খাঁজ

বিশ্বজিৎ রায়

 


তার ছোটোবেলার ভাড়াবাড়ি বড়ো ছিল না কিন্তু তাতে ছিল অনেক গোপন খাঁজ । সেই সব খাঁজে কখন যে কী ছবি ফুটে ওঠে কোন প্রাণ জেগে ওঠে তা কিছুতেই বলা যেত না ! তাদের বেঞ্চি লাগানো চারজনের শোয়ার খাটের পায়ের দিকে একটু উঁচুতে ছিল একটা ‘লিনটেল’। অভিধান খুললে লিনটেলের বেশ গুরুগম্ভীর সংজ্ঞা পাওয়া যাবে । শব্দটি ফরাসি বংশ জাত । তাদের বাঙালি বাড়িতে অবশ্য ফরাসি-টরাসির বালাই ছিল না । এ টি দেবের ইংরেজি বাংলা অভিধান ছিল । সে অবশ্য এ টি দেব খুলে মানে দেখার চেষ্টাও করেনি । সে জানত লিনটেল ইজ লিনটেল । খাটের ওপর দেওয়াল থেকে এগিয়ে আসা জানলার কার্নিশের থেকে বড়ো টানা আয়তকার সেই লিনটেলে থাকত ট্রাঙ্ক, সুটকেশ, বাবা-মায়ের বিয়েতে পাওয়া কাপড়ের পুঁটুলি বাঁধা টুকিটাকি । সব কিছুর হিসেব ছিল না । অনেক কিছুই লিনটেনে রাখার পর তারা আছে বলেই ভুলে যেত বাবা-মা । এই লিনটেলের পিছনের দেওয়াল পুরোটা দেখা যেত না । দেখা না দেখায় মেশা সেই ট্রেনের বাঙ্কের মতো লিনটেলের দিকে সে অনেকদিন চুপ করে চেয়ে বসে থাকত । একে একে মনে মনে সেখান থেকে সে নামিয়ে ফেলত জিনিসপত্র । ট্রাঙ্ক, সুটকেশ, পুঁটুলি নামাতে নামাতে সেই লিনটেলখানি ফাঁকা হয়ে যেত । তখন সে মনে মনে উঠে শুয়ে পড়ত সেখানে । তাদের এই শোওয়ার ঘরটি বেশ যেন রেলগাড়ি । হাওড়া-চক্রধরপুর প্যাসেঞ্জার । চলেছে পুরুলিয়া থেকে কলকাতা । সে শুয়েছে ওপরের বাঙ্কে । নিচের খাটটা তলার বার্থ – সেখানে বাবা, মা, দাদা । কু ঝিক ঝিক ঝিক । এই রেলগাড়ির ধোঁয়া সবসময় দেখা যায় না । দেখা যায় সাত সকালে । তখন মা উনুন ধরায় । তার এই ভাবনার ঘোর মায়ের ডাকে ভেঙে যেত । ‘কী রে অঙ্কগুলো হল !’ একধাক্কায় বাঙ্ক থেকে পড়ে যেত সে। পেনসিল তুলে নিত হাতে । সাদা চুনকাম করা ঘরের দেওয়াল টানা বৃষ্টিতে মাঝে মাঝে ফুলে-ফেঁপে উঠত । সেই ফুলে-ফেঁপে ওঠা ড্যাম্পলাগা দেওয়ালের রঙ হঠাৎ যেত বদলে । সাদা দেওয়াল হত ছানা-কাটা নীলচে । তাতে ফুটে উঠত নানা রকম ছবি । একদিন সকালে ঘুম ভেঙে সে দেখল লিনটেলে সুটকেশের খাঁজ থেকে উঁকি দিচ্ছে নীলচে মেঘের দল । সেই মেঘের জলছবির যেখানটা দেখা যাচ্ছে না সেখানে কী আছে ? খুব জানতে ইচ্ছে করে তার । আজ টানা বৃষ্টি । ইস্কুল যাওয়ার উপায় নেই । সারাদিনে সে ঠিক খুঁজে নেবে ঢেকে থাকা ছবি । সে ছবি কি রেলগাড়ির ধোঁয়ার ? সকালের উনুনের ধোঁয়া শুধু নয় । তার বাঙ্কের গা বেয়ে এখন সারাদিনের ধোঁয়ার ছবি ।
