হারানো মেয়ের গপ্পোটি

সরোজ দরবার

 

‘বাপের মতো, বাপ তো নয়, তাহলে আপত্তি কীসের?’- প্রহরে প্রহরে দেওয়ালঘড়ির ঘন্টা বাজার মতোই কথাটা কানে বাজছে সরস্বতীর। এখন কত রাত হল কে জানে! চোখে একফোঁটা ঘুম নেই তার। আসলে এমন আজব প্রস্তাবও যে সে জীবনে পেতে পারে ভাবেনি কোনওদিন। জীবনটা তো তেমন সুখের কিছু নয়। কে যে তার মা-বাবা সে জানে না। তবু একটা বড় মস্ত মানুষের নামে তার পরিচয়। এই এলাকার তাবৎ জনগণ লোকটাকে ভগবানের মতো মানেন। যেন তিনিই সৃষ্টিকর্তা। কথাটা মিথ্যে তা নয়। এতবড় একটা জনপদ তৈরি করা তো চাট্টিখানি কথা নয়। বাইরে থেকে এল, যুদ্ধ করল, জয় হল, আর সভ্যতা গড়ে উঠল- তা তো আর হয় না। সুশৃঙ্খল একটা সভ্যতার কাঠামো গড়তে এমন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষেরই দরকার হয়। চারজন লোক যা ভেবে উঠতে পারে না এই লোকটার মাথাতে সে সব আসে। চারজনের বুদ্ধি মিললেও যা করে উঠতে পারে না, ইনি একাই তা পারেন। যেন এক মাথাই চার মাথার সামিল। তাই তো তাঁকে সৃষ্টিকর্তা জ্ঞান করেন সকলে। এই লোকটাই সরস্বতীর বাবা। মানে পালনকর্তা। সরস্বতীকে মানসকন্যা হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন ইনি। কে জানে কোত্থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন! ইনি না থাকলে হয়ত কবেই মরে যেত সে। এই লোকটার জন্যই আজ তার সবকিছু হয়ে ওঠা। আর সেই লোকটাই কিনা এমন প্রস্তাব দিল!
মানুষটা যে খারাপ নন, এ কথা সকলেই মানেন। সরস্বতী নিজেও তা মানে। তাকে পড়াশোনা শিখিয়েছে।অনেকটাই। তারপর একদিন ডেকে বললেন, ‘তোমার এত বিদ্যেবুদ্ধি, শুধু নিজের কাছে কেন রাখবে? তোমার অধীত বিদ্যা তুমি অন্যদেরও দান করো।’ বাবা না হলেও সরস্বতী লোকটাকে বাবার মতোই জানে। আর তাই এ নির্দেশ শিরোধার্য করে সে কাজে লেগে পড়ল। কিন্তু কী করে বিদ্যা দান করবে সে? এই নতুন গড়ে ওঠা সভ্যতার সব কিছুই বেশ কাঠামো মেনে চলে। বাবার কাজ দেখে সরস্বতী শিখেছে, কাঠামো না থাকলে কোনওকিছু দীর্ঘমেয়াদি হয় না। হতে পারে যে উদ্দেশ্য নিয়ে সে কাঠামো তৈরি, পরবর্তীকালে তাতে শ্যাওলা ধরবে। পুরো বিষয়টারই অভিমুখ ঘুরে যাবে। তাও কখনও না কখনও নিশ্চয়ই আসল জিনিসটা বেরিয়ে আসবে। কেউ না কেউ পুনরুদ্ধার করবে। পুরনো কাঠামোকে সময়ের উপযোগী করে নেবে। আর তাই গোড়াতে একখানা কাঠামো খুব জরুরি। সাধারণ মানুষকে শিক্ষিত করে তোলার সংকল্প নিয়ে সে তাই প্রথমে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলল। কী নাম দেবে সে প্রতিষ্ঠানের? ভেবে ভবে আর কিছু না পেয়ে শেষে নিজের নামটিই বসিয়ে দিল।

