সেন্সর কাঁচি এবং রোস্টেড হিউমার

সৌরাংশু

 



খুব ছেলেবেলায় আমি যখন একেবারেই ছেলেমানুষ ছিলাম তখনকার একটা ঘটনা বলিঃ

মহেশ বারিক লেনের খান ৫-৬টা কোঠাবাড়িকে ঘিরে টালির ছাদ আর অ্যাসবেস্টাসের বন্দোবস্ত ছিল। পাশের বাড়ির ছাদে ক্রিকেট খেলতে খেলতে বল যদি সামনের বাড়ির দাওয়ায় পড়ল তখনই বুঝতে পারতাম যে তাদের ডাল রান্না হয় সারা উঠোন জুড়ে। নাহলে বল পড়লেই ডালে? আর তার প্রতিক্রিয়া হিসাবে বিপ বিপের সমারোহ।

তা তখন তো মন ছিল আয়নার মতো স্বচ্ছ। যা দেখা যেত তারই ছায়া পড়ত। কিন্তু একবার শুধুমাত্র ‘শালা’ শব্দটির উল্লেখ করায় মা জিজ্ঞাসা করল, “তোমার বাবা বলে? কথাটা?” উত্তর ছিল না কোন কারণ ভদ্রলোক হিসাবে আমার বাবার, পাড়ায় এবং নিজস্ব ক্ষেত্রে যথেষ্ট সুনাম ছিল। আর কে না জানে ভদ্রলোকের বিজ্ঞাপনে চার ছ অক্ষর কেন, দু অক্ষরও থাকে না। তা সেখান থেকেই আমার গণ্ডি কাটা হয়ে গিয়েছিল।

তা তখন মিডল ক্লাস মরালিটির একটা সংজ্ঞা ইতিমধ্যেই ছিল। যেখানে মদ, গাঁজা, জুয়া, সিগারেট এবং পঠন অযোগ্য শব্দের কোন স্থান ছিল না। অবশ্য এখনও মদ বা সিগারেট খাই না শুনলেই লোকে যেভাবে ‘ভালছেলে’ বলে গালাগাল করে তাতে মনে হয় যারা মদ, সিগারেট বর্জন করতে পারেন নি তাদের জন্য নরকের কোণা সংরক্ষিত আছে।

মানব চরিত্র বাহ্যিক আনুষঙ্গিকের মাধ্যমে তো চিত্রণ হয় না, তা হয় তার অন্দরের সৌন্দর্যের মাধ্যমে।

যাই হোক, আরেকটু বড় হয়ে পর্যন্ত পারিপার্শ্বিকে ‘বাপের সম্মান’ রক্ষার দায় ও দায়বদ্ধতা হাঁফ ধরিয়ে ছেড়ে দিয়েছিল।

তবে কেন জানি না, বাইরে থেকে বিদ্রোহীসুলভ রঙ তামাশা থাকলেও অদৃশ্য গণ্ডি কখনই পার করা হয়ে ওঠে নি।

বড় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে খোলা বাতাসের মধ্যে শ্বাস নেওয়া শুরু করলেও নিজের মত করে মরালিটির ভূত বেতাল হয়ে চেপে বসেছিল ঘাড়ে। তবে সেটা নিয়ে তো বিশেষ সমস্যা নেই, আমি কি খাব বা পড়ব বা ভাবব সেটা একান্তভাবেই আমার সমস্যা বা অসমস্যা। কিন্তু আমার ভাবনা যখন অপরের ভাবনার সঙ্গে ভাব না করে আড়ি করে এবং সমস্ত অন্তঃকরণ দিয়ে ইন্দ্রিয়ের বিবাদভঞ্জনের উদগ্র ইচ্ছা নিজস্বতার চাদর ফাটিয়ে চিৎকার করে ঠিক ভুল নির্ণয় করতে চলে যায় সেখানেই যত গোল বাধে। আপনার ভাবনা যতক্ষণ পর্যন্ত আপনার সেখানে পেটে গ্যাস ছাড়া কোন কিছু দুষ্ক্রিয়া হবার সম্ভাবনা কম। কিন্তু যেই তা জনসাধারণের হয়ে গেল ব্যাস সেখানেই ব্যক্তিগত চৌহদ্দিতে টান পড়ল।

