গন্ধের টানে

ডঃ বিশ্বরূপ নিয়োগী

 



আমাদের শরীরের যে পাঁচটি ইন্দ্রিয় তার প্রত্যেকটির সাহায্যেই আমরা আদপে কিছু না কিছু সঙ্কেত অনুভব করি। তারমধ্যে চোখে দেখা দৃশ্য আর কানে শোনা শব্দকে আমরা আবার বৈদ্যুতিন মাধ্যমে স্থানান্তরিত করতেও পারি। সুদূর অস্ট্রেলিয়ায় ক্রিকেট খেলা হচ্ছে। আমরা ভারতে বসে তার সম্প্রচার দেখতে পাচ্ছি। অন্য জায়গা থেকে কেউ ফোনে কথা বলছে। আমি বাড়িতে বসে শুনতে পাচ্ছি। বা ধরুন এই দুইয়ের সমন্বয়ে ভিডিও কনফারেন্স। কিন্তু একটা কথা ভাবুন তো। আমাদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্দ্রিয় নাক। তা এই নাকের মারফৎ অনুভূত গন্ধকে কি এইভাবে স্থানান্তরিত করার কোনও উপায় এখনও অবধি আমরা করে উঠতে পেরেছি ?
ধরুন এই যে গোলাপ ফুলের ছবিটা এই মুহূর্তে আপনি দেখছেন। এই ফুলটা আমার বাগানে ফুটেছিল। আমি ক্যামেরায় ছবি তুলে সেই ছবিটা বৈদ্যুতিন মাধ্যমে পাঠিয়ে দিয়েছি বলেই আপনি দেখতে পাচ্ছেন। আচ্ছা, এই ফুলটাকে দেখার সঙ্গে সঙ্গে তার গন্ধটাকে কি আপনি টের পেলেন ? পেলেন না তো! ধরুন যদি গোলাপের গন্ধটুকুও আপনি একইভাবে টের পেতেন কেমন হত ব্যাপারটা! এবার ভাবুন আপনার পাশের বাড়িতে কষা মাংস রান্না হচ্ছে। আপনার বাড়িতে বসে আপনি সেই গন্ধটা পাচ্ছেন। ঘ্রাণে অর্ধভোজন হয়ে যাচ্ছে কিনা সেটা অবশ্য আপনার ব্যাপার। কিন্তু কর্মসূত্রে ঠিক এই মুহূর্তে আপনাকে যদি নিউ ইয়র্কে বসে থাকতে হয় তবে সেই অর্ধভোজনের আশাটুকুও সুদূরপরাহত। মানে এই কষা মাংসের মনমাতানো গন্ধটুকু পাশের বাড়ি অবধি যেতে পারে কিন্তু অতদূর নিউ ইয়র্কের পথ পাড়ি দেওয়া তার কম্মো নয়। তা ছবি আর শব্দকে ভিনদেশে পাঠানোর পর কেমন হত যদি গন্ধকেও আমরা পাঠিয়ে দিতে পারতাম প্রিয়জনের কাছে ? এটা কীভাবে সম্ভব ? বা আদৌ সম্ভব কি ?
ফিরে আসি পুরনো গোলাপ ফুলের ছবি আর তার গন্ধের প্রসঙ্গে। আচ্ছা আপনি যখন কম্পিউটারে এই গোলাপের ছবিটা দেখছেন সেই মুহূর্তে যদি আপনার ঘরে খানিকটা রোজ পারফিউম ছড়িয়ে দেওয়া যায় তাহলে ছবি দেখার সঙ্গে সঙ্গে গন্ধ পাওয়ার একটা অনুভূতি তৈরি হয় না কি! আমরা যদি এরকম একটা গ্রাহক যন্ত্র তৈরি করতে পারি যে যন্ত্রটা থেকে যে কোনও ধরনের গন্ধ বেরোতে পারে তাহলে কেমন হয়! ব্যাপারটা একটু খোলসা করে বলা যাক। আপনার বাড়িতে এই গ্রাহক যন্ত্রটি আছে। যার মেমোরিতে অনেক ধরনের গন্ধ আগে থেকেই সঞ্চিত হয়ে আছে। ধরুন এই গোলাপের ছবিটা আপনার গ্রাহক যন্ত্রে ধরা পড়তেই সেই যন্ত্রের মেমোরিতে সঞ্চিত গোলাপের গন্ধটা যদি যন্ত্র থেকে নির্গত