চামড়া শিল্প বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম শিল্প-সৈনিক

রঙ্গীত মিত্র

 



কলকাতায় চামড়াজাত দ্রব্যের কাঁচামাল সুলভ্য।কারণ বানতলা লেদার কম্পপ্লেক্সের ট্যানারির দ্বারা নির্মিত উচ্চমানের লেদার। এছাড়াও শুধু কাঁচামাল নয়।উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা, স্কিলড লেবার ইত্যাদি এই শিল্পকে অক্সিজেন দিচ্ছে। পশ্চিমবঙ্গে লেদারগুডস এবং জুতোর কম্পানিরা মুলতো দুরকমের। কেউ জব ওয়ার্ক করে,কারুর আবার নিজস্ব ব্র্যান্ড আছে। আমরা যদি পশ্চিমবঙ্গের লেদারইন্ডাসর্টির শেয়ার দেখি,তাহলে বুঝতে পারবো হাইডিজাইন, অ্যাডিডাস, পিউমা, বাটার সাথে সাথে খাদিমস, অজন্তা, শ্রীলেদার্স, এলিট ইত্যাদি লোকাল কম্পানিগুলোও নিজেদের একটা স্থায়ী জায়গা করে নিতে পেরেছে। তবে আগেই বলেছি, বেশিভাগ ইন্ডার্স্ট্রি জব ওয়ার্ক কিম্বা আউটসোর্সিং-এর উপর নিভরশীল ।
বাটানগর, খিদিরপুর, মেটিয়াবুরুজ, রাজাবাজার, পার্কসার্কাস, বানতলা ইত্যাদি অঞ্চলের চামড়া-শিল্প কলকাতা আর্বানিটিকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে। আপনি যদি একটু মনোযোগ দিয়ে এই শিল্পকে দেখেন,তাহলে বুঝতে পারবেন এই আন-ওরগানাইজড “স্মলস্কেল ইন্ডাস্ট্রির” একটা বড় অংশ দেশীয় কিম্বা বিদেশী ব্র্যাণ্ডের হয়ে কাজ করে । দেশীয় ব্র্যান্ডের আউট সোর্সিং বলতে ঃ বাটা, খাদিমস, শ্রীলেদার্স ইত্যাদির কম্পানির অনেক অংশ কাজ এদের ভিতর ডিস্ট্রিবিউটেড হয়।অন্যদিকে বানতলা চর্মনগরীর মতো অত্যাধুনিক শিল্পাঞ্চল এই শিল্পের অগ্রগতীর কারণ।যদিও চেন্নাই বা ভারতবর্ষের অন্যান্য লেদারহাবে গেলে আপনি অনেক উন্নত মানের টেকনোলজি বা যন্ত্রপাতি পাবেন।তবু কলকাতা শিল্পাঞ্চলকে তারা এখনো স্পর্শ করতে পারেনি।এর পিছনে বড়ো করণ হলো বর্তমান সরকারের নীতি ও পরিকল্পনা। যার ফলে,পশ্চিমবঙ্গে চামড়া শিল্প ক্রমাগত প্রসার পাচ্ছে । আর এখন অবশ্য প্রযুক্তির দিক থেকেও কলকাতা পিছিয়ে নেই , তার মুল কারণ এফ- ডি -ডি -আই (ফুটওয়্যার ডিজাইন অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট ইন্সটিটিউট)।যদিও চেন্নাই, নয়ড়া, রায়বেরিলি ইত্যাদি ভারতবর্ষের অন্যান্য শহরেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি আছে। তাঁরা শুধু HRD-এর কাজ করেন না অন্যদিকে একটা সম্পূর্ণ ইনস্টিটিউট চালান,যেখানে এম-বি-এ,বিডেজ ইত্যাদি পড়ানো হয়। প্লেসমেন্ট থেকে গ্রুমিং সব কিছুই তাঁরা দেখেন । একদিকে ইন্ডাস্ট্রিকে সাপোর্ট অন্যদিকে মানুষকে এই শিল্পে উৎসাহিত করাই তাদের ব্রত।