আসুন ডিগবাজি খাই ...

সুশোভন

 

ছোটবেলায় ডিগবাজি খেয়েছেন কমবেশী সবাই। ডিগবাজি দেওয়া কি মুখের কথা ? ফিটনেস লাগে হেব্বি। আমার তো মাঝেমাঝে বেশ সন্দেহ হয় যে, ‘ডারউইন’ দাদু আমাদের ডিগবাজি খাওয়া দেখেই বোধহয় বলে বসেছিলেন “Survival of the fittest”। ডিগবাজি –র আবার প্রকার ভেদ আছে। যেমন ধরুন গোল করে মিরাসাভ ক্লোসের ডিগবাজি একরকম, আবার অ্যাথেলেটিক দি কলকাতার ফিকরুর ডিগবাজি আরেক রকম, নাইট-রা আই পি এল চ্যাম্পিয়ন হলে ইডেনে শাহরুখের ডিগবাজি একরকম, YouTube -এ দেখলাম প্লেন দেখে পেঙ্গুইন দের ডিগবাজি আবার আরেক রকম। বয়স বাড়লে স্বাভাবিক ভাবেই ডিগবাজি খাবার বা দেওয়ার শারীরিক সক্ষমতা ও মানসিকতা দুটোই কমে যায়। কিন্তু এখানেই প্রয়োজন হল গিয়ে কঠিন অধ্যাবসায়ের। রবার্ট ব্রুস আর সেই মাকড়সার গল্পটা মনে আছে ? তাই চেষ্টা চালিয়ে যান। যুগের নিয়মে পাল্টি আপনাকে খেতেই হবে, ডিগবাজি আপনাকে দিতেই হবে।

এই দেখুন না, তখন ২০১১, তখন ৩৪ বছর, তখন আমরা ৮ থেকে ৮০ ডিগবাজি দিচ্ছি, তখন কেজি দরে বাজারে 'পরিবর্তন' বিক্রি হচ্ছে। বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্ন দর। সিঙ্গুরে ৯৯৬ একরে এক কেজি ‘পরিবর্তন’। নন্দীগ্রামে ‘পরিবেশ বান্ধব’ শিল্পের বিনিময়ে সোয়া সাতশ গ্রাম ‘পরিবর্তন’। পাহাড়ে এককেজির আবার জলের দর, শুধু এক চিলতে ‘গোর্খাল্যান্ড’। জঙ্গলমহলের বাজারে মাওবাদী দের জন্য ‘চৈত্র সেলের’ বিশেষ ছাড়। কলকাতার রাজপথে এক বুদ্ধিজীবীর সাথে একশো গ্রাম ‘পরিবর্তন’ একবারে বিনামূল্যে। রাঢ় বাঙলায় এক বর্গফুট ‘গ্রেটার ঝাড়খণ্ডে’ ৬৫০ গ্রাম পরিবর্তন। তখন বাজার থেকে আনা আলুর একটা পচা বেরোলে, ঘরে ফিরে বৌ-র সাথে ঝগড়া হলে, অল্প বয়সে মাথার চুল পড়ে গেলে, নাপিতের ক্ষুরে ধার কম থাকলে, এমনকি গরু দুধ কম দিলেও লোকে বলত "পরিবর্তন চাই গো ... পরিবর্তন চাই"। 'পরিবর্তন' হলেই... এরাজ্যে আলু আর পচবে না, বৌ আর বকবে না, মাথার চুল আর পড়বে না, নাপিতের ক্ষুরের ধার আর কমবে না , গরুও আর কম দুধ দেবে না।

