সখী, সমর্থক কাহারে বলে ?

সুশোভন

 


ধোনির বাড়ির সামনে কড়া পাহারা

“চলছে না ! চলবে না ! ” বলার থেকে ‘চালানোটা’ একটু কঠিন। “মানছি না ! মানবো না !” থেকে মানিয়ে নেওয়াটা একটু কঠিন। “হচ্ছে না ! হবে না !” থেকে ‘হতে’ দেওয়াটা একটু কঠিন। “ভেঙ্গে দাও ! গুঁড়িয়ে দাও!” বলার থেকে গড়ে তোলাটা একটু কঠিন। ব্যক্তি আক্রমণ করার থেকে ব্যাট হাতে সেঞ্চুরি করাটা একটু কঠিন। বলির পাঁঠা খোঁজরা থেকে বল হাতে উইকেট ভেঙ্গে দেওয়াটা একটু কঠিন। সোশ্যাল নেটওয়ার্ক একটা জোকস শেয়ার করার থেকে স্লিপে দাঁড়িয়ে ক্যাচ নেওয়াটা একটু কঠিন ।
ক্রিকেট বিশ্বকাপ ঘিরে কদিন ধরেই প্রতিবেশী দুটি দেশের মানুষের ভাবাবেগ ও বিদ্বেষের আশ্চর্য সমাপতন দেখতে দেখতে আঙ্গুল চুষছিলাম প্রায় নিঃশব্দেই । বিশ্বায়নের ভরা যৌবনে একদল মুনাফাখোর শ্রেণীর অঙ্গুলিহেলনে, ক্রিকেট ব্যাকরণ কে সম্পূর্ণ বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে, আলোচনার ভরকেন্দ্র বদলে যাবার গতিবেগে ক্রমশ দিশাহারা লাগছিলো নিজেকে। এ, ওঁকে খোলা চিঠি লিখছে, ও সেটাকে খামে ভরে দিচ্ছে, ঠিকানা লিখে দিচ্ছে, সে আবার পিওনের মত চিঠি পৌঁছে দিয়ে আসছে, উনি আবার চিঠি পড়ে, ফেসবুকে স্ট্যাটাস টাঙ্গিয়ে দিচ্ছেন। অনবদ্য চিত্রনাট্য। দুরন্ত অভিনয়। টানটান উত্তেজনা। নিখাদ ক্লাইম্যাক্সটা আর হল কই... সেমিফাইনালে তো হেরেই গেলো।
ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগ ইতিহাসের অন্যতম সফল ম্যানেজার স্যার আলেক্স ফারগুসান ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের কঠিন সময়ে সমর্থক দের উদ্দেশ্যে একবার বলেছিলেন “ আপানরা যদি ক্লাবের খারাপ সময়ে সমর্থন করতে নান পারেন তাহলে দয়া করে ভালো সময়েও করবেন না।” তাই... Seat back ! Relax ! Take your time and ask yourself , সখী... সমর্থক কাহারে বলে ?
প্রতিক্রিয়াশীল শক্তি থেকে বিচ্ছিন্নতাবাদী ভক্তি, সাধারণ ছা পোষ থেকে ধার্মিক পাপোষ, ‘হেই মারো মারো টান হেইও’ বলে আধুনিক ক্রিকেট বিপ্লবীদের শ্লোগানে সকালবেলা কোষ্ঠকাঠিন্য হবার জোগাড়। ম্যাচ শেষে আবার শুরু হল “আমাদের চক্রান্ত করে হারিয়ে দিল ! চোরের দল!” ... উফ কি ডায়লগ ! আসলে “আবেগ আর আমাশার বেগ একবার আইলে সামলানো যায় না। ” আবেগ আমাশার বেগ কিভাবে একটা গোটা দেশকে খেয়ে ফেলতে পারে তার মোক্ষম উদাহরণ বোধ হয় বাংলাদেশ। আসুন ক্রিকেটীয় ব্যাখ্যা দিয়ে আপনাদের আমাশার উপশম করি। বাংলাদেশ ক্রিকেট টিমের বিশ্বকাপের সাফল্য শতকরা ১০০% “ফ্লুক” । একদম