গুটিকয় বইয়ের রাতকথা

সরোজ দরবার

 


স্বপনকুমারের গল্পের স্টাইলে ঢং ঢং করে ঘণ্টা বাজল না কোথাও। তবু রাত দশটা বেজে গেছে। মিলনমেলা জুড়ে নেমেছে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। সারাদিন যেরকম হই হল্লা চলছে তাতে দিনের শেষে এই স্তব্ধতা সত্যি অদ্ভুতই লাগে। অদ্ভুত লাগে যাদের, তারা এই সময়টা ছাড়া হাত পা। কেউ ধরে টানাটানি করছে না। এক হাত থেকে আর এক হাতে ঘুরতে হচ্ছে না। সঙ্গী- সাথীরা এর ওর হাতে হাতে করে জুট ব্যাগবন্দি হয়ে চলে যাচ্ছে দেখে আর মনখারাপ হচ্ছে না। কাটতি কম আর বেশির হিসেব শুনে অকারণ হীনমন্যতা তৈরি হচ্ছে না। মেলা শেষ হওয়ার পর পর এই অনুভূতিগুলিই বেশি কাজ করে। খানিকটা সময় ঝিম মেরে থাকে সবাই। কেউ কারও সঙ্গে কথা বলে না। পুরনো সংস্করণরা মনে মনে ভাবে তাদের বন্ধুরা আজ কোন শোকেসে সাজানো। এবার আবার কত নতুন ছেলে ছোকরা এসে জুটেছে। এদের নিয়েই এবার বেশি রমরমা। ক্কচিত দু’একজন এসে তাদের খোঁজখবর করলে তখনই যা একটু ভালো লাগে। এবারেও গতি না হলে আবার সেই বস্তাবন্দি হয়ে প্রকাশকের গুমোট ঘরে। না থাকে সেখানে আলো, না পৌঁছয় এসির ঠান্ডা, টানা একটা বছর দমবন্ধ হয়ে পড়ে থাকা। নতুন প্রকাশিতরা এ-ওর দিকে তাকায়। এ ভাবে ওকে নিয়ে এত মাতামাতি। কই তাকে নিয়ে তো তেমন হচ্ছে না। ভাবে, পরে একদিন নিশ্চয়ই কেউ কেউ আসবে, যাতে তারও কপালে আদর কদর জুটবে। এই যে স্টল বন্ধের সময় প্রকাশক ঠোঁটটা সরু করে তার দিকে তাকিয়ে বলে, এটা করে এবার কিছু হল না, আর আর একটার দিকে তাকিয়ে বলে, এটাই বাঁচিয়ে রেখেছে... প্রকাশক তো নিজেও জানে না তাদের নরম মনে কেমন ব্যাথা লাগে। আর প্রকাশক কেন, লেখকই তাদের নরম মনের খবর জানে নাকি! ওরা সকলে তো তাদের নিয়ে কাটাছেঁড়া করে। তাদের সামনে রেখে নিজেদের গরিমার বেলুনে হাওয়া দেয়। এই জন্যেই তো এক এক সময় তাদের হাতের পুতুল মনে হয়। তখনই আবার খানিকটা কলার তোলা ভাব আসে। মনে মনে তারা ভেবে নেয়, তারা ছিল বলেই না এত হইচই। নইলে কই পুলিপিঠের ওপর কেউ আর ফলাও করে অটোগ্রাফ দিতে পারে নাকি, সে স্বাদে যত ভালোই হোক, আর যত লোককেই তাদের থেকে পাশে কাটিয়ে ফুসলিয়ে নিয়ে যাক। আসলে পিঠে হোক কিংবা পকোড়া সবগুলোই ঢলানি টাইপস। স্বভাবেই গায়ে পড়া। জিভের ডগায় গড়িয়ে পড়া ভিন্ন আর কিছু নেই ওদের। লোক দেখলেই তাই ছোঁক ছোঁক করে। একটু লো স্ট্যান্ডার্ড। তাদের মতো হাই ফাই নয় ওরা যে, লোকে আসবে, দু’একটা পাতা ওল্টাবে তারপর গম্ভীর চশমাটা নাকের মাঝখান থেকে ওপরে তুলে কাউন্টারের ছেলেটাকে বার দুই মেপে নিয়ে বলবে, দিন তো একটা বিল করে। এর মধ্যে যে ঘ্যামটা আছে, সেটা ওই ঠোঙায় উপর ছিরিত করে সস ঢেলে দেওয়া পকোড়াদের আছে নাকি! মেলা শেষ হওয়ার ঘন্টাখানেক এইরকম কত ভাব যে ঘোরাফেরা করে। তারপর একসময় সব চিন্তা থিতিয়ে যায়। ভাবনা সব তলানিতে গিয়ে পৌঁছলে উপরে দার্শনিকতার একটা বুদবুদ ভেসে ওঠে- পৃথিবীতে কা কার! পৃথিবী হোক আর বইমেলা, সত্যিই কে কার!
