আমি ও সুনীল, অর্থাৎ সুনীল ও আমি : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় স্মরণে একটি চিঠি

জয়ন্ত দেবব্রত চৌধুরী

 

প্রিয় অনিমেষদা,
প্রথমেই বিজয়ার শুভেচ্ছা জানিয়ে শুরু করি। কেমন আছো সকলে? আমি ভালোমন্দ মিশিয়ে আছি একরকম। তোমার মনে পড়ে, আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগের এই দিনেই তোমাদের প্রিয় কবি সুনীল গাঙ্গুলি মারা গেছিলেন আচমকা? তুমি বলবে আচমকা মোটেই নয়, কোথাও ‘অকালপ্রয়াণ’ কথাটা ব্যবহৃত হয়নি তেমন একটা, আটাত্তর বছর বয়স মোটেও কম নয় বরং কিছুটা বেশিই। তোমরা বলবে আধুনিক বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের যোগ্য উত্তরসূরি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আয়ুতেও ওনাকে প্রায় স্পর্শ করেছিলেন। কিন্তু কী জানো তো, আকাশ থেকে কোটি বছর বয়সী বৃদ্ধ তারাকে খসে পড়তে দেখলে চমৎকৃত হই এখনও, অপ্রস্তুত লাগে একটু। সেবছর নবমীর সকালে ঘুমের মধ্যেই খবরটা পেয়েছিলাম, সত্যি বলতে কোনো বিশেষ প্রতিক্রিয়া হয়নি সেসময়। আসলে কোনও বিরাট ভূমিকম্পে ক্ষয়ক্ষতির সামগ্রিক চিত্রটা ক’দিন পরে বোঝা যায়, কোনও যুগান্তকারী ঘটনার পূর্ণ তাৎপর্য বুঝতে একটু সময় লেগেই যায়। শুনেছি ওনার মৃত্যুতে অনেকে শোকস্তব্ধ, কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন অনেকেই; আমি কিন্তু কাঁদিনি, তাতে কী প্রমাণ হয়? আমি আমার সামান্য অগভীর চেতনা দিয়ে এটুকু বুঝি যে কারোর মৃত্যুকালে চোখের জল ফেলাটুকুই সবকিছু নয়, মৃত প্রিয় মানুষটি কখনোই তোমার সঙ্গ ছাড়েনা পুরোপুরি। এই তো এখন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে নিয়ে একটু ভাবতেই দেখি কত ভুলে যাওয়া কথা মনে পড়ে যাচ্ছে। ছেলেবেলায় আমি কিন্তু মোটেই কবি সুনীল গাঙ্গুলিকে চিনতাম না। জীবনে প্রথম পড়া সাহিত্যের কথা (ছেলেবেলার উপেন্দ্রকিশোর, সুকুমার, অবনীন্দ্র কিম্বা রবীন্দ্রনাথ বাদ দিলে) ভাবলেই দুটো লেখা মনে পড়ে, শীর্ষেন্দুর ‘সোনার মেডেল’ আর সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘সন্তু আর একটুকরো চাঁদ’— দুটোই একসাথে পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় বেরিয়েছিল। তারপর থেকেই কাকাবাবু আমার জগতের নিত্য বাসিন্দা। সুনীল কিন্তু খুব বিচক্ষণতার সাথে তাঁর কিশোরকাহিনীর ‘হিরো’ নির্বাচন করেছিলেন। এম্নিতে প্রায় সর্বগুণসম্পন্ন; কিন্তু কাকাবাবু নিখুঁত নন, পায়ে খোঁড়া। এইটুকুর জন্যই কাকাবাবু