সহিষ্ণুতার শেষ নক্ষত্র

সুমন্ত চট্টোপাধ্যায়

 

১৯৩৩ খ্রীষ্টাব্দ। ইতিমধ্যেই পৃথিবী একটা বিশ্বযুদ্ধ দেখেছে। মিত্রশক্তি ভার্সাইয়ের চুক্তির মাধ্যমে জার্মানীর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে কিছু কঠোর শর্তাবলী। অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক সবদিক দিয়ে ধুঁকছে দেশটা। কোনো মৃতপ্রায় মানুষ যেমন মৃত্যুর আগে শেষ আঁচড়- কামড় দিয়ে নিঃশ্বাসের সময়সীমাকে প্রলম্বিত করে, জার্মানীর অবস্থাও সেরকম। এরই মাঝে তীব্র প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে উঠে এসেছে একটি নতুন দল, “ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট পার্টি” (নাৎসি)। রাইখস্ট্যাগ পুড়িয়েছে তারা গোপন ষড়যন্ত্র করে। শ’য়ে শ’য়ে বিরোধীদের গ্রেফতার করেছে। পুরো দেশজুড়ে চলছে বই পোড়ানোর কর্মসূচী। গঠন হয়েছে “গেস্টাপো”-র মত একটি ভয়ঙ্কর বাহিনী। ইহুদীদের দোকানপাট- স্কুল- বাড়িঘর সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চূড়ান্ত এক হত্যালীলার আগে সেজে উঠছে ভয়াবহতা। সাহিত্যিক-সমাজ দ্বিধাবিভক্ত। গটফ্রায়েড বেন’এর মত কবি নতুন রাজত্বের রাজকবি হওয়ার লোভে নাৎসি শাসনের প্রশংসা করছেন, সরাসরি সমর্থন করছেন হিটলারকে। অন্যদিকে টমাস মান্ কিংবা কমিউনিস্ট বার্টল্ট ব্রেখটের মত সাহিত্যিকেরা নাৎসি শাসনের তুমুল নিন্দা করছেন। অথচ এই আগুনের সমুদ্রের সামনে দাঁড়িয়েও একজন সাহিত্যিক সম্পূর্ণ নিশ্চুপ।
প্রশংসা বা নিন্দা— কোনোপথেই হাঁটছেন না তিনি। সবাই জানে তাঁর বক্তব্য, কিন্তু তিনি মুখ খুলছেন না। কিছু লিখছেনও না। চুপচাপ ব্রেখট এবং মান’কে টাকা দিয়েছেন দেশ ছাড়ার জন্য এবং শেষে নিজেও দেশ ছেড়েছেন। চলে গেছেন সুইজারল্যান্ড। সেখানে গিয়ে লিখেছেন, কিন্তু নাৎসি বর্বরতা বা ইহুদীদের দুরবস্থা নিয়ে একটি শব্দও খরচ করেননি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার পর গ্যেটে প্রাইজ পেয়েছেন, পেয়েছেন সাহিত্যের জন্য নোবেল, কিন্তু তাঁর নীরবতা, আজ ৮২ বছর পরও এক আজব প্রহেলিকা। কি হয়েছিল তাঁর, কেন কিচ্ছু বলেননি এতবড়ো একটা অসহিষ্ণুতার পরিবেশ নিয়ে? সেসব রক্তাক্ত প্রশ্নের উত্তর হয়তো প্রচ্ছন্নভাবে দিয়েছিলেন সামান্য একটি বক্তব্যের মাধ্যমে,
“When dealing with the insane, the best method is to pretend to be
sane.”