রাজ্যসুদ্ধ ৪৬ শতাংশ (মা-মাটি) মানুষ নির্ভুল ডিগবাজি দিলেন। 'পরিবর্তন' হল... দিস্তা দিস্তা নিউজপ্রিন্টে সে খবরও ছাপল। আমাদের ৩৪ বছরের সাধ পূর্ণ হল। সবুজ আবিরের বিক্রি বাড়ল। এতোদিন যারা ডিগবাজি দিতে গিয়ে শীর্ষাসন পোশে আটকে গিয়েছিলেন তাঁরাও ধপ করে, সাফল্য সহকারে ভূমিষ্ঠ হয়ে পরিবর্তনের আনন্দে বাজি ফাটালেন। "বদলা নয় বদল" হল গো... তিনি উন্নয়নের কাজে ডুব দিলেন। এবং ডুবন্ত অবস্থায় ঘুম দিলেন। এবং ঘুমন্ত অবস্থায় স্বপ্নে দেখতে পেলেন ১০০% কাজই শেষ।
পাড়ার মোড়ে নচিকেতার গান বাজিয়ে কচিনেতারা বক্তৃতা শুরু করলেন...
"(বন্ধুগন) আর আজ প্রায় ৪ বছর পরে দেখুন... রাজ্যে কোন সমস্যাই নেই। ৬ মাসের মধ্যেই সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক কৃষকরা নিজের জমি ফেরত পেয়েছেন। সেই জমিতে তাঁরা এখন মন দিয়ে ঘাস চাষে আকণ্ঠ নিমজ্জিত। সেই ঘাসই বড় হয়ে ‘বাঁশ’ হয়ে ফিরে আসছে। বাকি জমিতে শিল্প হয়েছে। রাস্তায় রাস্তায় ন্যানো গুলো কিলবিল করছে। নন্দীগ্রামে পরিবেশ বান্ধব শিল্পের হয়েছে। ভেলর, চেন্নাইয়ের মত স্বাস্থ্য পরিষেবা পাওয়া যাচ্ছে। কলকাতা আজ লন্ডন হয়েছে। লোকে আর সুইজারল্যান্ডের ভিসা বাতিল করে দার্জিলিং মেলের টিকিট কাটছেন। পাশেই গোর্খাল্যান্ড দাঁত কেলিয়ে হাসছে। দিঘা উপকূলের বালি ট্রাকে চাপিয়ে গোয়াতে রপ্তানি করা হচ্ছে । এই লভ্যাংশ থেকেই কন্যাশ্রী প্রকল্পের কন্যাদের সোনার জল করা বালা গড়িয়ে দিচ্ছে রাজ্যসরকার। আমাদের নেত্রীর আশা এই বালা রাজ্যের নারী নির্যাতনের ব্যপক সাফল্য কে আরও গৌরবাময় করবে। নিয়মিত এস এস সি হচ্ছে। সরকারী কর্মচারীরা না চাইলেও তাঁদের কে জোর করে মহার্ঘ্য ভাতা দেওয়া হচ্ছে। প্রাইমারিতে নিয়োগ তো হচ্ছেই এমনকি শিক্ষামন্ত্রী রাজ্যে ঘুরে,ঘুরে হরি লুটের বাতাসার মত চাকরি বিলোচ্ছেন। কিন্তু রাজ্যে বেকার ছেলের অভাবে আর চাকরি দেওয়াই যাচ্ছে না। সিভিক পুলিশরাও নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। ৫৬,০০০ বন্ধ কারখানার গেট এখন হাট করে খোলা। রাজ্যের সাধারন মানুষ জানলা-দরজা ভালো করে বন্ধ করে না রাখলে যখন তখন ঘরের মধ্যে লগ্নী ঢুকে পড়ছে। অনেকের বাড়ির ছাদে হুড়মুড়িয়ে