আর ঈশ্বরের সমকক্ষ হননি, একজন বিরাট মাপের মানুষ হয়েই রয়ে গেছেন। প্রসঙ্গক্রমে একটা মজার কথা বলি। উঁচু ক্লাসে উঠে একবার আমার বন্ধু প্রিয়দর্শীকে (যে কিনা কখনো ‘কাকাবাবু সিরিজ’ পড়েনি!) কাকাবাবুর গুণপনা ব্যাখ্যা করছি প্রবল উৎসাহের সাথে; কাকাবাবু আর্কিওল্যজিকাল সার্ভের অবসরপ্রাপ্ত বিরাট অফিসার, ঘোড়া চাপতে পারেন, ফেন্সিংয়ে চ্যাম্পিয়ন, হিপনোটিসমে অদ্বিতীয়, রিভলবার চালান অরণ্যদেবের মতো অব্যর্থ লক্ষ্যে ইত্যাদি। শুনে প্রিয়দর্শী নিষ্পাপ মুখে একটাই প্রশ্ন করেছিল, ‘কাকাবাবু উড়তে পারেন না?’ শুনে স্বভাবতই ওই প্রসঙ্গে আর কথা বাড়াইনি কখনো। এখন বড়ো হয়ে বুঝতে পারি, সুনীল কী নিপুণ দক্ষতায় ছোটোদের অ্যাডভেঞ্চারের গল্পেও টুকরো টুকরো জ্ঞানের তথ্য পরিবেশন করেছেন, অবশ্যই লোভনীয় গল্পের মোড়কে। হিয়ারোগ্লিফ লিপির কথা (মিশর রহস্য), আন্দামানের জারোয়া আর সেলুলার জেল (সবুজ দ্বীপের রাজা), হিমালয়ের রহস্যময় জন্তু ইয়েতি (পাহাড়চূড়ায় আতঙ্ক), এমনকি ভারতবর্ষের ভীমভেটকায় আদিম মানুষের আঁকা প্রাচীন গুহাচিত্রের কথা (ভূপাল রহস্য), এসবই কিন্তু আমি অন্তত কাকাবাবু পড়েই প্রথম জেনেছি! কাকাবাবু অনেক সময় দার্শনিক উক্তি করেছেন। যেমন একবার বলেছিলেন যে আকাশ কিন্তু বরাবরই নতুন, কোনো মানুষই তার জীবনে দু’বার একই আকাশ দেখেনা। বলো তো, এই ছোট্ট কথাটার মধ্যে কী গভীর জীবনদর্শন লুকিয়ে আছে, যে দর্শন আসলে তাঁর স্রষ্টারই। এখনও কাকাবাবু পড়ি মাঝেমধ্যে, কী আশ্চর্য, আজো একইরকম ভালো লাগে, নতুন কিছু আজো খুঁজে পাই ওই পুরনো লেখাগুলোয়। অনিমেষদা, তোমাদের ছেলেবেলায় হয়তো কাকাবাবু ছিলেন না, পরিণত বয়সে ওগুলো আর পড়োনি, ‘বাচ্চাদের বই’ পড়ার বয়স আর নেই ভেবে, কিন্তু আমার অনুরোধে একবার ওই ‘বাচ্চাদের বই’গুলো নিয়ে নাড়াচাড়া করলেই দেখবে যে কতো গুরুতর চিন্তাভাবনার বিষয় কিম্বা সমকালীন সমাজের সমস্যার কথা কায়দা করে মেশানো রয়েছে ওগুলোর মধ্যে। গণ্ডারের শিং পাচার চক্র, আফ্রিকার অশান্ত রাজনীতি আর বিপ্লবীদল, দেশের ‘স্বাধীনতা’র পরিণাম দেখে প্রাক্তন স্বাধীনতা সংগ্রামীর আশাভঙ্গ— এগুলো কি ‘বাচ্চাদের বই’এর বিষয়? সুনীল ঠিকই বুঝেছিলেন, বর্তমান কিশোরকিশোরীরাই ভবিষ্যতের পৃথিবীর দায়িত্বশীল নাগরিক, অতএব তাদেরকে বিভিন্ন সমকালীন সমস্যা সম্বন্ধে সচেতন করা একজন বিবেকবান লেখকের কর্তব্য। বাংলা কিশোরসাহিত্যের মোটামুটি সচেতন পাঠক হিসেবে দাবী করতেই পারি যে এই প্রচেষ্টা একক নাও যদি বা হয়, তবুও বেশ বিরল।

