গোরু বিষয়ক নয়, মাংস বিষয়ক রচনা

বিশ্বজিৎ রায়

 



মাংস খেতে আমি খুবই ভালোবাসি । মাংস রান্না করতেও ।
আমাদের বাড়িতে প্রতি রবিবার পাঁঠার মাংস হত । আমরা তখন পুরুলিয়ায় থাকতাম । খুব বেশি মাংস কেনার সামর্থ আমার বাবার ছিল না – আড়াই শো পাঁঠার মাংস উমার দোকান থেকে কিনে আনত বাবা । সেই আড়াইশো মাংস মায়ের হাতের লাবণ্যে এমন সুস্বাদু হয়ে উঠত যে বলার নয় । আমাদের কম পড়বে বলে মা মাংস খেত না , খুব করে বললে ভেঙে নিত এক কুঁচি । রাতে আর মাংস থাকত না, আলু ঝোল দিয়েই পেট পুরে ভাত খেতাম । মাংসের আলু আমার শৈশবের স্বপ্নে যে কতবার এসেছে – গলা গলা সোনালি ঝোল মাখা মাংসের আলু । অমিতাভ দাশগুপ্তর ‘আজ মাংস’ নামে একটি অনবদ্য কবিতা আছে । পড়িয়েছিল সুব্রত সার, সুব্রতদা তখন নরেন্দ্রপুরে স্কুলে পড়াত । আমি তখন নরেন্দ্রপুর কলেজে ইলেভেনে পড়ি । বাঙালি মধ্যবিত্ত বাড়ির রবিবারের মাংস রান্না আর খাওয়া নিয়ে অমিতাভ দাশগুপ্তের সেই কবিতাটির স্বাদ এখনও মনে লেগে আছে , পরে আর খুঁজে পাইনি সে কবিতা ।
পাঁঠার দাম লাফিয়ে লাফিয়ে ওপরে উঠছে বলে পুরুলিয়াতেই আমাদের বাড়িতে মুরগী ঢুকে পড়ে । শান্তি মেসো পুলিশে চাকরি করত । সপ্তাহে একবার বা পনেরো দিনে একবার আমাদের পুরুলিয়ার বাড়িতে শনিবার রাতে আসত । পুলিশ লাইনে থাকা-খাওয়ার খুবই অসুবিধে বলে শান্তি মেসো একবার করে আমাদের বাড়ি ঘুরে যেত । শান্তি মেসো দিশি মুরগী কিনে আনত, আমাদের পুরুলিয়ার ভাড়া বাড়ির পিছনের উঠোনে আমাদের চোখের বাইরে সেটিকে নিকেশ করত । মা তাও পাঁঠার মাংস খেত, মুরগী একেবারেই না। তবে আদা-রসুন-পেঁয়াজ বেটে খুবই যত্ন করে তোলা উনুনে রান্না করত । পুরুলিয়ায় তখনও গ্যাসের লাইন আসেনি । সে সময় খুবই সাম্প্রদায়িক একটি ছড়া শুনেছিলাম, বড়োদের মধ্যে তা চালু ছিল – ‘তোমার যেমন ভালোবাসা, মুসলমানের মুরগী পোষা’। এই ছড়ার বাইরের অর্থ একরকম করে বুঝেছিলাম, ভেতরের অর্থ ছোটোবেলায় বুঝিনি । ক্রমশই মুরগী অসাম্প্রদায়িক মাংসের ধারক হিসেবে বিবেচিত হতে শুরু করল । গণতান্ত্রিক ‘পোলট্রি শিল্প’ বেকার বাঙালি যুবকদের খড়কুটো হয়ে উঠল । ১৯৮৫ সালে তাপস পাল-দেবশ্রী রায়ের ছবি ‘ভালোবাসা ভালোবাসা’ -- তাপস পাল তাতে পোলট্রি যুবা । ক্রমে পাড়ায় পাড়ায় এল মুরগী বিক্রির খাঁচা -- সেই টিনের বড়ো খাঁচার ভেতরে মুরগী থাকত, ওপরে বঁটি, ধুপ, ক্যাশ বাক্স আর দাড়ি-পাল্লা । ওপরে মুরগী কাটা হত ভেতরে তলায় বাকিরা ঝিমোত । পাড়ার পরিচিত বেকারেরা অনভ্যস্ত হাতে মুরগী কাটতে কাটতে ক্রমশই অভ্যস্ত হয়ে উঠল ।
