কন্যা ভ্রূণ হত্যা

পূজা মৈত্র

 

কন্যা ভ্রূণ হত্যা এদেশের একটি সামাজিক ব্যাধি বললেও কম বলা হয়।মহাকাব্যের নায়িকাদের আমরা কেবল পুত্রপ্রসব-ই করতে দেখি, প্রবাবিলিটির সব সুত্রকে তুচ্ছ করে। কুন্তী, পাঞ্চালী, গান্ধারী( কোনোক্রমে একটি কন্যা প্রসব করেছিলেন) রা উজ্জ্বল উদাহরণ। এখন তারা কি কোন বিশেষ উপায়ে গর্ভে কেবল পুত্র আনতে জানতেন, নাকি জাত- অজাত কন্যাদের সরিয়ে ফেলার বিশেষ ব্যবস্থা সে যুগেও ছিল, মহাকাব্যের কবি তা স্পষ্ট করেননি। তাই বলা যায়, এই ব্যাধি আজকের নয়, বরং বিজ্ঞানের উন্নতির সাথে সাথে এটি নানাবিধ কৌশলী রূপ ধারণ করেছে বলা যায়। বিগত শতকের নব্বইয়ের দশকে আমরা প্রত্যেকেই সদ্যজাত শিশুকন্যার হত্যার খবরের সাথে খবরের কাগজ খুললেই মুখোমুখি হতাম। সদ্যজাত কন্যা অবাঞ্ছিত তাই তার মুখে চাল বা নুন ঠেসে ভরে দেওয়া হত, কিংবা দুধের গামলায় তাকে চুবিয়ে নিকেশ করে ফেলা হত। এই সুমহান কাজটি বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই করতেন কন্যার পিতা বা পিতৃ স্থানীয় কেউ। সদ্য বিয়োন মাকে প্রস্তুত হতে হত পুনরায় রমণের জন্য। গর্ভে পুত্র আসতে হবে যে কোন মূল্যেই। মূলত গোবলয়ে এই নৃশংসতা প্রচলিত হলেও মাঝে মধ্যে যে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম থেকেও এমন খবর আসতো না, তা নয়। এখন আর এতোটা বর্বরতার দরকার হয়না। শহরে গর্ভস্থ ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ ব্যাপারটা আগেও প্রচলিত ছিল, বর্তমান শতকের প্রথম দশক থেকে গ্রামে আর মফঃস্বলেও বেশ ভালভাবেই ছড়িয়ে পড়েছে। গর্ভের মধ্যেই জেনে নেওয়া হয় ভ্রূণের লিঙ্গ এবং যদি USG রিপোর্ট বলে যে গর্ভে যে রয়েছে তার সেক্স ক্রোমোজোম XX এর পরিচায়ক তাহলে তাকেই অচিরেই বিদায় দেওয়া হয়। গর্ভের ২০ সপ্তাহের মধ্যে গর্ভপাত করা নিরাপদ। এই সময়সীমার আগেই ভ্রূণের বহিরযৌনাঙ্গ গঠিত হয়ে যায়। নিপুণ চোখে মেশিনের মনিটরে তা ধরে ফেলেন রেডিওলজিতে উচ্চশিক্ষিত চিকিৎসক। বাকি কাজ স্ত্রী রোগ বিশেষজ্ঞের। মোটামুটি নির্ঝঞ্ঝাটেই দায় ঝেড়ে ফেলে হাঁফ ছাড়েন অজাত কন্যার পিতা এবং পিতার পরিবার এমনকি কিছুকিছু ক্ষেত্রে মাতাও। কন্যাকে দায় ব্যতীত অন্য কিছু মনে করতে না পারার সংকীর্ণ মানসিকতা এই ব্যাধির মূল। কন্যাকে উপযুক্ত ভাবে প্রতিপালন এবং যথাযথ শিক্ষা দিতে পারলে সেও যে মা-বাবার অবলম্বন হতে পারে এই বোধটাই এখনো গড়ে ওঠেনি বেশীরভাগ মানুষের মধ্যে। এখনো গ্রামে ডাক্তারি করতে গেলে শুনতে হয় মেয়েটি পড়াশুনায় ভাল, সে পড়তে চায়- অথচ তার মা-বাবা চান তাকে অবিলম্বে বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতে। নাবালিকার বিবাহ এখনো বহুল প্রচলিত। চেম্বারে এসে সদ্যবিবাহিত পঞ্চদশীকে বয়স নিয়ে প্রশ্ন করলে সে স্বামী বা শাশুড়ির দিকে আড় চোখে তাকায়- তারা নির্লিপ্ত মুখে বলেন- আঠারো। অর্থাৎ আইন সবাই জানেন, কিন্তু আইনের লঙ্ঘন করে চলেন জেনে বুঝে। পুত্রসন্তান না থাকলে মুখে কে আগুন দেবে, পুন্নাম নরকবাস করতে হবে, ছেলে থাকলে বুড়ো বয়সে দেখবে, বংশের নাম এগিয়ে নিয়ে যাবে, বংশে বাতি দেবে- এইসব কুসংস্কার শুধু অশিক্ষিতদের মধ্যেই নয়, শিক্ষিতদের মধ্যেও গভীর ভাবে রোপিত রয়েছে। এছাড়া মেয়ে হলে তার জন্য কন্যাপণের ব্যবস্থা করতে হবে- এ চিন্তাও বাস্তবচিত।