পা পিছলে ইঞ্জিনিয়ার

তন্ময় ভট্টাচার্য

 

(উৎসর্গ – পৃথিবীর প্রত্যেক ‘তন্ময় ভট্টাচার্য’কে)

হতে চেয়েছিলাম সাহিত্য বা ইতিহাসের ছাত্র, হয়ে গেলাম ইঞ্জিনিয়ার। কেন, সে প্রশ্ন তুলবেন না। শিং ভেঙে বাছুরের দলে ঢুকে পড়ার সেই রাগ সারাজীবন বয়ে বেড়াতে হবে আমায়। আর যাই হোক, ‘ইঞ্জিনিয়ার’সুলভ আচরণ রপ্ত করতে পারিনি কোনোদিনই। তারই ফাঁকে ফাঁকে, বিভিন্ন সময়ে লেখা কলেজজীবন সংক্রান্ত কিছু গদ্য বা গদ্যাংশ এখানে জড়ো করলাম, হাজার হলেও অস্বীকার করা যায় না যেগুলো...

পরীক্ষা - ১
পরীক্ষা মানেই একটা রংচটা দিন আর টিউবলাইটের কোলাজ। ছাই হয়ে আসা মেঘের সঙ্গে খাতার সাদা পাতাগুলোর এক অদ্ভুত মিতালি তখন। চারদিকে ঘাড়গোঁজা ভালো ছেলে আর মধ্যিখানে আমার সামনে-পেছনে উঁকি মারার অক্লান্ত তিনঘণ্টা। পরীক্ষা মানেই টয়লেটে যাওয়ার নানা অজুহাত, মিনিটে মিনিটে জল খাওয়া আর সময় জানতে চাওয়ার নাম করে একটা পাঁচ নম্বরের প্রশ্ন নামিয়ে ফেলা। ছোটোবেলায়, যখন নিজে-নিজেই সব পারতাম, খাতার ওপর হাতদুটো এতটাই রাজত্ব করত যে বন্ধুরা ‘মার্কামারা ভালো’র ছাপ্পা লাগিয়ে দিয়েছিল গায়ে। আস্তে আস্তে একশো আশি ডিগ্রি ঘুরে এখন জানলা দিয়ে দেখি দূরের ফ্ল্যাটে মেয়েটার কাপড় তুলতে আসা, দেখি কাজল-পরা ম্যাডামের ভুরু কুঁচকে যাতায়াত। আগেভাগে কলেজে গিয়ে বেঞ্চে উত্তর টুকে রাখার অভ্যাস নতুন, কেননা প্রশ্ন ওলটপালট করতে করতে আমার মাথায় হাজিরা দেয় একলা থাকার কবিতা। এও এক যুদ্ধ বটে! সাইনোসোডিয়াল গ্রাফ আর সার্কিট ডায়াগ্রামের বদলে পেছন পাতায় ফুটে ওঠে আমার ঘরের মধ্যে দিয়ে বয়ে চলা নদীটা। বেরোনোর সময় মা মাথায় হাত রেখে অনেকক্ষণ কী যেন বলে। তার জোরেই বোধহয় মিষ্টি বান্ধবী শেষ আধঘন্টা খাতা খুলে দেয়, এমনই ভাগ্য - টুকতে টুকতেও নিভে যায় টিউবলাইট। আরো সামনে ঝুঁকে পড়ি, ম্যাডাম দেখেও দেখেন না, বিকেল হয়ে আসার এই অনর্থক আলোহীনতা-কে জীবনে প্রথমবার দোষারোপ করি। ফাইনাল বেল বাজে, জমা দেয়ার আগে মনে পড়ে যায় অমুক প্রশ্নটার সহজতম সলিউশান। আফশোস নিয়ে বেরোই, মিষ্টি বান্ধবীর পাওনা থাকে একটা ডেয়ারি মিল্ক। জীবনের সব পরীক্ষার শেষে একেবারে দেব বলে জমাচ্ছি, এখন থেকেই।
(26.05.14.)

