যা জানি না

রঞ্জন ঘোষাল

 


সুনীল গাঙ্গুলির জীবনের অনেক বিষয়ে আমরা সবাই অল্প-বিস্তর জানি। কিন্তু আমাকে যেটা ভাবায় সেটা হচ্ছে, কত কী যে অজানা।
আমি এই না জানার একটা লিস্টি তৈরি করেছি। আপনারা যদি কেউ জানেন, আমার তাদের কাছ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে কোনো আপত্তি নেই।

• উনি যথেষ্ট অনূদিত হন নি কেন? যেটুকু হয়েছেন তাতে একপিস নোবেল কি ওঁকে দেওয়া যেত না?

উনি কেন নোবেল পেলেন না, এ বিষয়ে আমার দীর্ঘদিনের ক্ষোভ আছে। ক্ষোভ এই কাওরণে যে আমরা একটি যথাযথ সুনীল ফ্যান ক্লাব তৈরী করতে পারিনি। পারলে, এবং যোগ্যভাবে সেই ক্লাবটি পরিচালনা করতে পারলে আমরা স্ট্র্যাটেজিকভাবে এই ইস্যুটা নিয়ে লড়ে যেতে পারতাম। প্রপার বা ইম্প্রপার চ্যানেলে গিয়ে লবিইং করা দরকার ছিল। নইপাল আমাদের চেনা লোক। একটু খ্যাপাটে আছেন। কিন্তু আরো কিছু চেনা শোনা বেরিয়ে পড়তে পারত। (নোবেলে নমিনেটেড হতে গেলে ঐ বিষয়ে নোবেল পাওয়া কারুর রেকমেন্ডেশন লাগে, সেতা জোগাড় করা যেত নিশ্চয়ই) আমরা মোট কথা, যথেষ্ট গা করিনি। নোবেল কি আর এমনি এমনি আসে রে ভাই? অমর্ত্য-দা যদি এ দেশেই বসে থাকতেন, নোবেল থোড়াই না পেতেন।

উনি বাঙালেপনা ছাড়লেন কী করে? ওঁর চরিত্রের মধ্যে হাভাতেপনা কেন ছিল না?

বাঘের কখনো ডোরা বদলায় না। বাঙাল কখনো মানুষ হয় না। ওঁর মামাবাড়ি ছিল বরিশাল। বরিশালের লোকেরা হেঁকে-ডেকে ছাড়া কথা কয় না। (শঙ্খবাবু-স্যার বা বুদ্ধদেব গুহ মানে লালাদা এক্সেপশন। ওঁরা ভিন্ন গ্রহের লোক।) ঘ্যটিদের বোল-বচন মিঠে মিঠে। বাঙ্গালদের মধ্যে লক্ষ করে দেখবেন মার্জিতভাব, সভ্যতা-ভব্যতা কম। অথচ সুনীলদাকে দেখে মল্লিকবাড়ির একজন রাজাগজা মানুষ নাকি মুগ্ধ হয়ে একবার বলেছিলেন, আপনি ওপারের? ভাবাই যায় না। আপনি তো এককথায়, ভদ্রলোক।
আর এক মহিলা বলেছিলেন, সুনীলবাবু, আপনার লেখায় কিন্তু এক্কেবারে বাঙাল টান নেই।
যখন মমতা হাওয়ায় পশ্চিমবংগ তোলপাড়, সেই প্রাক-নির্বাচনী সময়ে উনি মমতার সর্বনাশী ও অবিমৃশ্যকারী স্বৈরাচার-প্রবণতা সম্পর্কে অতটা শিয়োর হয়ে উল্টোমুখো হেঁটেছিলেন কোন দৈব অনুপ্রেরণায়?

