এ্যালবামঃ ঊনষাট । অঞ্জন দত্ত ও অমিত দত্ত

মালবিকা সাহা ও সৌম্যজিৎ চক্রবর্তী

 

‘জানি, তারপর বলা হবে এটা আসলে বয়েসের দোষ / আমি জানি, এটা আসলে বয়েস বেড়ে যাওয়ার সাহস
এবার হয়তো বলবে তুমি, গান তোমার কেন শুনবো? / আমি চুপচাপ আমার চলে যাওয়ার দিন গুনবো
বাজিয়ে যাবে আমার বন্ধু, আমার সাথে তার গীটার / হয়তো কেউ তার বন্ধুর কাছ থেকে এই গানটা করবে ধার
হয়তো এটা শুনে, সে, একা একা রাত্তিরে কাঁদবে / তারপর, ভোরের দিকে নিজের মতো ক’রে গান বাঁধবে
যা, আমার গানে নেই, হয়তো তার গানে থাকবে / আমি থাকি, না থাকি, হয়তো তুমি সেই গান শুনবে...’



ঊনষাট– একটা ভালো কাজ, না কি খারাপ কাজ? ঠিক কাজ, না কি বেঠিক কাজ?– এই কথাগুলো অপ্রয়োজনীয়। জরুরী হল, দীর্ঘ বারো বছর পর আবার নিজের লেখা গানের একটা গোটা এ্যালবাম। কেন? অনেকে বললেন, দু’তিনটে খারাপ ছবি বানানোর পর অঞ্জন দত্ত আবার গানেই ফিরতে চাইছেন। অনেকে এমনও বললেন যে কবীর সুমনের ‘তোমাকে চাই’-এর কুড়ি বছর এত মহাসমারোহে পালন করা হল, এবার অঞ্জনের গানের কুড়ি বছর পূরণেরও তো কিছু একটা করা চাই। কিছু মানুষ সুমন-অঞ্জনের এই যে
‘...স্টোরিজ্‌ আন্‌টোল্ড’ সম্পর্কটায় খুব মজা পান। তাই তাঁদের কিছু একটা বলতেই হবে। অঞ্জন দত্ত ইংরিজি গান থেকে টুকে গান লেখেন, কাঁধ ঝাকিয়ে কথা বলেন, গীটার তেমন ভালো বাজাতে পারেন না, বাংলা গানে অঞ্জন দত্ত একটি আগাছা- এ’সব অপমান করেছেন, লোকের অভাব নেই। এমন কী, নব্বই দশকে বাংলা গানের ধর্ম বদলে দেওয়া গানওলা’র মুখ থেকেও ঠিকরে বেরোয় তাচ্ছিল্য- আমার পরে যেসব মানুষ গীটার হাতে গান গাইতে এলেন, যত খেঁদি-পেঁচি, তারা আর কী কী করলেন জানিনা, গানটা গাইতে পারেননি । কেন অঞ্জন দত্ত আজও গান গাইছেন? উত্তর দেওয়ার আমরা কেউ নই। জবাব দিলেন অঞ্জন নিজেই – ‘ব্যালটের পদ্ধতি কোনো বদল আনতে পারেনি এখনো তাই/বুলেটের রাজনীতি কোনো সমাধান খুঁজে দেয়নি এখনো তাই/...সমকামী কতো হাজার, ভালোবাসা, সহজে পায়না এখনো তাই/...কোটি কোটি ইহুদীর ভালোবাসা হারিয়ে গেলো গ্যাস চেম্বারে, তবু প্রেম করতে পারে অনেকেই, হিরোশিমায়/...এখনো তাই, আমি গান গাইছি, এখনো তাই’। এই গানটা দিয়ে শুরু হল ঊনষাট – আর শুরুতেই ওলটপালট করে দেওয়ার চেষ্টা। অঞ্জন গান গাইছেন, ছবি বানাচ্ছেন, কান্না আসছে, চোখে চালসে তো বহুদিন... তবু অঞ্জন গান গাইছেন, এভাবেই। দ্বিতীয় গান সকলেই জানে। ‘সকলেই জানে’ গানটারই নাম। একটা জিভ জড়ানো গান, কিংবা মাতালের প্রলাপ- যে মাতাল সদ্য হুঁশে এসেছে, গ্যালন গ্যালন মদ গিলে। তবু প্রলাপের সহজাত একটা সমীরণ (সমীকরণ নয় কিন্তু) আছে, সেটার পুরো কৃতিত্ব অমিত দত্তের। এই প্রলাপ এতো সত্যি লাগেনি এর আগে। অঞ্জন দত্ত মেজাজে ফিরছেন- ‘সকলেই জানে, সকলে চাইলে পৃথিবীতে ক্ষমতা পাল্টে দেওয়া যায়/সকলেই জানে, ক্ষমতার কাছে এসে মাথা না নোয়ালে, মাথা কাটা যায়’। গানের মাঝামাঝি এসে গাইছেন- ‘সকলেই জানে, প্রেম করতে গেলে/সকলেই জানে উলঙ্গ হতে হয়’। চোখ বন্ধ করে পরস্ত্রী বা পরপুরুষের ঠোঁটে ঠোঁট ডোবানোর মধ্যে হিপোক্রেসি আমাদের যে মজ্জাগত। সেই মজ্জার রস শুষে তাকে শুকনো খটখটে করে তবেই এই প্রলাপ আসে কলমে। শেষ দিকে আমাদের বাঁকা হাসিকে চওড়া করে আবার বলছেন– ‘সকলেই জানে, চলে যাবার আগে/সকলেই জানে উলঙ্গ হতে হয়’; এবং ‘সকলেই জানে শোনা হয়ে গেলে এটাও স্রেফ আরেকটা গান’। এতবার সকলেই জানে শব্দবন্ধটা কেন এলো গানটাতে? মজ্জাগত করিয়ে দেওয়ার ইচ্ছেটুকুর নাম হলো রিপিটিশন্‌- বারংবার শব্দের পুনরাবৃত্তি, যেটা অঞ্জনই পারেন। আচ্ছা, অঞ্জন কি গায়ক, অভিনেতা কিংবা পরিচালক হিসেবে যথেষ্ট সফল? যদি প্রশ্ন করি, সাফল্যের অর্থ কি? কি বলবেন? নাম-যশ-খ্যাতি? অঞ্জন বলছেন অন্য কথা- ‘জেতা-হারার প্রশ্ন আজ আর বড় নয়/শুধু হতে পারো অন্যরকম’। কি নিয়ে বড় হলেন তিনি, কি দেখলেন এই দুনিয়া জুড়ে, কি পড়লেন, কি-ই বা শুনলেন, ঊনষাটে উজাড় করে শোনালেন সে’সবই- বাদল সরকারের মিছিল থেকে আর্নেস্তো গেভারা, জোয়ান অব আর্ক থেকে বব্‌ ডিলন, মাত্র তিনটে ছবি করে চলে যাওয়া জেমস্‌ জায়ান্ট ডিন থেকে অদৃশ্য মানুষ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়... বললেন, ‘এর বেশি কিছুই আর রেখে যেতে পারছিনা/কুড়িয়ে-বাড়িয়ে আমার আজীবন...আমি তোমার জন্য রেখে গেলাম’।

কাট্‌। এক মিনিট? অঞ্জন দত্ত কি প্রেমের কোনও গান গাইছেন না? একটা কাঞ্চন গোছের কিছু? পাহাড় নিয়ে আর কিছু শুনতে পাইনা ওর গানে, কতকাল... হয়ে গেল? ছেলেবেলায় এক অঞ্জন-ভক্ত বাংলা পরীক্ষায় ‘পাহাড়’-এর প্রতিশব্দ লিখে এসেছিলেন ‘অঞ্জন দত্ত’- এ’সব কানাঘুষো শোনা যায়। মাঝেমধ্যে অঞ্জন আক্ষেপ করেন, প্রথম প্রথম যখন গানের জগতে পরিচিত মুখ হলেন, তখন ক্যাসেট কোম্পানির ‘অনুরোধে’ পুজোর সময় এ্যালবাম বের করতেই হতো- একটা ছোটদের গান, একটা দার্জিলিং, আর একটা ঐ রঞ্জনা-পর্যায়ের গান। চেনা ছক, সহজ হিসেব মুনাফার। ঊনষাটে এসে অঞ্জন আজ মুনাফার চেয়ে অনেকটা দূরে, অনেকটা বেশি স্বাধীন। নাহ্‌, কোন ক্যাসেট কোম্পানি বের করেনি এই এ্যালবাম। কাছে আসার, ভালোবাসার ব্যবসা তিনি করেছেন অন্যভাবে, বাদল-আদলে। দুটো বন্ধু, গীটার বাজিয়ে-গান গেয়ে তাদের টুপি দুটো খুলে রাখলেন মাটিতে, বললেন- ‘একটা দাম ঠিক করা হয়েছে সেটা যেমন সত্যি, তেমনই কারোর কাছে যদি পাঁচ-দশ টাকা কমও বা পড়ে, এ্যালবামটা নিয়েই বাড়ি ফিরবেন কিন্তু’। বোধহয় এই ছোট্ট অনুভুতিটুকুর সাবেকী নাম ভালোবাসা। হ্যাঁ, অঞ্জন লিখেছেন ‘একটা দিন’-এর কথা, নীল একটা আকাশ মাথায় রেখে বলেছেন পাহাড়ের সাথে কাটানো দিনের কথা, হাত ধরে থাকার কথা- ‘ছিলনা কোন আফসোস, ছিলনা অপরাধবোধ, ছিলনা সারা শরীরে সংশয়/সেই পাহাড়, আমার... হারিয়ে গেল কোথায়?’ অঞ্জন ভালোবেসে গিয়েছেন সেইসব হেরে যাওয়া সৈন্যের দল-কে, যারা হার মেনে নেয় না, শুনতে পেয়েছেন একটা বধির বাচ্চার আবেগের হাততালি, দেখেছেন সেই হিজড়ে-কে, যার হঠাৎ পায় লজ্জা। তাঁর আক্ষেপ- তিনি এ’সব কথার মানে হয়তো পারেননি বোঝাতে। তবু... ‘যদি ভগবান বেঁচে থাকে, কোথাও, কোনোখানে/ভগবান জানে, এটা শুধু গান নয়’। অসহায় উলঙ্গ জোকার, সাদা প্রোজেক্টর, ট্রিগার টানতে টানতে ক্লান্ত হওয়া আঙুল, রক্তপাত, যন্ত্রণা, লড়াই, অশান্ত সমুদ্র, প্রলয়, হাহাকার, হারাবার ভয়- এই সবকিছু বুকে বয়ে নিয়ে যেতে যখন হবেই, ‘তখন, এসো/বলো, বন্ধু বিদায়।’ – অঞ্জন দত্তকে বড় পরিশ্রান্ত লেগেছে এই গানটায়। বিধ্বস্ত, অসহায়, ব্যর্থ, ওই কোনওরকমে টিকে থাকার চেষ্টায়; আর পাঁচজনের মতোই। তবু ‘বিদায়’ জানাবার সুযোগটা হাতছাড়া করবেন না কোনভাবেই। হয়তো বিদায়ের মুহূর্তেই আবার পিছুটান ফিরে ফিরে আসে। হয়তো ফিরতে চেয়েই বন্ধুকে বুকে জড়িয়ে বিদায়ের সুর। অঞ্জনের গায়কী সম্বন্ধে সকলেই সচেতন- ভীষণ লিরিক্যাল ভাবে গানটা উনি গান না কোনদিনই; যেভাবে আমরা