ছেলের বাবা মুখে বলেন, পণ? কি যে বলেন মশাই! তারপরই বলেন, যা দেবেন, আপনার মেয়েরই তো থাকবে- খাট, আলমারি, ড্রেসিং টেবিল, ফ্রিজ, টিভি সবাই দেয়, আপনি ভরি পনেরো গয়না, ছেলের শখের একটা বাইক( এই দাবীটা সাইকেল বা চারচাকা হয় পরিবেশ পরিস্থিতি ভেদে) দেবেন। এই দাবী মেটানোর সামর্থ্য অনেকেরই থাকে না, তাই গোড়াতেই দায় এড়াতে চান তারা। রোগের কারণ যাই হোক না কেন, প্রত্যেকটি কারণই অযৌক্তিক এবং কোন না কোন কুপ্রথার সাথে জড়িত। সঠিক মাত্রায় সচেতনতা এবং শিক্ষার প্রসার না হলে এই কারনগুলোকে কেবল মাত্র আইন দিয়ে দূর করা অসম্ভব। ১৯৯৪ সালে ভারতে PNDT( PRE NATAL DIAGNOSTIC TECHNIQUES ACT) প্রচলিত হয়েছে। গর্ভস্থ ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ এই আইন মোতাবেক এক দণ্ডনীয় অপরাধ। কোন ব্যক্তি যদি এইকাজ করে থাকেন অথবা এই কাজের সাথে জড়িত থাকেন তবে তার জেল জরিমানা দুই-ই হতে পারে। অথচ আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে ব্যাঙের ছাতার মত গজিয়ে ওঠা ডায়াগনস্টিক ক্লিনিকে এই কাজ রমরমিয়ে চলছিল, এখনো লুকিয়েচুরিয়ে চলে। ডাস্টবিন বা নর্দমায় পড়ে থাকা অপরিণত কন্যা ভ্রূণগুলি-ই তার পর্যাপ্ত প্রমান। যদিও এখন একটি USG যন্ত্রের ছাড়পত্র পেতে গেলে অনেক ধাপ পার হতে হয়, প্রত্যেক ক্লিনিকের দেওয়ালে স্পষ্ট হরফে লেখা থাকতে হয়-“এখানে গর্ভস্থ ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ করা হয়না। ” , প্রত্যেক গর্ভবতী মাকে ভ্রূণের ছবি তোলার আগে এই মর্মে ফর্মে সই করতে হয় যে তিনি কোনোমতেই ভ্রূণের লিঙ্গ জানতে চাইবেন না, এবং চিকিৎসককেও হলফনামা দিতে হয় যে তিনি লিঙ্গ সংক্রান্ত তথ্য ফাঁস করবেন না।তবুও অসাধু ক্লিনিক মালিক আর মধু লোভী ডাক্তারবাবুরা কিছু ক্ষেত্রে প্রলোভনের কাছে হেরে যান। মোবাইল USG যন্ত্র বস্তুটিও একটা বড় সমস্যা। এই যন্ত্রটি যেহেতু জঙ্গম তাই এর ক্লিনিকে থাকার দায় নেই। এটিকে নিয়ে গর্ভবতী মায়ের বাড়িতে, কোন গাড়িতেও কাজ সারা যায়। তাই PNDT act এর amendment এ ক্লিনিকের সংজ্ঞায় শুধু ল্যাবরেটরি ঘরটি নয়, মোবাইল মেশিনের বিস্তার যেখানে যেখানে হতে পারে সমস্ত স্থানকেই আনা হয়েছে। মোবাইল মেশিনের গতিবিধি সম্পর্কে CMOH কে সর্বদা জানাতে হবে, এমন নির্দেশও দেওয়া রয়েছে। গর্ভস্থ ভ্রূণের লিঙ্গ নির্ধারণ না হয় এভাবে কিছুটা ঠেকানো গেল, কিন্তু যদি ভ্রূণের লিঙ্গ নিষেকের আগেই নির্ধারিত হয়ে যায় তো? আমরা জানি ভ্রূণের লিঙ্গ পিতার উপর নির্ভর করে। ডিম্বাণু কেবল x ক্রোমোজোমই দিতে