ভূতের গল্প

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 



রাজারহাট থেকে ডিরেক্ট ঠাকুরপুকুরের দিকে আসার শেষ বাসটা আগে ছাড়তো রাত্তির আটটায়। এখন ব্যাপারটার একটু উন্নতি হয়েছে – বাসটা উঠে গেছে। এখন ঠাকুরপুকুর বেহালা ইত্যাদির দিকে আসতে গেলে শাটল ইত্যাদি ধরতে সেক্টর ফাইভের দিকে আসা অথবা রাসবিহারী-টালিগঞ্জের দিকে এসে তারপর অটো না ধরে উপায় নেই।
এখন এদিক থেকে বাড়ি ফিরতে রাতবিরেতে অফিসের বাস কিম্বা ক্যাবগুলোই ভরসা। বাসে আসার সমস্যা হচ্ছে – বাসগুলো চৌরাস্তার দিকে নামিয়ে দেয়। সেখান থেকে ঠাকুরপুকুর অবধি গাড়ি পাওয়াটা, রাত্তির এগারোটার সময় বেশ সমস্যা। তাই যারা আমার মতো দূরের লোক, তাদের অধিকাংশই কাজ করতে আটটা ন’টা বেজে গেলে তারপর অফিসের ক্যাবটাই প্রেফার করে।
সৌভাগ্যবশতঃ আজকের ক্যাবের সবকয়জনই বেহালার। এদিক ওদিকের লোকজন মার্জ করে খিচুড়ি রুট বানানো হয়নি। আমি ছাড়া তিনজনই মহিলা। গাড়িটাও ফোর সীটার – তাই সাথে সিকিওরিটি পার্সোনেল কাউকে এসকর্ট হিসেবে নেওয়ার সুযোগ নেই। তাই কালের নিয়মে আমারই লাস্ট ড্রপ। আজকে যদিও অসুবিধে নেই বিশেষ। এমনিতেও ভৌগলিক দূরত্বে আজকে আমার বাড়িই শেষে।
ভাদ্রমাসটা যাবো যাবো করে যাচ্ছেনা। আর এবারের মতো বিচ্ছিরি ভাদ্র কোলকাতায় বহুদিন আসেনি। বিচ্ছিরি ভ্যাপসা গরম চলছে দিন কয়েক ধরে। তারপর একদিন ঝমঝম করে এমন বৃষ্টি যে রাস্তাঘাটে জলটল জমে একশা। আর গরম মানে ঠিক পুজো আসছে, পুজো আসছে মিষ্টি গরম নয়। পাক্কা হিউমিডিটিওয়ালা কোলকাত্তাইয়া গ্রীষ্মকালীন গরম – হাবেভাবে মনে হচ্ছে সেটাই ইউ টার্ন নিয়ে ফেরৎ চলে এসেছে।
আজ যদিও সকাল থেকে ঝমঝম করে বৃষ্টি পড়ছে। কাল রাত থেকেই শুরু হয়েছে। এরমধ্যে এক কীর্তি হয়েছে। কাল – রাতে এই ক্যাবে করে একটা ছেলে সাউথের দিকেই ফিরছিলো। রাত বারোটার ক্যাবে। তা তাদের ক্যাবটা নাকি পরমা আইল্যান্ডের নতুন ফ্লাইওভারে উঠে খারাপ হয়ে গেছিলো। এতো অবধি ছেলেটার খোঁজ ছিলো।
এদিকে আজ সকালে ড্রাইভারকে আবার ট্রেস করা গেছে। সে বলেছে ছেলেটা নাকি একটা ওলা ক্যাব ধরে এগিয়ে যায়। কিন্তু ছেলেটা না বাড়ি পৌঁছেছে – না মোবাইল ইত্যাদি কিচ্ছু ট্রেস করা যাচ্ছে।
অফিসে সেই নিয়ে বেশ ভারী আবহাওয়াটা আজ।
আজো সেই বৃষ্টি চলেই যাচ্ছে। তাই ক্যাবটা আসতে স্বভাবতই দেরী হলো। আমি ছাড়া আর দুটো মেয়ে এসেছে।