পরীক্ষা – ২
এ এক অদ্ভুত ষড়যন্ত্র। পরীক্ষা এলেই চারপাশে কেমন জানি একটা প্রেম-প্রেম ভাব ছেয়ে যায়। আকাশ মেঘলা, ঝিরিঝিরি বৃষ্টি পড়ে যখন-তখন, বাড়ির সামনের রাস্তাটা দু’পাশের ড্রেন ভর্তি করে শুয়ে থাকে। যতদূর দেখা যায়, একটা পেনসিল- ঘষা ভাব যেন। ভেজা কাক তারের ওপর বসে ঠোঁট মুছছে ডানায় – সেটাও তখন জরুরি হয়ে দাঁড়ায় ম্যাথামেটিকাল এক্সপ্রেশনের চেয়ে। অথচ জানি, কাল বাদে পরশু পরীক্ষা, আমার ওপর যারা ভরসা করে আছে, তাদের জ্ঞান দিই – ‘নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে শেখ্‌’।

স্কুলজীবনে ‘ভালো ছাত্রে’র ছাপ্পা লেগে যাওয়ার মতো অভিশাপ আর নেই। প্রত্যাশার পারদ চচ্চড় করে বেড়ে চচ্চড়ি হয়ে ফিরে আসত। মায়ের গোমড়া মুখ, বাবার কোঁচকানো ভুরু আর আমার ঠোঁটচাপা আনন্দেই কেটে যেত দিনগুলো। আজকাল অবশ্য হাল ছেড়ে দিয়েছে সবাই। শুধু পরীক্ষার হপ্তাখানেক আগে থেকে একটু ছলোছলো চোখ। আমিও একনিষ্ঠ পূজারীর মতো সকাল সন্ধ্যে বই খুলে বসি এই ক’দিন, পেরেকে ঝুলিয়ে রাখা পৈতে গলায় নিতে ইচ্ছে হয় আবার। ঠিক তখনই শোনা যাবে কোনো মেয়ের খিলখিল হাসি।জানলায় দাঁড়িয়ে দেখতে পাই চলে যাওয়া কারোর ওড়নার রং। সেই দুঃখ-টুকুর সম্মানেই মাথায় জমিয়ে বসেন জয় গোস্বামী, বলতে থাকেন – ‘ভোরবেলা এলো মেয়ে, মুখে তার প্রেমে-পড়া দাগ’। পাখার হাওয়ায় তখন একের পর এক উল্টে যাচ্ছে ‘পাওয়ার সিস্টেম’এর পাতাগুলো। চ্যাপ্টার শেষ।

এদিকে চোরাগোপ্তা টেনশন বাড়ছে। কাল বাদে পরশু পরীক্ষা। হাজার হোক, পাশ তো করতে হবে! আমাদের জানলার পর্দাটা যে এত সুন্দর উড়তে পারে, এর আগে লক্ষ্যই করিনি। ঘরে ক’টা টিকটিকি থেকে শুরু করে টেবিলের ক’জায়গায় চাকলা উঠেছে – সব মুখস্থ হয়ে যায়, কেবল গালভরা ইংরিজিতে লেখা সংজ্ঞাটুকু ছাড়া। আমার সামনে যে মিষ্টি বান্ধবীটা পরীক্ষা দিতে বসে, তাকে ফোন করি – সুইচড্‌ অফ। অগত্যা পেনের রিফিল বদলে আর ক্যালকুলেটরের ব্যাটারি চেক করে তাড়াতাড়ি খেয়েদেয়ে চোস্ত ঘুম। একমাত্র পরীক্ষা এলেই আমি ঘুমের তাৎপর্য বুঝতে পারি। প্রচণ্ড চাপের মধ্যে সব ছেড়েছুড়ে ঘুমিয়ে পড়ার মজাই আলাদা। স্বপ্ন দেখি – নরওয়ের মাঝসমুদ্রে কোনো এক জাহাজের মধ্যে মিলনদা মুরগির মাংস কাটছে আর একটা কেবিনে আমায় বন্দী করে রেখেছে জুবিনদা।

ওসব দেশে পরীক্ষার বালাই নেই বলেই বোধহয় আমার একটুও ভয় করছিল না...
(27.05.14.)


