অভিজিত রায় স্মরণে ...

সুশোভন

 


খবর তো অনেক রকমের হয়। প্রধানমন্ত্রী হাঁচলে খবর। মুখ্যমন্ত্রী কাশলে খবর। মাধুরী দীক্ষিত হাসলে খবর। শাহরুখ খান টিকি রাখলে খবর। ধোনি মাথা ন্যাড়া করলে খবর। অনুস্কা, বিরাটের সেঞ্চুরিতে উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিলে খবর। আম্বানির কুকুরের বকলেস চুরি হলে খবর। আবার দেখুন আজ অভিজিত রায়ও খবর। তাঁর মৃত্যু খবর। এর আগে ২০১৩-র ফেব্রুয়ারিতে শাহবাগ আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ব্লগার রাজীব আহমেদও মীরপুরে তাঁরই বাড়ির সামনে থেকে খবর হয়েছিলেন। তারও আগে ২০০৪-এর ২৭ ফেব্রুয়ারি বইমেলা থেকে বার হওয়া মাত্রই খবর হয়েছিলেন লেখক হুমায়ুন আজাদ। তাই কোন খবরটা পড়বেন, কোনটা পড়ে ভাববেন, কোনটা পড়ে কষ্ট পাবেন, কোনটা পড়ে মহাপ্রভুর মত উর্ধ্ববাহু তুলে “ধিতাং ধিতাং বোলে” নাচবেন,কোনটা দেখে খবর কাগজের পাতা উল্টে দেবেন, আর কোনটা পড়ে মুচকি হাসবেন সে পছন্দ অবশ্যই পাঠকের। সে পছন্দ অবশ্যই আপনার। শুধু খেয়াল রাখবেন এই অবজ্ঞা অবহেলার মেঘে মেঘে বেশী বেলা না হয়ে যায়।


অভিজিৎ রায় কে কি আমি চিনতাম? বোধ হয় না। খুব অনুসরণ করেছি ? তেমনও বোধহয় না। তার সব বই কি আমার পড়া ? কই না তো। শুধু “মুক্তমনার” লেখক হিসেবে একরকম করে চিনতাম।মুক্তমনা তে তার একাধিক লেখা পড়েছি। সমৃদ্ধ হয়েছি। গঙ্গা জল গঙ্গা পুজো করার মতই দূর থেকেই তার লেখা পড়ে তাকে শ্রদ্ধা করেছি। তাঁর কলম কে কুর্নিশ করেছি। কিন্তু যা বুঝিনি তখন, আজ সেটা বুঝলাম। বুঝলাম যে অভিজিত রায়ের লেখার ধার তাঁকে কোপান মারণাস্ত্রের থেকে ঢের গুন বেশি।অভিজিত রায়ের লেখার গভীরতা মৌলবাদীরা তাকে কুপিয় যাওয়া রাতের অন্ধকারে চেয়ে লক্ষ গুন গভীর।অভিজিত রায়ের লেখার ব্যাপ্তি রক্তস্নাত বাঙলাদেশের বইমেলা প্রাঙ্গণ থেকে ভাষা শহীদের বেদীর থেকেও কয়েক যোজন বেশী বিস্তৃত । আর ধর্মীয় গোঁড়ামি , অনুশাসন এমনকি রীতি-রেওয়াজ থেকেও অনেক বেশী প্রাসঙ্গিক। তা যদি নাই হত , তাহলে কেনই বা অভিজিত রায় কে মরতে
হত?