তাদের বাড়িতে কাজে লাগে এমন জিনিসের থেকে কাজে লাগেনা এমন জিনিসের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি । যেমন লিনটেলে থাকা জিনিসগুলোর অনেককটাকেই কোনোদিন ব্যবহৃত হতে দেখেনি সে । তবু তারা থাকত – ফেলে দেওয়া হত না । লিনটেলে ধরত না যারা তারা থাকত অন্যরকম খাঁজে । তাদের শোয়ার ঘরের পাশে ছিল একচিলতে আরেকখানা ঘর – সেটায় তাদের ভাঁড়ার থাকত আর থাকত সারি সারি ঠাকুর । সেই ঠাকুরেরা থাকত সিমেন্টের টানা একটা তাকে । মা এই ভাড়া বাড়িটাকে পছন্দ করত কেননা এই বাড়িটায় ছিল সিমেন্টের নানা মাপের তাক । ঠাকুরের তাকে ঠাকুর ছাড়াও থাকত গঙ্গাজলের শিশি, মাটির লক্ষ্মীভাঁড় আর পেতলের ঘট । সেই ঘটের ওপর ধানের ছড়া । আর থাকত কিছু আরশোলা এবং একখানা নেংটি ইঁদুর । আরশোলারা অসম্ভব ভালো লুকোতে পারত । মা রাসের মেলা থেকে কৃষ্ণনগর থেকে আসা যে মাটির ঠাকুরদের কিনেছিল তাদের পেছনে ছিল ফাঁক সেই ফাঁকের মধ্যে আরশোলারা বাসা বুনত, থাকত জোড়ায় -- ক্রমে পারিবারিক সুখে আরশোলারা বড়ো হত । তাদের মাসে একবার নিকেশ করার চেষ্টা করত মা । খুব একটা লাভ হত না । আর ছিল নেংটি ইঁদুর, তার আনাগোনায় হাত দেওয়া যেত না । যতই হোক গণেশের বাহন তো । বুধি ধরে, ধরা দেয় না । মায়ের প্রিয় ঠাকুর অবশ্য গণেশ নয় লক্ষ্মী । ‘দোলপূর্ণিমার নিশি নির্মল আকাশ / বহিতেছে মৃদুমন্দ মলয় বাতাস’ – মা লক্ষ্মী পাঁচালি পড়ত । আর সে দেখত ইঁদুর আসে কি না । ঠাকুর না আসুক লক্ষ্মী ঠাকুরের দাদার ইঁদুর তো আসুক । তাই বা কম কী !
ঠাকুরের তাকের উলটো দিকে থাকত একটা সিঙ্গল খাট । মা মহাদানীকে দিয়ে করিয়েছিল । মহাদানী স্কুলেও পড়াত আবার কাঠের ব্যবসাও করত । ইনস্টলমেন্টে কাঠের ফার্নিচার দিত । সেই সুযোগে ছত্রিওয়ালা কাঁচ-কোঁচ শব্দ করা সিঙ্গল খাট এল । খাট এল কিন্তু তাতে কেউ শুতে গেলো না । বেঞ্চিলাগানো চারজনের খাট থেকে এঘরে কে আসবে? তাছাড়া সেই খাটের ওপর অমন বাঙ্কের মতো লিনটেল নেই । রেলগাড়ি ছেড়ে কে আসবে সিঙ্গল খাটে ! সেই খাট আসার ফলে ঠাকুরের তাকের উলটো দিকের দেওয়ালের জানলা দুটোর অনেকটা ঢেকে গেল । এই জানলাগুলোর সামনে বেশ খানিকটা জায়গা, সেই সিমেন্টের এগিয়ে আসা অংশে বসাও যায় । খাটে ঢেকে গেল বলে আর বসা গেল না । বসার জায়গা বদলে গেল খাঁজে । এক জানলার খাঁজে থাকত তার বই আর স্কুলের অ্যালুমিনিয়ামের সুটকেশ । অপর জানলায় থাকত একটা বড়ো চামড়ার বাক্স । সেটাও