কলঙ্কিত আত্মচরিত
ছ্যা ছ্যাঃ! তুমি তো দেখছি ইঞ্জিনিয়ার নামের কলঙ্ক হে! ফ্রেশার্সে সবাই যখন নর্তকীর বক্ষ আন্দোলনে উজ্জীবিত অথচ উপায়ান্তর না দেখে নিদেনপক্ষে সিটি মারছে এবং উত্তাল কোমর নাচিয়ে ভবিষ্যতের বাত প্রতিরোধ করছে, তখন তুমি কিনা এককোণে চুপচাপ বসে আছ! ভুরু কোঁচকানো কেন? এতই যদি বিরক্তি, যাও না বাপ শান্তিনিকেতনে পোঁদ দুলিয়ে ‘ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে’ করো গে! আসবে, আবার অপসংস্কৃতি বলে গালও পাড়বে, ইয়ার্কি নাকি? আড়চোখে নর্তকী’র ‘আজা আজা’ দেখে গরম হয়ে যে উঠছ বলাই বাহুল্য। তাহলে ভালোমানুষি কেন!

গায়কের মুখে মদের গন্ধ শুঁকে খিস্তি মারো, এদিকে মাঠে-ময়দানে বসে বন্ধুদের সঙ্গে ঢুকুঢুকু তো বেশ চলে! তার বেলা? নিজের তো ফাটা বাঁশের পিছনে ফুঁ দেয়া গলা, শিল্পীর কথা যদি মাঝেমধ্যে জড়িয়েই যায়, কম্প্রোমাইজ করবে না?
মারা সবচেয়ে সহজ। সে খিস্তিই হোক বা অন্যকিছু। তোমার কোমর যৌবনে যোগিনী হয়ে বসে আছে বলে অন্যদের অসভ্য বলবে কেন? নিজের এন্টারটেনমেন্ট বলতে তো আদ্যিকালের কাঁসা বাজানো গান! কোথাকার একটা ভোঁদড় উদ্বোধনী সঙ্গীতে কী সব ‘ধ্বনিল আহ্বান মধুর গম্ভীর’ করে কাঁদল, যার আদ্ধেক মানে ঢোকেই না মাথায়, তাতে তোমার ইনিয়ে বিনিয়ে সে কি ঘাড় দোলানো! আর আমরা শার্টের তিনটে বোতাম খুলে একটা দিন একটু মস্তি করলেই অণ্ডকোষে বন্দেমাতরম শুরু হয়ে যায়!

তুমি শালা বালের ইঞ্জিনিয়ার!
(26.08.13)

কলেজনামা
মাথাপিছু দশটা আঙুল আর আঙুলপিছু ওয়ান-থার্ড আংটি নিয়ে আমরা ক’জন গোল করে বসেছি। এদের মধ্যে আমার আধ-খাওয়া চুরুটতুল্য অঙ্গুলিদাম শুষ্কং কাষ্ঠবৎ পরিত্যাজ্য। গলায় নেই পৈতে, হাতে নেই ঘাস- বিচালি- হরতকি, বহিরঙ্গের আভরণ বলতে শুধু শার্ট- প্যান্ট- জুতো- মোজা আর চটা -ওঠা চশমা। বাকি জনাতিনেকের ঘাড়ে-গর্দানে গরু বাঁধার দড়ি, অবিশ্যি তামা- লোহা- নীলা-গোমেদ -মুক্তো থেকে শুরু করে ‘বিপদতারিণী রিস্ট ব্যান্ড’ অন্য সবারই সহধর্মিণী।