থাক না বিতর্ক। থাক না তক্কো। কিসের এত আপত্তি ? কোন আদর্শ, কোন মতবাদ, কোন লড়াই,
কোন জেহাদ, কোন দাবী, কোন যুক্তি, কোন ব্যাখ্যা, কোন ধর্মাচরণের পরিধি আর ব্যাপ্তি দিয়ে এই রক্ত বন্যা কে ব্যাখ্যা করবেন বলুন দেখি ? এই যে আপনারা, যারা কথায় কথায় ইসলাম কপচান, শরিয়ত্পন্থী রাষ্ট্র করে তুলতে চান, আজ একে হুমকি দেন, কাল ওকে গালি গালাজ করেন, রাতের অন্ধকারে কুপিয়ে খুন করেন, রক্তের হোলি খেলেন, প্রতিদিন, প্রতিপদে বাংলাদেশ কে ঠেলে দিচ্ছেন নিশ্চিন্ত অন্ধকারের দিকে, ধ্বংসের দিকে, আপনাদের বলছি , এপারে থেকেও ওপার কে আমরাও ভালবাসি, খবর রাখি, আপন মনে করি আর তাই দুশ্চিন্তা হয়। যে সিনেমা- ছবি- বই- নাটকে- কার্টুন আপনার “নাজুক” ভাবাবেগে আঘাত লাগছে, কোনও অন্ধ বিশ্বাসের স্ক্রু হালকা করে আলগা হয়ে যাচ্ছে, আপনার ধর্মাচরণ যুক্তির কাছে ক্যাবলা হয়ে যাচ্ছে, চোখের ঠুলি খুলে রাখার আস্কিং রেট বাড়ছে দয়া করে সেগুলিকে এড়িয়ে চলুন। ভাল না লাগলে মকবুল ফিদা হুসেনের সরস্বতী কে পূজা করবেন, তসলিমা নাসরিনের বই কিনবেন না, সলমন রুশদি পড়বেন না, শারলি এবেদো চাখবেন না, পপকর্ণ চিবিয়ে পিকে বা ওহ মাই গডের কর্নার সিটের টিকিট করবেন না। আপনি যে আজান পড়েন তা আমার কুরুচিকর মনে হতে পারে, যে হনুমান চল্লিশা গান শোনেন তা আমার পছন্দ নাই হতে পারে এবং সেই গান লোকে শোনে ভাবলে সমাজ কোথায় তলিয়ে যাচ্ছে গোছের চিন্তাও আমার রাতে ঘুম না আস্তেই পারে। কিন্তু যতক্ষণ না সেই গান চালিয়ে আপনি আমার জীবন অতিষ্ঠ করছেন, ততক্ষণ আপনার সেই গান শোনায় হস্তক্ষেপ করার পক্ষে যুক্তি আছে কি ? কারণ আপনার যা ঘোর অপছন্দের, তা হয়তো আর এক জনের কাছে বেঁচে থাকার মন্ত্র। তাই কুয়োর ব্যাং হয়ে থাকাটা যেমন আপানদের ব্যক্তিস্বাধীনতা, নিজেকে মুক্তমনা করা আমাদেরও ব্যক্তি স্বাধীনতা। সে বিশয়ে লেখা কথা বলা আমাদের বাক স্বাধীনতা। জানি বাকস্বাধীনতা জিনিসটা কিন্তু নিখরচায় মেলে না। বহু ক্ষেত্রেই তার মূল্য চোকাতে হয়। অভিজিত রায়ই কেমন দূরদর্শী ছিলেন দেখুন সেই কবেই ফেসবুকের দেওয়াল ভরিয়ে গেছেন লিখে ... "যারা ভাবে বিনা রক্তে বিজয় অর্জিত হয়ে যাবে তারা বোকার স্বর্গে বাস করছেন। ধর্মান্ধতা, মৌলবাদের মত জিনিস নিয়ে যখন থেকে আমরা লেখা শুরু করেছি, জেনেছি জীবন হাতে নিয়েই লেখালিখি করছি.." ঐ যে কথায় বলে Pen is mightier than sword । তাই অভিজিত রায়ের মৃত্যু তে আমি বিচলিত নই বরং বড্ড অসহায়। আসলে লিখতে
গেলে পড়তে হয়। পড়তে গিয়ে জানতে হয়। শিখতে হয়। ভাবতে হয়। ভাবা প্র্যাকটিস করতে হয়। আর সেই পথের অভিজ্ঞ শরিক কমরেড আজ শহীদ। আমার অসহায়তা কি অন্যায় ? আপনিই বলুন ? আর ঐ অসহায়তা থেকেই শহীদ স্মরণে শেষ কয়েকটা লাইনে আবার কয়েকবার জাস্ট এই কি বোর্ড টাকেই পিষব
জনাব, আপনি ধার্মিক, আমি নই। আপনি ঈশ্বর বিশ্বাসী আমি নই। আপনি ভালো আমি নই। তাই সই, না হয় তাই
সই...
আপনি নির্দোষ, আমি 'অনেক দোষেতে দোষী'। আপনার বিশ্বাস অন্ধ। আমার বিশ্বাস যুক্তি। আপনি যা দেখেননি তাই বলেন। আমি যা দেখি তাই বলি। আপনি ধর্মের বুলি কপচান, আমি শুধু চোখ কান খোলা রাখি। জনাব, আপনি ধার্মিক, আমি নই
আপনার ভাষায় আপনি নিষ্পাপ, আমি পাপী । আপনি বলেন আপনার ধর্মই সেরা ধর্ম। আমি বলি সেরা ধর্ম মানবধর্ম। আপনি মানুষকে আক্রমণ করে কথা বলেন, আমি পরিশীলিত ও মার্জিত ভাষায় বলি 'ধর্মই আফিম' । জনাব, আপনি ধার্মিক, আমি নই।
আপনি অযোধ্যায় মসজিদ ভেঙ্গে উল্লাস করেন, আমার কষ্ট হয় । আপনি পেশোয়ারে শিশু হত্যা করে তৃপ্তির ঢেঁকুর তোলেন, আমার চোখ জলে ভরে ওঠে। আপনি ধর্মের বিচারে 'সংখ্যালঘু' 'সংখ্যাগুরু' ঠিক করেন। আমি বলি খেতে না পাওয়া লোকই সংখ্যাগুরু । জনাব আপনি ধার্মিক, আমি নই।