হার্মান্ কার্ল হেস্। এতটাও উদাসীন, সন্ন্যাসী কিংবা ফকিরগোত্রীয় ছিলেন না মানুষটি। শৈশবে এতটাই প্রাণোচ্ছ্বল ছিলেন যে মা- বাবার পক্ষে মুস্কিল হয়ে উঠতো তাকে সামলানো। ১৪ বছর বয়সে যখন তাঁকে ইভাঞ্জেলিক্যাল থিওলজিক্যাল সেমিনারীতে ভর্তি করা হয়, একটা বছর জার্মানীর
বিখ্যাত সেই ক্রিশ্চিয়ান বোর্ডিং স্কুলে ঠিকঠাক কাটালেও, পরেরবছর তিনি
সেখান থেকে পালিয়ে যান। প্যাস্টরের মেয়ের প্রতি ব্যর্থপ্রেম তাঁর মনে
হতাশা আর অস্থিরতার জন্ম দিয়েছিল। সেসবের হাত থেকে মুক্তি পেতে সেই বছরই,
মাত্র পনেরো বছর বয়সে, আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। মেন্টাল ইনস্টিটিউশনেও
ভর্তি করা হয় তাঁকে। এরপর বয়স্ক ছেলেদের সাথে মিশে ধূমপান আর মদ্যপানে
হাতেখড়ি হয়, দেনায় ডুবে যায় জীবন। একসময় দৃষ্টিশক্তি আর স্নায়ুর
দুর্বলতার সাথে মাথাব্যথার রোগও ধরা পড়ে, যা সারাজীবনই তাঁর সাথী হয়ে রয়ে
গেছিল। কিন্তু এসব সত্ত্বেও দমানো যায়নি তাঁর প্রাণশক্তিকে। বহুদিনের স্বপ্ন ইটালীভ্রমণ শেষে মায়ের মৃত্যুর খবর, এড়িয়ে গেছিলেন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া, পাছে নৈরাশ্য গ্রাস করে আবার! কিন্তু দুঃখের ভার নিতেই হয়েছিল, আর তা থেকে বেরোনোর জন্যই বিয়ে করেন ঠিক পরেরবছর।
পল্লীপ্রকৃতি গেইনহোফেনের নিরিবিলিতে বসবাস শুরু করেন তাঁর সংসার নিয়ে।
বৌদ্ধধর্ম এবং ভারতীয় সংষ্কৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে ঘুরে আসেন দক্ষিণ- পূর্ব
এশিয়ার দেশগুলিতে। কিন্তু ঘনিয়ে আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের মেঘ। যুদ্ধে একের
পর এক কবি- সাহিত্যিকের মৃত্যুর খবর তাঁর কাছে এসে পৌঁছালে তিনি আর চুপচাপ
হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারেননি, পারেননি শত শত তরুণের জীবন তছনছ হয়ে
যাওয়ার সময় সুইজারল্যান্ডের (১৯১২ খ্রীষ্টাব্দ থেকেই এখানে চিরস্থায়ী
বাসস্থান বানিয়েছিলেন কার্ল ইয়ুং- এর সহকারী জে.বি. ল্যাং-এর কাছে মনস্তাত্ত্বিক চিকিৎসার জন্য) নিরিবিলিতে শান্তির দিন কাটাতে। তাই যোগ দেন জার্মান বাহিনীতে। শারীরিক দুর্বলতা তাঁকে বন্দুকহাতে নামতে না দিলেও, অন্য কাজে নিযুক্ত হন। খুব অল্পসময়েই অন্ধ জাতীয়তাবাদ আর যুদ্ধের অসারতা অনুধাবন করতে পারলেও নিজের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে লিখে ফেলেন একটি প্রবন্ধ, “O Freunde, nicht diese Töne” (এই সুরে নয়, ওহে বন্ধু)।


সামান্য একটা প্রবন্ধ কিভাবে মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে
দেয়, কিভাবে বদলে দেয় জীবন, তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ ছিলেন হেস্ নিজেই।
শান্তির আবেদন, ভালোবাসার বাণী, পারস্পরিক বোঝাপড়ার বক্তব্যসম্বলিত এই
প্রবন্ধ প্রকাশিত হতেই হেস বুঝতে পারেন, পৃথিবীটাকে আসলে তিনি যত
কঠোর-কঠিন ভেবেছিলেন, আসলে তা তাঁর ধারণার থেকেও বেশী খারাপ। শৈশবে
উটেমবার্গের ক্যল্ শহরের যে রাস্তাঘাট, ঘরবাড়ি, মানুষজন, চ্যাপেল,
চামড়াশিল্পের কারখানাগুলো তাঁর মনে নৈরাশ্যের বীজ বুনেছিল, সেগুলো যেন
তুলনায় অনেক ভালো ছিল। ভালো ছিল, মা যখন তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থের সমালোচনা করেছিলেন। একটা প্রবন্ধের পর যখন এত রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের মুখোমুখি হতে হল, জার্মান প্রেস আক্রমণ শানালো প্রতিটি লেখায় —প্রতিটি দিন, হেস্ উপলব্ধি করলেন এই সময়ে এই যুদ্ধকামী দেশে মানবতার কথা বলা অপরাধেরই সমান। শুধু তাই- ই নয়, তাঁর বাড়ির ঠিকানায় আসতে থাকলো সাধারণ মানুষের ভর্ৎসনার চিঠি, একের পর এক। যুদ্ধবিরোধী মনোভাবের জন্য পুরোনো বন্ধু- আত্মীয়রা সবাই একা ছেড়ে গেল পৃথিবীবিখ্যাত এই সাহিত্যিককে। বন্ধু থিওডোর হিউস এবং প্রখ্যাত ফরাসী সাহিত্যিক রোমা রঁলা পাশে দাঁড়ালেও সেইসময়েই তাঁর বাবার মৃত্যু, ছেলের শরীরখারাপ আর স্ত্রী’র স্কিজোফ্রেনিয়ায় আক্রান্ত হওয়া তাঁকে সম্পূর্ণভাবে আধ্যাত্মিকতার পৃথিবীতে নিয়ে আসে। পার্থিব দুনিয়ার দ্বন্দ্ব- দোলাচল থেকে
স্বেচ্ছানির্বাসন নেন তিনি। চলে আসেন দক্ষিণ সুইজারল্যান্ডের মোন্ট্যাগনোলা’য়। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়া এবং নাৎসি শাসন ক্ষমতায় আসার মাঝে তিনি তাঁর সেরা উপন্যাসদুটি লিখে ফেলেন: “সিদ্ধার্থ” (১৯২২) এবং “স্টেপ্পেন্উল্ফ্” (১৯২৭)। ১৯৩১ খ্রীষ্টাব্দে শেষ উপন্যাস “গ্লাস-বীড্গে ম” লেখার পরিকল্পনা করলেও তা প্রকাশিত হয় ১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দে,
সুইজারল্যান্ডে।