কথা বলি, যেভাবে দুঃখে-আনন্দে আলতো গলায় গেয়ে উঠি, তাদের কাছে অঞ্জনের গায়কী বিশাল বড় একটা অনুপ্রেরণা। এখানেও তার ব্যতিক্রম নয়। গায়কীর চেয়েও যেটা কানে লাগছে, তা হলো অমিত দত্তের মিজিক্যাল অ্যারেঞ্জমেন্ট। গোটা এ্যালবাম জুড়ে ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে একটা তোলপাড় হয়ে যাচ্ছে শ্রোতার হৃদয়ে। একটা মোহ তৈরি করেছেন অমিত। আর সেখানেই ঊনষাট-এর ম্যাজিক। সঙ্গীতের নেশায় বুঁদ হয়ে থাকা দুটো বন্ধু কাঁধে হাত রেখে একে অন্যকে ঘর পৌঁছে দিচ্ছে। পা হড়কালে একে অপরকে আদর করছে। ঊনষাটের এই জার্নিটা হোঁচট খাওয়ার ঊর্ধ্বে গিয়ে তাই পথ চলা হয়ে গেছে। এ্যালবামও পথ চলছে। বুঝতে পারছি, পথ ফুরোল বলে এখনি। সাত নম্বর গানটায় গিয়ে অঞ্জন ভেঙে-চুরে দিচ্ছেন সমস্তটাই। অঞ্জন দত্ত কোনদিন এই গান লিখতে পারেন, এমনটা ভাবেনি এর আগে কেউ। ‘রাজনৈতিক অঞ্জন দত্ত’ এই সময়ের দগদগে ছ্যাতলাগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছেন মানুষকে। গাইছেন বদলের গান। হ্যাঁ, বলতে পারেন যে এর আগে ‘চলো বদলাই’ গেয়েছেন, কিন্তু এই গানটা শুনলেই বোঝা যাবে, কোথায় এই বদলের গুঢ় তাৎপর্য। যতবার শোনা যায়, বিহ্বল করে দেয় চেতনাকে। তবু ভেতরের তোলপাড়কে কালো সানগ্লাস পড়াতে হয় শেষমেশ। আসলে ‘বদল’ শব্দটায় অদ্ভুত এক বিপ্লবের গন্ধ আছে, জেদ আছে। এই জেদ অনুভব করতে গেলে আমাদের নিজেদের ভেতর সার্চলাইট ফেলাটা অত্যন্ত জরুরী। আয়নার সামনে নগ্ন হয়ে দাঁড়াবার সাহস যোগায় এই গান। রাজনৈতিক অনীহার ক্রমবর্ধমান সংস্কৃতি, নোবেল পিস্‌ প্রাইজের ব্যর্থতা, পারমাণবিক বৃষ্টির ভ্রূকুটি, কৃষিজমি দখলে বারুদের গন্ধ, চুরি করে ডাউনলোডের অভ্যেস থেকে ধর্ষণ, ড্রেনের জলে কন্যাভ্রূণের ভেসে যাওয়া, টেলিফোনের ভেতরে পর্ণোগ্রাফি, দারিদ্র্যকে অপমান করার তুমুল অধিকার, মধ্যমেধার জয়জয়কার – গণতান্ত্রিক মননের অবক্ষয়ের ওপরে একটার পর একটা বিস্ফোরণ ঘটাচ্ছেন অঞ্জন। আজও ইচ্ছে করে, বদলে দেওয়ার। আমরা না পারলে, আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম পারবে, নিশ্চয়ই পারবে। সেই অপেক্ষাটার আয়ু নিঃসন্দেহে বাড়িয়ে দিলেন বেনেপুকুরের আধবুড়ো লোকটা। শেষমেশ এসে এ্যালবাম থেমে যায়, গায়কের মন বলে এখনও, থেমে যাবে সব যুদ্ধ। কেবল আফসোস থেকে যায়, ছোট ছোট ছেলেদের হাতে পিস্তল দেখে যাব/আরও বছর দশ, হয়তো আট/প্যালেস্তাইনে আবার ল্যান্ডমাইন ফাটবে/জ্বলে উঠবে হয়তো গুজরাট.../আজ আমার বয়েস...‘ঊনষাট’।