আমার কাছে যা ঠিক তা আপনার কাছে ভুল মনে হতেই পারে। তার মানে কি আপনিই ঠিক বা আমিই ভুল? তা তো নয় দাদা! স্থান কাল পাত্র এবং পানীয়ের ফেরে সকলেরই নিজস্ব মতামত অজুহাত এবং খয়রাত আছে। ক্ষুদিরাম একশ বছর আগে সন্ত্রাসবাদী হতে পারে কিন্তু পঞ্চাশ বছর পরেই তিনি স্বাধীনতা সংগ্রামীর মর্যাদা পেতে পারেন। এখানে পানীয়ের ফের নেই কিন্তু স্থান কাল তো আছেই।

পাত্রের ফেরের হিসেবও তাহলে দিয়ে দিই, কি বলেন? এই যে ষাটের শেষ আর সত্তরের মাঝামাঝি পর্যন্ত সেই যে কচি কচি তাজা তাজা সবুজের আহ্বানেরা রোমান্সের ডাকে ময়দানের কাকভোরের এনকাউন্টারের শিকার হল, তারা কি ক্ষুদিরামের থেকে বা ভগত সিং-এর থেকে অন্য কিছু ভেবেছিল? সমাজ এবং মানবজীবনে ঊষা ডেকে আনার স্বপ্নে সামান্য দশ বাই দশের জানের পরোয়া করে নি তারাও, যেমন ক্ষুদিরামও করে নি। তাইলে? আজকের যুগে গান্ধী বা সুভাষকে মাইক্রোস্কোপে ফেলতে গেলেও কালের ঝুলন্ত কাটারিটাকে ভুলতে পারি না।

এবারে আসুন মোদ্দা কথায়। কয়েকদিন আগেই সর্বভারতীয় বক্তিমবাজদের একটি পোড়ানো সভা অনুষ্ঠিত হল, তাতে করণ জোহর বরকত্তা হিসাবে এবং রণবীর সিং ও অর্জুন কাপুর বর হিসাবে উপস্থিত ছিলেন। আর তার কয়েকদিনের মধ্যেই সেন্সর বোর্ডের মহাকর্তা এবং ‘সরকাইলে খাটিয়া’ ‘অঙ্গনা মে বাবা দুয়ারে পে মা’ ইত্যাদি খ্যাত শ্রী পহেলাজ নিহালনীর মোজেসসুলভ দৈববাণী ঘোষিত হল।

যদিও দুটি ঘটনার মধ্যে কোন যোগসূত্র নেই, তবু একটা তৃতীয় ঘটনার আমদানি ঘটল। দেশ জুড়ে, বিশেষত গৌবলয়ের গেরুয়া নামধারীরা ফতোয়া জারি করলেন ১৪ই ফেব্রুয়ারিতে জোড়ায় দেখা গেলেই বিয়ে দিয়ে দেওয়া হবে। তা বাবা- মেয়ে, কাকু- ভাইঝি, মা-ছেলে, মাসি-বোনপো অথবা ইতিমধ্যেই বিবাহিত স্বামী-স্ত্রী যেই হোক না কেন।
তার প্রতিবাদে কয়েকটি ছাত্র সংগঠন শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদে মিছিল করল, আর কয়েকটি তো একহাত এগিয়ে সিঁদুর, শাঁখা নিয়ে মিছিল করল, যে ‘দাও হে সিঁদুর ভরে দাও’। তা ভারতীয় এবং বিশ্ববাসী এইসব নিয়ে বেশ আছে। তাদের কাছে মহামারী কোন ইস্যু নয়, মারামারিও কোন ইস্যু নয়। এসব তো হামেশাই হয়ে থাকে।

তাইলে? এবার দাদা আমি একটু ঝেড়ে কাশি। প্রথমে দ্বিতীয় ঘটনাটিই নিই। তবে দ্বিতীয় ঘটনাটাকে নিতে গেলে একটু পিছিয়ে যেতে হয়। ঈশ্বরের বার্তাবাহক বলে একটি সিনেমা অবান্তর গল্প আর অদ্ভুতুড়ে হিরোর পাল্লায় পড়ে সেন্সর বোর্ডের দরজার ছিটকিনিতে আটকা পড়ে গেছিল। কিন্তু সিনেমার প্রযোজক, প্রকাশক, নির্দেশক, গায়ক, নায়ক এমন কি দর্শক রামরহিম বাবা আবার লোকসভা নির্বাচনে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের হয়ে প্রচার করেছিলেন। শাঁখের করাত হয়ে ওঠার আগেই ভিতরের কলকাঠিতে সেন্সরবোর্ডের গণপদত্যাগ এবং নতুন বিশ্বাসী গোষ্ঠীর আনয়ন ঘটে।

