বাসের জানলা, আন্তর্জাতিক নারী দিবস এবং অন্যান্য

অনির্বাণ ভট্টাচার্য

 



১) হ্যাঁ, টিভি কভারেজ নয়, ফেম ম্যাগ নয়, পাতা ওলটানো নিরালা চুল খোলা দুপুরও নয়, সরাসরি বাসের জানলা থেকে নারী দিবসকে দেখছি । চৌমাথার মোড়ে একটা থ্যাঁতলানো কুকুর – ওর অহঙ্কারী নাড়িভুঁড়ি, পেটে এদ্দিন ধরে বড় হতে থাকা বাচ্চাকাচ্চার টুকরো – পেরিয়ে, বছর ৩০ এর যে শাঁখাসিঁদুর ছোট্ট ছেলেটাকে ইস্কুল থেকে নিয়ে আসছে তার জন্মদিন ৮ মার্চ না । তাকে পুরনো প্রেমিকের চিঠি লুকোতে হয় না – তবে মাস পেরলে মাসমাইনের হিসেব রাখতে হয় । আনমনা দুবলা স্বামীটার খপ্পরে প’ড়ে । সুলেখাদের বাড়ি থেকে তার বাড়ি অনেকটা দূর । সে নষ্ট মেয়ে হয়নি । তবে কুঞ্জে অলি গুঞ্জে উঠলে সে কলঘরে গিয়ে একফাঁকে বমি করে আসে । বরকে বলে শরীর খারাপ । আজ থাক ।
২) ‘একটু অ্যাডজাস্ট করতে হয়’ – ভিড় থেকে কে যেন ‘থ্রেট’ ছুঁড়ে দিল আব্রু সামলাতে না পারা তরুনী অফিসযাত্রীর দিকে । আমি ঘাড় ঘোরালাম । এতক্ষন ধরে চোখ দিয়ে, কনুই দিয়ে এবং অন্যান্য জরুরি প্রত্যঙ্গ দিয়ে মেয়েটিকে অ্যাডজাস্ট করানো শেখাচ্ছিলেন দাদা – বাবা – কাকা’রা । যমের দুয়ারে কাঁটা পড়লে এসব দাদা ভাইরা একদিন দীর্ঘজীবী হবে – তুই দেখবি বোন । আমি উঠে জায়গা দেব । আর মেয়ে ব’লে গলে যাচ্ছে ধরনের চোখ তুলে আমাকে দেখবে সহযাত্রীরা । দেখুক । আমার সময় হয়ে গেছে, এবার নামব ।
৩) বাসটা থেমে আছে । সকালের ব্যস্ততম ট্রেনটা প্ল্যাটফর্মে এল হয়ত । কাজের দিদি আসেনি বলে আজ আমায় বাইরে থেকে খেতে হয় । টু বি এইচ কে’র মাটি খুব পরিষ্কার । ওরা ওখানেই বসে । চা খায় । ক্যানিং থেকে বাবুদের ফ্ল্যাট অনেকটা উঁচু – ওখানে পৌঁছতে পারেনা কমলার মা’রা । তাই প্রায়ই কামাই করে । আর আমি আবার বাইরে থেকে খেতে হবে বলে পার্সের নড়বড়ে ভিতে একটার পর একটা বাড়ি বসাই – হিসেবনিকেশের ।
৪) কন্ডাক্টরের মনে থাকেনা । খানিকটা দেরি হয়ে যায় বৃদ্ধাকে নামাতে । ওল্ডেজ হোমের ক্লিশে হয়ে যাওয়া পায়েস রেখে রেখে পুরনো হয়ে গেছে ফ্রিজ । বিকেল বয়স্ক হ’লে সন্ধ্যা আসে । যেখানে রাস্তা পার ক’রে দেবার জন্য কোনও কোনও ফারিস্তা এসে যায় ওই বুড়ী মা’র জন্য । মুছে দেয় চশমা । ছানি কাটা চোখটা জ্বালায় খুব । জল পড়ে । সগগে যাওয়া মানুষটার মতো লাগে ছেলেটার মুখ । বেঁচে থাক বাবা । বেঁচে থাক ।
৫) সামনে পেছনে ৮ মার্চ থাকলে রানিং-এ নামতে হয় না আমাদের । এবারেও তাই হল । ঘাড় ঘুরে দেখলাম একপাল প্রজাপতির মতো বাসে উঠল বিনুনি-স্কার্ট-বইখাতা । এশহরে মাঝেমাঝে মফঃস্বল হামলা করে । বেশ লাগে । ওরা বড় হবে । দেখবে একদিন আর ছেলে বন্ধুগুলোকে আর নিজের মনে হবে না । মা ফিসফিস ক’রে কথা বলবে । আকাশ থেকে পরী নেমে এসে বলবে, একপাটি জুতো হারিয়ে ফেলো । নাহলে রাজকুমার আসবে না । কালো হ’লে বিজ্ঞাপনে নেবে না । তোমাকে একটা সরু, এঁদো গলির মতো শর্তাধীন আকাশে উড়তে বলবে এশহরের অরনিথোলাভার-রা । তোমরা উঠবে । আমি নামব । বাস ছেড়ে দেবে । শুধু চোখে লেগে থেকবে জানলা থেকে আমার দিকে টাটা করা ‘বাইরে হাত বার করো না মামনি’ শাসন না মানা একটা ছোট্ট মুখ । নারী দিবস বিজ্ঞাপনের । ও আমার ।

আপনার মতামত জানান