মধ্যিখানে রহস্যময় চোখ ও ভারিক্কি এক্সপ্রেশানে সুসজ্জিত আধা-দৈবজ্ঞ বন্ধুবর। একের পর এক হাত টেনে নিয়ে ভুরু কুঁচকে অথবা মিচকি হেসে অবলীলায় বলে যাচ্ছে ভূত-ভবিষ্যৎ-বর্তমান। মুখে বিনয় - ‘এখনও কিছুই শিখে উঠিনি, ভাই’। তাতে জনপ্রিয়তায় ভাঁটা পড়ছে না নিশ্চিত। এক বন্ধুর হাত ধরে পাতলা পায়খানার মতো মসৃণ অথচ স্থানে-অস্থানে ব্যাগড়াদায়ক জীবনের ইঙ্গিত দেয়া হল। প্রেমিকার হাতে নাকি স্বাচ্ছন্দ্যময় ও সুখী ভবিষ্যতের ইশারা। আমি তো থ! ঠিক যেন ‘মনটা করে উড়ুউড়ু বুকটা করে দুরুদুরু...’। আমি আছি অথচ সুখী ভবিষ্যৎ! শেষমেশ কেটে যাব নাকি?

ঘুরতে ঘুরতে আমার পালা। মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে বন্ধুবর বলল - ‘তোর চোখদুটো অদ্ভুত পবিত্র ও সুন্দর। তুই খুব শান্ত ও ভালো ছেলে দেখলেই বোঝা যায়।’ (একটু আগেই বাথরুমে চোখে-মুখে জল দিয়ে ঘাম মুছে এসেছি!) এরপর হাতের তালুর দিকে কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা। আমি যৎসামান্য জ্ঞানে জানতাম, হাত ও পায়ের তালুর দাগগুলো গর্ভাবস্থায় ভাঁজ হয়ে জন্যেই ডেভেলপ করে, কিন্তু টিভিজ্ঞ জ্যোতিষী ও আধা-দৈবজ্ঞ বন্ধুবর এই সামান্য জিনিসেও গ্রহ- নক্ষত্র -জীবনদর্শন টেনে আনায় গর্ব না করে পারলাম না যে, মহাবিশ্ব আমার হাতের মুঠোয়।

অনামিকা ও কনিষ্ঠা জড়ো করে গভীর পর্যবেক্ষণের পর বন্ধুবরের মতে আমার নাকি দেবগণ(বাড়ি ফিরে মা’কে জিজ্ঞেস করে জানলাম খাঁটি মানুষ আমি, অর্থাৎ নরগণ) এবং আয়ুরেখা দীর্ঘ, জীবনে সম্মান পাব, জ্ঞান ও বুদ্ধি দুটোই বর্তমান, প্রচুর টাকা-পয়সা হবে ইত্যাদি শুনে দুপুরের টিফিন না খাওয়ার চুঁইচুঁই আর মনেই রইল না। হাসি-হাসি মুখে জিজ্ঞেস করলাম - ‘দ্যাখ তো ভাই, কবিতা থাকবে তো সারাজীবন আমার সাথে?’ থমকে দাঁড়িয়ে বাম্পার বিস্ফোরণ - ‘সংসারী হলে আস্তে আস্তে কাজের চাপ ও বউ-বাচ্চার দাপটে লেখালিখি হারিয়ে যাবে। সময়ই দিতে পারবি না’! ক্লাস নাইনের সেই ‘শালা’ থেকে শুরু করে এখন অব্দি শেখা সবক’টা খিস্তি উগরে তবে শান্ত হলাম। হৃদমাঝারে চাপা কষ্ট নিয়ে মনে জোর আনলাম, আমায় করে দেখাতেই হবে!(কী এবং কী কী করে দেখাতে হবে সেটার ভাবনা চলছে যদিও...)

