শান্তিনিকেতন থেকে

বিশ্বজিৎ রায়

 


ফটো সূত্র- গুগল

শান্তিনিকেতনে এখনও দোল লাগেনি তবে বসন্তের ঘোর লেগেছে । আজ বিকেল থেকেই ভেজা হাওয়া, নরম আর পুরনো পাতারা সব খসে পড়ছে । বুড়ো পাতারা বিছিয়ে রয়েছে লাল মাটিতে, সবুজ ঘাসে। ক্লাস নিয়ে ফিরতি পথে এই সব পড়ে থাকা পাতাদের সমারোহ ডিঙিয়ে বাড়ি ফেরা গেল । বাড়িতে কি আজ থাকার দিন ? তাই বিকেল সন্ধে আবার পথে । আকাশে চাঁদ আর মেঘের খেলা। চাঁদ এখনও পুরো গোল হয়নি তবে চন্দ্রাহত করার পক্ষে যথেষ্ট । রবীন্দ্রভবনের সামনে সাইকেল নিয়ে হেঁকে যাচ্ছে দইওয়ালা । তার গ্রামে যাওয়ার কথা অবশ্য ভাবছে না কোনও অমল । দইওয়ালার কাছ থেকে সুধার জন্য দই কিনে নিচ্ছে । সংগীত ভবনে দোলের রিহার্সাল চলছে । ছেলে-মেয়ের দল পাঠভবনের ভেতর আপন মনে ঘুরছে । কেউ কেউ নিজের মনে নেচে নিচ্ছে । মূল অনুষ্ঠানের নাচের দলে হয়তো সে নেই তবে নাচ কি কেবল অনুষ্ঠানের ? সে তো ব্যক্তিগতও । বুড়ো গাছগুলো পাতা খসিয়ে দিলে বটে তবে সেই আদ্যিকালের গাছগুলোর মত খলখলে যুবক-যুবতী আর কজন আছে ! তাদের আশে পাশে কত বসন্ত এলো-গেলো । সেই বসন্তের রঙ মেখে মেখে তারা জানে রঙ কেবল বাইরের নয় মনেরও । মনের সে রঙ যে কী পাকা । সেই পাকা রঙের দাগ মাতালও করে না মদিরও করে না । ধ্যানী সৌম্য করে তোলে । কী যে নির্ভার সেই বুড়ো গাছদের যৌবন যাপন তা যে বুঝেছে সে বুঝেছে । গাছের মতো ধ্যানী সৌম্যরাই তো যৌবনের ভীষণ ঢেউ বইতে পারে , সে ঢেউতে নাইতে পারে । ঘন্টাতলায় চাঁদের আলোছায়া । এ ঘন্টারও কি বয়স কম হল ? রবিঠাকুরের ইস্কুলে এ কতবার কতদিন ধরে যে বাজছে আর মাখছে ধু ধু রোদ, শীত কুয়াশা, উথাল-পাথাল বর্ষা, পাগল করা বাতাসিয়া বসন্ত । মাখতে মাখতে বাজাতে বাজাতেও সে দিব্যি নতুন রয়ে গেল – পুরনো কিন্তু নতুন । তার ঘন্টার গমকে দুপাশের গাছেরা ভেতরে ভেতরে এখনও দুলে ওঠে ।
এই গাছ, ঘন্টা ঝরাপাতার দল অবশ্য জানে একদিন পরেই তাদের ওপর এসে পড়বে গোটা কলকাতা । শুরু হবে মুদ্রারাক্ষসের দাপট। লোক আর লোক । এত লোক । তাদের ঘিরে শুরু হবে ব্যবসা আর আমোদের কারবার । রঙের পসরা নিয়ে ছোট ছোট দোকান বসে পড়েছে । রতনপল্লীর মাঠে এসে জুটেছে অনেক অনেক অনেক টোটো । যে পথ এক দুই বা তিন চার জনের পায়ে চলার সেই পথে গাড়ি চলবে । কলকাতা শান্তিনিকেতন হওয়ার চেষ্টা করবে ।
রবি ঠাকুরের এই প্রতিষ্ঠান ঘিরে যে পরিযায়ী মানুষদের আনাগোনা , আমোদে আর মুদ্রার চলাচলে যে পর্যটন শিল্প তাকে এক ফুঁয়ে নিভিয়ে দেওয়া যাবে না । যুক্তি তো নানাপক্ষীয় । এখানে তো আর কোনও শিল্প তেমন করে গড়ে ওঠেনি । দুর্গাপুর, আসানসোল, বর্ধমান যে অর্থনীতির অনুকূল জল-বাতাস পেয়েছে তা বীরভূমে কোথায় ? তাহলে তো প্যাকেজ ও পর্যটনের এই সমবায় শিল্প গড়ে উঠবেই । তার ওপর বাঙালির মধুপুর, গিরিডি গিয়েছে – হাতের কাছে আছে এন আর আই ও বিত্তবানদের জন্য শান্তিনিকেতন । এই তো নবারুণের গল্প নিয়ে তৈরি ‘কাঙাল মালসাট’ ছবিতেও শান্তিনিকেতন ছায়া ফেলে গেল । সেখানে ভদি যুদ্ধু-টুদ্ধুর পর শান্তিনিকেতনে পর্যটন করে গেলেন !
তবু এই ঝরাপাতা আর গাছেদের ওপর পড়ে থাকা চাঁদের নরম আলোয় দোলের দুদিন আগে মনে হয় এভাবে একদিন দলে-দঙ্গলে না এসে, মাঝে মাঝে আসুন – সারা বছরই । গাড়ির ধুলো না উড়িয়ে পায়ে পায়ে গাছেদের কাছে গিয়ে বসুন । চুপ করে দেখুন । বেশি কথা নাই বা বললেন । বেশি কোলাহল নাই বা করলেন ।
আমি শান্তিনিকেতনের কেউ নই , নিতান্তই চাকরি করতে এসে শুধু শেখার চেষ্টা করছি কীভাবে প্রকৃতিকে বিরক্ত না করে সহবাস করা যায় ।
বুদ্ধদেব বসুর ‘সব পেয়েছির দেশ’ এই শান্তিনিকেতন । কবির আতিথ্যে কয়েকটা দিন কাটিয়ে বুদ্ধদেব বুঝেছিলেন কবির জীবন চর্যার মূল কথা হল, কীভাবে সামান্যকে নান্দনিক করে তোলা যায় তার সাধন । একটা সামান্য প্যাকিং বাক্স তাই উলটো করে রেখে একটু হাতের সাজ-গোজে হয়ে উঠল চমৎকার বসার জায়গা । প্রকৃতিকে দেখতে গেলে ভোগ করতে গেলে এই সামান্যকে অসামান্য করে তোলার মন চাই, চোখ চাই । কলকাতা থেকে গাড়ি ধুলো উড়িয়ে এলে সেই চোখ আর মনটুকু যে আদায় করা যাবে না । আর এখানে যাঁরা থাকেন তাঁরাও যদি সামান্যের সহজ অসামান্যটুকু ভুলে যান তাহলে চলবে কেমন করে? ঘন্টাতলার ওই চির পুরাতন , চির নতুন ঘন্টাখানি আপনাদের বকুনি দেবে ।

আপনার মতামত জানান