আর্থ টু পয়েন্ট ও

মাসকাওয়াথ আহসান

 



যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ বিজ্ঞানীদের \"আর্থ টু পয়েন্ট ও\" দেখতে পাওয়ার খবর চাউর হবার পর সেখানে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। পৃথিবী খুব খারাপ জায়গা; সেখানে হিংস্র উপমানবের বসবাস। এরা পৃথিবীর প্রকৃতি বিনাশ করেছে; আর উপমানবদের নিজেদের খুনোখুনি তো লেগেই আছে। এই দস্যুগুলো যদি কলম্বাসের মতো এসে আর্থ টু পয়েন্ট ও জবর দখল করে; সর্বনাশ হয়ে যাবে শান্তিগ্রহটির।পৃথিবী র অপরাধীগুলো এসে পৌঁছানো মানেই মুসোলিনি, হিটলার, বুশ, লাদেন ইত্যাদি নানা রঙের খুনীতে শান্তিগ্রহটি রঞ্জিত হওয়া।
শান্তিগ্রহের গার্ডিয়ান এনজেল পর্ষদের জরুরী বৈঠক ডাকা হয়েছে। পর্ষদ আচার্য ট্রুথ এনজেল গভীর বিষাদের সঙ্গেই বলেন,
--এতোদিন ছিলাম ভালোই। মাঝে মাঝে ইউ এফ ও পাঠিয়ে ওদের সমাজটাকে বোঝার চেষ্টা করা হয়েছে। এলিয়েনরা যে খবর দিয়েছে তা ভয়াবহ। পৃথিবীর মানুষ কাম -ক্রোধ -লোভ -হিংসা -মোহ -মাতসর্য্য এসবের পাঁকে পুঁতে আছে। ওরা এক একটি চলন্ত ভাইরাস। এখন তারা আমাদের এই শান্তিগ্রহের খবর পেয়ে গেছে। ১৪০০ আলোকবর্ষ এমন কোন দূরত্ব নয়। গভীর রাতে বাগদাদে হানা দেয়ার মতো এখানেও তারা হানা দেবে। যেহেতু এমেরিকা মিথ্যার রাজা; হোয়াইট হাউজের লাস্যময়ী মুখপাত্রী ঠোঁটে লাল লিপস্টিক মেরে নখরা করে মিথ্যা বিবৃতি দিয়ে দেবে, আর্থ টু পয়েন্ট ও-তে মানববিনাশী মারণাস্ত্র আছে। অথচ আমাদের এ গ্রহে ভালোবাসা ছাড়া আর কিছু নেই।
পর্ষদ উপাচার্য বিউটি এনজেল বলেন, ওরা দ্রুত নিজেদের একটা ন্যারেটিভ বানিয়ে ফেলে। আমাদের শান্তি গ্রহটি পৃথিবীর চেয়ে ৬০ শতাংশ বড়; ওরা পট করে আমাদের গ্রহের নাম বলেদিলো, আর্থ টু পয়েন্ট ও। আসলেতো আমরাই আর্থ ওয়ান পয়েন্ট ও। পৃথিবী দুই নাম্বার লোকে ভর্তি; ওদের বসতবাড়ীর নাম হওয়া উচিত আর্থ টু পয়েন্ট ও।
আচার্য বলেন, ওরা হয়তো ফিউচারিস্টিক অর্থে আমাদের শান্তিগ্রহটিকে আর্থ টু পয়েন্ট ও বলছে।
উপাচার্য বলেন, এখানে নেক্সট জেনারেশান হাউজিং স্টেট বানানোর নীল-নক্সা আর কী; ইটের পর ইট মাঝে মানব কীট বানাতে চায় এ জায়গাটাতে।
উপ-উপাচার্য গুডনেস এনজেল বলেন, ওদের মানুষ বেড়েছে; সম্পদ কমেছে; অক্সিজেন নেই, পানি নেই, প্রাকৃতিক সম্পদ নিয়ে কামড়াকামড়ি করছে। অভাবের তাড়নায় ওরা করতে পারেনা এমন কিছুই নেই। নিজের মায়ের কিডনী বেচে দেয়া বা তাকে বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসা রাক্ষস ওরা।
বিজ্ঞানাচার্য লজিক এনজেল বলেন, ওরা বিজ্ঞানটাকে পারমাণবিক বোমা তৈরীতে আর প্রকৃতি বিনাশে কাজে লাগিয়েছে। আমরা গড়েছি সবুজ গ্রহ। ওরা আজ যে নবায়নযোগ্য জ্বালানীর গপ্পো দিচ্ছে; সৌর শক্তি-বায়ু শক্তি সেগুলোতো আমাদের সততঃ জীবনচর্যা।আমরা হয়তো অস্ত্র না বানিয়ে ভুলই করেছি। সামরিক বাহিনী না গড়াটাও বাস্তবসম্মত হয়নি।
উপাচার্য বলেন, কে জানতো মহাবিশ্বের সবচেয়ে কদর্য গ্রহের হিংস্র উপমানবগুলো আমাদের এই শান্তিগ্রহের খোঁজ পেয়ে যাবে!
