বাঙালির এক বিস্মৃত ইতিহাস

অপূর্ব সাহা

 



১৯শে মে ১৯৬১। শিলচরের রেল স্টেশন চত্বর। বাংলাভাষা স্বীকৃতির দাবিতে অনড় শত শত ভাষা সৈনিকদের জমায়েত। ভোর ৪টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত হরতাল কর্মসূচী পালন করতে গিয়ে শান্তিপূর্ন পরিবেশ-ই বজায় ছিল। বেলা ২টা বেজে ৩৫মিনিট নাগাদ বিনা প্ররোচনায় পুলিশের গুলি চললো; ৭মিনিট ব্যবধানে ১৭ রাউন্ড এলোপাথারি গুলি। একটি গুলি মাথা ভেদ করে চলে গেল ঠিক দু’দিন আগেই ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ করে এই আন্দোলনে যোগ দিতে আসা ১৬ বছর বয়সী এক কিশোরীর। নাম কমলা ভট্টাচার্য্য, ভাষা আন্দোলনে পৃথিবীর প্রথম নারী শহীদ। গুলি চালানোর জন্য পুলিশের রাইফেল নিশানা করলে ২০ বছর বয়সী দশম শ্রেনির ছাত্র শচীন্দ্র নাথ পাল জামার বোতাম খুলে খালি বুকে দাঁড়ান রাইফেলের সামনে । শহীদের ন্যায় মৃত্যুবরন করেন তিনি। মারা যান ১৫বছর বয়সী দশম শ্রেনীর ছাত্র সুনিল সরকার।পুলিশের গুলি প্রান কেড়ে আরও ছয় জন বাঙালির এঁরা হলেন কানাই লাল নিয়োগী, সুকোমল পুরকায়স্থ, চন্ডীচরণ সূত্রধর, হীতেশ বিশ্বাস, কুমুদরঞ্জন দাস এবং তরনী দেবনাথ। ঠিক দুদিন পর স্টেশন চত্বরের পাশের পুকুর থেকে বীরেন্দ্র সূত্রধর এবং সত্যেন্দ্র দেবের লাশ উদ্ধার করা হল। আসাম পুলিশ এওবং কেন্দ্রীয় সামরিক এবং আধা সামরিক বাহিনীর অমানবিক লাঠি চার্জ, লাথি এবং বেয়োনেটের আঘাতে গুরুতর ভাবে আহত হয় শতাধিক আন্দোলনকারী। এই দিন আহত হয়ে চব্বিশ বছর ধরে বুকে গুলি নিয়ে যন্ত্রণাক্লিষ্ট জীবন কাটিয়ে মারা যান কৃষ্ণকান্ত বিশ্বাস। নারী পুরুষ নির্বিশেষে মারমুখী প্রশাসনের নৃশংস শক্তি প্রদর্শন রেহাই দেয়নি সাত বছরের এক বালিকাকেও। আসাম সহ গোটা দেশ রবীন্দ্র জন্মশতবর্ষে সাক্ষী হয়ে থাকে এই বাঙালি নিধন যজ্ঞের, প্রত্যক্ষ করে ঊনিশের রক্তাক্ত ইতিহাস ।
এবার একটু পিছনে ফেরা যাক। ইতিহাস থেকে তথ্য অনুসন্ধানের পূর্বে ভৌগলিক মানচিত্রটা জেনে নিই। বর্তমানে আসাম বহ্মপুত্র উপত্যকা, বরাক উপত্যকা এবং দুটি পার্বত্য জেলা নিয়ে তৈরি। কাছাড়, হাইলাকান্দি এবং করিমগঞ্জ এই তিনটি জেলা নিয়ে তৈরি বরাক উপত্যকা। করিমগঞ্জ দেশভাগের পূর্বে সিলেট জেলার অন্তর্গত ছিল কিন্তু ১৯৪৭ এর দেশ ভাগের পর করিমগঞ্জ ভারতের অর্ন্তভুক্ত হয় এবং সিলেটের বাকি অংশ পূর্ব পাকিস্তানের (বাংলাদেশ) অন্তর্গত হয়। শিলচর কাছার জেলার প্রধান প্রশাসনিক শহর। শোষণ এবং শাসন মানচিত্রের আকার বৃদ্ধির জন্য বৃটিশ কোম্পানী আসামের পতিত জমিতে “আসাম টি কোম্পানী” স্থাপন করে। এই কোম্পানীরে কেন্দ্র করে ভিন রাজ্য থেকে প্রচুর মানুষের আগমন ঘটে। আসামে প্রশাসনিক সহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে শিক্ষিত বাঙালিদের আধিপত্য ছিল বেশী এবং বৃটিশ শাসনাধীন আসাম রাজ্যে প্রায় ৩৫ বছর ধরে শিক্ষার মাধ্যম ছিল বাংলা। ১৯৩১ সালের জনগণনা অনুযায়ী আসামের মোট জনসংখ্যার ৩১.