ক্যাবটা দশটা পাঁচ অবধি দেখে ছেড়ে দেবার নিয়ম। কিন্তু যেহেতু আজ গাড়িটা এসেইছে দেরী করে – তাই আরো খানিক দাঁড়িয়ে দশটা পনেরো নাগাদ গাড়িটা যখন ছাড়বো ছাড়বো করছে – তখন একটা মেয়ে দৌড়ে দৌড়ে এসে গাড়িটাকে ঠাকুরপুকুরে নিয়ে যাবার জন্য রিকোয়েস্ট করলো।
আমার এম্নিতে কোনো অসুবিধে হতোনা, কিন্তু এই মেয়েটা নামবে গৌরনগর – জেমস লংয়ের দিকে। আর আমার বাড়ি ঠাকুরপুকুর বাজার দিয়ে আরো খানিকটা ঢুকে হাঁসপুকুরের কাছে – সেটা ডায়মন্ড হারবার রোডের দিকে। এই মেয়েটাকে নেওয়ার মানে আরো খানিক দেরী করা।
খানিক দোনোমোনা করে নিয়েই নিলাম। মেয়েটাকে দেখতে ভালো, একগাল হেসে থ্যাঙ্কস বললো। সারাদিন কাজের পর ব্যাপারটা খারাপ লাগলো না।
...
মেয়েগুলোর মধ্যে একটা মেয়ে আমার চেনা ছিলো। বেহালা চৌরাস্তার ভিতর দিকে থাকে। ওই বকুলতলা ছাড়িয়ে শকুন্তলা পার্কের ওখানে। আরেকটা মেয়ে থাকে ম্যান্টনের ভিতর দিকে – ম্যান্টন থেকে বকুলতলা যাওয়ার একটা রাস্তা আছে শর্টকাট। ওটা ধরে নিলে তাড়াতাড়িই হয়ে যাবে। তারপর মিস গৌরনগর, তারপর আমি।
গাড়িটা রাজারহাটে আমাদের অফিস ক্যাম্পাসের ভিতর দিয়ে বেড়িয়ে তখন নারকেলবাগানের কাছাকাছি এসেছে। বৃষ্টির স্পিড কমার কোনো লক্ষণ নেই। তাই ওয়াইপার দুটো চলেই যাচ্ছে। একটা হাল্কা ডিজল্ভড টোনের কোলকাতার রাত্তির কেটে কেটে এগোচ্ছে গাড়িটা।
মিস গৌরনগরের বেশ কোঁকড়ানো খোলা চুল। অফিসের পক্ষে একটু ওভারড্রেসডই লাগলো। বেশ জমকালো সাদা একটা সালোয়ার স্যুট পরে এসেছে। নতুন জয়েনি হবে। আমাদের মতো যাদের পাঁচ-সাত বছর হয়ে গেছে, তাদের অফিসে মাঝেসাঝে হাওয়াই চটি পরে আসার প্রাণ করে। তবে মেয়েটার চেহারাপত্তর দেখে আমাদের কাছাকাছিই মনে হয়।
‘চারদিকটা কির’ম যেন!’ – বকুলতলার চেনা মেয়েটা বললো। এসব লেট নাইট ক্যাবে সবাই বেশিরভাগ সময় ঘুমোতে ঘুমোতে ফেরে। তাই কথাবার্তা হওয়ার সুযোগ থাকেনা বিশেষ।
এই মেয়েটা চেনা ছিলো – তাই কথা বললো।
‘কির’ম মানে?’ – আমিই জিজ্ঞেস করলাম।
‘কির’ম গা ছমছমে, খালি খালি রাস্তা – স্পুকি স্পুকি একটা ব্যাপার চারদিকে’।
গাড়িটা ইতিমধ্যে টেকনোপলিস ছাড়িয়ে উইপ্রো ফ্লাইওভার ধরবে বলে, সেক্টর ফাইভে না ঢুকে সোজা বেরিয়ে এসেছে। সত্যিই এদিকটা গাড়িঘোড়া আজ একটু কম।
আমি একটু হাসলাম।
গৌরনগরের মেয়েটা একটু পর বললো – ‘এই এক হয়েছে গাছমছমের জায়গায় আনক্যানি, ভূতুড়ের জায়গায় স্পুকি স্পুকি বলার অভ্যেস’।
চেনা মেয়েটা একটু দমে গেল।
একটু হাল্কা করতেই চারদিকটা ম্যান্টনের মেয়েটা বললো – ‘আসলে সবই স্মার্টফোনের দোষ’।
এবার গৌরনগরের মেয়েটা অবাক হয়ে – ‘স্মার্টফোন আবার কী দোষ করলো?’