কলেজে ভর্তি হবার পর সুনীলের বড়োদের জন্য লেখা উপন্যাসগুলো কয়েকটা পড়ে দেখেছি। কয়েকজন সমবয়সী যুবকের ঔদ্ধত্য-অভিমান-উচ্ছৃঙ খলতায় ভরা জীবনযাত্রা যে একটা পুরো উপন্যাসের বিষয়বস্তু হতে পারে একথা আগে তো বুঝিনি! ওনার অপেক্ষাকৃত অনামী উপন্যাসগুলোও বিষয়বৈচিত্র্যে ভরপুর; কোনোটার বিষয় আধুনিক যুগে গৌতম বুদ্ধের পুনরুদ্ভব (নবজাতক), কোনোটার বিষয় মানবজাতির ধ্বংসের আশঙ্কায় কিছু মানুষকে নির্জন দ্বীপে পাঠিয়ে বৈজ্ঞানিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা (অমৃতের পুত্রকন্যা), আর কোথাও উনি দেখিয়েছেন কীভাবে সামান্য এক আর্যপুত্র নিজ ক্ষমতাবলে গোষ্ঠীপতি হয়ে ক্রমে জন্ম দিলো দেবরাজ ইন্দ্রের জনশ্রুতির (আমিই সে)। আমায় অবশ্য সবচেয়ে বেশি টেনেছিল ওনার লেখা ঐতিহাসিক (কিম্বা বলা যেতে পারে ইতিহাসনির্ভর) উপন্যাসগুলো। সেগুলোয় অবাক হয়ে দেখেছিলাম, আমাদের নমস্য মনীষীরা ওখানে ওদের সমস্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্ন-স ্বপ্নভঙ্গ নিয়ে তোমার আমার মতোই চলে ফিরে বেরাচ্ছেন রক্তমাংসের শরীরে, কেউ মাটির একহাত ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে যাচ্ছেন না। তবু নিজেদের কামনা-হতাশাকে তাঁরা ছাপিয়ে গেছেন বলেই আজ আমাদের কাছে বড়ো, আজ আমাদের কাছে প্রণম্য। হয়তো ‘প্রথম আলো’ বিশ্বসাহিত্যের নিরিখে তেমন কিছু মহৎ উপন্যাস নয়, খুব একটা নতুন ভাবের লেখাও নয়; কিন্তু ওই যে ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে না, যার বাংলা অনুবাদ করলে দাঁড়ায় যে অজ্ঞতাও কখনোসখনো আশীর্বাদ রূপে প্রতিপন্ন হয়, আমারও হলো সেই দশা। ভাগ্যিস বিদেশি সাহিত্য তেমন পড়া নেই, তাই তো ‘প্রথম আলো’ আজো আমার কাছে রবীন্দ্রোত্তর বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের অন্যতম দাবীদার (হ্যাঁ, ‘ঢোড়াইচরিত মানস’এর আঙ্গিকের কথা মাথায় রেখেই বলছি)। ব্যক্তিগতভাবে আমি শীর্ষেন্দুর উপন্যাসগুলোর একটু বেশি ভক্ত; সেখানে অধিকাংশ চরিত্রই একটু ‘অদ্ভুত’, অনেক বেশি নিয়তিবদ্ধ। তুমি তো জানোই, আমি নিজে একজন হতাশাগ্রস্ত মানুষ, কাজেই নিয়তির কাছে হেরে যাবার মধ্যে একটা অহেতুক রোম্যান্টিসিজম খুঁজে পাই, মনোরম কিম্বা শ্যামকে মনে হতে থাকে নিজের ভবিষ্যৎস্বত্বা। অপরপক্ষে সুনীলের উপন্যাসের বেশির ভাগ চরিত্রই কিন্তু ভীষণভাবে আত্মবিশ্বাসী, আত্মসচেতন; এরা নিয়তির কাছে পরাজয় স্বীকার করতে চায় না, এমনকি অনেকে নিয়তিকেই