যখন তখন দেশী-বিদেশী বিনিয়োগ এসে টপকে পড়ছে। গ্রামের মানুষ সময়ের আগেই ১০০ দিনের কাজের টাকা পাচ্ছেন। ধানের সহায়ক মূল্য কমে গেছে। জিনিসপত্রের দাম এতো কমে গেছে যে "এতো দাম খাবো কি ?" লিখে তেলো ফাটা রোদে আর মিছিল করতে হচ্ছেনা। তাপসী মালিক, চম্পলা সর্দার, ফেলানি বসাকের আত্মা শান্তি পেয়েছে। কামদুনি, মধ্যমগ্রাম, গেঁদো, পার্কস্ট্রীট তো ছাড়ুন গোটা রাজ্যে আর কোথাও ধর্ষণ হয় না। বরুন বিশ্বাসরা মরছে না। কিষানজী পছন্দের মুখ্যমন্ত্রী হয়ে ভীষ্মের মত স্বেচ্ছামৃত্যু গ্রহন করেছেন। বিরোধীদের তো বটেই এমনকি বাক স্বাধীনতা আছে অম্বিকেশ বাবু, শিলাদিত্য, তানিয়া ভরদ্বাজ দের মত চুনিপুঁটিরও। তোলাবাজি নেই। কলেজে কলেজে নিয়মিত নির্বাচন হচ্ছে। পুলিশ টেবিলের তলায় লুকোচ্ছে না। মন্ত্রীরা যেমন পুলিশ কে চড় মারছে না তেমন সাধারন মানুষ বিরক্ত হয়ে ভাইপো কে স্টেজে উঠেও (ক্যালাচ্ছে) না। রাজ্যে আর্থিক কেলেঙ্কারির লেশমাত্র নেই। গরীবের সর্বস্ব লুঠ করে রাজ্যের নেতা-মন্ত্রীরা জেলবন্দী না হয়ে দেশের বুকে “সততার প্রতীক” হিসেবে লিমকা গিনিশ বুকে নাম তুলেছেন।”
এ পর্যন্ত ঠিকই ছিল। ডালে, ঝোলে বেশ চলছিলো বক্তৃতা। কিন্তু হঠাৎ করে বাঁধ সাধলেন এক কচিনেতা। রাজ্যের মন্ত্রী স্টেজেই ডিগবাজি দিয়ে বসলেন। বললেন অনেক হয়েছে স্থির হয়ে বসে থাকার। আবার ডিগবাজি দেবো। তা দিলেনও। সাফল্যের সাথে গেরুয়া রং ধারন করে এবং ভুপতিত হয়ে বললেন “আমারই তো মাইন্ড! চেঞ্জ করতে তো বাধা নেই!” আমি ভাবলাম তা বটে ! ঠিকই তো জয়েন্ট ফ্যামিলির হাজারো সমস্যা। সবার সাথে, সবসময়, সববিষয়ে মানিয়ে গুছিয়ে চলা নেহাতই মুখের কথা নয়। এসব নিয়ে একযুগে আমাদের টলিউড কম গবেষণা করেছে ? "আপন হল পর", "সংসার সংগ্রাম", "বাবা কেন চাকর ?", 'মা কেন কাপড় কাচে?', 'ভাই কেন পাঁপড় বেচে?', "স্বামী কেন আসামী?" ইত্যাদি ইত্যাদি । শুরুতে সুখের সংসার, তারপর জমি ,জায়গা, ক্ষমতা, টাকা, গয়না এমন ‘বস্তুবাদী’ এবং ন্যায়, অন্যায়, দায়িত্ব, কর্তব্য এমন ‘ভাববাদী’ বিষয় নিয়ে সংসারে প্রবল টানাপোড়েন, তারপর বাঘা বাঘা ডাইলগ বর্ষণ, চোখের জল, দুঃখের গান এবং অন্তিম লগ্নে মধুর মিলন। পারফেক্ট চিত্রনাট্য।