‘অটো কারেক্ট – ভূতুড়ে লিখতে গেলে কি থেকে কি হয়ে যাবে। স্পুকিটা ইংরিজি – ওটায় কোনো রিস্ক নেই’।
‘তার মানে অটোকারেক্টের ভিতরেও ভূত?’ – এবার চেনা মেয়েটা হেসে জিজ্ঞেস করলো।
‘হ্যাঁ আর খুব খামখেয়ালী ভূত’ – ম্যান্টনের মেয়েটা বললো।
সবাই হেসে ফেললো।
...
গাড়িটা চিঙড়িঘাটা দিয়ে বাইপাসে উঠেছে। এইসময় অন্যদিন রাস্তায় কিছু বাড়িফিরতি লোক চিঙড়িঘাটা বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে থাকে – শাটল, বাস, ট্যাক্সি ইত্যাদির আশায়। আজ চারদিক ভোঁ ভাঁ করছে। এইসময় ট্রাকগুলো ঢুকে যায় কোলকাতায়। তো বাইপাসে সারি সারি ট্রাক চলছে – তার মাঝখান দিয়ে আমাদের ক্যাবটা – স্বভাবতই গতি মন্থর ট্রাক আর বৃষ্টির সাথে পাল্লা দিতে দিতে।
‘রাত্তিরবেলা দুটো হাত কাটাকুটি করে ঘুমোবেন দেখবেন কী হয়!’ – আমাদের ক্যাব ড্রাইভার হঠাৎ স্টিয়ারিং ছেড়ে তার দুটো হাত ক্রস করে দেখানো শুরু করলো।
‘কী হবে?’ – মিস গৌরনগরের প্রশ্ন।
‘দেখবেন না দিদি।‘
‘এই এটা জানি’ – শকুন্তলা পার্ক নিবাসিনী চেনা মেয়ের ফোড়ন – ‘বোবায় ধরে’।
‘বোবায়?’ – মিস গৌরনগর।
‘স্লিপ প্যারালাইসিস’ – আমিই বললাম – ‘আমার বহুদিন ধরেই মাঝে মাঝে হয়। ঘুমের মধ্যে মনে হয় বুকের ওপর কেউ বসে আছে, হাত পা নাড়াতে পারছিনা’।
‘আর তারপর একটু মুভ করলেই কেটে যায়’ – ম্যান্টনসুন্দরী কথাটা শেষ করে দিলো – ‘ধুর এটা ভূত নয়। এ তো আমারো হয়’।
এতক্ষণ জায়গার নাম দিয়ে দিয়ে তিন তরুণীকে অভিহিত করা হচ্ছে। ব্যাপারটা গর্হিত হয়ে যাচ্ছে। সবারই নিজস্ব নাম আছে – সেগুলোই লেখা যাক –
ম্যান্টন নিবাসিনীর নাম জয়িতা, শকুন্তলা পার্কের নাম শ্বেতা। আর গৌরনগরের নামটা – যথাস্থানে বলবো। নামগুলো আমি জেনেছিলাম ক্যাবের রোস্টার থেকে। গৌরনগর যেহেতু – রোস্টার বহির্ভূত আগমনী – তার নামটা স্বভাবতই ওখানে ছিলোনা।
এবার আমিই একটু গলাখাঁকারি দিলাম – ‘ইয়ে আমার এক পাড়াতুতো দাদার একটা ঘটনা জানা আছে। আর সে আমায় চট করে মিথ্যে বলেনা’।