আপনি কায়দা করে দাড়ি রাখেন, অন্যকে বোরখা পরান, টিকি বাড়ান, ঘোমটা দেন, পাগড়ি বাঁধেন,
ম্যাট্রিমোনিয়ালে জাত-পাত-গোত্র খোঁজেন, বৃহস্পতিবার নিরামিষ খান। আমি অনিয়মিত দাঁড়ি কাটি। যা ইচ্ছে হয় তাই পরি। যত্ন করে চুল আঁচড়াই। বৃহস্পতিবারও যা জোটে তাই খাই। মানুষ কে শুধু মানুষই ভাবি । ঘোমটার আড়ালে খ্যামটা নাচি না। জনাব আপনি ধার্মিক, আমি নই।

আপনি হাঁচি, টিকটিকি মানেন। আর আমি আইন। আপনি ধর্মগ্রন্থ মানেন। আমি শুধুই সংবিধান। আপনি কবর, শ্মশান আর কফিনের পার্থক্যে বন্ধু খোঁজেন। আমি মনের মত বন্ধু খুঁজি। আপনি জাত পাতের বিচার করেন। আমি করি না। আপনি শিয়া না সুন্নি'র খোঁজ নেন। আমি পরোয়া করি না। আপনি তিনটে আংটি, পাঁচটা মাদুলি পরেন। আমার জামা কাপড়ই যথেষ্ট মনে হয়। আপনি মেয়েরা কি পরবে, কি বলবে, কিভাবে চলবে ফতোয়া দেন।
আমি নারী স্বাধীনতার পক্ষে। জনাব আপনি ধার্মিক, আমি নই।
আপনি ঠিক করে দেন কে অচ্ছুৎ, কে অস্পৃশ্য। আমি প্রশ্ন করি আপনি ঠিক করার কে ? আপনি ঠিক করে দেন কে মন্দিরে ঢুকবে আর কে যাবে নরকে। আমি প্রশ্ন করি স্বর্গ আর নরকের জিপ কোড কত? আপনি বলেন শিশুদের স্কুলে যাওয়া চলবে না। আর আমি বলি স্কুলই হোল পৃথিবীর একমাত্র মন্দির বা মসজিদ বা গির্জা বা আরও কিছু। জনাব আপনি ধার্মিক, আমি নই ।

আপনি বাংলাদেশে সংখ্যালঘু নিধন নিয়ে সোচ্চার হন। গুজরাট নিয়ে চুপ করে থাকেন। আপনি পেশোয়ারের তীব্র নিন্দা করেন। বিহারে উচ্চবর্ণের দ্বারা দলিত হত্যা ও অত্যাচার নিয়ে মুখে কুলুপ আঁটেন। আপনি কাশ্মীরে জঙ্গি হানার নিন্দা করেন। বোড়ো জঙ্গিদের দ্বারা আদিবাসী হত্যা নিয়ে 'স্পিক টি নট'। আমি সব গুলোর মুক্তকণ্ঠে নিন্দা করি। জনাব আপনি ধার্মিক, আমি নই।

আপনি রাজীব কে মারেন। আপনি অভিজিত কে কোপান। হুমায়ুন আজাদ কে বাঁচতে দেন না। মুরুগান কে হুমকি দেন।
ওয়েঙ্গারের বই পোড়ান। আর আমি পড়তে চাই। জানতে চাই. ভাবতে চাই। মুক্তমনা হতে চাই। জনাব আপনি
ধার্মিক, আমি নই।

আপনি এসব দেখেশুনে আমাকে ধর্মের তত্ত্বকথা বোঝাবেন। অমুক বইয়ের তমুক পৃষ্ঠার বাছাই করা লাইন খুঁজে নিয়ে আসবেন। আর আমি ধর্মের নামে গণহত্যার তথ্য দেব। হানাহানির ইতিহাস বলব। অভিজিতের লাশ কে সেলাম করব। বন্যার হাতের কাটা আঙ্গুলের শপথ নেব। জিজ্ঞেস করব ধর্ম কি গরীবদের খেতে দেয় না পরতে দেয় না দেয় মাথার উপর ছাদ ? আর বিনীত ভাবে বলব “আপনি থাকুন আপনার ধর্ম নিয়ে, আমি এই বেশ ভালো আছি”।

জনাব, আপনি ধার্মিক, আমি নই। আপনি ঈশ্বর বিশ্বাসী আমি নই। আপনি ভালো আমি নই। তাই সই, না হয় তাই সই ...

আপনার মতামত জানান