রাষ্ট্র যখন জঙ্গলে পরিণত হয় তখন হুমায়ুন আজাদ, রাজীব হায়দার, অভিজিৎ রায়দের মেরে ফেলা হয়

কুলদা রায়

 



অভিজিৎ রায়কে মেরে ফেলা হল। তিনি লেখক। বিজ্ঞান, ইতিহাস, দর্শন, রাজনীতি, ধর্ম নিয়ে লিখেছেন। সব কিছুকেই প্রশ্ন করেছেন। প্রশ্ন করতে উদ্বুদ্ধ করেছেন।

প্রশ্নের মধ্যে দিয়েই জ্ঞানের উন্মেষ ঘটে। জ্ঞানই জীবন। প্রশ্নহীন জগৎ অন্ধকার। মানুষের বসবাসের অনুপযুক্ত।

প্রশ্নকে তারাই ভয় পায় যাদের কাছে উত্তরটি নেই। উত্তর নেই বলেই সেটা ফাঁকি। ফাঁকি দিয়ে সভ্যতা নির্মাণ অসম্ভব।

আর যারা প্রশ্নকে মোকাবেলা করেন ঘৃণা দিয়ে নয়, শক্তি দিয়ে নয়, হুমকি দিয়ে নয়, অস্ত্র দিয়ে নয়, রক্ত নিয়ে নয়, জীবন কেড়ে নিয়ে নয়--যুক্তি, তর্ক আর প্রমাণের মধ্যে দিয়ে--তারা প্রশ্নকে স্বাগত জানান। প্রশ্নের মধ্যে দিয়ে জ্ঞানের হাজারও দরোজা খুলে যায়। সত্যের দেখা মেলে। একটি সত্য আরেকটি সত্যের পথ দেখায়। সে সত্য আরো সত্যের সন্ধান দেয়। সত্য একটি নয়। সত্য বহুপ্রকার। সবগুলো মিলেমিশে একটি মহৎ সত্যকে গড়ে তোলে। বহুর মধ্যে ঐক্য সে সত্যের প্রকৃত নাম।

অভিজিৎ রায় যা বিশ্বাস করতেন তাই তিনি লিখতেন। তার এই লেখা আমার বিশ্বাসকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে, আমার বিশ্বাসকে ভেঙে দিতে পারে, নতুন বিশ্বাসের পথ দেখাতে পারে, বিশ্বাসহীনও করে তুলতে পারে, অবিশ্বাসী করে তুলতে পারে, তাতে আমার কিছু ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তিনি যা বিশ্বাস করেন সেটা বলা ও লেখার অধিকার তাঁর রয়েছে। আবার তাঁর বিশ্বাসকে মোকাবেলা করার অধিকারও আমার রয়েছে। কিভাবে? বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে। যুক্তি, তর্ক আর প্রমাণের মধ্যে দিয়ে অভিজিৎ রায়ের বিশ্বাসকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে, তাঁর বিশ্বাসকে ভেঙে দিয়ে তাঁকে মোকাবেলা করা যায়। অস্ত্র দিয়ে নয়। হত্যা করে নয়।

এবং যদি অভিজিৎ রায়ের সঙ্গে কখনো ঐক্যমতে না পৌছানো যায় তাতেও কোনো সমস্যা নেই। তিনি যদি তাঁর বিশ্বাস নিয়ে ভালো বোধ করেন--করুন। তাকে সংশোধন করার দায় আমার নয়। অথবা আমাকেও সংশোধন করার দায় তার নেই। তিনি তাঁর মত বলছেন। আমি আমার মত বলছি। আমি আমার মত নিয়ে যদি শান্তি পাই তাতে কার কি অসুবিধা? দুটো মতই থাক না পৃথিবীতে। তিনটি মত থাকুক না তাদের মত করে। বহু মতের মধ্যে থেকে আমি/আপনি/সে যে কোনো মতটাই বেছে নেবো। আবার কোনো না কোনো মতকে বেছে নিতেই হবে এমন দিব্যি দিয়েছে কে? কেনো বলতে হবে আমি যা বলছি তাই শ্রেষ্ঠ?

যে কোনো শ্রেষ্ঠত্বের ভাবনাই বিপজ্জনক। শ্রেষ্ঠত্বের মধ্য ঘৃণা ও হিংসা লুকিয়ে থাকে। অসভ্যতা বেড়ে ওঠে।