নৈতিকতাচার্য বলেন, ওরা আসা মানেই সত্য-সুন্দর-মঙ্গলের জীবন ধর্ম ফেলে বিশ্বাস-অবিশ্বাসীর অন্তহীন চাপাতি ও গালাগাল অশ্লীলতা। সমস্যা হচ্ছে নিরন্ন মানুষের মুখে খাবার তুলে দেয়ার চেয়ে বিমূর্ত বিতর্কে অশান্তি সৃষ্টি এদের মজ্জাগত। একদল অন্ধ বিশ্বাসের রোগী; আরেকদল অজ্ঞেয়কে অস্বীকার করা বেশী বোঝা রোগী।
উপাচার্য জিজ্ঞেস করেন, আমাদের এলিয়েনরা পৃথিবী থেকে যে কটি বিশ্বাসী ও অবিশ্বাসী উপমানব নমুনা এনেছিলো তাদের আপডেট কী! এ সবুজ সমাজে কী তারা আত্মীকৃত হতে পেরেছে।
নৈতিকতাচার্য বলেন, আত্মীকৃত হতেই পারেনি। বরং এক একজন একটা করে মাজার-আখড়া-ফ্যানক্লাব খুলে ‘গুরু’ ব্যবসা শুরু করেছিলো। আমরা তাদের সঙ্গনিরোধ কেন্দ্রে রেখেছি। শীঘ্রই পৃথিবীতে ফেরত দিয়ে আসা হবে এসব নমুনা।
উপাচার্যের কপালে চিন্তার রেখা। সম্মেলন কক্ষের ভেতরে বাইরে শান্তিগ্রহের সবুজ মানুষেরা শান্তিপূর্ণ অবস্থান নিয়েছে। তাদের প্রশ্ন, পৃথিবী নামের রাক্ষস গ্রহের উপমানবদের হাত থেকে আমরা কী করে বাঁচবো! অনেকের চোখেই সবুজ অশ্রু। প্রেমিকেরা আলতো করে প্রেমিকার কপালে চুমু খায়। কে জানে পৃথিবীর রাক্ষসেরা এলে নিয়ম করে দেবে, প্রকাশ্যে ধর্ষণ করা যাবে, খুন করা যাবে; কিন্তু চুম্বন দেয়া যাবে না।
বিদ্যাচার্য বলেন, ওদের লুন্ঠনমুখী শিক্ষা ব্যবস্থাটা ওদের পরের ধনে পোদ্দারী করতে শেখায়; যেহেতু ওরা বুঝেছে আমাদের সম্পদের কমতি নেই, পার্থিব মোহ নেই, পুঁজিবাদী আত্মকেন্দ্রিকতা নেই, ধনী-গরীবের ব্যবধান নেই; এখন এই শান্তিগ্রহের কীভাবে বারোটা বাজানো যায় সে চেষ্টাই করবে অপগন্ডগুলো।
বিজ্ঞানাচার্য বলেন, আমাদের এখানে পৃথিবীর দ্বিগুণ মাধ্যাকর্ষণ শক্তি কাজ করে; ওরা এখানে টিকতে পারবে না। কারণ ওদের তো একটু টাকা-পয়সা হলেই মাটিতে পা-ই পড়েনা। তবে কে জানে হয়তো লোহার ভারী জুতা পরে নেমে পড়বে এমেরিকান মেরিন ও ন্যাটোর সেনারা যারা গোটা পৃথিবীতে মাস্তানী করে বেড়ায় গ্যাং তৈরী করে।
উপউপাচার্য অশ্রু সজল চোখে বলেন, এমেরিকাতো একা কোথাও যায়না; সঙ্গে করে আল-কায়েদা ও আই এস নিয়ে ঘোরে। যুদ্ধ যুদ্ধ খেলে; আর প্রাকৃতিক সম্পদ লুন্ঠন করে। কাজেই আমাদের শান্তিগ্রহের ইতিহাসে আজ এক ঘোর বিপন্নতার এ কোন সকাল, রাতের চেয়ে অন্ধকার!