ঠিক তখনই নিস্তব্ধতা গাঢ় এবং অদ্ভুত হয়ে ওঠে। কেমন যেন অন্যরকম। ওদেরও মনে হয় এবার কিছু একটা করতে হবে। নইলে এতবড় রাত আর কাটবে না। ঠান্ডাটাও বেশ কিটকিটে হয়ে পড়েছে আবার। স্টল নং ৪৫৭-এর উপর তাক থেকে ‘বিশাল ভারতীয় লঘুগল্প’ প্রথমে নেমে আসে। স্টলের বাকিরা সবাই তার দিকে তাকিয়ে। সবার চোখে একটাই জিজ্ঞাসা, যাচ্ছ কোথায়? সে উত্তর দিল, যাই একবার বোনের সঙ্গে দেখা করে আসি। বোন কে, মাঝের তাক থেকে জিজ্ঞেস করল ‘নতুন কবিতার কবি’। সে বলল, ‘আমি যার, সেও তার, আছে ৪২৬-এ। একই মেলায় আছি, এবারেই প্রথম বেরিয়েছি। যাই একবার দেখা করে আসি। তোমরা কেউ যাবে নাকি?’ ‘নতুন কবিতার কবি’ বলল, চলো যাই। শুনে আরও দুজন বলে উঠল, দাঁড়াও দাঁড়াও। আমরাই বা বসে থেকে কী করব। বরং ঘোরাই ভালো, বলে ‘এভাবেও ফিরে আসে যায়’ আর ‘জেড মাইনাস’ ওদের সঙ্গ নিল। ওরা এগোতেই ‘ফিসফাস-২’ আর বসে থাকতে পারল না। ‘কেউ কোথাও যাবে না’-কে ডাকা বলল, ‘চলো হে, আমরাও ঘুরে আসিগে।’ ডানদিকের র্যা ক থেকে দুজনে নামতেই ‘চলতি হাওয়ার পঙক্তি’ বলল, ‘আমিও আছি তোমাদের সঙ্গে।’ দুটো দল কলাপসিপলের ফাঁক বেয়ে নেমে এল মেলার মাঠে।
প্রথম দল ইতমধ্যে পৌঁছে গেছে ৪২৬-এ। সেখানে দেখা হয়েছে ‘মাতৃভূমি বাম্পার’-এর সঙ্গে। দু’একটা টুকরো কথাবার্তা শেষে সে বলল, তোমরা জানো তো এখান থেকেই ‘অপ্রকাশিত’ বেরিয়েছে এবার। সকলেই ঘাড় নাড়ল। এতগুলো কবিতা রাখা ছিল চোখের আড়ালে। ভাবা যায়! সকলেই কাগজে একটা দুটো নমুনা এতদিনে পড়েছে। সকলেরই চোখেমুখে কেমন যেন একটা বিহ্বল ভাব। সেই বিহ্বলতাকে সঙ্গে নিয়েই ওরা হাঁটতে হাঁটতে লাগল। ২২১-এর কাছে আসতে দেখল ‘বিপরীত পরাগ সংযোগ’ লাজুক লাজুক মুখে দাঁড়িয়ে। ওরা চোখ তুলে জানতে চাইল, কী ব্যাপার। হাসি টেনে উত্তর এল, এই একটু বাইরে এসে দাঁড়িয়েছিলাম। সারাদিন এত হই হট্টোগোল। আমি তো আবার এত চেঁচামেচি নিতেই পারি না। যাক তোমাদের সঙ্গে দেখা হয়ে ভালোই হল। তা যাচ্ছ কোন দিকে? এ ওর মুখের দিকে তাকাল সকলে। ‘নতুন