উৎসবের নাম ‘বসন্ত’

সরোজ দরবার

 




দিগন্তে মোর বেদনখানি লাগল...
আচ্ছা বসন্তদিনে মাংস কিনে বাড়ি ফেরার মধ্যে হাসাহাসি করার কী এমন ব্যাপার আছে? একশো জনে নিরানব্বই জনই তো অন্তত তাই করেন। টানা দুমাস কেউ মাংস কিনে বাড়ি ফেরেননি তা আবার হয় নাকি? অথচ এই গানখানা শুনলে নিরানব্বই জনেরই গোঁফের উপর একখানা বেয়াড়ারকমেরহাসি ঝুলে পড়ে। ভাবখানা এই, যেন মাংস নয়, কালো পলিথিনে মুড়ে শ’পাঁচেক পলাশফুল কিনে বাড়ি ফেরা উচিৎ ছিল। আসলে বসন্ত নিয়ে আবির- কুমকুম টাইপস ন্যাকামি একদমই সহ্য করতে পারে না সৌরভ। বসন্তের নামে একধরনের ঘিনঘিনে ঘেণ্ণা আর চিনচিনে যন্ত্রণা জেগে আছে সেই ক্লাস নাইন থেকে। প্রি- টেস্টের আগে বলা নেই কওয়া নেই হঠাৎ পেটের উপর দু’পিস লাল গুটি। তারপর শুধু দ্বারে কেন,বসন্ত জাগ্রত গোটা শরীরে। কোথায় ‘মধু দ্বিরেফঃ কুসুমৈকপাত্রে’...মৌমাছ ি দম্পতির মধুপান দূর অস্ত, প্রাণ যায় যায় যন্ত্রণায়। সেদিন থেকেই, খোদার কসম জান, বসন্তের রোম্যান্টিকতায় আর ভুলছে না সৌরভ। পলাশ, কৃষ্ণচূড়া, নিয়ে এই দেদার ন্যাকাপনা তার একদমই ভাল্লাগে না। আরে উষ্ণায়নের জেরে গোটা প্রকৃতি জুড়েই যখন অনিয়মিত ঋতুর বিজ্ঞাপন, তখন দুটো গাছ লাগানোই জরুরি। বদলে রেড রোডে একগাছি পলাশ ফুটেছে কি না ফুটেছে, অমনি দু’পাতা কাব্যি লিখে ফেলার আদেখলপনায় সৌরভ নেই। বরং এই সব দেখে,সেদিন এক নাটকে দেবশংকর হালদার যেরকম ভেন্ট্রিলোকুইজিমে গান গাইছিলেন, সেরকম করেই তার বলতে ইচ্ছে করে, ‘ন্যাকাপনা, আমার ভাল্লাগে না।’

কিছু পলাশের নেশা...

কিন্তু তাতে কী, বসন্ত নিয়ে যত সো কলড ‘ন্যাকাপনা’ শিখার মজ্জাগত। এমনিতে মেয়েদের মন বোঝে কার সাধ্য, আর শিখার মন বোঝা তো ভগবানের বাবারও অসাধ্য। দিব্যি অফিসে কথা বলছে, হোয়াটস আপ করছে, অথচ আসল কথাটা বলার বেলায়, যেমন বেণী তেমন রবে, চুল ভিজাব না। বোঝো! দুম করে বলে কিনা বসন্ত উৎসব কী জানিস? আরে বাবা কে না জানে? ক’দিন আগে একটা সিনেমাও বেরিয়েছিল এই নামে। গুছিয়ে একপিস উত্তর দেওয়ার আগেই, ফেসবুকে টুং। সৌরভ দিতে পারবে না ধরে নিয়েই উত্তর, এ হল সব দিয়ে নিজে পূর্ণ হওয়ার উৎসব।বলে কিনা, সব দিতে হয় জানিস। নইলে ‘চলে গেলে জাগবি যবে /ধনরতন বোঝা হবে, / বহন করা হবে- যে দায়। /হায় হায় হায়।’ ... হায়! হায়! সৌরভের বুঝতে বাকি থাকে না যে, শিখা তার কথা বুঝেও বুঝবে না। হায় রবিঠাকুর! ‘ফল ফলাবার আশা আমি মনেই রাখি নি রে। /আজ আমি তাই মুকুল ঝরাই দক্ষিণসমীরে।’-এ পংক্তি যে সৌরভের কাছে এমন মর্মান্তিক হয়ে দাঁড়াবে, তুমিও কী আর জানতে!