৪ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা অসমীয়া এবং ৫৬.৭ শতাংশ মানুষের মাতৃভাষা ছিল বাংলা। স্বাধীনতার পর সিলেটের বৃহৎ অংশ পূর্ব পাকিস্তানে চলে যাওয়ায় ধর্মীয় নিরাপত্তার জন্য প্রচুর হিন্দু বাঙালি আসামে আসতে শুরু করে। ১৯৪৭ এর আগস্ট মাসেই ১২২৯৭ জন বাঙালি পূর্ব পাকিস্তান ছেড়ে আসামে আসে। বাঙালি হিন্দু উদ্বাস্তুর সংখ্যা ১৯৫১ থেকে ১৯৬১ এই দশ বছরে ২.৬২ লাখ থেকে ৬ লাখে পৌছায়। এরা আসামের বহ্মপুত্র ও বরাক উপত্যকার বিভিন্ন অংশে ছরিয়ে পড়ে। বাঙালিদের এই সংখ্যা বৃদ্ধি অসমিয়া মধ্যবিত্ত শ্রেণীর মনে তৈরি করে ক্ষোভ। বাংলা ভাষা ও বাঙালিদের প্রতি এই ক্ষোভ জন্ম দেয় অসমিয়া জাতীয়তাবাদের। এই অগণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদের মূল বক্তব্য ছিল “আসাম কেবল মাত্র অসমিয়াদের জন্যই”। এই আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদ আক্রমণের হাতিয়ার হিসাবে ভাষাকে ব্যবহার করতে শুরু করে। বিভিন্ন ক্ষেত্রে বৈষম্যমূলক সরকারী নির্দেশিকার পাশাপাশি অসমিয়া ভাষাকে শিক্ষার মাধ্যম হিসাবে ব্যবহার করার নির্দেশ দেওয়া হয়। গোয়ালপাড়ার মতো বাঙালি অধ্যুষিত এলাকায় স্বাধীনতা প্রাপ্তির তিন বছরের মধ্যে বাংলা মাধ্যম বিদ্যালয়ের সংখ্যা হুমকির জেরে ২৫০ থেকে ৩ টি তে দাঁড়ায়, সেখানে অসমিয়া মাধ্যম বিদ্যালয়ের সংখ্যা ৩৪৮ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে হয় ৮৩৩। অঅসমিয়াদের আসামে বসবাস করার ক্ষেত্রে বিভিন্ন শর্ত আরোপ করা হয়। দরিদ্র মুসলিম বাঙালি কৃষিজীবীরা এই ষড়যন্ত্রের শিকার হয়। স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য, সহজে বসবাস করার জমি পাওয়ার জন্য এবং অন্যান্য সুবিধাপ্রাপ্তির আশায় এদের মাতৃভাষা বাংলা হলেও অসমিয়া বলে ব্যক্ত করে। ফলে দেখা যায় ১৯৩১ এ যেখানে অসমিয়া ভাষাভাষী জনসংখ্যা ছিল ১৯.৮ লাখ সেখানে ১৯৫১ সালে প্রায় ১৫০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে তা হয় ৪৯ লাখ। অসমিয়া ভাষাকে একক রাজ্যভাষা করার উদ্দেশ্যেই তৈরি হয় এই ষড়যন্ত্রের পরিসংখ্যান। বাঙালিদের প্রতি অসমিদের ক্ষোভ চরমপন্থী রূপ নিয়ে শুরু হয় “বঙাল খেদা”। যা হল মূলত বাঙালিদের সমূলে উৎপাট করার অভিপ্রায়ে অসমিয়াদের আন্দোলন। শুরু হয় দাঙ্গা, উৎপীড়ন এবং ধর্ষণ। বহ্মপুত্র উপত্যকার বেশ কিছু অংশে বাঙালিদের ঘরবাড়ি, ক্লাব, বিদ্যালয় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। একটি এলাকায় প্রায় ৬০০ বাঙালি পরিবারের সম্পত্তি লুঠ করে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়। আসামে কর্মরত বাঙলিদের ওপরও অত্যাচার শুরু হয়। প্রশাসনের নির্লিপ্ত মনোভাব আরো ব্যপক করে “বঙাল খেদা” আন্দোলনকে। প্রশাসন নিষ্ক্রিয় না থাকলে কামরুপের ২৫টা গ্রামের ৪০১৯টি কুঁড়েঘর ও ৫৮টি বাড়ী ধ্বংস করা (গোপাল মেহরোত্রার রিপোর্ট) সহজ হতো না। এই নৃশংস আক্রমণে ৭জন বাঙালি মারা যায়, আহত হয় শতাধিক। এরপর ১৯৬০ এর ২৪শে অক্টোবর বিমলাপ্রসাদ চালিহার মূখ্যমন্ত্রীত্বে আসাম বিধানসভায় একক রাজ্যভাষা বিল পাশ হয়ে যায়। অসমিয়া হয় আসামের একমাত্র সরকারী ভাষা। এই একক রাজ্যভাষা বিল ছিল ১৯৫৬সালের রাজ্য পুর্ণগঠন প্রস্তাবের পরিপন্থী। এই রাজ্য পুর্ণগঠন প্রস্তাবে বলা হয়েছিল যদি একটি রাজ্যে ৭০ শতাংশ মানুষ একই ভাষাই কথা বলে তবেই সেটি একভাষী রাজ্য হিসাবে বিবেছিত হবে। কিন্তু সেই সময় আসামে অসমিয়া ভাষাভাষী মানুষের সংখ্যা ছিল মাত্র ৫৭.১৪ শতাংশ।
এরপর বাঙালিরা আর বসে থাকেনি।আসাম সরকারের ভাষিক সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ আন্দোলন। বাঙালিদের ক্ষোভ অসমিয়া ভাষার ওপর ছিল না, ক্ষোভ ছিল এই অগণতান্ত্রিক ও বৈষম্যমূলক বিলের বিরুদ্ধে। তাই তাদের দাবি ছিল অসমিয়ার সাথে বাংলাকেও স্বীকৃতি দেওয়ার। প্রতিবাদ শুরু হয় বরাক উপত্যকায় যেখানে শতকরা ৮০ ভাগ মানুষই বাঙালি। তৈরি হয় কাছাড় গণসংগ্রাম পরিষদ। শুরু হয় দলমত নির্বিশেষে মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার আন্দোলন। পদযাত্রা, সংকল্প দিবস, সত্যাগ্রহর মত বিভিন্ন কর্মসূচী নেওয়া হয়। এরপরই আসে ঐতিহাসিক ১৯ শে মে ১৯৬১। মোট ১১ জন বাঙালি শহীদ হন সেই দিন। তাঁদের পরিচয় প্রবন্ধের প্রথমেই দেওয়া হয়েছে। এতগুলো প্রানের বিনিময়ে বরাক উপত্যকায় বাংলাভাষা স্বীকৃতি পেয়েছে। ভাষা সৈনিকদের আত্মত্যাগ মাতৃভাষার অধিকার রক্ষা করতে সক্ষম হয়েছে। বাংলা ভাষা ও বাঙলির সেই অধিকার এখনো বিরাজমান বরাক উপত্যকায়।
ঊনিশের ভাষা আন্দোলন ও একুশের ভাষা আন্দোলন চেতনাগত দিক দিয়ে অভিন্ন। সে চেতনা মাতৃভাষার অধিকার রক্ষার চেতনা। একুশের আন্দোলন একটা স্বাধীন দেশের জন্ম দিয়েছে ঠিকই কিন্তু শিলচরের ১১ জন শহীদের বলিদান কোনো অংশে কম নয়। ইতিহাস জীবনের গতিপথ নির্ধারণ করে। তাই বিস্মৃত ইতিহাস দ্বারা দিকভ্রান্ত হওয়াই স্বাভাবিক। বাস্তবেও তাই হচ্ছে। “যে ভাষার জন্যে এমন হন্যে এমন আকুল হলাম” সেই বাংলা ভাষা বাঙালির মধ্যেই অবহেলিত। সমগ্র বিশ্বের অর্ধেক মানুষ যে আটটি ভাষায় কথা বলে তার মধ্যে বাংলা ভাষা অন্যতম। তবুও বাঙালির একাংশ মাতৃভাষা বাংলা নিয়ে হীনমন্যতায় ভোগে। ইংরেজী, হিন্দি এবং বাংলা এই ত্রিস্তরীয় দোলাচলে সব থেকে ক্ষতি হচ্ছে যে ভাষার তা হল বাংলা। মাতৃভাষার প্রতি ভালোবাসা জাগ্রত না হলে তৈরি হবে এক শেকড়হীন প্রজন্ম। এই শেকড়হীন প্রজন্ম ক্ষতি করবে বাঙালি সংস্কৃতি সর্বোপরি বাঙালি সমাজকে। তাই আমাদের এখন থেকেই সাবধান হওয়া প্রয়োজন।


তথ্যসূত্র
১) এন.সি. চ্যাটার্জী কমিশন রিপোর্ট
২) www.censusindia.gov.in
৩)১৯শে মে – সম্পাদনা নির্মলেন্দু শাখারু
৪) www.wikipedia.org

আপনার মতামত জানান