কিন্তু পড়াতে গিয়ে দেখে আর এক জ্বালা। শিক্ষা তো পরের কথা, আগে তো সাধারণের মুখে খাবার তুলে দিতে হবে। মায়ের স্তন পেয়ে শিশু আগে বাঁচলে তবে না তার বেড়ে ওঠা শিক্ষা ইত্যাদি। সরস্বতী বুঝেছিল, শুধু শিক্ষায় আটকে থাকলে চলবে না। এই জায়মান সমাজে সত্যিই শিক্ষা ছড়িয়ে দিতে গেলে একটা বহুমুখী প্রকল্প নিতে হবে। এমন একটা প্রকল্প যা অন্নসংস্থান করবে, বেঁচে ওঠার সহায়ক হবে আবার শিক্ষিতও করে তুলবে। কোমর বেঁধে সে কাজে নেমে পড়েছিল সে।
২)
হু হু করে কাজে নাম ছড়িয়ে পড়েছিল সরস্বতীর। নদীর জলও বোধহয় এত দ্রুত চারিদিকে ছড়িয়ে পড়তে পারে না। কন্যাসমা মেয়েটির কৃতিত্ব দেখে মুচকি হেসেছিল লোকটি। তিনি জানতেন, তাঁর একার পক্ষে সব করা সম্ভব নয়। যদিও এ জনপদে তাঁকে সবাই সৃষ্টিকর্তা বলে থাকেন, তবু তিনি তো জানেন রাজনীতিটা আসলে কোথায়। কাকে দিয়ে কোন কাজ হবে সেটা না ধরতে পারলে, এই পদটায় তাঁর থাকারই কোনও মানে হয় না। এখন তাঁকে যে সহযোগিতা করে, ভবিষ্যতে হয়ত সেই এই পদের দায়িত্ব নেবে, কিন্তু নাম পাবে না। নিজের নামকে তিনি এমন উচ্চতায় পৌঁছে দেবেন যে, পরে যেই এই পদে বসুক না কেন তাঁর নামেই পরিচিত হবে। স্বতন্ত্র পরিচয় বলে তাদের কিছু থাকবে না। সৃষ্টিকর্তার এ গোপন রাজনীতি দুনিয়ার কেউ জানে না। অমরত্বের প্রত্যাশা কে পূরণ করতে পারে, যদি তিনি নিজে না তা আদায় করতে পারেন। হ্যাঁ, এ দুনিয়ায় খুব কম মানুষই জানেন, অমৃত কোন বস্তু নয়, আসলে এই বেঁচে থাকার রাজনীতিই।
বিদ্যেবতী মেয়েটিকে তিনি কাজে লাগাতে চেয়েছিলেন। রূপসী মেয়ে সামনে থেকে কাজ করলে, যে কোনও কাজ যে সহজ হয়ে যাবে, তিনি জানতেন। হচ্ছেও তাই। সাধারণ মানুষগুলো মেয়েটাকে এখন দেবী জ্ঞান করে। করবে নাই বা কেন, যেভাবে নিজের চেষ্টায় এতবড় প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, তাতে এটাই স্বাভাবিক। জ্ঞানচর্চার বিকেন্দ্রীকরণ চাট্টিখনাই কথা নয়। কিন্তু তাঁর এক আদেশ পেয়ে মেয়েটা কী তুলকালামই না করেছে। আসলে এ প্রতিভাটা যেন তার ছিলই। শুধু তাঁর আদেশটা অনুঘটকের কাজ করল। আরও কত যুগ পরে, কালের নিয়মে যখন এ সভ্যতা আর থাকবে না, তখনও হয়ত মেয়েটার কথা বলবে লোকে। ‘যজ্ঞফলরূপধন্দাত্রী’ বলে এর বন্দনা করা হবে হয়ত। বিদ্যা, শিক্ষা এবং সর্বোপরি জ্ঞান ছাড়া একটা সভ্যতা কখনও মাথা তুলে দাঁড়াতে পারে না। মেয়েটা সেই অসাধ্য সাধনই অনায়াসে সম্ভব করে তুলেছে। আগে অন্নের ব্যবস্থা করেছে, পরে শিক্ষা দিয়েছে। তারপর শিক্ষিত শ্রেণি নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, সমাজে কাজের ভেদ অনুসারে নিজের অন্নসংস্থান করে নিতে পারছে। এ মেয়ে যদি ‘অন্নযুক্তযজ্ঞবিশিষ্ টা’ বলে ভূষিতা না হয়, তবে কে হবে!