‘সত্যি মানে? সত্যি ভূত?’ – জয়িতা নড়েচড়ে বসলো।
‘হুমম’।
‘কীরকম শুনি’।
‘খিদিরপুরের ওখানে দাদার এক জেঠু থাকেন।দূরসম্পর্কের। চট করে যাওয়া আসা নেই।
তো একবার সেই বাড়িতে গিয়েছিলো। ভূকৈলাশের জমিদার বাড়ির সাথে ওই জেঠুর কি একটা যেন রিলেশন আছে।
জেঠুর এক মেয়ে আছে। বহুদিন বিপত্নীক। মেয়ে ছোটো থাকতেই সেই জেঠুর বউ মারা যান। ঘটনাটা তাকে নিয়েই’।
‘সেটিংসটা মন্দ নয়’ – মিস গৌরনগরের টিপ্পনী।
‘জেঠি তখন খুব অসুস্থ, জেঠুকে তখন একবার অফিসের কাজে ঝাড়গ্রামের দিকে যেতে হয়েছিলো। এটা সত্তরের শুরুর দিকের কথা। তখনকার ঝাড়গ্রাম অনেকটাই গ্রাম। যেখানে জেঠু থাকতো – সেই বাড়িটার থেকে বেশ খানিক দূরে একটা টয়লেট ছিলো। মাঠের মাঝে’।
‘খাটা পায়খানা? হি হি হি’ – শ্বেতা উল্লসিত।
‘ওই আর কি। তো একদিন ভোরে, ভোররাতেই বলা যায় জেঠু ওই টয়লেট থেকে ফিরছে। দেখে একজন বয়স্ক বিধবা মহিলা দাঁড়িয়ে আছে। তিনি জেঠুকে দেখে বল্লেন – তুই বাড়ি যা। জেঠু অবাক হয়ে আপনি কে জিজ্ঞেস করায়, কিছু না বলেই চুপচাপ চলে গেলেন’।
জয়িতা জিজ্ঞেস করলো – ‘তারপর আর দেখেননি?’
‘দেখেছিলেন। বাড়ি ফিরে জেঠু দেখে জেঠি মৃত্যুশয্যায়। আর জেঠির মাথার কাছে কয়েক সেকেন্ডের জন্য মনে হয়েছিল ওই মহিলা বসে আছেন’।
‘আর? আর কিচ্ছু না?’
‘জেঠির মারা যাবার পর, জেঠুর মাঝেসাঝে মনে হতো আধঘুমে যখন মেয়ে পাশে ঘুমোচ্ছে – কেউ মেয়ের মুখের কাছে ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে, কিম্বা মেয়েটাকে কোলে নেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কখনো দেখেননি কিছু’।
‘হ্যালুসিনেশান?’ – গৌরনাগরিকার প্রশ্ন।
‘হতেও পারে’।
‘স্যার কাল ওই গাড়িটা, এখানে খারাপ হয়েছিলো’, হঠাৎ করে আমাদের ড্রাইভার কথা বলে উঠলো। আমরা সবাই চমকে তাকালাম।
জায়গাটা পরমা ফ্লাইওভারের ঠিক মাঝামাঝি। নীচে তাকালে বাঁদিকে হিন্দু কবরস্থানটা দেখা যাচ্ছে।
...