রাজনীতি-আচার্য দীর্ঘশ্বাস ফেলেন, আমাদের এখানে রাজনীতিটা মানুষের জন্য; আর পৃথিবীতে রাজনীতি একটা ব্যবসা। এই জুয়াখেলায় প্রতিটি দেশে কালো ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দুটো করে পার্টি খোলে; একেক নির্বাচনে একেকদলের ওপর বাজি ধরে লুন্ঠনের এই রাজনীতি-রাজনীতি খেলা হয়। ওরা আমাদের এই শান্তিগ্রহের জনবান্ধব রাজনীতিকে শেষ করে দেবে। পৃথিবীর সভ্যতার পাদপীঠ গ্রীসের যে হাল করেছে নাতসী জীনেরা; এখানেও তাই হবে।
প্রকৃতি আচার্য প্রায় চিৎকার করে বলেন, কোনভাবে চাইনিজগুলো এসে পড়লে আমাদের তাবত প্রাণীকূলকে খেয়ে ফেলবে; যা চোখের সামনে পড়বে। কোরিয়ানরা এলে তো আমাদের গৃহপালিত আদরের কুকুরগুলোও খেয়ে ফেলবে। আরবেরা এলে উটগুলো ঝলসে খাবে। বলদেশিয়ার মুসলমানেরা গরুগুলো খেয়ে সাফা করে দেবে; হিন্দুরা পাঁঠাগুলো চিবিয়ে খাবে। এরা কেউ দেয় কুরবানী-কেউ দেয় বলি; হত্যার রিরংসা আর কী!আমরা যে আনন্দ খেয়ে বাঁচি; এ ওদের বোঝাবে কে! নিরামিষ খাওয়া লোকগুলো উজাড় করবে বনের লতাপাতা। এখন করি কী!
নৈতিকতাচার্য হাহাকার করে ওঠেন, পৃথিবীতে কখনো কোন সভ্যতার উত্থান ঘটেনি। এগুলো ওদের কষ্ট কল্পনা। গরীবের অর্থ লুন্ঠন করে তৈরী করা প্রাসাদ-ট্রাসাদগুলো আবার তাদের হেরিটেজ সাইট। ধাপ্পা দেয়ার জায়গা পায়না আর! সামান্য একটু পড়ালেখা শিখে টিশার্ট পরে কফি খেতে খেতে ওয়াই ফাই জোনে বসে সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রণিক্যাল স্টেটাস আপডেট আর সেলফি আপলোডই ওদের সর্বোচ্চ অর্জন। অথচ আমাদের এখানে কী মন্দ্র দর্শনচর্চার আবহ।
রাজনীতি-আচার্য বলেন, এই ফেইক স্মার্টনেসটা বৃটিশ কলোনিয়াল হ্যাং-ওভার। মুখে বিরাট জ্ঞান-বিজ্ঞানের গল্প আর উপনিবেশ থেকে দরিদ্র মানুষকে লুন্ঠন করা সাদা হাতি সব। পৃথিবী নামের সার্কাস পার্টির জোকারগুলোকে কোন ভাবেই আমাদের শান্তিগ্রহে ঢুকতে দেয়া যাবে না। কারণ এরা পৃথিবীর সৃজনশীল মানুষগুলোকে হিংস্র আক্রমণে মেরে ফেলে। চিত্রকর-কবি-বিজ্ঞানী-ঔ পন্যাসিকদের জীবদ্দশায় ‘পাগল’ বলে মানসিকভাবে হত্যা করে এরা। আর মৃত্যুর পর তাদের জন্য ভক্তি উপচে পড়ে যেন। খুলে বসে পদক ও শ্রদ্ধার ব্যবসা।