আরো শুনছিলাম, আমার হাতে মঙ্গল-বুধ-বেস্পতি-রবি সব ভালো। তালুতে ত্রিভুজ চিহ্ন আর গুলতি চিহ্ন বর্তমান, যেগুলোর মানে বন্ধুবর এখনো শেখেনি। মুখ ভার করে বেরিয়ে এলাম। শালার বুজরুকি নিপাত যাক। যা মানি না, দুর্বল জায়গায় সুড়সুড়ি দিয়ে কেন রে বাপ কাব্যরোগের ঘ্যাঁট বানানো!

সাহস করে ‘সংসারী হমু না’ বলতেও পারছি না! উভয় সংকট!
(27.08.13.)

নরকের মধ্যে আবার
ক্যালেন্ডারের দিকে তাকিয়ে শরীরটা কেমন যেন গুলিয়ে উঠল। সার বেঁধে কালো-কালো তারিখগুলো দাঁড়িয়ে আছে, আগামী মাসতিনেক রোববার ছাড়া লালের চিহ্নমাত্র নেই। রক্তাক্ত দিনের প্রতি এত আকর্ষণ যে আমারও জন্মাতে পারে, জানা ছিল না। কলেজের পাশে এমন কোনো বাড়ি নেই, যার বারান্দায় কোনো কিশোরী এসে দাঁড়াবে আর আমি প্রেমে পড়ব। ন্যাড়া ছাদের চারদিকে শুধু লোহার শিক উঠে আছে, একদিকে কারখানার চিমনি আর অন্যদিকে গতানুগতিক রেললাইন। এই ম্যাপের মধ্যে দিনের দশঘন্টা আমায় কাটাতে হবে ভাবতেই অসুস্থ লাগছে। যতটুকু আকাশ, কলেজের দারোয়ান আর রেজিস্টারের চোখরাঙানিতে মরো-মরো হয়ে আমায় পালিয়ে যেতে বলছে ওই চারকোণা ঘরটায়, যেখানে খানচল্লিশেক ছেলে বাপের সুপুত্রের মতো হাঁ করে রোজ পড়া গেলে। ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার কি প্রাণপণ চেষ্টা সবার! আলো নেই, প্রেম নেই, রবীন্দ্রনাথ-শক্তি-জয়-শ ্রীজাত’র কবিতা নেই, স্মরণজিতের উপন্যাস নেই, নেই সম্বিত বসুর দেওয়াললিখন ‘অন্যমনস্কতা একধরণের কনসেন্ট্রেশন’; শুধু সবুজ বোর্ডের ওপর ধর্ষকের মতো হুমড়ি খেয়ে পড়ে আছেন ঘন্টায় একটি করে ফ্যাকাল্টি। আমাদের স্কুলেও তো ব্ল্যাকবোর্ড ছিল, পৌনে এগারোটার সময় ঢুকেই দেখতে পেতাম কোনো পাখি বসে আছে লতা জড়িয়ে, বা নদী নেমে আসছে পাহাড়ের ফাঁক দিয়ে। অথবা কেউ হয়তো আগেরদিন লিখেছিল ‘A host of golden daffodils’, ‘ইহার চেয়ে হতেম যদি আরব বেদুইন...’, মোছা হয়নি। স্যারেরা এসে একটুক্ষণ দাঁড়িয়ে পড়ে নিতেন লেখাগুলো, তারপর যতটাসম্ভব বাঁচিয়ে মুছতেন আশপাশটা। আর এখন আঁকা থাকে গাদাগুচ্ছের ট্রান্সফরমার মোটর জেনারেটরের ছবি, যেন কেউ পাগলের মতো গলা টিপতে ছুটে আসছে। সেইসব ক্লাসে বসে আমার মনে পড়ে ওথেলো’র শেষ দৃশ্যের কথা, অন্যের কথায় নেচে ভালোবাসাকে খুন করে নিজেকেও তো শেষ করে চলেছি অনবরত। কী ক্ষতি হত যদি বেঞ্চগুলোর গায়ে কম্পাস দিয়ে খোদাই করা যেত বেলঘরিয়ার সেই মেয়েটার নাম, যে স্কুলের প্রতিটা বেঞ্চে বেঁচে আছে? কী ক্ষতি হত যদি ক্লাসের মধ্যিখানেই প্রেমিকার আঙুল আমার আঙুলের থেকে কত ছোটো সেটা মাপতে বসতাম? কিন্তু না! এখানের সমস্ত মাপ ডিজিটাল মিটারে হয়, ক্যালকুলেটরে এরর কষে মাইনাস না করলে উত্তর সঠিক হয় না। এইভাবে সব এরর মাইনাস করতে করতে একদিন এমন একটা সার্টিফিকেট পাব, যেখানে লেখা থাকবে – ‘তুমি ইঞ্জিনিয়ার তো সার্থক, কিন্তু ক্লাস টুয়েলভের স্বপ্ন দেখা ছেলেটা সার্থক কি?’ সেদিন কী উত্তর দেব জানি না। সব সত্যিকথা সবসময় বলতে নেই। বললে মিথ্যেরা হিংসুটে হয়ে বড়ো বেশি কাছে ঘেঁষে আসে।
(10.02.14.)