দেখা পেলেম ফাল্গুনে...
তবু বসন্ত বলেই কিনা কে জানে, একটু যেন উলটহাওয়া বইল একদিন। এমনিতে বসন্তের অনেক গুণের কথা শুনেছে সৌরভ। শিব-পার্বতীর মিল ঘটাতেও নাকি হাত ছিল বসন্ত সখার। প্রেমিক কৃষ্ণের কথা ছেড়েই দিলাম, যুদ্ধের সময়, ঐ প্রবল রাজনৈতিক কৃষ্ণও বলেছেন, বসন্তের মধ্যেই নাকি তিনি থাকেন। এ সব অবিশ্যি উইকিপিডিয়ায় থাকে না, শিখাকে ইম্প্রেস করতে, এক সংস্কৃত জানা বন্ধুর দ্বারস্থ হয়েছিল। তার থেকেই কিছু কিছু মোবাইলের ড্রাফটে সেভ করে রেখেছে। যাকগে, মোদ্দাকথাটা হল বসন্তের গুণে ঘাট নেই। নয়তো শিখার মতো মেয়ে কেন বলে বসবে, তোমার বাড়ি যাব...
আকাশের লাগে ধাঁধা...আর তার লাগবে না। পায়ে ধরে না সেধেও রাধার রা দেওয়ার মতো হঠাৎ এমন করে কেন শিখা আসতে চাইছে? চাঁদকে দোলা দিতে আচমকা নদির এত কীসের গরজ? অনেক ভেবে দেখল, তেমন কিছু কারণ সত্যিই নেই। দখিনহাওয়া দিশেহারা। অর্থাৎ এও ঐ বসন্তের হাতযশ। আর সে খাতিরেই শিখা এল। এল তো ভালো, কিন্তু, ‘এলে আগুনরঙা দিনে/ তোমায় কোথায় বসাই বলো/ছিল অনেক কালের নদি/এখন একফোঁটা নেই জলও।/ তোমার মুঠো উপচে আবির/ডাকছে সর্বনাশী রংইয়ে/আমি উত্তেজিত মৃদু/ভাবি ডাকব তোমায় স্নানে’ ... আর স্নান! শিখাকে দেখে মনে হয়, সে এসেছে বটে, কিন্তু আসলে সে শীতঘুমে আছে। সৌরভকে সে দেখেও দেখতে পায় না। হঠাৎ হঠাৎ দু’একটা কথা...যেমন এই এক্ষুণি বলল, জানিস কী করে ‘ফুলের আগুন’ লাগে? কী করে আবার...পলাশ...কৃষ্ণচূড়া সব লাল টকটকে ফুল...তাই...বলতে বলতে নিজেকে তার কীরকম fool foolটাইপস লাগল...অন্য কিছু আগুনের কথা বলছে কি? এই বসন্তের বুকের ভিতরেও যে আগুন আছে, সে নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। সোরভের ঐ সংস্কৃত পড়া বন্ধু বলেছে, গীতগোবিন্দমেও নাকি বসন্তের এই আগুনের রেফারেন্স আছে। এইভাবে আগুনের সুরাহা প্রায় মেরেই এনেছিল, হঠাৎ শিখার প্রশ্ন ‘ছাদ আছে তোদের বাড়িতে?’...না থাকার কি আছে? দিব্যি ছাদ আছে। সেখানে দখিনহাওয়াও বয়, কিন্তু প্রেয়সীই যেখানে নেই, সেখানে চারিচক্ষুতে চাওয়ার প্রশ্নও নেই, আর ছাদে যাওয়াও নেই। তাই তা তালাবন্ধই পড়ে থাকে। অথচ কী কাণ্ড, আজই সে ছাদের ‘দখিন দুয়ার খোলা’। জেনারেলি তো এরকম হয় না। তবে কি এরই নাম বসন্ত! সে নিজেও পথভোলা। তাই পথ ভুলিয়ে সে ডাক পাঠাতে পারে। মর্জিতে চিরপলাতক, মেজাজে রাজা বলেই কি সে এভাবে সকলকে আপন হতে বাহির করে আনতে পারে। ঘর ছেড়ে বাহির হয়ে ছাদের উপর এসে দাঁড়াল ওরা।