সংবাদাচার্য জানান, পৃথিবীতে এখন শিশুদের খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয়, পুলিশ টাকা খেয়ে খুনীকে পালাতে সাহায্য করে। বৃটিশ বা এমেরিকানদের বর্ণবিদ্বেষ ঢুকে পড়েছে বলদেশিয়ায়। নারী নির্যাতন চলছে অহোরহো। নারী অধিকারের দোকানীরা আবার ক্ষমতায়নের ডান্ডা হাতে নিয়ে পুরুষ নির্যাতন করছে। গোল্ড ডিগার নারীগুলো স্বামীর সব সম্পদ লুন্ঠনের জন্য শ্বশুর-শাশুড়ীকে বৃদ্ধাশ্রমে পাঠাচ্ছে। নির্মম লিবিডোর রোগী পুরুষগুলো নারীদের \'বেবিডল\' পণ্য করছে; বুলবুলি আখড়াই চলছে উপমানব সমাজে।
এমন সময় সংবাদাচার্যের স্ত্রী ফোন করে, তুমি কতদিন তোমার মা’র সঙ্গে দেখা করোনি মনে আছে! কেমন সন্তান তুমি! আমি যাচ্ছি শ্বাশুড়ী মার সঙ্গে দুদিন কাটিয়ে আসি।
সংবাদাচার্যের বুকের মাঝে হু হু করে ওঠে। পৃথিবীর প্লাস্টিক নারীগুলো এসে পড়লে এমন ভালোবাসার ইন্দ্রজালের শান্তিগ্রহটি দুর্মুখিনী বশীকরণের কুরুক্ষেত্র হয়ে পড়বে। এমন হেলেন অফ ট্রয় আমাদের প্রয়োজন নেই।
আচার্য সম্মেলন কক্ষের বাইরে বেরিয়ে আসেন, জনমানুষের সামনে করজোড়ে মিনতি করে বলেন, শ্রদ্ধেয় শান্তিগ্রহবাসী; আমাদের আনন্দভূক ভালোবাসার বসত ভিটায় আমরা পৃথিবীর কোন উপমানব ঢুকতে দেবোনা। আমাদের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নেই। কিন্তু প্রকৃতি আমাদের এক প্রতিরক্ষাকবচ উপহার দিয়েছে। সুতরাং দুঃশ্চিন্তার কিছু নেই।
শান্তিগ্রহবাসী আনন্দ পায় আবার অবাকও হয়। সমস্বরে জিজ্ঞেস করে, সেটা কীরকম!
বিজ্ঞানাচার্য এগিয়ে এসে বলেন, পৃথিবীর উপমানবেরা অক্সিজেন বিনাশ করে এক বিষাক্ত গ্যাস চেম্বারে বসবাস করে। আর আমাদের শান্তিগ্রহে ঘন অক্সিজেন চারপাশে। আমরা যে কটি নমুনা পৃথিবী থেকে এনেছিলাম, তাদের কার্বন-ডাই-অক্সাইড খাইয়ে কোন মতে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে; কারণ ওরা শান্তিগ্রহের অক্সিজেনে মাথা ঘুরে পড়ে যেতো প্রায়শঃই। ফলে এটা নিশ্চিত পৃথিবী থেকে কোন কলম্বাস যদি স্পেসশীপ নিয়ে এসেও পড়ে; অক্সিজেনের তোড়ে সে ও তার হানাদার বন্ধুরা মারা পড়বে। সবাই বলুন, উল্লাস।
শান্তিগ্রহবাসী সমস্বরে বলে, উল্লাস।

আপনার মতামত জানান