভদ্রলোক রুমাল দিয়ে মাথার ঘাম মুছে নিলেন, কতই বা আর পায়ে পড়তে দেবেন?
ওদিকে ক্লায়েন্টের মন রেখে দিন রাত এক করে ‘গো লাইভ’ শেষে এমনিই মেজাজ খিঁচড়ে ছিল জামাই বাবাজির। হঠাৎ ফোন পিঁক পিঁক। প্যাটার্ন এঁকে ঢুকে দেখল,মেসেজ- your sasuri spent weeks preparing for jamai shasthi. Why not say thanks with a special gift from অমুখ ব্র্যান্ড। নিকুচি করেছে স্পেশাল গিফট, কে বলেছিল, উইকস স্পেন্ট করতে। এমনিতে তো এক জামাইষষ্ঠীর কুমীরছানা দেখিয়ে চৈত্রসেল থেকে সিকিম বেড়ানো কোত্থাও মা-বাবার জন্য কেনাকাটায় বাদ রাখেনি তরুণী গৃহিণী। প্রতিবারই এক সঙ্গলাপ- জামাইষষ্ঠীতে তোমাকে অমুখ জিনিসটা কেমন দিয়েছিল বল...। কিন্তু এই বাজার ঠিক করে দিল সে সবও স্পেশাল নয়, এবার পার্সের ছাল ছাড়িয়ে স্পেশাল কিছু কিনতে হবে। বিরক্তির মুখে ঘনঘন যখন সিগারেটে টান পড়ছে, এমন সময় অতি উৎসাহী বউয়ের ফোন- জানো মাকে টিভিতে দেখাচ্ছে... বলছে মালাইকারি রাঁধবে...। আইটির ভাইটি ভাবল, এই মুহূর্তে যদি তার নিজের মালাইচাকি বিকল হয়ে সে চলচ্ছক্তিহীন হয়ে পড়ত, তবে বড় ভালো হত।
সকাল সকাল খবরের কাগজে সেলেবগুষ্টির জামাইষষ্ঠীর প্রস্তুতি দেখে মন খারাপ এক জামাইয়ের। আসলে চাকরিটা তেমন ভালো ছিল না। কিন্তু যার যেথা মজে মন, কিবা ইস্কুল মাস্টারি কিবা প্রাইভেট টিউশন। সুতরাং অত বড়লোকের মেয়েও কোচিং সেন্টারের মাস্টারের বউ হয়ে গেল। মেয়ের বাবা কমল মিত্র না হোন, কোমল মিত্রও নন মোটে। সুতরাং শ্বশুরবাড়িতে অলিখিত নোটিস জারি হল-ট্রেসপাসার্স উইল বি প্রসিকিউটেড। অতএব ষষ্ঠীতে শ্বশুরবাড়ি নয়, সেই একতলার ভাড়াবাড়ির চার দেওয়ালেই আটকা। উপরের বাড়িওয়ালা বুড়ো-বুড়ির বছরভর খিচখিচের শেষ নেই। শুধু এই একটা দিন যেন কীরকম উলটপুরাণ! হাতে দু’চারটে বাটি নিয়ে, ঘোমটা একটু টেনে দিয়ে বাড়িওয়ালি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলবেন, জামাই ফিরেছে নাকি? জামাই অনেক আগেই ফিরেছিল, মহিলার গলা শুনে হঠাৎ কেন কে জানে বনফুলের ‘চুনোপুঁটি’গল্পটার কথা মনে পড়ে গেল তার। চুনো ছিল ভাড়া করা জামাই, আর সে ভাড়াটে জামাই।
আসলে মধ্যবিত্তের রোজনামচা তো স্টারও নয়, তাতে তেমন আনন্দও নেই। প্রতিদিন কর্পোরেটের ঘানি টেনে অন্তপুরে রক্তক্ষরণ। কিন্তু করবী ফোটে না, শুধু গলায় ঝোলানো আই কার্ড নিয়ে 14A, 55G কে বলে কী আর করবি? শুধু এই একদিনই শ্বশুরবাড়িতে জামাই হিরো। ওদিকে যে শ্বশুর মেয়ের পড়াশোনা আর ফ্ল্যাটের ইএমআই চুকিয়ে এ জীবনে আর চারচাকা কিনতে পারলেন না, মুখুজ্যে - স্যান্যালদের কাছে জীবনে প্রতিষ্ঠায় দশ গোল খেয়ে কনস্টিপেশনের সঙ্গে আত্মগ্লানি যার নিত্যসঙ্গী, তিনিও এই একটা দিন যেন স্বমহিমায়। গুলজার যেমন তাঁর ‘The Charioteer’ গল্পের মারুতিকে এক লাইনে জিতিয়ে দেন, নিত্যদিন বোটের নোংরা পরিস্কার করা মারুতি যেমন নিজের সংসারের সুখি গৃহকোণে দাঁড়িয়ে charioteer হয়ে ওঠেন, এও যেমন তেমনটাই। ওই যে গৃহিণী ফোনে যেন কাকে গোটা দিনের রিপ্লে শোনাচ্ছেন, ওই যে জামাই সিগারেট ধরাবে বলে বিকেলে চায়ের কাপ হাতে ছাদে উঠছে, ওই যে মেয়েটা খুশি খুসি মুখে নখে রিমুভার ঘসছে- এ সবই টুকরো ছবি জামাইষষ্ঠীর পাওনা। যে যেখানেই ‘lowliest of the low’ থাকুন, এই সব ছবিই যেন জীবনকে ডেকে বলে, তেরা ধেয়ান কিধার হ্যায়, তেরা হিরো ইধার হ্যায়।
শুধু ভাবনায় পড়েছেন পাড়ার লোকনাথ ফার্মেসির সাধন পুরোহিত। তার অভিজ্ঞতা বলে, জামাইষষ্ঠীর বাজারে জামাইদের মধ্যে ‘ইনো’ আর শ্বশুরদের মধ্যে ‘সরবিট্রেট’-এর ব্যপক চাহিদা থাকে। এদিকে হতচ্ছাড়া সাপ্লায়াইয়ের ছেলেটা বারবার ফোন কেটে দিচ্ছে। ব্যাটাচ্ছেলেও কি জামাইষষ্ঠীর চক্করে নাকি।
দিকে দিকে তৃপ্তির ঢেকুরের মধ্যেই পুরোহিতদা কেবল বিড়বিড় করে বলে চলেছেন, জামাইষষ্ঠীর কী জ্বালা বল দেখি!

আপনার মতামত জানান