সমানভাবে তাঁরা এই দুই ধরণের কাজেই সফল।তারফলে লেদারগুডস ও ফুটওয়্যার ফ্যাক্ট্রির পজিটিভ ইমপ্যাক্টের অন্যতম কারণ FDDI ও তার ছাত্ররা। তবু এই শিল্পের অনেকগুলো ত্রুটি আছে। যেমন,
১। চামড়া শিল্প এখনো পর্যন্ত অরগানাইজড হতে পারেনি।
২। বিশেষ কিছু অঞ্চল ও কিছু সংখ্যাক মানুষের ভিতরই সীমাবব্ধ।
৩। আমরা ভারতীয়রা জুতোকে এখনো সেরকম ভাবে ফ্যাশন আইটেমের মধ্যে রাখিনি।তার একটা প্রভাব এই শিল্পে পড়ে।
৪। পরিবেশ খুব অস্বাস্থকর।
৫।এম্পপ্লয়ি সিকিওরিটি খুব কম।
৬। অনেকক্ষেত্রে আপগ্রেডেসানের অভাব।
৭। কোয়ার্ডিনেসান এবং কোয়াপোরসানের ও অভাব দেখা যায়।
৮। পৃথিবীর অন্যান্য লেদার হাবের তুলনারয় প্রগ্রেস খুব স্লো।
৯। সঠিক টেকনিক্যাল লোকজনের অভাব।তার প্রভাব কোয়ালিটিতে পড়ে।
১০। সরকারের পলিসিমেকিং-এর ভিতরও গলদ থাকে।তাই সব সময় লেদার সেক্টরটাকে ইগনোর করা হয়।
১১। লেদার সেক্টার এখনো করপোরেট হতে পারেনি।
১২। কেমিক্যালস,লাইনিং মেটিরিয়্যাল ইত্যাদি অনেক কিছু বিদেশ থেকে আসে।
ইত্যাদি কারণের জন্যে পশ্চিমবঙ্গের লেদার মার্কেট পিছিয়ে যাচ্ছে। তবে যদি এই সেক্টরকে আইটি সেক্টরের মতো ব্র্যান্ডিং করা যেতো,তাহলে ভারত-সরকার আরো বেশি রেভিনিউ পেতো।কারণ চামড়া শিল্পের প্রফিট মার্জিন অন্যান্য শিল্পের থেকে অনেক বেশি।আর আপনি আপনার গ্যারেজের থেকেও এই শিল্প আরম্ভ করতে পারেন।ফলতঃ খুব কম ইনভেস্টমেন্ট করে,আপনি খুব বেশি প্রফিট করতে পারেন। এখন যদি আপনি পশ্চিমবঙ্গের গ্রামীন শিল্পকে চামড়া-শিল্পের সাথে সঠিক ব্যবহার করতে পারেন,তাহলে দেখবেন আপনার ব্যবসা অন্যমাত্রায় চলে গেছে।তাই কাঁচামাল, লেবার,ল্যান্ড, বিদ্যুৎ ইত্যাদির দাম এখানে খুব কম।আপনাকে শুধু নিজের আউটলুক বদলাতে হবে।প্রথাগত শিল্পধারণা থেকে বেরিয়ে কনসেপ্ট শপ কিম্বা টেলার-মেট শু-সপ কিম্বা আরো অন্যরকম ফুটওয়্যার বুটিক এইসব নিয়ে যদি আপনি ভাবতে পারেন,তাহলে অবশ্যই লাভের মার্জিন খুব বাড়বে। কারণ মানুষ এখনো ফুটওয়্যার (জুতো) সংক্রান্ত বিষয় খুব একটা এওয়্যার নয়। তাছাড়া পশ্চিমবঙ্গ থেকে পূর্ব- এশিয়ার বাজার ধরাও খুব শক্ত নয়। শুধু দরকার মানসিকতা বদল। একবার চলুন না একটু অন্যরকম ভাবি।

আপনার মতামত জানান