হয় তাহলে নিশ্চয়ই আপনি ছবি দেখার সঙ্গে সঙ্গে গন্ধটাও অনুভব করতে পারবেন। অথবা ধরুন আজকাল টিভিতে তো বিভিন্ন ধরনের রান্নার অনুষ্ঠান সম্প্রচারিত হয়। মহিলামহলে বেশ জনপ্রিয়তাও পেয়েছে এই অনুষ্ঠানগুলি। ভেবে দেখুন তো, আপনার গ্রাহক যন্ত্রে ধরা পড়া রান্নার চলচ্ছবি অনুযায়ী যদি একইসঙ্গে উক্ত যন্ত্র থেকে রান্নার গন্ধটাও আপনার নাকে ধরা দিত তবে ব্যাপারটা কতখানি আকর্ষণীয় হত! অথবা ধরুন আপনি সিনেমা হলে অমিতাভ বচ্চনের সিলসিলা ছবিটি দেখতে গেছেন। অমিতাভ বচ্চন যখন ফুলের বাগানে হেঁটে যাচ্ছেন তখন আপনিও যদি সেই ফুলের গন্ধটা পেয়ে যান তবে সিনেমার সঙ্গে নিমেষে আপনার কতখানি একাত্মতা তৈরি হয়ে যাবে একবার ভাবুন তো!
আধুনিক বিজ্ঞানে অনেক কিছুই সম্ভব। প্রথমত বলি এই ধরনের চিন্তা ভাবনা নিয়ে সারা পৃথিবীতেই ইদানিং গবেষণা চলছে। বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বিভিন্ন প্রাযুক্তিক লক্ষ্যে এগোতে চাইছেন। কিছুটা সাফল্যও এসেছে প্রাথমিক পর্যায়ে। মনে রাখবেন, আমরা বাঙালি গবেষকরাও পিছিয়ে নেই এক্ষেত্রে। আমরা কয়েকজন বাঙালি গবেষক আপাতত খুবই প্রাথমিক পর্যায়ের একটি যন্ত্র নির্মাণে সমর্থ হয়েছি। এই যন্ত্রটি থেকে এখনও পর্যন্ত তিনটি ফুলের গন্ধ আপনি পেতে পারেন। ধরুন, ভ্যালেন্টাইন্স ডে-র দিন কেউ আপনাকে ফেসবুকে একটি গোলাপের ছবি পাঠাল। আপনি কিন্তু আমাদের এই স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রটির মাধ্যমে ওই ছবিটি দেখার সঙ্গে সঙ্গে গোলাপের গন্ধটুকুও অনুভব করে নিতে পারবেন। ছবির ক্ষেত্রে সাফল্য পাওয়ার পর এই মুহূর্তে ভিডিও নিয়েও কাজ করছি আমরা। অর্থাৎ কোনও ভিডিও কনফারেন্সে আপনাকে কেউ গোলাপ দেখাল এবং আপনি তার গন্ধটাও পেয়ে গেলেন ওই কনফারেন্স চলাকালীন।
আসলে আমাদের গন্ধের অনুভূতিটুকু একধরনের রাসয়নিক বিক্রিয়া। যেটা আমাদের মস্তিষ্কে ঘটছে। একথা আজ সকলেই জানেন যে আমাদের দেখা যে কোনও রঙই আসলে রামধনুর সাতটি মৌলিক রঙের নিয়ন্ত্রিত সমাহার। তেমনি পৃথিবীর যে কোনও গন্ধের মূলে কিন্তু রয়েছে আসলে মাত্র দশটি মৌলিক গন্ধ। আমাদের লক্ষ্য এই দশটি মৌলিক গন্ধের পরিমাণ মাফিক সংমিশ্রণ ঘটিয়ে একদিন আমাদের এই যন্ত্র থেকে পৃথিবীর যে কোনও গন্ধকে নির্গত করা।




[এই নিবন্ধে বর্ণিত গন্ধগত গবেষণার বিষয়টুকু Indian Intellectual Property অনুযায়ী পেটেন্টের জন্য দাখিল করা হয়েছিল এবং পেটেন্টটি পাবলিশডও হয়ে গেছে। এই সংক্রান্ত কিছু গবেষণাপত্র বিদেশের বিভিন্ন জার্নালে ইতিমধ্যেই প্রকাশিত।]

আপনার মতামত জানান