পহলাজ নিহালনী হলেন সকল ‘কা’ ‘কা’ কারীদের প্রধান। তিনি বহুকাল যাবত, সরাসরি বিনোদন জগত থেকে দূরে আছেন। কিন্তু সিনেমার পোকা একবার যাকে কামড়ায় তার রোগ যাবার নয়। ফলে এক কথাতেই রাজী। আর আনুগত্য প্রদর্শন করতে আগ বাড়িয়ে হিটলারি হুকুম দিতে তো এখন কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। যেমন ‘নির্মল ভারত অভিযান’-এর তাড়ায় সংস্কৃতি মন্ত্রকের থেকে হুকুম হয়েছে যে অনুদান পেতে গেলে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলিকেও ঝাড়ু হাতে কিছু না কিছু করে দেখাতে হবে। তা শৈল্পিক এবং সাংস্কৃতিক ভাবে হলেও করতে হবে। তা নিহালনী সাহেব জারি করলেন ছছ্রিশ বেদবাক্যের একটি তালিকা।

সেই তালিকা অনুযায়ী, বসন্তী বিপেদের সামনে নাচবে না। গব্বর চিৎকার করে বলবে, “বিপ, ক্যা সমঝা? কে সর্দার বহুত খুশ হোঙ্গে?” অমরীশ পুরি অধিকাংশ সিনেমায় বিপভাষী হয়ে থাকবেন এবং শক্তি কাপুর পলিগ্যামি ছেড়ে বিপগ্যামি অনুশীলন করবেন। সবথেকে মুশকিল হল তাঁদের যারা ভবিষ্যৎকে অস্বীকার করে অতীতের গলিতেই ঘুরতে চান তাদের। তারা আর ঘুণাক্ষরেও বোম্বেতে থাকতে পারবেন না। ডালহৌসি, কনট প্লেস, মেরিন ড্রাইভ, সান্তাক্রুজ, কাব্বন পার্ক, জিমখানা, টালীগঞ্জ, গড়িয়ার উপর খাঁড়া নেমে আসত। কিন্তু নিহালনী সাহেব তো আর যশ চোপড়া নন, তাই বোম্বে থুড়ি মুম্বইয়ের রাস্তা ছেড়ে তিনি বহুকাল বাইরে যান নি। তাই তাঁর স্বয়ংক্রিয় খাঁড়া মুম্বইতে এসেই থেমে গেল।

অনেকে অবশ্য এরকম কথা বলছেন যে নব্বই দশকের পর যেহেতু নিহালনী সাহেব ‘সেইরকম’ ছবি বানান নি তাই অতীতের উপর অভিমান করে অস্বীকার করতেই তাঁর এই শুদ্ধিকরণ প্রচেষ্টা। যেমন প্রীত ভারারা, ভারতীয়ত্ব ত্যাগ করে অ্যামেরিকানত্ব গ্রহণ করার তাগিদে ভারতীয় দেখলেই ফাঁসিতে লটকে দিয়ে নগ্নতল্লাশির দাওয়াই দিতে উঠে পড়ে লাগেন আর কি।



তা এর বিরুদ্ধে তো প্রতিবাদ হবেই- সঙ্গত প্রতিবাদ। কেউ কেউ মোদী সাহেবকেও অবগত করাবেন, যে আখেরে দিল্লির আম দরবারে শুকনো খরা চলে এসেছে, এবং আজকের এই লাভ জেহাদ আর চারখান হিঁদু সন্তানের দাবীর মাঝখানে সিনেমার কাঁচি যদি ললিতা পাওয়ারের নজর হয়ে দেখা দেয় তাহলে আখেরে ত্বকের যত্ন নিতে বোরোলীনেও কাজ হবে না। মোদী সাহেব অবশ্য সামনাসামনি কারুর কাজেই ডানহাতের তর্জনী ব্যবহার করতে চান না। আর ভিতরের কলকাঠির খবর কেই বা রাখতে গেছে।

দ্বিতীয়ত আসি প্রথম ঘটনাটিতে, ‘এআইবি’ বা সর্বভারতীয় বক্তিমবাজদের জন্ম হয় বেশ কিছুকাল আগে পশ্চিম থেকে আগত বাবাগনুশ মার্কা স্ট্যান্ডআপ কমেডিয়ানদের অভিযোগ থেকে। মানে পাপা সিজে রাসেল পিটার্স ইত্যাদিরা আমাদের বীর দাসদের সঙ্গে মিলে ভারতীয়দের নিজেদের উপর হাসার অপারগতা নিয়ে কান্নাকাটি করেছিলেন, আর ফল স্বরূপ পাশ্চাত্য ধারণায় মন্ত্রগুপ্তির শপথ নিয়ে এআইবির উৎপত্তি বা ব্যুৎপত্তি। এখন এআইবি-র যারা সদস্য গুরসিমরণ খাম্বা, রোহণ জোশী, তন্ময় ভাট এবং আশিস শাক্য তাঁরা কয়েকটি ইউটিউব ভিডিও বানিয়ে ভারতীয়দের গাঁট কেটে বেশ খ্যাতিই পেয়েছিলেন। এনাদের কয়েকটি ভিডিও বিশেষত নারী শরীরের বাণিজ্যিকরণ, আলিয়া ভাট, কংগ্রেস বনাম বিজেপি ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়তাই পেয়েছিল। কিন্তু তালগাছের শখ যাদের থাকে তাদের কলাগাছে দোল খেতে কি ভাল লাগে?