এই দেখুন না, গুজরাট দাঙ্গার পর পরই বিধানসভা নির্বাচনে ‘ছোড়দার’ জয়ের খুশিতে ফুল পাঠিয়ে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন আমাদের দিদি। সেই থেকেই 'পদ্মফুল' আর 'ঘাসফুল' হল গিয়ে 'ফুলতুতো' ভাই-বোন। এর পর বিভিন্ন সময়ে ফুলতুতো ভাই বোন'রা কখনও কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে (১৯৯৯ সালের লোকসভা নির্বাচন) কখন পা'য়ে পা মিলিয়ে (২০০০ সালে কলকাতা মিউনিসিপিলিটি নির্বাচন) কখন আবার হাতে হাত রেখে (২০০৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে ) জীবনযুদ্ধের কত লড়াই একসাথে পার হয়েছেন। ২০০৩ সালের ১৫-ই সেপ্টেম্বর দিল্লীতে হিন্দুধর্মের স্বঘোষিত (মোড়লদের) মুখপত্র পাঞ্চজন্য-র সম্পাদক তরুণ বিজয়ের লেখা একটি বইয়ের প্রকাশ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে এসে, দীর্ঘ বক্তৃতায় আমাদের দিদি স্বঘোষিত (মোড়লদের) উদ্দেশ্যে বলেছিলেন "আমি জানি আপনারা প্রকৃত দেশ প্রেমিক। আপনারাই আসলে দেশ কে ভালোবাসেন ।" এইচ ভি শেষাদ্রি , মোহন ভাগবত, মদনদাস দেবী-র উপস্থিতিতে পদ্মভাই রাজ্যসভার সাংসদ বলবীর পুঞ্জ খুশিতে গদগদ হয়ে বলেছিলেন "হামারি মমতা দি সাক্ষাৎ দুর্গা।"
এহেন সুখের সংসারে টলিউডের কালজয়ী এবং অনিবার্য নিয়ম মেনে শুরু হল টানাপোড়নে। বাঘা বাঘা ডাইলগ বর্ষণ। একসময়ের "সাক্ষাৎ দুর্গাই" খাগড়াগড়ে হয়ে গেলেন "জেহাদি"। ফুলতুতো বোন, ফুলতুতো ভাই কে “কোমরে দড়ি পরিয়ে জেলে” ঢোকানর ধমকানি দিলেন। সাপে নেউল সম্পর্ক। তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠা। সংসারে এই দুঃসময়ে ফুলতুতো বোনের "চোর বাঁচাও" আন্দোলনে সুপ্রিম কোর্টে পাশে পেলেন দু(র্নীতি)সম্পর্কের আরএক ভাইকে। কখন প্রেম , কখন বিচ্ছেদ। কখন হাসি কখন কান্না। এই তো জয়েন্ট ফ্যমিলি। সেদিন 'ভ্রান্তিবিলাস' সিনেমা দেখতে গিয়ে দেখলাম নিজের জমজভাই কে দীর্ঘদিন পরে খুঁজে পাওয়ায় সংসারে সে কি আনন্দের জোয়ার। তাই ভাইবোনের বিপদের সময়, এখন অনেকে গঙ্গাসাগর মেলায় প্রাগৈতিহাসিক যুগে হারিয়ে যাওয়া মাসতুতো, পিসতুতো, খুড়তুতো এবং অবশ্যই 'ফুলতুতো' ভাই-বোন খুঁজে পাবেন এবং খুঁজে পেয়ে আনন্দ পাবেন এবং আনন্দে ঘরে সুখের জোয়ার আসবে এবং সুখের জোয়ারে ভেসে মধুর মিলন হবে।
চোখ কান খোলা রাখুন, লজ্জার মাথা সাধ্যমত চিবিয়ে খান, ঘৃণা,ভয় দূরে রাখতে মুখে নিয়ম করে শোবার আগে চুনকালি মাখুন, আর বিশেষজ্ঞ নিযুক্ত করে কোন দোলের টিআরপি এখন কেমন আর কোন নেতার গ্রাফ এখন মহাপ্রভুর মত দু-হাত আকাশের দিকে তুলে ঊর্ধ্বগামী সে বিষয়ে পুঙ্খানুপুঙ্খ খোঁজ খবর রাখুন। গ্রহ-তারা-নক্ষত্র-রাশি -গোত্র নাক বরাবর সোজা থাকলে, আর ভাগ্য NH 16’র মত সুপ্রশস্ত বুঝে, ‘পরিবর্তন’ চেয়ে ডিগবাজি দিন। আসলে, নীতি,আদর্শ, মূল্যবোধ, এথিক্স, ন্যায্যতা, এই সব শব্দ গুলো এখন অচল পয়সা। এগুলো সঙ্গে করে তো আপনি তো আর এই পৃথিবী তে আসেননি। দেখুন গীতাতেই লেখা আছে “... যা হয়েছে তা ভালই হয়েছ/ যা হচ্ছে, তা ভালই হচ্ছে/ যা হবে, তা ভালই হবে/ তোমার কি হারিয়েছে, যে তুমি কাঁদছো?/ তুমি কি নিয়ে এসেছিলে, যা তুমি হারিয়েছো?/ তুমি কি সৃষ্টি করেছ, যা নষ্ট হয়ে গেছে?/ তুমি যা নিয়েছ, এখানেই দিয়েছ/ তোমার আজ যা আছে, কাল তা অন্য কারো ছিল/ পরশু সেটা অন্য কারো হয়ে যাবে/পরিবর্তনই সংসারের নিয়ম।” আর ঘরে একটা কুকুর পুশুন, নাম রাখুন ‘বিবেক’। দেখবেন পোশা বিবকে আর অযথা দংশনও করছেন না।
তাই গাধারা আপনাকে যতই বেইমান বলুক, উল্লুকরা আপনাকে যতই ঘেন্না করুক, বিরোধীরা যতই কুৎসা করুক, ভোট এলে আমরা আপনাদেরই ভোট দেবো, পাড়ার মোড়ে দেখা হলে সেলফি তুলে ফেসবুকের দেওয়ালে টাঙ্গিয়েও দেবো। নিজেকে সৎ রাজনীতিবিদ নয়, মানুষের কাছে, নীতি,আদর্শের কাছে দায়বদ্ধ নয় বরং টাকা নামক ‘বস্তুবাদী’ আর লোভ নামক ‘ভাববাদী” বিষয়ের দাস ভাবুন। বিকিয়ে দিন নিজেকে। ব্যাস ! এবার নিশ্চিন্তে আর একটা ডিগবাজি দিন। আর পরের ডিগবাজির জন্য নিজেকে আবার প্রস্তুত করুন।
পুনশ্চঃ লেখাটির সঙ্গে বাস্তবের মিল নিতান্ত ‘ছোট্ট ঘটনা’ এবং অবশ্যই ‘বিরোধীদের চক্রান্ত’। আর এই চক্রান্ত সমাধানের জন্য সি বি আই ডাকার প্রয়োজন নেই।

আপনার মতামত জানান