নির্বোধের আত্মকথা (অংশ)
...মায়ের প্রেশারের ওষুধ দিনকেদিন বেড়েই চলেছে। বাবার দাবি জয়েন্টে ভালো করতেই হবে। ইঞ্জিনিয়ার হও, নিদেনপক্ষে ডাক্তার। অন্য লাইনে চাকরি নেই। টাকা ছাড়া জীবন অচল। বাংলা অনার্স পড়বে! ঠাস! ঠাস! ইতিহাস পড়বে! ওয়াক! মামাবাড়ির কাছে লজ্জায় মাথা কাটা যাবে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ো, চাকরি করো, দরকার হলে দেশের বাইরেও যাও – আপত্তি নেই। আমেরিকা... জার্মানি... কানাডা... অহোহো! কোন বংশের ছেলে দেখতে হবে তো! এটুকুও পারবি না হতভাগা! নির্বোধ কাঁহাকা...

জয়েন্টে বাজে র‍্যাঙ্ক, উচ্চমাধ্যমিকে অঙ্কে পঞ্চান্ন, তবু কানকাটা। যতোই বন্ধুদের কাছে দাঁত ক্যালাই আর বাড়িতে শোকসন্তপ্ত, গতি সেই ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। দুনিয়ায় যতদিন ডিগ্রি তৈরির কারখানা আর আমাদের মতো গোবর আছে, রিফরমেশন চলবেই। সে আরেক বিপত্তি। অ্যাই তোর এত কম মার্কস হল কেন! ওমুক স্যারকে হাতে রেখেছিস তো? তমুকে বলল তুই নাকি ফাঁকা খাতা জমা দিয়ে এসেছিস? ঠাস ঠাস – এবার মনে মনে। বড়ো হয়ে গেছি কিনা! পকেট থেকে সিনেমার টিকিট পাওয়া যাচ্ছে, ব্যাগে সিগারেট। ছেলে হাতের বাইরে চলে গেছে – বাড়িতে বেহুলা-লখিন্দর যাত্রা। ট্রেনে একদম ঝুলবি না, যা যা পড়াবে মন দিয়ে নোট করে নিবি। প্রেম কচ্চিস? হুহু! বুঝিনা ভেবেছিস! রাতে কার সাথে এতো গুজুরগুজুর? চাকরি না পেলে কেউ বিয়ে করবে না – বউকে খাওয়াবি কী?