তাই এআইবি রোস্ট এবং বিতর্ক। এখন উপরের অনুচ্ছেদ দেখে এমনিতেই বুঝতে পারছেন যে ভারতীয়দের (অবশ্যই সর্দাররা ছাড়া) নিজেদের উপর ঠাট্টার বিষয়ে মানসিকতা এখনো সেই সিপাহী বিদ্রোহের আগের জমানার। তাই সরাসরি আক্রমণ যদি বেডরুম ছাড়িয়ে বাথরুমে চলে যায় তাহলে কি মানা যায়? বিশেষতঃ সাধারণ ভদ্রতার সীমা গ্রাউণ্ড ফ্লোরে ফেলে চ্যাটার্জী ইন্টারন্যাশনালের ছাদে হাওয়া খেতে উঠে গেলে? ব্যাস এফআইআর- এর লাইন লেগে গেল। এমনিতেই আলিয়া ভাট আর হিরু জোহর দীপিকা পাড়ুকোনের শয্যাদৃশ্য কল্পনা করে একই প্রেক্ষাগৃহে হাসছেন এই দেখতে ভারতীয় দর্শক এখনও তৈরী নয়। তার উপর ধর্ম, বর্ণ এবং সর্বোপরি লিঙ্গভেদ নিয়ে পাতে দেবার অযোগ্য মস্করা।

আসুন দেখি বিদগ্ধ জনেরা কি বলছেন। বোন অর্পিতাকে নিয়ে দুষ্টু চুটকির প্রতিবাদে প্রথমেই সলোমন খান তন্ময় ভাটের অ্যানাটমি বিগড়ে দেবার হুমকি দিয়েছেন। করণ জোহর বলেছেন, যাদের পছন্দ নয় তারা দেখবে না বা শুনবে না। করণ, অর্জুন, রণবীর, দীপিকা, আলিয়া, সোনাক্ষী সহ ১৪ জনের বিরুদ্ধে অশ্লীলতা বা অশালীনতার অভিযোগে জনস্বার্থ মামলা দায়ের হয়েছে। তাতে আলিয়ার বাবা মহেশ খেপে গিয়েছেন কিন্তু তাঁর মাথায় জল ঢেলে দিয়েছেন সোনাক্ষী এই বলে যে ছেলেপুলেরা বড় হয়েছে এবার নিজেকেই সামলাতে দিন। আর সব নিয়ে যদি মাথা ঘামাতে হবে তো মহেশ ভাটের মতই টাক পড়ে যেতে পারে। ওদিকে ফিল্ম বিশ্বের যুগপুরুষ ‘সত্যমেব জয়তে’র পরিবেশনকারী মহান আমির খান করণ, রণবীর ও অর্জুনকে সেলিব্রিটি হিসাবে আরও দায়িত্ববান হবার পরামর্শ দিয়েছেন। তার উত্তরে এক ব্লগার প্রথম বিষোদ্গার করেন এবং আমিরের একদা সহকর্মী পূজা ভাটও আমিরকে বিখ্যাত ‘দিল্লি বেলী’র কথা মনে করিয়ে দিয়েছেন। আমির তাতে একটু চেপে গিয়ে বলেছেন, ‘দিল্লি বেলী’তে তিনি তো সরাসরি গালাগাল কাউকেই করেন নি। তার সিনেমার চরিত্ররা করেছেন। যদিও তখন তিনি বলেছিলেন, ‘যার পছন্দ হবে না সে দেখবে না!’ তাতে আবার কানাডিয়ান ভারতীয় রাসেল পিটার্স আমির খান কে নিজের চরকায় তেল দিতে বলেছেন, কারণ পিটার্সের নিজের জামাকাপড় চরকায় নয় উলের কাঁটায় হাতে বুনে তৈরী হয় এবং তাতে তেলের কোন দরকার পড়ে না। শেষ মেষ ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রির স্বনিয়োজিত সাফাইকারী টুইঙ্কল খান্না (রাজীব ভাটিয়ার মতো প্লে বয়কে পনেরো বছর ধরে চাবকে সোজা রেখে ফিল্ম ইন্ডাস্ট্রি তথা সমগ্র বিশ্ব সমাজের যে উপকার তিনি করেছেন তা সারা বিশ্ব দুশো বছর পরেও মনে রাখবেন), আবার নিজের ব্লগে ঘোষণা করেছেন, ‘যাও যাও সব নিজ কাজে!’ অর্থাৎ সারা বিশ্বে এর থেকেও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আশয় আছে সেখানে গিয়ে নাক পেন্সিল করো হে সব।