স্বীকার করতে অরাজী। বস্তুত সুনীলের রচিত চরিত্রগুলো হয়তো বাস্তবের অনেক কাছাকাছি নেমে আসে। সুনীল এযুগের ব্যস্ততম বাঙালি লেখক ছিলেন ওনার শেষদিন অবধি, সম্পাদকের চাপে ওনাকে প্রচুর পরিমাণে লিখতে হয়েছে, সব লেখা যে খুব উচ্চমানের শিল্পের পর্যায়ে গেছে তাও হয়তো নয়, কিন্তু ওনার কোনো লেখাই যে খুব খারাপ তা বলা যাবে না, তুলনামূলক বৈচিত্র্যহীন লেখাগুলোও স্বাদু গদ্যের জোরে ভালোমতোই উতরে যায়। ওনার গদ্যগুলির প্রতি প্রধান অভিযোগ আনা হয় যে ওনার লেখায় ওই ইংরেজিতে যাকে বলে ‘বিটুইন দ্যা লাইনস’ নাকি খুব কম, সেই অভিযোগও সর্বাংশে যথার্থ নয়। আর হলেই বা কী এসে যায়? একজন দায়িত্ববান লেখকের প্রাথমিক কাজ কি তাঁর সমকালীন সমাজ-মানুষ-সমস্যা নিয়ে লেখা, নাকি তত্ত্বপ্রধান দার্শনিকতা প্রচার করা অথবা আমার মতো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরের ব্যাকরণের অর্থহীন আস্ফালন করা? মানে শুধুই কথা নিয়ে খেলা, মন নিয়ে নয়?

সুনীলের লেখা ভ্রমণকাহিনীগুলো প্রচলিত ভ্রমণকাহিনী থেকে একারণেই আলাদা যে সেখানে কোনো স্থানের বর্ণনা কিম্বা সৌন্দর্যের চেয়ে বেশিরভাগ জায়গা জুড়ে আছে সেখানকার মানুষজন। সুনীলের জার্মানি আর রাশিয়া ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ধরা আছে ‘ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ’এ, যেখানে উনি দেখিয়েছেন যে গত শতকে যে সাম্যবাদ সারা পৃথিবীকে আশার আলো দেখিয়েছিল, মাত্র কয়েক দশকের মধ্যেই সেই সাম্যবাদের স্বপ্ন কেমন মুখ থুবড়ে পড়লো। ওনার এই বক্তব্য নিয়ে তর্ক চলতেই পারে কিন্তু আমার সেটা পরিণত গভীর মননের সৃষ্ট বলেই মনে হয়েছে। ‘ছবির দেশে, কবিতার দেশে’ ওনার ইউরোপ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা রয়েছে, কিন্তু ‘অর্ধেক জীবন’ পড়ে ওনার ফরাসী বান্ধবী মার্গারিটের প্রেমে পড়েছিলাম, এই বইতে সেই প্রেমিকার ট্র্যাজিক পরিণতির কথা পড়ার পর আর বইটা শেষ করা হয়ে ওঠেনি। সুনীলের কিশোরদের জন্য লেখা ছোটোগল্পগুলো ছাড়া অন্য গল্প তেমন পড়া নেই আমার। রণজয় অর্থাৎ নীল মানুষের গল্পগুলো কল্পবিজ্ঞান ঘেঁষা হলেও মানুষের আর পৃথিবীর প্রতি ভালোবাসায় মাখামাখি। বিজ্ঞানী বিশ্বমামা চরিত্রটা কিছুটা প্রেমেন্দ্র মিত্রের মামাবাবুর আদলে গড়া, সেগুলো পড়ে কিশোরমনে বিজ্ঞানচেতনা বেড়ে উঠবে বলেই আশা রাখি। এবার সুনীলের কবিতার অভিজ্ঞতাই বিশেষভাবে ভাগ করি তোমার সাথে। ঐতিহাসিকভাবে কবিতা সম্বন্ধে আমার মনে একটা ভীতি