...একটু আঁতেল দাড়ি, উড়ুউড়ু চুল, লকপকে একটা পাঞ্জাবি আর কলেজ স্ট্রিটে দু’দশ ডন-বৈঠক মারলেই একশো পারসেন্ট সাকসেস। আধখামচা জীবনানন্দ আর আধখামচা শ্রীজাত মেরে পাণ্ডুলিপি দিয়ে আসি সম্পাদকের কাছে। পরিচিতরা বলেন, ‘ইঞ্জিনিয়ারিং সামলে কবিতা লেখো কী করে?’ চশমার ফাঁক গলে এমন লুক দিই যেন ‘এটা পারি বলেই তো আপনার থেকে আলাদা মশাই!’ এরপর কিছু সাহিত্যসভা আর কিছু তৈলমর্দন – সোঁ সোঁ একেবারে শক্তি চাটুজ্যের পাশের সিট। ঠোঁটে সিগারেট, চোখে কবিতা – গৌরাঙ্গদশা বোধহয় একেই বলে...

...নাক থেকে সর্দি ঝাড়ার মতো আমাদের ঝেড়ে ফেলতে চায় সমাজ। কবিতা তো শুধু লাথখোর আর ন্যাকাদের বিজনেস! মেইনস্ট্রিমের সঙ্গে তার সম্পর্ক কই? কবিতা লিখে ভাত জোটাতে পারবে? ভাত! লেজকাটা কুকুরের ঢঙে মিনমিন করতে করতে ফিরে আসি ভাগাড়ে। কলেজেও একই দশা। পেছনের দিকে গুটিসুটি বসে থাকি, ব্যাগভর্তি লিটল ম্যাগাজিন। সার্কিটের কার্ভ আর ম্যাথামেটিকাল এক্সপ্রেশান খাতায় জমা হয় কাটাকুটি খেলার ছক হিসেবে। নিজেই কাটা দিই, নিজেই গোল্লা। সেমিস্টারে কম নাম্বার। প্রিয় বান্ধবী সাবধান করে দেয়, জব পেতে মুশকিল হবে। আমাদের কাছে ‘জীবন- মৃত্যু পায়ের ভৃত্য’, চাকরিটা কোনো ব্যাপারই নয়। যখন হবে দেখা যাবে। এদেশে সবাইকে কি চাকরি করতেই হবে? কলেজ কেটে ঘুরে বেড়াই, নন্দনে প্রতিবাদ মিছিল। একের পর এক কম্পানি চলে যায় লবডঙ্কা দেখাতে দেখাতে...

...সেদিনও খচরামি করে নরক থেকে একপাটি জুতো টিপ করব সমাজের দিকে। ইঞ্জিনিয়ার নিপাত যাক! টাকার মেশিন নিপাত যাক! হিপ হিপ হুররে...
(13.01.15.)

সাঁওতালডিহি (অংশ)
বেড়ানোর উদ্দেশ্য যদি নিছক পুণ্যসঞ্চয় ও আনন্দলাভ হয়, তাহলে আমাদের এই যাওয়া কোনোমতেই ভ্রমণকাহিনী নয়। অথচ, আমার কাছে ব্যক্তিগতভাবে এটি ভ্রমণকাহিনীর থেকেও অনেক বেশি। পড়াশুনায় আমি চিরকালই ক -অক্ষর গোমাংস। কাজেই ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার দৌলতে ভোকেশনাল ট্রেনিং-এর জন্য যখন সাঁওতালডিহি নির্বাচিত হল, আমার চেয়ে বেশি আনন্দ বোধহয় আর কেউ পায়নি। পুরুলিয়ার একপ্রান্তে কোথাকার কোন সাঁওতালডিহি, রাজ্যের ম্যাপে যেটা এই এত্তটুকু, সেখানে দিন পনেরো-সতেরো টানা কাটাবো ভাবতেই আমার প্রায়-কুড়ি মনটা লাফিয়ে উঠেছিল।