বাবা পুরুলিয়া থেকে কলকাতার অফিসে বদলি হয়ে চলে এল বলে আমরা শেওড়াফুলি- বৈদ্যবাটীতে বাড়ি ভাড়া নিলাম । আমাদের বৈদ্যবাটীর বাড়ির পাশে একজন শেওড়াফুলির বাজারে মুরগীর মাংসের দোকান দিলেন । সেই মাংসদাদার বাবা, বউ মারা যাবার পর নিকটবর্তী গণিকালয়ে যেতেন । সেখানে যাঁর সঙ্গ করতেন তাঁকে পরে বাড়িতে নিয়ে আসেন । সেই রমণী ছোটো ছোটো ছেলে মেয়েগুলোকে সন্তান স্নেহে যত্ন করতেন – ছেলে মেয়েরাও তাঁকে ক্রমে মা ডাকতে শুরু করে । তাদের বাবা মারা যায় । নতুন মা তাঁর জমানো টাকা দিয়ে বড়ো ছেলেটির জন্য বাজারে একটি মুরগীর মাংসের দোকান করে দেন । ছেলেটি পড়াশোনা ছেড়ে বাধ্য হয়ে দোকান চালাত – সেই টাকায় ভাই-বোনের পড়ার খরচ, সংসার চলত । আমার মহাভারতের ধর্মব্যাধের কথা মনে পড়ত । ধর্মব্যাধ মাংস বিক্রি করে সংসার ধর্ম নির্বাহ করতেন, অন্য সময় দর্শন চর্চা করতেন । কলিযুগের বড়ো ছেলেটি দর্শন চর্চা করত না তবে এই নতুন জীবনদর্শনে মানিয়ে নিয়েছিল । আমার বাবা যখন অসুস্থ তখন আমার মাকে বাড়ি বয়ে নরম মাংস বেছে বেছে দিয়ে যেতেন এই সুপবিত্র ‘ধর্মব্যাধ’ । বলতেন, ‘জামাইবাবুকে পাতলা করে স্টু করে দাও । গায়ে বল পাবে।’ আমরা তখন কর্মসূত্রে বাইরে – নিত্যদিন বাবা-মায়ের সঙ্গে থাকি না ।
মাংস যে এক বিশেষ ‘সংস্কৃতি’ তা টের পেলাম একটু বড়ো হয়ে । আমি তখন খিদিরপুর কলেজে চাকরি করি । কলেজ ফের্তা এক মুসলমান চাচার পাঁঠার দোকানের সামনে দাঁড়াতাম । তিনি জল ছাড়া মাংস কেটে খুবই যত্ন করে খবরের কাগজ দিয়ে প্যাক করে দিতেন । আমিও নানারকম গল্প গাছার পর সেই কাগজ ঢাকা মাংস বইয়ের ব্যাগে ঢুকিয়ে বাড়ি ফিরতাম । কীভাবে মাংস কাটলে স্বাদ অটুট থাকে চাচার কাছে শিখেছিলাম । তাঁর হাতের অস্ত্রগুলো যে কী নরম মোলায়েম ভাবে মাংসের ওপর চলাচল করত – যেন তার যন্ত্রের ওপর সুর তোলার কাঠি বুলোচ্ছেন । খিদিরপুরের এ গলি ও গলি থেকে এক এক রকম মাংসের গন্ধ আসত – পাঁচুর দোকানটি ছিল গাছতলায়, সেখানে পাঁঠার মাংসের চমৎকার স্টু পাওয়া যেত ।
গো-মাংস প্রথম খাওয়ার সুযোগ আসে নরেন্দ্রপুরে পড়ার সময় । স্টেডিয়াম গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে বিকেল বেলায় নরেন্দ্রপুরের ইলেভেন-টুয়েলভ ডিগ্রি কোর্স সস্তায় গোরুর মাংস খেত । কম পয়সায় পেট পূর্তি । তবে গোরুর মাংস রান্নার যে নানারকম ঘরানা তা জানতে পারলাম আরও পরে । সাধে রামকৃষ্ণদেব বলেছিলেন, ‘যাবৎ বাঁচি তাবৎ শিখি’ । ছোটোবেলায় আমাদের পুরুলিয়া রামকৃষ্ণ মিশনে পরমহংসের জীবনী পড়াতেন যিনি তিনি আমাদের বলেছিলেন রামকৃষ্ণের ইসলাম মতে সাধনার কথা । ইসলাম মতে সাধনার সময় ঠাকুর রামকৃষ্ণ গো-মাংস গ্রহণ করেছিলেন । এমনিতে রামকৃষ্ণ মিশন খাওয়া-দাওয়ার বিষয়ে উদার । বিবেকানন্দের ‘প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য’ বইটি পড়লে বোঝা যায় বিবেকানন্দ খুবই খাদ্য রসিক । খাদ্য-পানীয়ের বিষয়ে বিদেশে খুব আচার-বিচার মানতেন না । এমনিতে তো ছোটোবেলায় নরেন্দ্রনাথ নানা জাতের আলাদা হুঁকোয় মুখ দিয়ে দিয়ে দেখেছিলেন জাত কীভাবে যায় ! বিদেশে বিবেকানন্দ আহারে সংকীর্ণতা দেখাবেন কেন ! শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী জিজ্ঞাসা করেছিলেন , মাংস খাওয়া উচিত কি না ? স্বামীজী বললেন, ‘খুব খাবি বাবা ! তাতে যা পাপ হবে তা আমার। ’ শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীকে বিবেকানন্দ বাঙাল বলতেন । ও-বঙ্গের মানুষ কি না । বাংলাদেশে গিয়ে পলাশীর মোড়ে চমৎকার হালিম খেয়েছিলাম , পুরানা ঢাকায় জমিয়ে খাওয়া হয়েছিল মোরগ পোলাও । বাংলাদেশে গো-মাংসের রান্নার সঙ্গে দক্ষিণ ভারতে কেরালার গো-মাংসের রান্নার মিল নেই, ঘরানা একেবারেই আলাদা । বন্ধু জিমি জর্জ সার্ভিস দিতে মুনার চলল । আমিও জিমির কলেজে চাট্টি রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বলার পর ওর সঙ্গ নিলাম । মুনারের আগে ছোট্ট একটা গ্রাম । সেখানে জিমি প্রয়াতের আত্মার শান্তি কামনায় প্রার্থনা করলে । তারপর এক নবদম্পতি হাজির । আমাকে আর জিমিকে খেতে দিলে । জিমি জিগ্যেস করলে, মাংস নিয়ে আমার বাছ বিচার আছে কি না ? নেই শুনে খুব খুশি । দুপুরে পাতে পড়ল নারকোলের দুধ দিয়ে রান্না করা স্নিগ্ধ গো-মাংস । খেয়ে মনে হল আহা এবার মুনারের গাছ তলায় ঘুম যাই ।
পর্ক দিয়ে চমৎকার স্পেশাল চাউমিন বানাতেন কলকাতার কিম লিং-এর দাদু । আমি আর শুভশ্রী নিয়মিত খদ্দের ছিলাম কিম লিং-এর । বিয়ের পর খিদিরপুর কলেজ ফেরতা কিম লিং-এর স্পেশাল চাউমিন নিয়ে বাড়ি ফিরতাম । তবে চমৎকার পর্ক খাইয়েছিল অমৃতা, অমৃতা ভট্টাচার্য । পশ্চিমবঙ্গের সরকারি হরিণঘাটার আউটলেট থেকে কেনা পর্কের জবাব নেই,জবাব নেই অমৃতার রান্না করা পর্কের ।
এই সব মাংসের স্মৃতি যে হঠাৎ মাথায় এল তা অকারণ নয় । মাংস খাওয়াখায়ি নিয়ে বিধি নিষেধের নানা ওঠা পড়া এখন । ফের বিবেকানন্দ মনে পড়ল । গোমাতা রক্ষাকারী সমিতি তৈরি হয়েছিল । তাঁরা বিবেকানন্দের কাছে সমর্থন লাভের আশায় এসেছিলেন । স্বামীজী শুনে-টুনে নাকি বলেছিলেন মানবমাতাদের রক্ষা করার নাম নেই, গো-মাতাদের নিয়ে মাথা ব্যথা । যাই হোক । একথা বিবেকানন্দ কোথায় বলেছিলেন এই মুহূর্তে মনে পড়ছে না । শঙ্করীপ্রসাদ বসু-র ‘সহাস্য বিবেকানন্দ’ বইতে আছে এ-ঘটনা । মোদ্দা কথা হল মাংস খাওয়া না-খাওয়া সাংস্কৃতিক কাণ্ড । তার সঙ্গে ধর্মের যোগাযোগ ঘটিয়ে সবার জন্য এক বিধি চাপানোর মানে হয় না । যার ইচ্ছে খাবে , যার ইচ্ছে খাবে না । ইচ্ছাই হল মোদ্দা কথা । তুমি বাপু নিদান দেওয়ার কে ! ছোটোবেলা থেকে রবিবারের মাংস খেয়ে বড়ো হয়েছি । ডাক্তারি নিষেধাজ্ঞা জারি হলে না-খাওয়ার কথা ভাবা যাবে । তার আগে নৈব নৈব চ । আপাতত নানা স্বাস্থ্যপ্রদ কায়দায় নানারকম মাংস খাওয়া চালিয়ে যাওয়া স্থির করেছি । আপরুচি খানা । কেউ কিছু বলতে এলেই বিবেকানন্দকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করব ।

আপনার মতামত জানান