ঘুমের আঁচল আকুল হল...
বসন্তের রঙ খেলা আসলে একটা ছোঁয়াছুঁয়ি খেলা। মানসিক এবং শারীরিক। কিন্তু ছাদে এসে নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকাকে কী বলা যায়? আধ্যাত্মিক! সৌরভের অন্তত তাই মনে হচ্ছে। আর নিরুত্তাপ শিখা গুনগুন করছে, ‘আমি রব , উদাস হব ওগো উদাসী’। কী মুশকিল! তোমার এ উদাসীনতা সত্যি কিনা...কী করে জানবে সৌরভ!আর যদি নাও হয় গোপন কথা নব ফাল্গুনের দিনে কেমন করে জেনে নিতে হয় সৌরভ কি আর তা জানে? কোন পলাশের নেশা কোন চাঁপায় গিয়ে মেশামেশি হয়, তার খবর কে রাখে! যে না রাখে তাকে এভাবেই বোকা বোকা হয়ে চেয়ে থাকতে হয়। হায় রে, “বকুল শাখা পারুল শাখা/ তাকাও কেন আমার দিকে?”...কই শাখা কোথায়? এ তো শিখা? এভাবে তাকায় কেন? ‘ব্যাকুল নয়নে ভাবের খেলা, উতল আঁচল, এলোথেলো চুল... এমন শিখাকে দেখেনি সৌরভ। ‘ মনে করি, আমার তুমি, বুঝি নও আমার।/ বলো বলো পথিক, বলো তুমি কার?’ প্রশ্ন সহজ...আর উত্তরও তো জানা -‘আমি তারি যে আমারে, যেমনি দেখে চিনতে পারে।’তবে এবার ভাঙুক শীতঘুম। ঝরে যাও পুরনো পাতারা। ‘ধীরে ধীরে ধীরে বও ওগো উতল হাওয়া।’ ওই তো শিখা বলছে, ‘আমার কিছু কথা আছে /ভোরের বেলায় তারার কাছে,/সেই কথাটি তোমার কানে /চুপি চুপি লও।’

আমায় চেনো কি
আসলে একরোখা ছেলেটার উপর একটু মায়াই ছিল বসন্তের। ‘মায়ের দয়া’ আর তার মায়ায় যে তফাৎ আছে, সেটাই দেখানোর ছিল ছেলেটাকে। বোকা কবিদের অভিসার সে অনেক দেখেছে, কিন্তু নাস্তিকের ভক্তি যে চিরকালই স্পেশাল। বাকিরা তো যাস্ট পাগল। বসন্তের মধ্যেও ফুল ফোটানোর খ্যাপামি আছে, কিন্তু তা কাগজের ফিচার আর টিভির স্পেশালের কাছে নেহাতই ইনটার্ণ। বসন্ত যে কোথায় তা নাকি সক্কলে জানে? কেউ বলে শান্তিনিকেতনে, তো কেউ বলে ভেষজ আবিরের দোকানে। পূর্ণ থেকে রিক্ত, রিক্ত থেকে পূর্ণ...বাঁধন পরা আর খোলার খেলা...কেউ তা ঠাহরই করল না, বাজার মাতাল শুধু বাঁদুরে রং । সুতরাং নিজেকে প্রমাণ করতে বসন্তের একটা পালটা চালের দরকার ছিল। এই নাস্তিক ভক্তটি এবারে সে সুযোগ করে দিল। ওকে দিয়েই এবারের উৎসবটা আপন মর্জিতে সেলিব্রেট করে নিল মধুমাস।
হ্যাঁ কিস্তিমাতের এই শেষদানটিই জানল, আর কিছু নয়, শুধু এবার ‘বসন্তে সৌরভের শিখা জাগল’।

আপনার মতামত জানান