ঊনষাট একটা বন্ধুত্বের সেলিব্রেশন, রন্ধ্রে রন্ধ্রে সৃষ্টিসুখের উল্লাস। তবে সব পাওয়া গেল কি এই এ্যালবামে? উত্তর- না, সবটুকু নেই এখানে। জ্ঞান মঞ্চের নীল আলোয়, চিবুকে পাতা অহংকারের আড়ালে যন্ত্রণাগুলো দেখতে পেলাম আমরা কয়েকজনই, দুই বন্ধুর ভিন্ন স্বাদের এক কথোপকথনে- একজনের কথায়, আরেকজনের গীটারে। না, ভালবাসাবাসিতে নয়, স্রেফ কতগুলো সোজাসুজি কথোপকথনে। এ্যালবাম প্রকাশের দিন, মঞ্চে- অঞ্জন জিজ্ঞেস করছেন, ‘অমিত, কত বয়েস বেড়ে গেল, বলো!’; গীটারে গীটারে অমিতের উত্তর, ‘হ্যাঁ, তাই তো!’
- ‘তা, কেমন আছো অমিত?’
‘ভালো, মন্দ- সব মিলিয়ে-মিশিয়ে চলছে, ভালোই আছি।’
- ‘কি কি করতে ইচ্ছে হল এতদিন ধরে, আরও কি কি ইচ্ছে করে এখনো?’
‘ইচ্ছে হল বাজাতে গীটার।’
- ‘শুধু গীটার?’
‘ইয়েস্‌, ওনলি’- দ্য গড্‌ অব গীটার বললেন সুরে সুরে।
_ _ _
এ্যালবামের প্রাপ্তিস্থানঃ অঞ্জন দত্ত’র যে কোন গান, নাটকের মঞ্চে | যোগাযোগঃ উষ্ণক বসু – ৯০৩৮৫৪১৩০৭

আপনার মতামত জানান