বর্তমান ছিল এই সেদিন অবধি। কোনো কারণে আমার একটা ভ্রান্ত ধারণা ছিল যে কবিতা মানেই হয় দুর্বোধ্য নয়তো ন্যাকান্যাকা। ইস্কুলে পড়ার সময় পাঠ্যবইয়ের মূল কবিতাগুলো না পড়েই ‘মানে বই’ থেকে সারাংশটা পড়ে নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছি প্রায়শই। আগেই বলেছি, কবি সুনীল আমার কাছে অচেনা ছিলেন তখন। উঁচু ক্লাসে পড়ার সময় হঠাৎ গায়ক নচিকেতা চক্রবর্তীর একটা গানে একটা লাইন শুনলাম ‘শক্তি বা সুনীলের কবিতা’। মনে মনে ভাবলাম, সুনীল মানে নিশ্চয়ই আমাদের সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, উনি আবার কবিও নাকি! যদিও ইতিমধ্যে পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় ওনার একেবারে ছোটোদের জন্য লেখা কিছু ছড়া চোখে পড়েছে, পড়ে দেখবার ইচ্ছে জাগেনি কখনো। শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের নামটাও শুনিনি তখন। পরে কলেজে উঠে দাদাদের মুখে এমন কথাও শুনেছি যে সুনীল নাকি আসলে ভালো লেখকই নন, ওঁর কবিতাগুলোই ভালো! তখন প্রেসিডেন্সী কলেজে পড়ি, সুনীলের কবিতা না পড়লে আর মান থাকে না! একদিন ‘হঠাৎ নীরার জন্য’ কাব্যসংগ্রহ কিনে পড়লাম। সবটা মন দিয়ে পড়িনি, পড়তে হবে বলেই পড়া, তবুও ‘বাস স্টপে দেখা হল তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল/ স্বপ্নে বহুক্ষণ/ দেখেছি ছুরির মতো বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে— দিকচিহ্নহীন—’ লাইনগুলো মনে ‘বিঁধে’ই থাকে, কী সহজ অথচ কী দুর্বোধ্য! কলেজ পেরিয়ে ইউনিভার্সিটি; তখন বান্ধবীদের সাথে সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং সাইটে রাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করি, কবিতা উদ্ধৃতি না দিলে কি মানায়! কাজেই সুনীলের ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ কেনা হলো, কথায় কথায় উদ্ধৃতি। লাগসই লাইন খুঁজতে গিয়েই কবিতাগুলো পড়া হয়ে গেল একে একে। তারপর একদিন সেই সব বান্ধবীরা কোথায় হারিয়ে গেল, মধ্যে থেকে ওই কবিতাগুলো আমার আজীবন সঙ্গী হয়েই রইলো। একটা মজার ব্যাপার লক্ষ্য করেছো কখনো, লেখক মানুষটাকে আমরা অভিহিত করি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় নামে, কিন্তু যেই কবিতার প্রসঙ্গ এসে পড়লো অম্নি বলি সুনীল গাঙ্গুলি! ওনার সব কবিতার সব লাইন তোমাদের মুখস্ত জানি, তবু রামায়ণের সেই কাঠবেড়ালির মতো আমি এটুকু বলতে পারি যে কোনো কলেজপ্রেম ব্যর্থ হলে