অবাক হবার ভাব করবেন না তো ! এটাই বাস্তব। বিশ্বকাপের আগেও বাংলাদেশ ক্রিকেট টিম এমন কিছুই আহামরি ক্রিকেট খেলছিল না । বিশ্বকাপের প্র্যাকটিস ম্যাচেও ডাহা ফেল ! আরে মশাই নিজেদের টেস্ট স্ট্যাটাস পাবার ১৫ বছর পর ভারত কে দেশের মাটিতেই দুবার হারিয়ে ,গ্রুপ লিগে ৫ ম্যাচে ৫ টিতেই জিতে, কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ড কে নাস্তানাবুদ করে, লাহোরে অস্ট্রেলিয়া কে ঐ বিশ্বকাপেই দ্বিতীয়বারের জন্য ল্যাজে-গোবরে করে ৯৬’র উইলস ওয়ার্ল্ড কাপ নিয়ে কলম্বো তে অবতরণ করেছিলেন অর্জুন রনতুঙ্গার সিংহবাহিনী। দীর্ঘদিন নির্বাসন কাটিয়ে, ৯২-এ কেপলার ওয়েসেলসের দক্ষিণ আফ্রিকা সেমিফাইনালে পৌঁছে চমকে দিয়ে ছিলেন ক্রিকেট বিশ্বকে। আর আপনারা, ২০০০-এ টেস্ট স্ট্যাটাস পেয়েও টানা ২১ টি টেস্ট,টানা ১৬ টি টেস্ট সিরিজে, টানা ২৩ টি ODI -এ, অ্যাসোসিয়েট টিমের বিরুদ্ধে ODIতে মোট ১১বার পরাজিত হবার পরও যদি আম্পায়ার দের দোষারোপ করেন, কথায় কথায় আই সি সি-র চক্রান্ত খুঁজে চোখ বন্ধ করে ট্রাফিক লাইট কে ডিস্কো লাইট ভেবে বসেন তাহলে তো বলতেই হয় নাচতে না জানলে উঠোন বাঁকা ! ইংল্যান্ড ম্যাচে ক্রিস জর্ডনের রান আউটে আপানদের আম্পায়ারিং ত্রুটি চোখে পড়েনি, ইমরুল কায়েসের ক্যাচের সময় মনে পড়েনি ? অন্যের বেলা আঁটিশুটি, নিজের বেলা দাঁতকপাটি ? বিশ্বাস করুন বা নাই করুন বাস্তব এটাই যে আপনাদের মত যুক্তিহীন আবেগ সমর্থক দের জন্যই আই সি সি আপানদের টেস্ট স্ট্যাটাস কে শালগ্রাম শিলার মত এখনও আগলে রেখেছেন ! যে দেশের মানুষ অভিজিৎ রায়ের মৃত্যুর বিচার চেয়ে দেশ অচল করতে পারে না, তাঁরা যদি আম্পায়ার দের কুশপুতুল পোড়ান তাহলে সেই আগুন দাবানল হয়ে যে নিজের দেশই জ্বলে পুড়ে মরবে এতে আর অবাক হবার কি আছে। ক্রিকেটের অজুহাতে আমাদের কাঁটাতারবিহীন, ভিসা-পাসপোর্টবিহীন স্বপ্নটা, বার্লিনওয়ালের মত থেঁতলে দেবেন না ! দয়া করুন ! এবার লাগাম টানুন !

যাগ গে যাক ... ঘরের খেয়ে বোনের মোষ তাড়া করতে তো বুকের পাটা লাগে... তাই ঘরেই ফিরি এবার।
১১ ডিসেম্বর ২০১৪। অ্যাডিলেড। প্রথম টেস্টের তৃতীয় দিন। অস্ট্রেলিয়া ৫১৭ রানে প্রথম ইনিংস ডিক্লেয়ার করেছে। দিল্লীর ঠাণ্ডায় লেপ মুড়ি দিয়ে ঘুম ঘুম চোখে সেট-টপ-বক্সটা অন করলাম। ঘড়িতে তখন ভোর ৫ঃ১০। একটু পরেই শিখর ধাওয়ানের ব্যাটের ইনসাইড এজে লেগে উইকেট ভেঙ্গে দিলেন রায়ান হ্যারিস। লাঞ্চের কিছু আগে ফিরে গেলেন বিজয়। সামনে ঝুলছে ফলো-অনের খাড়া। ক্রিজে তখন, বিরাট কোহলি। ফিল হিউজের কফিনের স্মৃতি তখনও রগরগে। বল হাতে আগের বছর অস্ট্রেলিয়ান সামারে ইংলিশ টিম কে গুড়ো করে দেওয়া মিচেল জনসন। সেই মিচেল যিনি অ্যাসেজের মাঝ পথেই সাদা চামড়ার অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান জোনাথন ট্রট কে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করে বাড়ি ফিরে যেতে বাধ্য করেছিলেন।