‘এ’ চিহ্নের গোলোকধামে

সরোজ দরবার

 




মেলা ছিল নেহাতই চড়কের। তবু প্যান্ট হলুদ করে ফিরল দেবনাথ। অথচ বয়সটা তার মোটেও সেরকম নয়। ‘ওই আধো কথা ন্যাকামি, পাকা কথা জ্যাঠামির বয়সে আমরা ততোদিনে পৌঁছে গেছি।গলার স্বর ভেঙেছে। সদ্য গোঁফ-দাড়ির আভাস দেখা যাচ্ছে।শরীর জুড়ে আমূল বিপ্লব। অস্বস্তিরও যে অচেনা আনন্দ থাকে তা আধেক ধরা দিয়েছে। বাকি আধেক মেলে এতদিনের চেনা সহপাঠিনীদের দিকে তাকিয়ে।আয় তবে সহচরী..কিন্তু আর যে নাচিব ঘিরি ঘিরি শোভা পায় না, সে তো বোঝা হয়ে গেছে। অতএব কী করি! উত্তর মেলে না দেখে আমাদের সন্দীপ কেয়াকে একখানা প্রেমপত্রও লিখে ফেলেছে ততোদিনে। শচীনের বিতর্কিত রান আউটের থেকেও বড় খবর তখন, এইট এ-র মোহিতদা, এইট-সি র নীপাদিকে যে চিঠি ছুঁড়ে দিয়েছিল তা লক্ষ্যভ্রস্ট হয়ে বায়োলজির টিচার তপনবাবুর পাঞ্জাবির পকেটে গিয়ে পড়েছে। অতঃপর আসছে বায়োলজি ক্লাস, মন তাই বলছে কী জানি কী হয়!
এহেন বয়সে চড়কের মেলা নেহাতই পানসে। গুবগুবি কেনার বয়স গেছে, কিন্তু কী যে কিনতে আমার মন বলে চাই চাইরে...সে আর ভেবে পাই না। কিন্তু বাংলা ক্লাসে প্রায়ই হাতছড়ি খাওয়া দেবনাথ যে, যেখানে দেখিবে ছাই, উড়াইয়া দেখো তাই করে সেই বয়সের অমূল্যরতনটি খুঁজে আনবে কে জানত।আমরা জানতাম ওই সব বইয়ের দোকানে লক্ষ্মীর পাঁচালি, ব্রতকথা বিক্রি হয়। বড়জোর টুকিটাকি হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা কিংবা কালিদাসের হেঁয়ালি। কিন্ত আসল হেঁয়ালিটা ধরতে পেরেছিল দেবনাথ, যখন ঐ সব বইয়ের ফাঁকেই আবিষ্কার করে ফেলল বয়সন্ধির স্বপ্নরঙিন দিনের চাবিকাঠি। আমরা ক্লাসে ছাই উড়ানোর কবিতা আওড়েই গেছি, কিন্তু শিক্ষার ব্যবহারিক দিকটা বিন্দুমাত্র বুঝিনি।
এ তো গেল গৌরচন্দ্রিকা পর্ব। আখর দিয়ে আমরা যখন মূল পালায় ঢুকলাম তখন শনিবার হাফ ডে-র রোদ্দুর বারপোস্টের একপাশে ঢলে পড়েছে। প্রহর শেষের আলোয় রাঙায় সেদিন কী মাস মনে নেই, তবে আমরা স্বচক্ষে দেখলাম আমাদের সর্বনাশ। দেখলাম, ভূগোল বই যেমন বলে, পৃথিবীর তিন ভাগ জল, আর এক ভাগ স্থল, পৃথিবীটা শুধু তাই নয়। এর বাইরেও একখানা পৃথিবী আছে। সে পৃথিবীর আলাদা ভূগোল। সেখানে চড়াই-উতরাই, নদী-গিরিখাতের পৃথক ভূমিরূপ। আমরা ম্যানগ্রোভ অরণ্যের তরুণ পরিব্রাজক, ভূগোলের সেই নয়া আবিষ্কারে শিহরিত তো হবই। সে শিহরণ আঁখি হত ঘুম নিল হরি। এমনকি ঘুমের ভিতরও রেহাই দিল না। সকাল জোড়া অস্বস্তি আর লজ্জানিবারণের ভিতর দিয়েই দিনে দিনে আমাদের সাবালক করে তুলল সেই প্রথম পাঠ।