কবিতার কবি’ এমনিতেই কথা বলে কম। এতক্ষণ পর মুখ খুলে বলল, চলো বরং লিটল ম্যাগের দিকেই যাওয়া যাক। লিটিল ম্যাগের দিকটা কোন আগল নেই। বড্ড ফাঁকা ফাঁকা লাগে। আর তার উপরে পতপত করে উড়ছে ব্যানারগুলো। তাদের ছায়াগুলো মাঝেমধ্যে দুলে উঠছে টেবিলের উপর। বড় অদ্ভুত পরিবেশ। টেবিলের তলায় লিটল ম্যাগ মেলার জুট ব্যাগে বেশিরভাগকেই আটকে দিয়ে গেছেন মালিকরা। কাউকেই তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। ওরা সকলেই ভাবছে এই অবস্থায় ডাকলেও কেউ বেরোতে পারবে না। এক যদি ব্যাগের মুখ খোলা রেখে যায় কেউ তবেই সম্ভব। কিন্তু এই ঘুপচির মধ্যে কোনটার মুখ খোলা কে জানে। ‘বিশাল ভারতীয় লঘুগল্প’ বলল, চলো বরং একবার ‘শুধু বিঘে দুই’ এর কাছে যাওয়া যাক। ওরা পৌঁছল। ডাক দিল ‘জেড মাইনাস’। মুখ বন্ধ ছিল। তবু ম্যানেজ করে উঁকি দিল নতুন একটা সংখ্যা। কিন্তু পরপর এমনভাবে রাখা বেরিয়ে আসবে জো নেই। বরং পাশ থেকে ম্যানেজ করে বেরিয়ে আসতে পারল ‘রাস্তা ভুল হওয়া শেষ বাঁকে’। ‘বিপরীত পরাগ সংযোগ’ বলল, ও তুমি এখানেও আছ নাকি? তারপর নিজেই বল, হ্যাঁ তা তো থাকবেই। ‘মাতৃভূমি বাম্পার’ বলল, আরে একটা কথা শুনছিলাম, মানে পড়ছিলাম, কে নাকি ‘শুধু বিঘে দুই’ পড়তে গিয়ে পড়েছে ‘শুধু বিয়ে দুই’। সকলে মিলে তারস্বরে হাসতে থাকল ওরা। ‘জেড মাইনাস’ একটু জোরেই হাসল, কিন্তু মিলিত শব্দে তার হাসির মাত্রাটা আলাদা করে বোধহয় কেউ খেয়াল করল না। হাসি থামিয়ে সে বলল, চলো বহু প্রচ্ছদের পাত্রটিকে একবার পাকড়াও করা যাক। ও যেন কত নম্বরে আছে? কোত্থেকে সুড়ুৎ করে একটা ম্যাপও বেরিয়ে এল তখনই। সে আসলে চেয়ারের উপরই ছিল। তন্দ্রা মতো এসেছিল সবে। এদের হাসিতে তা চটকা মেরে ভেঙে গেছে। জেগে উঠেই শুনছে কারা যেন স্টল খুঁজছে। এমন সময় আবার কারা! সারাদিনেও দলাই মলাই করে মনের সাধ মিটল না, আবার এসেছে রাতে! নির্ঘাত কোনও বদ মতলব আছে। তারপরেই সে ভাবনা মন থেকে উড়িয়ে দিয়েছে, তার কাজ সাহায্য করা, অত ভেবে কী হবে! সে এগিয়ে এসে বলল, বলছি দাঁড়ান।