আমিও সেই লাইনগুলো আওড়াতাম মনে মনে, ‘প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমই আমাকে নতুন অহংকার দেয়/ আমি মানুষ হিসেবে একটু লম্বা হয়ে উঠি’, ‘আমার দু’হাত ভর্তি অঢেল দয়া, আমাকে কেউ/ ফিরিয়ে দিয়েছে বলে গোটা দুনিয়াটাকে/ মনে হয় খুব আপন’ কিম্বা ‘অভিমান আমার ওষ্ঠে এনে দেয় স্মিত হাস্য/ আমি এমন ভাবে পা ফেলি যেন মাটির বুকেও/ আঘাত না লাগে/ আমার তো কারুকে দুঃখ দেবার কথা নয়’। আর ওই যে লাইনগুলো ‘কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনা!’, যেটা শুরু করলেই তোমরা কানে আঙুল চেপে বলো, ‘জানি জানি! ওটা শুনে শুনে পচে গেছে!’; সত্যি করে বলো তো, কোনো শিক্ষিত বাঙ্গালীকে চেনো, যে তার জীবনে একবার অন্তত দীর্ঘশ্বাস ফেলে ওই লাইনটা উচ্চারণ করেনি? সুনীল গাঙ্গুলির কবিতার বিরুদ্ধে প্রধান অভিযোগ হলো অশ্লীলতার। ওনার অনেক কবিতাই একটু যৌনগন্ধী হয়তো, কিন্তু আমাদের গোটা জীবনটাই কি তাই নয়? তাছাড়া উনি যে যুগে কবিতা লেখা শুরু করেন সেটা পুরনো মূল্যবোধ ভেঙে পড়ার যুগ, বস্তাপচা নিয়মগুলো ভেঙে ফেলার যুগ, দেশকালের বুকে দাঁড়িয়ে নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে খুঁজে নেবার যুগ। আমার মনে হয়, উনিও কোনো লেখায় স্বীকার করেছেন সেকথা, সেসময় কিছু বাঁধনভাঙ্গা লেখার উচ্ছ্বাসও হয়তো মনের কোণে কাজ করেছিলো কোথাও। ‘উনিশে বিধবা মেয়ে কায়ক্লেশে উনতিরিশে এসে/ গর্ভবতী হল’— এরকম লাইন আজ আমাদের কাছে নতুন কিছু না লাগলেও তদানীন্তন তরুণ কবির স্পর্ধা দেখে চমকে উঠতেই হয়। তবে ‘কথা দিয়েছিলে তুমি উদাসীন সঙ্গম শেখাবে’— যৌনতাই কি এখানে শেষ কথা?

সুনীলের আত্মজীবনী ‘অর্ধেক জীবন’ এতবার পড়েছি যে এটুকু প্রায় নিশ্চিত যে উনি আমাদের পাঠ্যপুস্তকগুলো লিখলে আমি বরাবর ফার্স্ট হতাম। কিন্তু কখনো ব্যক্তিগত ভাবে মনে হয়েছে যে ওনার অকপট স্বীকারোক্তি’গুলোর ভেতরে নিজেকে ‘ভালো’ সাজাবার গোপন প্রচেষ্টা রয়েছে হয়তো কোথাও। তা যদি হয়ও তবে ক্ষতি কি? আমরা সবাই তো নিজেকে ‘ভালো’ প্রমাণ করবার চেষ্টাই করি সর্বত্র, উনি তো অতো বড়ো একজন মানুষ হয়েও নিজের অনেক দোষত্রুটি মেলে ধরেছেন পাঠকের কাছে। তাছাড়া ‘শ্রীমদ্ভাগবত’ না কোথায় আছে না, ‘তেজীয়সাং ন দোষায়’! ঔপন্যাসিক শীর্ষেন্দু হয়তো আমার কিছু বেশি প্রিয়, কবি হিসেবে হয়তো জীবনানন্দ কিম্বা শক্তি মনের একটু বেশি কাছাকাছি, কিন্তু সাহিত্যিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় একমেবাদ্বিতীয়ম! কখনো