পারে, শুক্রাণুর থাকে x এবং y দুইধরনের সেক্স ক্রোমোজোম। যদি নিষেকের দৌড়ে y ক্রোমোজোম সম্বলিত শুক্রানু জেতে তবেই পুত্র হবে, নচেৎ কন্যা। যদিও এই দুর্ভাগা দেশে পরপর মেয়ের জন্ম দেওয়ার জন্য অনেক মাকে শ্বশুর বাড়ি থেকে বিতাড়িত হতে হয়, আত্মহত্যা করতে হয় চরম অপমান সইতে না পেরে। স্বামীটি দিব্যি আবার বিয়ে করেন, ছেলের বাবা হওয়ার জন্য। এই সত্যটি নিয়ে শিক্ষিত পুরুষও অন্ধকারে থাকতে ভালবাসেন, কারন নিজের দায় নারীর উপর চাপিয়ে দিয়েই তিনি অভ্যস্ত। যে কারনে সন্তানহীন দম্পতির কেবল স্ত্রী-ই একের পর এক পরীক্ষা দিয়ে চলে, স্বামীদেবতা টি সিমেন পরীক্ষায় নারাজ হয়ে আরামে দিন কাটিয়ে চলেন। সে অন্য প্রসঙ্গ, এখন এই টেস্ট টিউব বেবির যুগে, সন্তানের লিঙ্গ জন্মের আগেই নির্ধারিত হয়ে যায়। ল্যাবের মাইক্রোস্কোপে দক্ষ চোখ বেছে নেয় Y ক্রোমোজোম সম্বলিত সুস্থ তাগড়াই শুক্রানুগুলিকে। টেলর মেড বেবি তৈরি হয়- জিন কারখানায়। এই জিন ব্যবসায়ীদের কাজে বাধা দেওয়ার জন্য PNDT ACT ২০০২ সালে PCPNDT(PRE CONCEPTIONAL AND PRE NATAL DIAGNOSTIC TECHNIQUES ACT) ।
অর্থাৎ নিষেকের পূর্বে লিঙ্গ নির্ধারণ- ও এখন আইনত দণ্ডনীয়। জিন ব্যবসায়ীরা যদিও মোটা টাকার লোভে এইসব অর্ডারি বংশের বাতি এখনো সাপ্লাই দিয়ে থাকেন। তবে আইনের ভয়ে কিছুটা সংযত হয়েছেন।
এখন দেখা যাক এই আইনের ফলে কতটা উপকার হয়েছে। ২০০১ এর জনগননা অনুযায়ী ভারতে ১০০০ জন পুরুষ পিছু ৯২১ জন নারী ছিল, ২০১১ ই সংখ্যাটি ৯৪০ এ এসেছে। অর্থাৎ ০.৭৫% উন্নতি হয়েছে এই হারের। প্রতি ১০০০ জন পুরুষ শিশু(০-৬ বছর) প্রতি মেয়ে শিশুর সংখ্যা ৯৪৪। সংখ্যাটি এখনো মোটেও সন্তোষ জনক নয়। একমাত্র কেরালা(১০০০ জন পুরুষে নারী ১০৮৪) এবং পুদুচেরী(১০০০ জন পুরুষে ১০৩৮ জন নারী)তেই নারীর সংখ্যা পুরুষের চেয়ে বেশি।অনেক রাজ্যে এই অনুপাত শুধু কম-ই নয় আশঙ্কাজনক। এদের মধ্যে হরিয়ানা( ৮৭৭) দিল্লী(৮৬৬) চণ্ডীগড় (৮১৮) সিকিম(৮৮৯) পাঞ্জাব(৮৯৩)। বিহারে ২০০১ এর ৯১৯ থেকে ২০১১ ই কমে ৯১৬ হয়েছে।এই তথ্যটি হতাশাজনক।পশ্চিমবঙ্গে এই হার ৯৩৪ থেকে বেড়ে ৯৪৭ হয়েছে। যা এখনো ৯৫০ ছুঁতে পারেনি। নারী পুরুষের হারে সামঞ্জস্য না থাকলে তা অনেক অপরাধের জন্ম দিতে পারে এ আমাদের অজানা নয়, দেশে নারী নির্যাতনের হার বেড়ে যাওয়ার এটিও একটি কারণ। আবার কন্যা জন্মালে নিরাপত্তা দিতে পারবেন না এই ভেবেও অনেকে কন্যা চাইছেন না। সমস্তটাই একটি ভিসিয়াস সাইকেলের মত। আইন প্রনয়নের ফলে পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে তবে, আরও উন্নতির অবকাশ রয়েছে। কন্যা সন্তান যে দায় নয়- বরং নির্ভরতা এই ধারনার প্রচার এবং প্রসার করার প্রয়োজন রয়েছে। এইজন্য সচেতনতা শিবির আয়োজন, সফল নারীদের উদাহরণ হিসাবে জনমানসে বিজ্ঞাপিত করা আশু প্রয়োজন। মানসিকতার বদল না হলে কিছুতেই এই জঘন্য অপরাধ রোধ করা সম্ভব নয়।


photo credit: indianchild.com

আপনার মতামত জানান