(পশ্চিমবঙ্গের বুদ্ধিজিবিরা দীর্ঘজীবী হোন। কিন্তু বাম জমানাকে হঠাতে গিয়ে তাঁরা এ কোন্‌ হবুচন্দ্র রাজাকে আমদানি করলেন?)
সুনীলদাকে সবাই ছি ছি করেছে। তবু উনি নড়েননি তাঁর অবস্থান থেকে। মমতারা গদিতে বসলেন, বসেই সুনীলকে ব্রাত্য করলেন। আর ব্রাত্যকে করলেন মন্ত্রী। সভায় অনুষ্ঠানে কলকাতা ছেয়ে গেল। সুনীলের নেমন্তন্নও হল না। অথচ, সুনীলের মরদেহ যাত্রার সময়ে দেখা গেল মমতা ভিড় সামলাচ্ছেন। ফুঁপিয়ে উনি একবার দুবার কেঁদেও ফেলেছেন হয়ত। তৃণমূলের একজন বলবান নেতা শোক মিছিলের অফুরন্ত জনসমাবেশ দেখে রুষ্ট হয়ে নাকি বলেও ফেলেছিলেন, “ওহ্‌ এরা সুনীল দেখাচ্ছে। ঠিক আছে, ঠিক আছে, আমাদেরও মহাশ্বেতা দেবী আছে। তখন দেখিয়ে দেব শোক মিছিল কাকে বলে। রাস্তায় ট্রাইবাল ট্যাঙ্গো লাগিয়ে দেবো। রায়বেঁশে, ছৌ। শহীদ মিনার জড়িয়ে দেব বাংলার কাঁথায়।“
বেঁচে থাকুন মৃণালদা, মহাশ্বেতাদি চিরজীবী হয়ে, শকুনের আকুতিতে গরু মরে না। ঐ তৃণমূল নেতা এও জানেন না, মহাশ্বেতা দেবী ওদের শিবিরে আজ বহুদিন নেই।

উনি কোন কৌশলে অত আয় করে গেছেন?
আনন্দবাজারের মাইনেতে তো ওঁর বাজার খরচটুকুরও জোগান হত না। শুধু লিখে?

উনি যে বড়োলোক ছিলেন তার প্রমাণ আমাদের সবার কাছেই আছে। প্রকৃত অর্থে বড়োলোক। না, না, উনি তেমহলা দালান হাঁকান নি বা অ্যাস্টন মার্টিন গাড়ি কেনেন নি। ডোন্ট বি সিলি। কিন্তু একজন প্রকৃত বড়োলোকের যা যা লক্ষণ তা তো ওঁর মধ্যে দেখা গিয়েছে। অকৃপণ হস্তে দান ধ্যান করে গেছেন। তাঁর গাড়ির ড্রাইভার, বাড়ির পরিচারক এদের জন্য ফ্ল্যাট কিনে দিয়ে গেছেন। দিয়েছেন অচিরেই লাটে তোলার জন্য প্রস্তুত বইয়ের ব্যবসা।
আজ নয়, বছর তিরিশেক আগে, উনি তখন মধ্য-চল্লিশ, বেহালায় এক ক্যান্সার হাসপাতেলে গিয়ে পাঁচলক্ষ টাকা দান করে এসেছিলেন। মীডিয়াতে খবর-টবর যাতে না হয় সে সব গোপনীয়তাকে সতর্কভাবে এনশিয়োর করে। তিরিশ বছর আগে পাঁচ লক্ষ? মানে উনি রিয়েল এস্টেটে ইনভেস্ট করলে আজ কোন্‌ না পাঁচ কোটি টাকা হেসেখেলে। পুপ্‌লু (সুনীল-পুত্র সৌভিক)কে তাহলে আজ ঐ ধ্যাদ্ধেড়ে আমেরিকায় পড়ে থাকতে হত না।
তাহলে? সুনীল কি লটারি পেয়েছিলেন? লন্ডনের ডার্বি জিতেছিলেন?
উনি সি-আই-এ কিম্বা কেজিবির দালালি করতেন না, গোপনসূত্রে আমরা তা জানতে পেয়েছি। অসাধু পথে উপার্জন করার পার্টি উনি ছিলেন না।
তাহলে? তাহলে?
আচ্ছা, মানা গেল, লিখে। লিখে উনি লক্ষ লক্ষ ্টাকা আয় করেছেন। কিন্তু কী ভাবে? তাঁর অধিকাংশ পাঠক তো বাংলাদেশে। তারা তো অমনিই ছাপায়, মূল প্রকাশককেও এক পয়সা ঠেকায় না। লেখককে তো নয়ই। ম্যাক্সিমাম, যেটা ওঁরা করতেন সেটা এই, যে ঢাকায় গেলে উনি যে হোটেলে থাকতেন সেখানে গিয়ে খানিকটা উইস্কি ধ্বংস করে আসতেন আর অশ্রুপূর্ণ কণ্ঠে বলতেন, “দাদা কী ল্যাখসেন। ইতিহাসরে জীবন্ত কইরা তুলসেন”। কিম্বা, “দাদা, একটা পশ্নের একটু মীমাংসা কইরা যান। কবি-ল্যাখক হিসাবে কে বেশি জীবনসম্পৃক্ত? নির্মলেন্দু গুণ না রফিক আজাদ?” (বস্তবিকই বাংলাদেশীদের মধ্যে হাড়-হারামজাদা লোক পশ্চিমবঙ্গের তুলনায় কম কিছু নয়।।)
তা এঁদের কাছ থেকে দুপয়সা আয় হয়নি কদাপি। আবার, কলকাতার প্রকাশকেরা লেখক ঠকাতে ওস্তাদ। এঁরা শক্তিপদ রাজগুরুকে বেটার লেখক ধরেন। একটা সময় ছিল যখন নবকল্লোলের চিত্তরঞ্জন মাইতি, হরিনারায়ণ চট্টোপাধ্যায়, মায়া বসুরা উপন্যাসের জন্য সুনীলের চেয়ে বেশি অঙ্ক দাবী করতেন । সুনীল অসংখ্য লেখা লিখেছেন লিট্‌ল ম্যাগাজিনের জন্য, তারা পয়সা দেয় না। ঊল্টে তাদের অনেককেই উনি অর্থ সাহায্য করেহেন বলে খবর পাওয়া গেছে। তাহলে ওঁকে অর্থ জুগিয়েছে কে? বা কারা? আনন্দবাজার গোষ্ঠী? অমন পীরিত তো তাদের মধ্যে দেখিনি কো ভাই। যাঁরা সুনীলকে দেশের সম্পাদক করতে পারলেন না অথচ আটতরিশ বছর ধরে দেশের সম্পাদকীয় লিখিয়ে গেলেন, তাঁরা সুনীলের ঝুলি ভরে ভরে দিয়েছেন?
নাকি আনন্দ পাব্‌লিশার্সের বাদল বসু? সখ্য ছিল ওঁদের ঠিকই, কিন্তু কেস্‌টা ‘আপনি খেতে পায় না শঙ্করাকে ডাকে’র মত হয়ে আচ্ছে না?
অন্য বহু প্রকাশকও এসে হাতে পায়ে ধরে উপন্যাস, গল্পের কালেকশানের বায়না দিয়ে গেছেন। তাঁদের ৮০ শতাংশই মিনি মাগনা বায়না করেছেন। এবং প্রকাশের পরে ঘুণাক্ষরেও বিক্কিরির কমিশন দিতে আসেননি। সে না এসেছেন, না এসেছেন, আপনার আমার তাতে কী? কিন্তু মূল প্রশ্নটা যে রয়েই গেল। উনি তো ঠাকুর দেব্‌তা মানতেন না। তাহলেও লক্ষ্মীর কৃপাটি কোন জাদুবিদ্যায় হাসিল করেছিলেন সুনীল?