গাড়ি আরো কিছুটা এগিয়ে পার্ক সার্কাসে সেভেন পয়েন্ট কানেক্টরের সিগনালে দাঁড়িয়েছে। কোলকাতার রাত্তির গুলোর রঙ স্বভাবতই হলদে। বৃষ্টিটা একটু ধরেছে। একটা কাকভেজা নেড়ি – গেরুয়া গায়ের রং ভয়ে ভয়ে রাস্তা পেরোচ্ছে।
শ্বেতার মুখ দেখা যাচ্ছিলো রেয়ার ভিউ মিররে। মুখে লাল আলো পড়ছে। সামনে দাঁড়ানো একাকিনী ইন্ডিকার না ছোঁয়ার চেতাবনি। আলোটা দপদপ করছে। মেয়েটা স্বভাবত বাঙালি সুন্দরী না। কিন্তু ছোটো করে কাটা চুল, আর রিমলেস চশমায় লাল আলো – একটা বেশ মোহমায়া জাগাচ্ছিলো।
চটকা ভেঙে আলোটা হলুদ হলো। গাড়িটা চলতে শুরু করলো।
‘হ্যালুসিনেশান কি না জানিনা’ – জয়িতা বলতে শুরু করে – ‘আমি আর আমার ভাই তখন ছোটো। ম্যান্টনের ভিতর দিকটা তখনো অতোটা ঘিঞ্জি হয়নি। ভাই বাবার সাইকেলের পিছনে চেপে তবলার বাঁয়াটা সারাতে নিয়ে যাচ্ছিলো, ভাইয়ের বয়েস তখন বছর দশেক, আমার চেয়ে দু’বছরের ছোটো। হঠাৎ পাশ থেকে একজন বয়স্ক লোক একটা সাইকেল চেপে চলে গেলেন বাঁয়াটা পড়ে যাবে, আরেকটু উঁচু করে ধরতে বলে’।
‘তো?’ – আমিই জিজ্ঞেস করলাম।
‘তো এই যে, ভাই কিছুক্ষণ পর রিয়্যালাইজ করলো যে লোকটা বলে গেল সে আমাদের ছোড়দাদু, দাদু আই মিন ঠাকুর্দার ছোটো ভাই। তিন মাস আগে মারা গেছেন । আর ...’
‘আর?’ – শ্বেতা বেশ জিজ্ঞাসু গলায় জানতে চাইলো।
‘আর বাঁয়াটা তার ছিলো’।

বৃষ্টিটা আবার ঝিরঝির করে শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে গাড়িটা পিটিএসে পার্ক সার্কাস ফ্লাইওভার থেকে নেমে ভবানী ভবনের পাশ দিয়ে বেরোচ্ছিল।
আমাদের ড্রাইভার হঠাৎ ভবানীভবনের সামনে গাড়িটা দাঁড় করালো। দাঁড় করিয়ে আমাকেই বললো –
‘ওই ফুটে পেট্রল পাম্পটা দেখছেন স্যার?’
আমি অবাক হয়ে তাকালাম।
‘কিছুদিন আগে পেপারে একটা খবর বেরিয়েছিলো – ওখান থেকে রাত বারোটা একটার পর একজন সার্জেন্ট খালি ট্যাক্সি পেলে উঠে বসে’।
‘রাইট রাইট – পেপারে বেরিয়েছিলো’।
‘আমি তখন পাড়ার সিধুদা, ট্যাক্সি চালাতো – আমি চালানো ওর কাছেই শিখেছি – হেল্পারগিরি করি ওর। তো সেদিন অনেক রাত্তির – আমরা ফিরছি – সেই সার্জেন্ট উঠে বসলো’।
‘বলো কী? নিজে দেখেছো?’
‘হ্যাঁ স্যার’।
‘তারপর?’
‘আমি আর সিধুদা সিগারেট খাচ্ছিলাম। আমাদের বললো এতো সিগারেট খাও কেন? এর মধ্যে গাড়ি পিটিএসের কাছাকাছি পৌঁছেছে। কথা বলতে বলতে হঠাৎ পিছন ঘুরে দেখি লোকটা নেই’।
‘নেই?’
‘না স্যার। এর মধ্যে গাড়ি কোথাও দাঁড়ায়ওনি। কিছুই না!’
‘যাক’ – গৌরনগরের ফিডব্যাক।
‘যাক?’ – জয়িতা জিজ্ঞেস করলো।
‘একটা লোক দেখলাম জীবনে যে নিজে ভূত দেখেছে’।
...
জয়িতা নেমে গেছে। গাড়ি আরকেডিয়া দিয়ে ঢুকে বকুলতলার দিকে এগোচ্ছে। বৃষ্টিটা আবার ধরে এসেছে।
‘শ্বেতা’ – আমি বললাম।
‘বলো’।
‘এই রাস্তাটায় একটা কবরখানা আছে না? বকুলতলা দিয়ে বেরোবার জাস্ট আগে?’