প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হতেই দেশে ফিরে আসেন হেস্।
সক্রিয়ভাবে যুক্ত হয়ে ওঠেন জার্মান সমাজ পুনর্গঠনের কাজে। তরুণদের মন
থেকে অন্ধ জাতীয়তাবাদের গোঁড়ামি দূর করার জন্য এখানে-ওখানে ঘুরে
শিক্ষাদানের কাজ শুরু করেন। “Vivos Voco” (দ্রুত আহ্বান) নামের একটি
বিশেষ জার্নাল প্রকাশ এবং সম্পাদনার কাজও শুরু করেন। হেস্ চাননি, যে ক্ষত
একবার তৈরী হয়েছে তা জেগে উঠে মড়কের আকার নিক। ওয়েইমার রিপাবলিকের
দুর্বলতা থেকে ধীরে ধীরে নাৎসিপ্রধান হিটলারের উঠে আসা’কে খুব উদ্বেগের
সাথে দেখেছিলেন তিনি। ১৯৩০ খ্রীষ্টাব্দের শেষ থেকে জার্মান প্রেস তাঁর
লেখা ছাপানো বন্ধ করে, নাৎসিরা এসে সরাসরি নিষিদ্ধ করলেও তিনি দেশ
ছাড়েননি। ১৯৪৩ খ্রীষ্টাব্দে নাৎসিদের ব্ল্যাকলিস্টে যুক্ত হয় তাঁর নাম।
কিন্তু ততদিনে বহু জল গড়িয়ে গেছে রাইন নদী দিয়ে। নোবেলজয়ী টমাস মান বা
কমিউনিস্ট বার্টল্ট ব্রেখট নাৎসিশাসনের নিন্দা করলেও হেস্ একই ভুল
দ্বিতীয়বার করেননি। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন, সেই প্রতিশোধস্পৃহার জোয়ারে
তাঁর মানবতার কথা খড়কুটোর মত তলিয়ে যাবে। হয়ে উঠবেন “গণশত্রু”, যাদের
জন্য বলবেন তারাই হয়তো সবথেকে আগে দাঁড়াবে তাঁর বিপরীতে। ৪০৪
খ্রীষ্টাব্দে দু’জন মরণকামী গ্ল্যাডিয়েটরদের বাঁচাতে গিয়ে উন্মত্ত
দর্শকদের ছোড়া পাথরবৃষ্টিতে মারা গেছিলেন এক আধপাগল বৃদ্ধ (সেইন্ট
টেলিম্যাকাস) এবং সেইথেকে রোমে বন্ধ হয়েছিল গ্ল্যাডিয়েটরদের “রক্তাক্ত
বিনোদন”। কিন্তু বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে দাঁড়িয়ে, পৃথিবীর নৃশংসতম
একনায়কের সামনে, একজন সাহিত্যিকের জীবনের কোনো মূল্যই ছিলনা। পুরো
জার্মানী ফুঁসছিল ভার্সাই সন্ধির প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য। হেস্ কোনোভাবেই
পারতেন না আরেকটা বিশ্বযুদ্ধ থেকে মানবতাকে বাঁচাতে। বিকল্প রাজনীতির
দিশা দেখাতে না পারলেও, নাৎসিবাদকে যে তিনি ঘৃণা করেন, তা বুঝিয়ে
দিয়েছিলেন নাৎসিবাদ তৈরীর বহু আগেই। তাঁর তৃতীয় স্ত্রী ছিলেন একজন ইহুদী।
কিন্তু নাৎসিবাদের সমালোচনা না করার জন্য সমালোচনা পিছু ছাড়েনি। কেউ
বলেছেন, নাৎসি বর্বরতায় ভয় পেয়েছিলেন; তো কেউ আবার বলেছেন, নিজের প্রাণ
বাঁচানোর স্বার্থে কিছু বলেননি। কিন্তু ভয় যে তিনি পাননি তার প্রমাণ
দিয়েছেন বহুবার। বলতে পেরেছেন, “Some of us think holding on makes us
strong; but sometimes it is letting go” বা “Words do not express
thoughts very well. They always become a little different immediately
after they are expressed, a little distorted, a little foolish”।
বুঝিয়ে দিয়েছিলেন, প্রতিশোধের আগুনে অন্ধ কোনো স্বৈরাচারী একনায়কের থেকে
তাঁর সাহস ছিল শতগুণে বেশী। কেননা, তাঁর নীরবতা একশো’টা হিটলারের
ক্রোধোন্মত্ত চিৎকারের থেকেও ছিল বেশী অর্থবহ, বেশী বাঙ্ময়, বেশী
শক্তিশালী।

আপনার মতামত জানান