অভিজ্ঞতা সংগ্রহের দ্রুততার নাম কি বুদ্ধি? উনি কি অণুতে ভূমা দর্শন করতেন? নইলে তাঁর সৃষ্টির পথ এত বিচিত্র অভিজ্ঞতায় আকীর্ণ হল কীভাবে?

নানান ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার গল্প বলতেন উনি। অসাধারণ সব এনেক্‌ডোটস। কিন্তু ওঁর কোনো লেখায় সেগুলোর কোনো উল্লেখ কখনো দেখিনি। সেই শোনা গল্পগুলো এবারে নিজের নাম করে বাজারে ছাড়বো ভেবে রেখেছি। ভালো প্রকাশক পেলেই মোটা দাঁওয়ে। আমার সঙ্গে চালাকি নয়!) ওঁর অভিজ্ঞতার ঝুলি কি ছিল অফুরান? এক গল্প দুবার বলেন নি। (কিন্তু ‘সারা জীবন ধরে একটাই তো কবিতা লিখতে চেষ্টা করেছি’)।
সুনীলদা ছিলেন মোটাসোটা মিষ্টির দোকানের কর্মচারীদের মত চেহারার লোক। শঙ্খবাবুর মত মিহিন চেহারাটি পান নি। জয় গোস্বামীর মত ক্ষীণজীবিতাও নয়, তাহলে কোন মন্ত্রে উনি স্বাতীদিকে এবং তার পরে আরও কয়েক লক্ষ গোপিনীকে বশ করেছিলেন? শুধু বাসস্টপে তিন মিনিট লিখে?

এর উত্তরটা আমার জানা আছে। আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাদের ময়রা-মুদি সুনীল গঙ্গো শুধু কাব্যি লিখেই শ্রীকৃষ্ণ হয়েছিলেন। আরে, মহিলারা তো কুরুশ কাঁটায় ওঁর জন্যে প্রেম বুনেছে, কতো পুরুষ বানুষও যে তাঁর জুতো বুরুশ করে দিয়ে গেছে, তার গুন্‌তি আছে?
হরে দরে, সুনীলদা সম্পর্কে না জানার ভাগটাই বেশি।

আপনার মতামত জানান