...গেস্ট হাউসের সামনেই স্টপেজ, রোজ ওখান থেকে বাসে উঠতাম আমরা সাতজন। এর মধ্যে বেশিরভাগ দিনই ফার্স্ট হাফের পর পালিয়ে এসেছি আমি আর সুরজিৎ, বাকিরা তখন ঘাড় গুঁজে ইঞ্জিনিয়ার হতে ব্যস্ত। সকাল ও দুপুরের খাওয়াটা প্ল্যান্টের ক্যান্টিনেই হয়ে যেত। আর রাতে লোকাল মার্কেটে রুটি-তরকারি। অনেকগুলো ডিপার্টমেন্ট ঘুরে ঘুরে সার বুঝেছি এটাই যে বিশাল জায়গা জুড়ে বানানো এই কারখানার মোদ্দা কাজ হল বয়লারে কয়লা পুড়িয়ে স্টিম তৈরি করে ওই স্টিম টারবাইনে ফেলে জেনারেটারের মাধ্যমে ইলেকট্রিসিটি তৈরি করা আর গ্রিডের মাধ্যমে বিভিন্ন এলাকায় পৌঁছে দেয়া। এর জন্যে এত ঝামেলা দেখে বিরক্ত হয়েছিলাম খুব।...
(10.08.14.)

টোকাটুকির দিনগুলি (অংশ)
...সিস্টার্নের ভেতর লুকানো আছে অর্গানাইজার, আমাদের গীতা কোরান বাইবেল ত্রিপিটক জেন্দ আবেস্তা সব ওই একটাই। হাভাতের মতো ওল্টাতে থাকি পাতা। আঙুলে সিগারেট। ইউনিভার্সিটিও হারামি, কিছু প্রশ্ন এমন করে যে অর্গানাইজার ঘেঁটেও পাওয়া যায় না। তবু, কুড়িয়ে-বাড়িয়ে কমন’গুলো মুখস্থ করি, বিড়বিড় করতে করতে ফিরে আসি একজাম হলে। ততক্ষণে পাঁচ মিনিট পেরিয়ে গেছে। একজামিনার খাতা আটকে রাখেন পনেরো মিনিট। তারপর ফেরত নিয়ে দেখি, যা মুখস্থ করলাম বাথরুমে দাঁড়িয়ে, ভুলে গেছি সবই। আবার বসে থাকা। পেচ্ছাপ পেয়ে যায় আবার। বাথরুমে যেতে চাইলে উত্তর পাই, ‘প্রিন্সিপ্যালের থেকে অ্যাপ্লিকেশান নিয়ে এসো’। আমরা মাথা খুঁড়ি। পেছনের বন্ধু, সামনের বান্ধবী, ফার্স্ট বেঞ্চের ভালো ছেলে সবাই এইট পয়েন্ট পাওয়ার দৌড়ে কীসব জানি লেখে। দেখি তো বুঝতে পারি না। টুকি তো বানানভুল। ক্যালকুলেটরের ফাঁকে চোথা। চোথা আমাদের টাইয়ের ভাঁজে। মোজার ভেতর। কিন্তু বাঘের মতো তিন-চারজন গার্ড ঘুরে বেড়ায়। আমাদের এক চোখ খাতার ফাঁকে, আরেক চোখ সামনে। একজামিনার এসে খাতা ঝাড়েন। আমরা চেঁচিয়ে উঠি – ‘মিছিমিছি সন্দেহ করছেন স্যার, আমরা গুড বয়। ফেল করবো, তবু টুকবো না। এতদিনে এই চিনলেন?’ বৃষ্টির অনুকরণে ঝরে পড়ে ট্রান্সফরমারের ওয়ার্কিং থিওরি। লজ্জার মাথা খেয়ে দাঁত ক্যালাই। ‘চোথারা চলিয়া যায় বেইমান নারীদের মতো’।...
(25.08.15.)

‘তবুও শান্তি, তবু আনন্দ, তবু অনন্ত জাগে।’ কলেজের শেষ সেমিস্টারের শেষ ভাইভা দিয়ে যখন বেরোচ্ছি, আমাদের ইলেকট্রিক্যালের অভিষেক স্যার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলেছিলেন – ‘লেখালিখিটা ছাড়িস না তন্ময়’।
জীবনের সেরা সম্মান হিসেবে থেকে যাবে এটুকুই...

আপনার মতামত জানান