ইংরেজ দের অন্যতম সেরা স্পিনার গ্রেম সওয়ানের অবসরের নেপথ্যে থাকা মিচেল । কুক আর পিটারসেনের ঠাণ্ডা যুদ্ধের খলনায়ক মিচেল। প্রসঙ্গত তৎকালীন আই সি সি র্যারঙ্কিং -এ সেরা টেস্ট টিম ইংল্যান্ড কে ৫-০ ব্যবধানে অ্যাসেজ হারিয়ে ছিল অস্ট্রেলিয়া। প্রথম বলই বাউন্সার, আছড়ে পড়ল ভারতের ক্যাপ্টেন বিরাট কোহলির হেলমেটে। হেলমেট খুলে বিরাট যখন মাথা ঝাঁকালেন, ক্রিকেটপ্রেমী ভারতের তখনও শীতঘুম কাটেনি। গোটা অস্ট্রেলিয়ান টিম ভয় পেয়ে দৌড়ে এসেছিল পিচে। উদ্বিগ্ন হয়ে দৌড়ে এসেছিলো ফিজিওথেরাপিস্ট। ভয় পায়নি শুধু বিরাট। বিন্দুমাত্র উদ্বিগ্ন হয়নি। বুক চিতিয়ে সেঞ্চুরি করেছিলো ঐ ইনিংসে । পরের ইনিংসেও। গোটা টেস্ট সিরিজ শাসন করেছিলো অস্ট্রেলিয়ান বোলিং কে । আর সেমিফাইনালে ডান কাঁধের সামনের বল কে পুল করতে গিয়ে আউট হয়ে সে ভিলেন হয়ে গেলো ? ২০০৩ সেঞ্চুরিয়ানেও শচীনও ঐ একই পুল করতে গিয়ে ধরা পড়েছিলেন ম্যাকগ্রাথের হাতে । ২৮ বছর পর এই যে ভারত যখন লর্ডসের মাটিতে প্রথম টেস্টে জিতল তারও নেপথ্যে ছিল ইংলিশ ব্যাটসম্যান দের ঔদ্ধত্যপূর্ণ পুল শটের অত্যধিক ব্যবহার। ব্রায়ান লারা, গারফিল্ড সোবার্সের ৩৬৫ টপকে গিয়েছিলেন পুল করেই। বিরাট কোহলি পারেননি। তো ? কি হোল ? পূর্বদিকে সূর্য ওঠা বন্ধ হয়ে গেলো ? খেলোয়াড়েরে জীবনে উত্থান পতন থাকবে না ? ভুল হবে না ? আপনি করেন না ভুল ? আপনার জীবনে নেই উত্থান পতন ? যা চেয়েছিলেন তার সবই করতে পেরেছেন তো ?
বার্সেলোনার ডিফেন্ডার, জেরাদ পিকে, তাঁর বান্ধবী বিখ্যাত পপ সিংগার, শাকিরা। তিনি নিয়ম করে মাঠে উপস্থিত থাকেন। বার্সেলোনা কে সমর্থন করেন। কোনদিন পিকে ভালো খেলেন, কোন দিন পারেননা। কই শাকিরা কে তার জন্য দায়ী করার স্প্যানিশ আদিখ্যেতা তো দেখিনা। দীনেশ কার্তিকের প্রেমিকা ভারতের সেরা ওমেন স্কোয়াশ প্লেয়ার দীপিকা পাল্লিকাল। তাঁর সাম্প্রতিক খারাপ পারফরম্যান্সের জন্য আপনি দীনেশ কে দায়ী করেছেন তো ? না, নির্ভয়া কাণ্ডে লজ্জায় মুখঢাকা, মধ্যমগ্রাম,কামদুনি, রানাঘাটের প্রতিবাদী আপনি আসলে নিজের বুকের ডানদিকের অন্ধকারে পুরুষতান্ত্রিক আবেগের লালন পালন করছেন সযত্নে ?