‘আমরা আসার পথে তিন তিনটে কবরখানা পেরিয়ে এসেছি’ – গৌরনগরের ভবি ভোলবার নয়।
‘এই কবরখানাটা দেখলে বুঝবে। ভাঙা ভাঙা কবর। তার মধ্যে বাঁশবাগান, একটা ডোবা, তালগাছ সবই আছে। এখানে যদি ভূত না থাকে কোলকাতার কোত্থাও নেই’।
‘ধুত্তেরি তখন থেকে খালি ভূত ভূত – সেদিন ফেসবুকেও দেখলাম – কোলকাতার টেন মোস্ট হন্টেড প্লেসেস নিয়ে স্কুপহুপ কি একটা আর্টিকেল বের করেছে’।
‘হ্যাঁ আমিও দেখেছি’ – শ্বেতা উত্তেজিত – ‘আহিরীটোলা পুতুলবাড়ি, রবীন্দ্র সরোবর মেট্রো স্টেশন সঅব আছে’।
‘দেখো – ওগুলোয় না কিচ্ছু হয়না। জাস্ট কিচ্ছু না’।
‘তুমি কি করে জানলে?’
‘এককালে এসব এক্সপিডিশনে বেরোবার বদভ্যেস থেকে’।
‘বল কী? রবীন্দ্রসরোবরে লাস্ট ট্রেনে এসেছো?’
‘হ্যাঁ ভোরবেলা পার্কস্ট্রীট গোরস্থানেও ঢুকেছি টুপি পরিয়ে’।
‘বাব্বা। মানে সরি – তোমায় দেখে –‘
‘বোঝা যায়না তাই তো?’
‘হুমম’ – শ্বেতা একটু চিন্তিত মুখে বসে রইলো। তার পর হঠাৎ বলে উঠলো – ‘আচ্ছা গল্পই যখন হচ্ছে আমিও বাদ যাই কেন? জানো আমার এক দিদি কানেটিকাটে থাকে। ওর বর থাকে ফ্লোরিডায়। রিসার্চ করে’।
‘এটা গল্প?’
‘আরে শোনোই না গো দিদি। তো সেই দিদি একা একা থাকে। ঘরের মধ্যে কিসব ধুপধাপ আওয়াজ। সিঁড়ি দিয়ে ওঠানামার শব্দ হয় খালি। এদিকে দিদির বর মানে আমার জামাইবাবু এলেই সব বন্ধ’।
‘আচ্ছা?’
‘হ্যাঁ – তারপর খোঁজ নিয়ে জানলো। ওইখানে নাকি একটা গ্রেভইয়ার্ড ছিলো। তাই বাড়িভাড়া এতো কম’।
‘তারপর কী করলো? ভূতনাশক যজ্ঞ? তা’তে সাহেব ভূত যায়?’
শ্বেতা ফিক করে হেসে বললো – ‘বাড়ি চেঞ্জ’।
...
শ্বেতাকে শকুন্তলা পার্কে নামিয়ে গাড়িটাকে ইউটার্ণ নিতে হবে।
নীহারিকাই কথা বললো আগে – ‘তুই কী সামনেই বসে থাকবি?’
আমি বুঝতে পারছিলাম না ঠিক কি বলা উচিৎ, ওর কথাটায় খানিক চাপ কমলো।
ড্রাইভারকে একটু দাঁড়াতে বলে পিছনে এসে বসলাম আমি।
গাড়িটা বেহালা চৌরাস্তার দিকে খানিকটা এগিয়েছে। ডায়মন্ড হারবার রোডে উঠে ডানদিকে ঘুরবে।
আমি আমতা আমতা করে জিজ্ঞেস করলাম – ‘কেমন আছিস?’
‘দেখ – এখান থেকে আমার বাড়ি যেতে টাইম লাগে আধঘন্টা। রাত্তিরে সেটা কুড়ি মিনিটে দাঁড়াবে। সো ইউ শুড বেটার মেক ইট কাউন্ট’।
‘এখন বাপের বাড়ি এসেছিস?’
‘বাহ – এবার অনেকটা পয়েন্টের প্রশ্ন করেছিস’ – নীহারিকা হেসে বললো – ‘হ্যাঁ, অনেকদিন’ ।
‘কদ্দিন আছিস?’
‘যদ্দিন ইচ্ছে – ফেরবার তো জায়গা নেই কোনো’।
‘মানে?’