অভিজিৎ রায়ের সঙ্গে আমি বহু বিষয়ে সহমত পোষণ করিনি। তার সঙ্গে আমার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য ছিল। কিন্তু আকাঙ্ক্ষা ছিল এক। সেটা হল বহুমতের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান। তাঁকে যারা হত্যা করেছে, তাঁর স্ত্রীকে হত্যা করতে চেয়েছে তারা শুধু তাঁকেই নয়--আমাদের সবাইকে হত্যা করতে চায়। রাষ্ট্র এই হত্যাকারীদের বিচার না করে তাদেরকে রক্ষা করছে। রাষ্ট্র তার নাগরিকদের মানুষ হিসেবে নয়-- সবার আগে দেখতে চাইছে মুসলমান হিসেবে, হিন্দু হিসেবে, খ্রিস্টান হিসেবে, বৌদ্ধ হিসেবে, সংখ্যা গুরু হিসেবে, সংখ্যালঘু হিসেবে, আস্তিক হিসেবে, নাস্তিক হিসেবে। এভাবে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠী রাষ্ট্রে তার ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখতে চাইছে। আর ক্ষমতার বাইরের গোষ্ঠী যারা আছে তারা রাষ্ট্র-ক্ষমতায় আসতে চাইছে। এটা ক্ষমতার খেলা। এদের কাছে মানুষ, নাগরিক, অধিকার, দ্বায়িত্ব, নিরাপত্তা অর্থহীন। এই ফোঁকর গলিয়ে একাত্তরের খুনীরা উল্লাশে পেট্রল দিয়ে মানুষের গায়ে আগুন লাগিয়ে দিচ্ছে। স্কুলের দরোজায় তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। সড়ককে করে তুলেছে সহজ মৃত্যুর ফাঁদ। রাষ্ট্রকে পালটে দিতে চাইছে। এভাবে রাষ্ট্র টেকে না। রাষ্ট্র জঙ্গলে পরিণত হয়। রাষ্ট্র এই জঙ্গলের দিকে যাত্রা করছে বলেই বলেই হুমায়ুন আজাদকে মেরে ফেলা হয়েছে। রাজীব হায়দারকে মেরে ফেলা হয়েছে। অভিজিৎ রায়কে মেরে ফেলা হয়েছে। যে কোনো ভীন্নমতাবলম্বীকেই মেরে ফেলা হবে। রাষ্ট্রের দ্বায়িত্ব সবার নিরাপত্তা বিধান করা। রাষ্ট্র এক্ষেত্রে ব্যর্থ।

অভিজিৎ রায়কে যারা মেরেছে তারা ঘোষণা দিয়েই মেরেছে। তাদের একজন লিখেছিল গেলো বছর ফেব্রুয়ারি মাসে--অভিজিৎ রায় আমেরিকায় থাকে। তাকে সেখানে মারা সম্ভব নয়। কিন্তু দেশে এলেই তাকে মেরে ফেলা হবে। এই ফেব্রুয়ারি মাসেই অভিজিৎ রায় আমেরিকা থেকে এসেছেন স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে। এসেছেন বইমেলায়। তাঁর দুটো বই বেরিয়েছে। সদ্য প্রকাশিত তার একটি বইয়ের মোড়ক উন্মোচন করেছেন। বন্ধুদের সঙ্গে কথা বলেছেন। লুকিয়ে থাকেননি। হাত ধরাধরি করে স্ত্রীকে নিয়ে বাসার উদ্দেশ্যে রওনা করেছেন। রিকশায় উঠেছেন। টিএসসির কাছে এলে তাদেরকে থামিয়ে হত্যার উদেশ্যে চাপাতি দিয়ে কোপানো হয়েছে। এর অদূরেই ছিল পুলিশ। পুলিশ এগিয়ে আসেনি। হত্যা করে হত্যাকারিরা নিরাপদে চলে গেছে।

এই হত্যার হুমকি যে লোকটি দিয়েছিল সেই লোকটি শাহবাগের গণজাগরণ আন্দোলনের অন্যতম উদ্যোক্তা ব্লগার রাজীব হায়দারকে হত্যার দায়ে গ্রেফতার হয়েছিল। উচ্চ আদালতের জামিন নিয়ে লোকটি একের পর এক প্রগতিশীল মুক্তমতের পক্ষের তরুণদেরকে হত্যার ঘোষণা দিয়ে যাচ্ছে। সেই লোকটি কোনো ব্যক্তিগত আক্রোশে নয়--একাত্তরের খুনি-যুদ্ধাপরাধীর জামায়াতের লোক, যুদ্ধাপ্রাধীদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে কাজ করছে। রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না। মিডিয়া তার অপরাধ নিয়ে কোনো খবর প্রকাশ করছে না। সবার চোখের সামনে দিয়ে ফারাবী নামের সেই উন্মাদ জঙ্গী মৌলবাদী লোক কিরিচ ঘুরিয়ে চলছে। তাকে রক্ষার চেষ্টা করছে সর্বাধিক প্রচারিত একটি প্রধান পত্রিকা। তাকে শুধু একজন ব্যক্তি হিসেবে উল্লেখ করছে। সে যে কোনো ব্যক্তি নয়--একটি ভয়ঙ্কর জঙ্গী মৌলবাদী গোষ্ঠীর লোক, এই লোক যে রাজীব হায়দার নামের আরেকজন ব্লগার হত্যাকাণ্ডের আসামী সে কথা বেমালুম চেপে গেছে। এই হত্যা যে একাত্তরের গণহত্যারই অংশ সেকথা বলতে চায় না। তারা মৌলবাদের কাছে তওবা করে মুক্তমতকে বিপদগ্রস্থ করে তুলেছে।

অভিজিৎ রায়, আপনার হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করছি। হত্যাকারীদের বিচার দাবী করছি। বিচারে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি কামনা করছি। সে শাস্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা চাইছি। জঙ্গলে নয়--রাষ্ট্রে ফিরতে চাইছি।

আপনার মতামত জানান