সব মিলিয়ে জমজমাট অবস্থা। তবে সাধারণভাবে আমাকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে আমি সামগ্রিক ভাবে মরাল পুলিস নিয়ে আদেখলাপনার বিরোধী। মনে করি যে যা ভাল তা নিজে থেকেই থেকে যাবে, আর যা নিম্নরূচীর বা নিকৃষ্ট তা আপসেই মুছে যাবে। কিন্তু বহু ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে, আমাদের বাকস্বাধীনতাকে বাক...এর শেষ স্টেশনে নিয়ে চলে যাই। আত্মনিয়ন্ত্রণ তখন পরস্মৈপদী শব্দ হয়ে দাঁড়ায়। আর তখনই গোলযোগ। আমার যা ভাল লাগে তা অপরের ভাল নাও লাগতে পারে এই বোধটাই কোথায় যেন চাপা পড়া মানুষ হয়ে যায় আর মস্তিষ্কের রাজপাট রাইটার্স থেকে নবান্নে পাড়ি লাগায়।

সংবেদনশীলতা এবং বাকস্বাধীনতার একটা নমনীয় মোড়ে আমরা দাঁড়িয়ে। না পারি ছাড়তে, না পাড়ি ধরতে। বাকস্বাধীনতা খর্ব করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে গর্জে উঠি কিন্তু নিজগুণে সংবেদনশীলতা না দেখাতে পেরে অপরের ব্যক্তিগত ক্ষেত্রে ঝাঁপিয়ে পড়ি।

চোর চুরি করে বলেই কি না পুলিশের মাহাত্ম্য? সব কি আর অপাপবিদ্ধ উত্তরাঞ্চলী গাঁও? বিশ্বাসের বস্তু তর্কের থেকে কয়েক যোজন এগিয়ে যাবে? আসল কথা হল ব্যালেন্স বা ভারসাম্য। যা আমাদের জীবন ট্রাপিজের খেলায় পোক্ত সাইকেল চালক করে তুলবে। পরের জুতোয় পা আমরা তা ঝেড়ে দেবার জন্যই গলাব না, তার জায়গায় নিজেকে রেখে নিক্তিতে মেপে পা ফেলতেও কাজে লাগাব।

সেই সকালের কল্পনা করতেই পারি যেখানে টিটকিরিটাকে নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে নির্মল হাসির দিকে ঝুঁকব। কিন্তু অপ্রাপ্তমনস্কতার নামে খামোখা আমার অপছন্দকে সামনে রেখে মরালিটির বিচারকের ভূমিকা পালন করব না। তাই দাদা, মন খুলে খেলুন, সম্পূর্ণ মাঠটাই আপনার, কিন্তু অপরকেও খেলতে দিন। আপনার বাপের সম্পত্তি হলেও। ভাগ করে নেবার মধ্যেই যে পাবার আনন্দ লুকিয়ে আছে। কি বলেন?

প্রয়োজনহীন পুনশ্চঃ শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত, হিন্দু সেনাদের মুখপাত্র নতুন ক্যাম্পেন শুরু করেছেন, ‘বেটি বাঁচাও, বহু লাও’! সত্যিই, কবে যে এদের নবি হাজির হবেন? ও হো নবি বলতে মনে পড়ল, মোদী সাহেব স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মুখ খুলেছেন, বলেছেনঃ ‘প্রত্যেকেরই অপরিহার্য অধিকার আছে নিজধর্ম বজায় রাখতে ও পালন করতে’। রবি ঠাকুর ও বিবেকানন্দকে সাক্ষী রেখে বলেছেন, স্বাগত জানাবার এবং সম্মান প্রদর্শনের ভারতীয় ঐতিহ্যের কথা। কোথাও না কোথাও তো শুরু করতেই হয়। বলুন?


(সৌজন্যেঃ সরোজ দরবার)

আপনার মতামত জানান