কলকাতার শেরিফ হয়ে বাংলা ভাষার স্বপক্ষে বিদেশী জুতোর দোকানের কাঁচ ভাঙছেন, কখনো বা কোনো সাহিত্যিক অনুষ্ঠানের উদ্বোধন করছেন কিম্বা বইমেলায় কবিতাপাঠ, সর্বক্ষণই সংবাদের শিরোনামে। যেসব বাঙালী কখনো বাংলা সাহিত্য ছুঁয়েও দেখেননি, তাঁরাও সকলে প্রত্যেকে সুনীলকে নামে ও চেহারায় চেনেন, এটাই ওনার সাফল্য। রবীন্দ্রনাথের পর বোধহয় অন্য কোনো সাহিত্যিক (এক বুদ্ধদেব বসু ছাড়া) নাটক, কাব্যনাটক, কবিতা, গল্প, উপন্যাস, ভ্রমণকাহিনী, প্রবন্ধ— সাহিত্যের প্রায় প্রতিটি শাখায় এমন স্বচ্ছন্দ বিচরণ করেননি। সুনীলের কোনো সাধারণ লেখাতেও যখন পাই ‘এক সিগারেট-পথ’ কিম্বা ‘ক্লাস এইট-বয়েস’ এসব শব্দ, তখন চেনা শব্দগুলোও নতুন হয়ে ধরা পড়ে আমাদের কাছে। হয়তো জীবনানন্দ-শক্তির কবিতার পরাবাস্তবতা তাঁর কবিতায় কিছু কম, কিন্তু আর কোন কবি এমন সহজ ঔদ্ধত্যে বলতে পেরেছেন, ‘আমাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছিলে যদি, তোমার সহমরণ/ তবে কে বাঁচাবে?’ কিম্বা ‘ইচ্ছে করে লণ্ডভণ্ড করি এবার পৃথিবীটাকে/ মনুমেন্টের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বলি/ আমার কিছু ভাল্লাগে না’ অথবা ‘ক্রোধ আর কান্নার পর স্নান সেরে শুদ্ধভাবে/ আমি আজ উচ্চারণ করবো সেই পরম মন্ত্র/ আমাকে বাঁচতে না দিলে এ পৃথিবীও আর বাঁচবে না।’ এই শেষ বয়সেও উনি কিশোরকিশোরীদের জন্য জন্য আনন্দমেলায় ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করেছিলেন ‘ছোটোদের মহাভারত’। আমার এক বন্ধু অর্ক, যে তোমারই মতো একনিষ্ঠ সুনীলভক্ত আর ওনার লেখার বিশেষজ্ঞ, আগেই বলেছিলো, ‘ও লেখা উনি শেষ করতে পারবেন না, দেখে নিস’। পারলেনও না শেষ অবধি। ভালোই হয়েছে একদিকে, নিজের প্রিয় সাহিত্যিককে অসহায়, বার্ধক্যগ্রস্ত দেখে হয়তো সহ্য করা সম্ভবপর হতো না। এখন আমার মনে ওনার পাকাজুলপি, সদাহাস্যময়, সদাতরুণ ছবিটাই শেষ অবধি রয়ে যাবে হয়তো।
এই দেখো না, কত কী আগডুম-বাগডুম কথা লিখে ফেললাম। আমার মতো সামান্য অক্ষরজ্ঞানযুক্ত লোকের এই এক সমস্যা, কী বলতে গিয়ে শেষে কী বলে ফেলি! তোমার যে কতো লেখালেখি, সুনীলের কতো স্মরণসভায় মৌনতাপালন— কত্তো কাজ পড়ে আছে, তা কি আমি আর জানি না? তার চেয়ে এই অপ্রাসঙ্গিক চিঠি পড়ে থাক, আমি বরং দুটো এসএমএস টাইপ করে ফেলি জলদি, ‘হ্যাপি বিলেটেড বিজয়া’ আর ‘হ্যাপি ডেথ অ্যানিভারসারি অব পোয়েট সুনীল। রিপ।’ ভালো থেকো। অন্তত থাকার চেষ্টাটা ছেড়ো না।
বিনীত জয়ন্ত।

আপনার মতামত জানান