কিন্তু শিহরণের আরও বাকি ছিল যখন সবিস্ময়ে দেখলাম, একদিন যে জিনিসকে আমরা প্রায় নিষিদ্ধ ইস্তাহারের মতো গোপনে পাচার করেছিলাম, সে ঠিক ততখানি গোপনীয়ও নয়। যদি অবশ্য প্যাকেজিংটা ঠিকঠাক থাকে। ফলে অল্প কিছুদিনের মধ্যেই আমাদের কলঘরে স্নান দীর্ঘায়িত করে দিলেন অদ্বিতীয়া সবিতা ভাবী।এতদিন আমরা জানতাম মা দুগগার অসুর তার সমস্ত পুরুষালি চিহ্ন নিয়ে খোলা বুকে দাঁড়িয়ে থাকলেও নম্র মেয়েরা তাকে হাতজোড় করে নমস্কার করবে। আর বিমল পটুয়া যখন নগ্নিকা দেবীমূর্তিদের রোদ্দুরে রেখে দেবে, তখন নিতান্ত জ্যাঠা ছেলেও আড়চোখে তাকাবে, কিন্ত দেবীর বাইরে তাকে আর কিছু ভাববে না। সবিতা ভাবী এসে আমাদের মনে করিয়ে দেবে, আহা অসুর কী বেচারা। মনে করিয়ে দেবে, ওই নগ্নিকা দেবীমূর্তিরাই কী করে স্বপনে বাঁশি বাজাতে পারে। ফলত দুয়ে দুয়ে মেশানো চারে বয়ঃসন্ধি পার রুই কাতলারা সব ধরা পড়বেই এটাই স্বাভাবিক।
আসলে আমাদের দেশ তো ওয়াল্টারের দেশ নয়। যদিও তাঁর সত্যি নাম ওয়াল্টার (অনেকের ধারণা এটি তাঁর ছদ্মনাম। আসল নাম হেনরি স্পেন্সর অ্যাসবি)কি না সে নিয়ে সন্দেহ আছে, কিন্তু ‘মাই সিক্রেট লাইফ’-এ তিনি যেভাবে বর্ণনাতীতভাবে নিজের সহস্রাধিক রমণীর সঙ্গে যাপিত যৌনজীবনের আখ্যান রচনা করেন, সে সব আমাদের দেশের জলহাওয়ায় বোধহয় টিকতই না। শুরুবাতটাই তো করেছিলেন সেই পাঁচ কিম্বা আট-এ ... ‘my earliest recollections of things sexual are of what I think must have ocqurred sometime between my age of five and eight years. I tell of them just as I recollect them. Without attemt to fill in what seems probable. She was I Suppose my nursemaid. I recollect that she sometimes held my little prick when I piddled, was it needful to do so?’ … she kissed, me, got out of my cock, and played with it, took one of my hands and put it underneath her clothes. It felt rough there,that’s all, she moved my little hand violently there, and then she felt my cock and again hurt me, I recollect seeing the red tip appear as she pulled down the prepuce, and my crying out, and her quieting me. Then of her being on back, of my sttriding across between her legs, and her heaving me up and down, and my riding cockhorse and that it was not the first time I had done so. Then I fell flat on her, she heaved me up and down and squezzed me till I cried. I scrambled off of her, and in doing so my hand,or foot,went through a drum I had been drumming on, at which I cried.’