একটা টিম টানা ৭ টা ম্যাচ জিতেছে। সেমি ফাইনালে পারেনি। টস, পিচ একাধিক বিষয়ে ক্রিকেট অত্যধিক নির্ভরশীল। বোলিং, ব্যাটিং ,ফিল্ডিং কিছুই হয়ত ভালো হয়নি। এর আগেও সেমিফাইনালে হেরেছি। ৮৭ তে হেরেছি। ৯৬-এ হেরেছি। সেবারও হয়নি। ২০০৩-এ ভালো খেলেও ফাইনালে ধারাবাহিকতা রাখতে পারিনি। ২০০৭ –এ বাংলাদেশ আমাদের নিয়ে কিংস্টনের পিচে ছেলেখেলা করেছিলো। ২০০৭ –এ t20 বিশ্বকাপে নতুন দল নিয়ে মহেন্দ্র সিং ধোনি পেরেছিলেন। ২০১১ তেও পেরেছি। আবার পরের বার হয়ত পারব। মাথায় তো আর আকাশ ভেঙ্গে পড়েনি ! দয়া করে বুঝুন বিষয়টা খুবই প্রফেশনাল। জিতছে যেমন, হারবেও তেমন। জিতলে মাথায় তুলে নাচারও যেমন দরকার নেই তেমন হারলেই তাঁদের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে কাটাছেঁড়া করারও দরকার নেই। খেলা দেখুন। উপভোগ করুন। খেলা নিয়ে চায়ের আড্ডায় তুফান তুলুন। কভার ড্রাইভে সামনের পায়ে দেহের ওজনটা পুরো ট্রান্সফার হল কিনা সেটা নিয়ে তর্ক করুন। ফ্লিক করতে গিয়ে রোহিতের ব্যাটটা ফার্স্ট স্লিপের দিক থেকে কোনাকুনি নামছে কিনা সেটা নিয়ে দু চার কথা বলুন। শামির ডেথ বোলিং-এ ইয়র্কর টা ঠিক জায়গায় পড়ছে কিনা সেটা নিয়ে গরম বেগুনি হাতে ছেলের সঙ্গে গপ্পো জুড়ুন। অফিসের টেবিলে আশ্বিনের ক্যারাম বলের টেকনিক খুঁজুন। শুধু ব্যক্তিগত আক্রমণটা বাদ দিন। ব্যাস !
ছোটবেলায় শচীন ব্যাট করলেই বুক দুরুদুরু করত জানেন। ৯৬'র বিশ্বকাপে যখন শচীন জিম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে বোল্ড হলেন তারপরেই, জলের বোতল হাতে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে ইস্কুল গিয়েছিলাম, তার আগে না। ওয়াংখেড়ে তে মার্ক ও 'র বলে ৯০ রানে শচীন ষ্ট্যাম্প হতেই ভ্যা-ভ্যা করে কাঁদতে আরম্ভ করলাম। মা রেগে বলেছিল "শচীন তোকে খেতে দেয়, না পরতে ?"। মায়ের সঙ্গে রাগারাগি করে, ঐ রাত্রিবেলায় রাস্তায়-রাস্তায় দৌড়ে বেড়িয়েছিলাম। ছোটোকাকু চ্যাং-দোল্লা করে বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছিলো। তখন তো আমি সবে ৯ বছর। আমি এখন প্রায় ২৯, এখন আর এসব নেই। তাই আজকের হারটাকেও মেনে নিয়েই আবার খেলা দেখব। রঞ্জি দেখব। ইরানি দেখব। দেওধর দেখব। ভারতের পরের টেস্ট সিরিজ দেখব। খেলা ভালোবাসেই দেখব। বোঝার চেষ্টা করব। জানার চেষ্টা করব। আর যারা এখন বলে-বলে বিদেশী ক্রিকেটার দের চুমু ছুঁড়ে ফেসবুকের দেওয়াল ভরাচ্ছেন বা ভারত হেরে যাবার পর বিরাট -অনুস্কার মঙ্গলসূত্রে খাদ খুঁজছেন, নিজেকে নির্ভেজাল “দাদাভক্ত” প্রমান করতে সুযোগ পেয়েই ধোনি কে ল্যাং মারছেন, ক্রিকেটের কপিবুকে দেশপ্রেমের লিটমাস টেস্টের ছ্যাবলামি করছেন, তাঁদের বলি আপানাদের দাদাভক্তি দেখলে স্বয়ং সৌরভ গাঙ্গুলি লজ্জা পেতেন। দেশ ভক্তি দেখলে মুক্তিযুদ্ধের শহীদরা। Take a break !দেশে আরও অনেক গুরুতর সমস্যা আছে। তাই ছেলেমানুষি ঝেড়ে ফেলুন, ন্যাকামি বন্ধ করুন, "ক্রিকেট আমাদের ধর্ম"- বলে ছিঁচকাঁদুনে গাইবেন না। একদম আদিখ্যেতা করবেন না । এটা একটা খেলা। শুধুই খেলা। এখানে কোকোকোলার বিজ্ঞাপন দেখাচ্ছি না যে দু-হাত তুলে কেত্তন করে বলবেন "Eat Cricket, Sleep Cricket, Drink only Coca-cola !"

আপনার মতামত জানান