মা-বাবার বিয়েতে পাওয়া । দূরে কোথাও যাওয়ার দরকার হলে ওই বাক্স নিয়ে যাওয়ার কথা । বাক্স অবশ্য জানলার খাঁজে বসেই থাকত । তাদের দূরে যাওয়ার টাকা ছিল না, তাই তারাও কোথাও যেত না – বাক্সও যেত না । সে ভাবত ঠাকুর না আসুক, ইঁদুর আসুক । ইঁদুর এলেও হবে । ঠাকুর এলে টাকা হয় । ঠাকুরের বাহন এলেও খানিকটা হয় । খানিকটা টাকায় তারা যাবে দূরে – আর যাবে তাদের বাক্স ।
এমনিতে কানে শুনতে না পাওয়া চোখে দেখতে না পাওয়া কৃষ্ণনগরের ঠাকুরও যে কখনও কখনও কথা শুনে ফেলে সে জানত না । জানতে পারল এক শীতের সকালে । ঠাকুরঘরে ঢুকে বাবা শুনতে পেল কিঁচকিঁচে শব্দ । সে শব্দের উৎস কী ! এদিক তাকায় ওদিক তাকায় – খুঁজে আর পায় না । বাবার ডাকে মা এল । মাও খুঁজছে, পাচ্ছে না । তবে কি পাখি ? ভেন্টিলেটারে পাখির বাসা ! তা কী করে হবে ! এখানে তো পাখি নেই । শেষে পাওয়া গেল । চামড়ার বাক্স থেকে ওই কিঁচ কিঁচে শব্দ আসছে । মা খেয়াল করল চামড়ার বাক্স পুরো বন্ধ হয় না । বাক্সের খোলা-বন্ধ হওয়ার কলে মরচে ধরেছে । তেল দেওয়া হয়নি । ওই বাক্সে কিছু ঢুকেছে । তারাই কিঁচ কিঁচ করছে । কিন্তু তারা কারা ? খুব সাবধান । মায়ের নির্দেশ মতো বাবা খুব সাবধানে সেই পুরো বন্ধ না হওয়া চামড়ার বাক্স ধরে চট জলদি নিয়ে গেল বাড়ির পেছনের বাগানে । তারপর বাক্স খুলে উলটে দিল । আর তখনই তাদের সামনে বাগানের মাটিতে কিঁচ কিঁচ করতে করতে ঝরে পড়ল বাক্সের মধ্যে থাকা নেংটি ইঁদুরের চারখানা বাচ্চা । তখনও তাদের চোখ ফোটেনি , লাল তাদের রঙ । শীত সূর্যের আলো তাদের চোখে সইল না । তাদের দেখতে পেয়ে সহসা গাছের ডাল থেকে নেমে এল কাকের দল । চোখের নিমেষে সেই লাল চোখ না ফোটা ইঁদুরের বাচ্চাদের ওপর কাকের আক্রমণ । বাবা মা হতচকিত ।
বাবা মা জানল না, কিন্তু তার মন গেল খারাপ হয়ে । আর কিছুদিন ওই চামড়ার বাক্সে থাকলেই ইঁদুরদের চোখ ফুটত, তারা বড়ো হত । তাদের দেবতা গণেশকে বলত ‘এদের বাক্স ভরে টাকা দাও।’ তখন গণেশ লক্ষ্মীকে খবর দিত । লক্ষ্মী দাদা গণেশের কথা শুনে ইঁদুরের মুখে পিঠে কিছু টাকা পাঠাত । সেই টাকায় তারা দূরে যেত । সমুদ্দুরও দেখতে পেত । তাদের সঙ্গে যেত চামড়ার বাক্সও । কিন্তু যাওয়া আর হল না । ইঁদুরের বাচ্চারা সব চোখ না ফুটতেই মরে গেল যে । জানলার খাঁজে তাই আজীবন বসে রইল ওই চামড়ার বাক্স । আর সে মনে মনে বলেই চলল, তার ছোটোবেলায়, ‘ধুর ধুর /সমুদ্দুর/ অনেক দূর।/অনেক দূর!’




আপনার মতামত জানান