বর্ণনায় যদি লেখকসুলভ কিছু অতিরঞ্জন থেকেও থাকে, কিন্তু আমাদের কলঘরের গান এতখানি স্পষ্টবাক নয়। মোদ্দা কথা এতটা সাহসি নয়।এমনকি খুশবন্ত সিং তাঁর ‘কোম্পানি অফ ওম্যান’-এ যেভাবে একের পর এক রমণীসঙ্গের মনলোভা বিবরণ দেন, আমাদের ধরণটা ঠিক ওরকম খুল্লমখুল্লাও নয়। ছোটমাসির বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদার সময় যৌনতার প্রথম স্বাদ পাওয়ার কথা সকলেই বলতে পারেন না, কেউ কেউ পারেন। অথবা এহেন সরাসরি বাচন আমাদের রাখাঢাকা আতুপুতু সংস্কৃতির পরিপন্থিও বটে। অবশ্য সেক্সচুয়ালিটি এবং পর্ণোগ্রাফির মধ্যে সূক্ষ্ম প্রভেদটি বহুকাল থেকেই আমাদের কাব্য সাহিত্যে রক্ষিত হয়েছে। কিন্ত বয়সন্ধির কী কষ্ট যাচ্ছেতাইরা এত প্রভেদ বোঝে না। তাই সুনীল গাঙ্গুলির ‘জোছনাকুমারী’ থেকে তারা সযত্নে দেশভাগের ট্র্যাজেডিটা বাদ দিয়ে বাকিটুকু ছেনে নেয়। কষ্টেসৃষ্টে মিলে যাওয়া মিলন মুখোপাধ্যায়ের ‘রাতপরীদের ব্যাংকক’ হাত থেকে হাতে পাচার হয়ে যায় নিষিদ্ধ ইস্তাহারের মতো। যা কিছু প্রাপ্তবয়স্ক তাতেই তার টান। মনে আছে, দু’ক্লাস উঁচুর নিতাইদা গোঁফে হাত বোলাতে ঈষৎ গাম্ভীর্জের সঙ্গে বলেছিল, এগুলো প্রাপ্ত হলেই প্রাপ্তবয়স্ক। অন্য কোন মাপকাঠি নেই বুঝলি। আমরা শুধু আমাদের জলহাওয়ায় বড় হতে হতে বুঝেছিলাম মাপকাঠি একটা আছে, সেটা শুধু কতট প্রকাশ্যে আর কতটা গোপনে তারই অন্য কিছু নয়।
মোদ্দা কথা আমাদের ধরণটা ঠিক ‘আমেরিকান পাই’ নয়, বরং অনেকটাই ‘ম্যালিনা’ গোছের। একটু আড়াল আবছায়া পেলেই আলো হয়ে ওঠে আরব্য রজনীর রূপকথা। সুতরাং মামীর হাতে সিঙি মাছের ঝোল খাওয়ার পরই আমাদের তিন ইয়ারি কথা’য় জমে উঠবে পর্নোগ্রাফি ম্যাগাজিনের গল্পগাছা। কিংবা শোনা নয়, শুধুই দেখার।এবং অবধারিতভাবে সেখানে মশা মারার ধূপ জনিত দুর্ঘটনাও থাকবে।দুর্ঘটনা আরও যা যা থাকে সে শুধু ফড়িং কেন আমরাও জানি। যে জীবন দোয়েলের তার সঙ্গে আমাদের মিল নেই, কিন্তু ফড়িঙের জীবনের সঙ্গে এক্ষেত্রে অন্তত আমাদের দেখা হয়।
ক্রমে সময় গড়িয়ে গিয়েছে। আজ দেখি যা ছিল রোমাঞ্চ তাইই বিরক্তি। যা ছিল অনুরাগ তাইই রাগ। যা ছিল গোপন তাইই প্রকাশ্য। দেশের সাহিত্যবাসর আর টেটের ফর্মের পাশেই তাই দিব্যি ক্লিভেজে বিন্দু বিন্দু জল ধারণ করে গরমের ফুটপাতে তৃষ্ণার জল হয়ে চেয়ে থাকে প্রচ্ছদযুবতীরা। গোপনীয়তার গোলোকধাম আজ যতখানি প্রকাশযোগ্য, ততখানিই সহজলভ্য। সব পথ যেমন রোমেও যায় না, সব প্রকাশ্য বস্তুতে রোমাঞ্চও থাকে না। কিন্তু যার সঙ্গে বাজার জড়িয়ে আছে সে আর কতদিন ঘরে থাকবে? বাহির হয়ে এসো তাই যে ছিলে আড়ালে। আজ যে কোন ওয়াবসাইট খুললেই একদিকে ঝুলে পড়বে আধা নগ্ন শরীর। আজ বিজ্ঞাপনও অকারণে চঞ্চল। তাই প্রেক্ষিত যাই হোক চোখে পড়বে নগ্নতার বিপণন। হ্যাঁ বাজারচলতি যে নামই