‘মানে তাড়াতাড়ি বিয়ে – আর ততোধিক তাড়াতাড়ি ডিভোর্স’।
নীহারিকা কথাটা বলে সোজা আমার দিকেই তাকালো – ‘এই স্যুটটা, যেটা পরে আছি – বিয়েতেই পাওয়া – পরাই হয়নি সেরকম’।
চিবিয়ে চিবিয়ে কথাগুলো বললো নীহারিকা – বলে জানলার দিকে মুখটা ঘুরিয়ে নিলো। গাড়ি ডায়মন্ড হারবার রোডে উঠে গেছে। আমি জনকল্যাণ থেকে জেমস লঙ ধরে নিতে বল্লাম।
‘নীহার’ – বলে নীহারিকার দুটো আঙুলের সাথে আমার আঙুলের দূরত্বশূন্য হলো।
নীহারিকা ঝট করে হাতটার দিকে তাকালো। তারপর খিলখিল করে হেসে উঠলো।
‘সাহস বেড়েছে দেখছি – এটা কিন্তু অফিস ক্যাব’।
আমি হাতটা সরিয়ে নিলাম।
নীহার নিজের এবার আমার হাতটা ধরলো।
‘ঠিক সময়ে একটু শক্ত করে হাতটা ধরলেই পারতিস। পুরো গাড়ি এর’ম অপরিচিত সেজে বসে রইলি’।
আমি চুপ করে থাকলাম।
নীহারকে এতক্ষণ পর কথা বলায় পেয়েছে – ‘বানিয়ে বানিয়ে গল্প বলে মেয়েদের ইম্প্রেস করার বাতিক যায়নি এখনো। তাও সেই একই জেঠুর পটি করার গল্প? নতুন কিছু বানাতে পারিসনি এক’বছরে?’
‘নতুন কিছু বানাতেই হবে এর’ম মাথার দিব্যি কে দিয়েছে?’
‘বাব্বা। অ্যাই তোর হাত এতো ঠান্ডা কেন রে?’
গাড়িটা গৌরনগরের গলির মুখে এসে গেছে – নীহারিকার বাড়ির রাস্তা আমার মুখস্থই আছে এখনো। কলেজ থেকে ফেরার পথের সন্ধ্যেগুলো সাক্ষী।
হাতে আর বেশি সময় নেই। আর দু’এক মিনিট পরেই নেমে যাবে নীহার। যা বলার বলে ফেলা দরকার।
‘কাল-‘
‘কাল?’
‘কাল পরমাতে অফিসের ক্যাবটা খারাপ হবার পর যখন ওলা ক্যাবটা নিলাম তখন কি আর জানি যে সেই গাড়িটা হাঁসপুকুর যাবার রাস্তায় ব্রেক ফেল করে একটা চলন্ত লরির গায়ে ধাক্কা মারবে! কাল আমি আইকার্ড নিতেও ভুলে গেছিলাম। তাই ডিটেক্টও করতে পারেনি। মোবাইল টোবাইল সব ভেঙে চৌচির হয়ে এখন ঠাকুরপুকুর থানায়’।
নীহারের মুখের পট পরিবর্তন হচ্ছিলো দ্রুত। নীহারের বাড়ির গলিতে ঢুকে গেছি। কাকু-কাকিমা কোনোকালেই আমাকে দুচক্ষে দেখতে পারেনা। এখন আর কোনো মানুষের বিরাগভাজন হবার স্পৃহা নেই। এখানে নীহারের সাথে গল্পটা শেষ করাই যায়। শি উইল বি সেইফলি হোম।
ভালো বাঙলায় কি একটা কথা আছে না? পঞ্চভূতে বিলীয়মান। এতোক্ষণের সলিড স্টেট ছেড়ে সেই কেমিক্যাল ডিকম্পোজিশন হয়ে মিলিয়ে যাচ্ছিলো শরীরটা। এই সবের মধ্যে আমার কথাটাও মিলিয়ে গেল, ঠিক নীহারের বাড়ির গেটের সামনে এসে – ‘তোকে খুব দেখতে ইচ্ছে করছিলো নীহার’।

আপনার মতামত জানান