এদিকে দ্বিতীয় দল তখন এদিক ওদিক ঘুরছিল আর খোশগল্প করছিল। এমন সময় ৪৬১-এর সামনে ’১৩ নং রাস্তা’র সঙ্গে দেখা। ‘কেউ কোথাও যাবে’ না বলল, তুই এখনও ঘুমোসনি। সারাদিন যে এত বকবক করলি, ঘুমটুম আসে না? শুনে তার তুরন্ত জবাব, আমি বকবক করলাম কোথায়। যে বকবক করে সে আমি নই। তোরা মিছিমিছি বকাঝকা করিস। বলে দুই কলেজ লাইফের বন্ধু বেশ খুনসুটিতে মেতে গেল। ‘ফিসফাস-২’ এগিয়ে এসে ’১৩ নং রাস্তা’কে বলল জ্যাকেট টা তো বেশ পরেছ হে। বিড়াল বিড়াল। চলো একটা সেলফি তুলে রাখা যাক। বলে ওর ক্যামেরাটা বের করল। তারপর উলটো করে ধরে বলল, এই হল ক্যামেরা আর এটায় ছবি তুলতে হয় এভাবে। ঝকাস করে উঠে গেল সেলফি। টুকরো হাসি ঠাট্টা করতে ওরা দেখতে পেল প্রথম দলটাকে। হাত নাড়ল। ওরাও হাত নাড়ল। ফুড কোর্টের সামনে ফাঁকা জায়গাটায় বসল সকলে। কত কিসিমের যে গল্প শুরু হল তারপর। সেই প্রথমবার এখানে মেলায় বিরিয়ানির গন্ধ থেকে, ময়দানের মেলা, তরুণ কবির বই, প্রথম সংস্করণ শেষ হয়ে দশমাসে পুর্নজন্ম, প্রেস থেকে সংখ্যা না দিয়ে ঝুলিয়ে রাখা ইত্যাদি ইত্যাদি ইত্যাদি। আর গল্প চলতেই থাকল। এ পাতা থেকে ও পাতায়। যেন তার শেষ নেই। শেষ থাকতে নেই। শুধু রাত শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর সেই শেষ হয়ে আসতে থাকা প্রায় অলৌকিক রাতে মেলার মাঠে আড্ডা দিচ্ছে গুটিকয়েক বই। যাদের লেখকরা, হ্যাঁ খুব ভুল না হলে, তখন ঘুমোচ্ছিলেনই।
কিন্তু এখন আর লেখকদের তেমন দরকার নেই ওদের। কেননা বইরা জানে লেখকের হাত থেকে বেরিয়ে গেলে নিজেদের রাস্তা নিজেদের করেই নিতে হয়। লেখকরা তো চিরকাল থাকে না। এই তো ‘অপ্রকাশিত’-এর লেখক আর নেই, তবু আহা! সে আছে, তীব্রভাবে আছে। অদ্ভুত আঁধারের দেশে আলো হয়ে আছে।
ওরা সকলেই তো আলোর পথযাত্রী। আলাদা করে আলাদা করে। ওদের আড্ডাতেও তাই ছড়িয়ে আছে অপূর্ব এক আলো। সে আলো ওদের নিজস্ব, এমনকী ওদের লেখকরাও বুঝি সে আলোকে চিনতে পারে না তেমন করে।

আপনার মতামত জানান