থাকুক, সেগুলোও পর্ণোগ্রাফিই। এমনকি আমাদের বলিউডি-টলিউডি মশালা ছবিগুলিও তো কৌশলে পানুর হকারি করছে। সম্প্রতি ‘মস্তরম’ নামে এক ছবি মুক্তি পেয়েছে। যেখানে এক যশপ্রার্থী লেখক প্রকাশকদের দোরে দোরে ঘুরে ঘুরে শেষমেশ পেট চালাতে পানু লিখতে শুরু করবেন মস্তরম নামে। রোজগারও করবেনও ভালো। চেনাশোনা সব লোককেই তিনি দেখবেন তাঁরই লেখা রগরগে পানু সব গোগ্রাসে গিলছে।কিন্তু তাঁর পরিবার-পরিজন সমেত তাঁরাই যেদিন জানতে পারলেন যে তিনিই মস্তরম সেদিন তাঁকে অচ্ছুত করে দিলেন সকলে। আমাদের পণ্যসভ্যতার ধরনটাও যেন সেরকম। কাজে-অকাজে-টিভিতে-কাগজ ে পর্ণোগ্রাফি ব্যাপারিদের মগজ সচল। শুধু কিছু মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা।
আজ আর একখানা বই নিয়ে কাড়াকাড়ি নেই। একখানা সিডি নিয়ে হাতে হাতে ফেরাও নেই। আজ জালের দুনিয়ায় যে কোন মুহূর্তেই ডাউনলোড হয়ে যায় উষ্ণতা। সে উষ্ণতা হয়তো আজকের বয়সন্ধিদের কাছে উষ্ণভাবেই অনুমেয়, কিন্তু সোনায় সোহাগা হয়ে তাতে গোপনীয়তার আনন্দটাই নেই। মাল্টিপ্লেক্সগুলোর ভিড়ে সেই হলগুলোর দেখা নেই, যেখানে রোজ দুপুরে নীল রঙয়ের ঘন অন্ধকার জমত। আজও মেলা জমে, কিন্তু পাঁচালির নীচে আর সে সব বই মেলে না। আজ পেন ড্রাইভে পকেটবন্দি হয়ে ল্যাপটপ থেকে ফোনে পাচার হয়ে যায় সবিতাভাবী।
সুতরাং আমাদের গেছে যে দিন একেবারেই গেছে। পণ্য-পর্ণো-প্রযুক্তির ষড়যন্ত্র গোপন কথাটি আর গোপনে রাখতে দিল না। এদিকে আমাদের দিন ফুরোল। ব্যাকুল বাদল সাঁঝে দেখি শ্রেণিশত্রু জ্ঞানে পানুর হকাররা একে একে আমাদের প্রত্যাখান করে এগিয়ে যাচ্ছে কম বয়সের দিকে।
সে মুহূর্তে নিজেদের দিকে তাকিয়ে আমরা স্পষ্টই বুঝে যাই, শরীরে কোথাও ‘এ’ চিহ্ন নেই তবু আমরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে গেছি।
পুনশ্চ- এবার তো ওয়েবসাইটও গেল। তবে নাকি কীসব কোড ইত্যাদি আছে, যা দিয়ে খোলা যাবে। ওই দেখলে হবে, খরচা আছে গোছের ব্যাপার আর কী! প্রাপ্তবয়স্কের অপ্রাপ্তিজ্বালা যে বাঁধ বানবে না, তা বেশ ভালোই জানে কারবারীরা। আর মোবাইলে দিব্যি পাওয়া যাবে। আহা দেশপ্রেম! সত্যিই তো, গরীবগুর্বো দেশে আবার কম্পিউটরের খরচ করবে ক’জন? আজ তো সবার হাতেই স্মার্টফোন? টুকরো ক্লিপ ছেড়ে দিলেই কেল্লাফতে। হাত বয়ে নেশা এলে, বুঁদ হবে না এমন সচ্চরিত্রের ন্মুনা মাতালের থেকে আশা করা বৃথা। অতএন এবার বাণিজ্য হাতে হাতে, কৌশলে, আরও বিস্তারিতভাবে। হায় পর্ন, সত্যি তোমার এফিটাফ লেখার সময় হয়েছে। বয়স্কা বারবণিতার মতোই আজ আর তুমি অহঙ্কার করতে পারো না, পূর্বের সেই আবছায়ার গৌরব স্মরণ করে হয়ত বিচলিত হও আর বিকিয়ে যেতে বাধ্য হও বাজারীদের হাতে। নীল কৌলীন্য বলে আজ আর বোধহয় কিছু অবশিষ্ট থাকল না এই বাজারসভ্যতার হাতে।

আপনার মতামত জানান