একটা দ্বীপে একটা বড় গাছের তলা থেকে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন মেয়েটিকে। কোন জানোয়ার মা-বাপের কীর্তি কে জানে! আজ নিজের চেষ্টায় কোথায় থেকে কোথায় পৌঁছেছে সে। তবুও মেয়েটা বড় অন্তর্মুখী। এত রূপ, গুণ তবু অন্য কিছুতে মন নেই। বড় অধরা সে। এত প্রতিষ্ঠিত বাপের ঘরে থাকে তবু কোনও দেখনদারি নেই। সহজ, সরল, সাদা মনের মেয়ে সে। নিজের কাজ ছাড়া অন্য কোনওদিকে মন নেই তার। যদিও তার নাম নদীর জলের মতোই ছড়িয়েছে তবু প্রচারের আলোর বাইরে সে থাকতে চায়। যেন স্বর্গ নয়, পাতালই তার পছন্দ। নাম ডাকের বাহার নয়, ভিড় নয় বরং নির্জনতা প্রিয় তার।
কিন্তু এমন মেয়েকে যে সভ্যতার কাঠামোয় বড় দরকার। তাঁর পরে যারা এই সভ্যতার সৃষ্টিকর্তা পদে বসবে, তাদের সঙ্গে যদি এ মেয়ে থাকে, তবে এ সভ্যতার দৌড় কেউ থামাতে পারবে না। অর্থাৎ একে টেনে আনতে হবে প্রসাসনের মূল কাঠামোয়। তিনি জানেন, তাঁর এক নির্দেশেই সরস্বতী যে কোনও কাজ করবে। তবু এমন কিছু একটা করতে হবে যাতে মেয়েটারও হিল্লে হয়। সভ্যতার কাজও সমাধা হয়।
৩)
অনেক ভাবনাচিন্তা করে শেষমেশ মেয়ের কাছে কথাটা পেড়েই ফেললেন তিনি। মেয়ের বিয়ে দিতে চান তিনি। কিন্তু পাত্রটি যে মেয়ের খুব উপযুক্ত তা বলা যায় না। বরং একটু বয়সী। কিন্তু কাজে তুখোড়। সৃষ্টিকর্তা ঠিক করেছেন, এই চারমাথার কাজ একজনে করার গুরুভার যখন আর তাঁর সইবে না, তখন এই লোকটিকেই দায়িত্বভার তুলে দেবেন। তাছাড়া সভ্যতা গড়তে তাঁর যে দর্শন, এ লোকটি তা জানে। তাঁরই হাতে গড়া লোক। এর সঙ্গে সরস্বতীর বিয়ে দিয়ে দিলে কেমন হয়?
তাঁর মুখে কথাটা শুনে সরস্বতী প্রথমে অবাক দৃষ্টিতে তাঁর দিকেই তাকিয়ে থাকল। এমন প্রস্তাব পাবে সে আশাও করেনি। সে অন্তর্মুখী ঠিকই, পুরুষ সমাজের মন মজাবে এমন রুচিও তার বিশেষ নেই, কিন্তু তাই বলে, এই তাঁর বিয়ের পাত্র! আমতা আমতা করে সে শুধু বলেছেল, বয়সের ফারাকের কথা। বলেছিল বাবার সহযোগী প্রৌঢ় এই মানুষটিকে সে বাবা-কাকার মতোই ভেবেছে।
মেয়ের আবেগের কথা জানেন তিনি। তবু সৃষ্টিকর্তার দায় যে অনেক। সরস্বতীর সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধা হলে, এই লোকটিকে সৃষ্টিকর্তার আসনে বসালে তিনি নিশ্চিন্ত। হরেদরে তারই উত্তরাধিকার বাহিত হবে। তাঁর দর্শনে দীক্ষিত লোক বসল পদে, আর তাঁর মানসকন্যা থাকল সে লোকের পাশে। এর থেকে ভাল যে আর কিছু হয় না! হ্যাঁ লোকে হয়ত বলবে প্রায় বাপের বয়সি কারও সঙ্গে সরস্বতীর বিয়ে হয়েছে। কিংবা সৃষ্টিকর্তা পদে ওই লোকটি বসলে কেউ কেউ এমন ভুল করতে পারে যে, বাপই হয়ত মেয়ের দিকে হাত বাড়িয়েছে। কিন্তু সে যে যা ভাবে ভাবুক। এ ছাড়া তার উত্তরাধিকার বাঁচানোর আর কোনও রাস্তা নেই। সত্যি বেঁচে থাকার রাজনীতি যে কত বিচিত্র।
৪)
এই সংসারে কাকার মতো এক মানুষ আছে সরস্বতীর। একমাত্র তাঁর কাছেই মনের কথা বলতে পারে সে। যদিও তিনি আবার রগচটা মানুষ। এ কথা শুনে কোন রুদ্রমূর্তি না ধারণ করে বসেন! সাধে কি আর তাঁকে লোকে ধ্বংসের প্রতিনিধি বানিয়ে বসেছেন! তবু তাঁকেই এ কথাটা বলতে হবে। তাঁর পরামর্শ না শুনে কোনও সিদ্ধান্ত নিতে পারছে না সরস্বতী।
যথারীতি এ কথা শুনে তিনি যারপনাই রেগে গেলেন। তার বাবাকেই শায়েস্তা করবেন বলে ঠিক করলেন। তারপর তাকে বললেন, কোথাও একটা চলে যেতে।
সরস্বতী জানে তাকে কোথাও একটা চলে যেতেই হবে। কিন্তু বাবার মতো মানুষটার আদেশইবা অমান্য করবে সে কী করে! বিয়েটা মেনে নিলে বরং দুদিকই রক্ষা পায়। আর তার হাতে গড়া প্রতিষ্ঠানও একটা বড় কাঠামোর মধ্যে চলে আসবে। তার ভাবনাচিন্তা হয়ত তার হবু স্বামী, সৃষ্টিকর্তা পদের দ্বিতীয়জন, প্রশাসনিক কাজেরই অংশ করে নেবে। শিক্ষা অভিযান ব্যক্তিপ্রয়াস থেকে গণতান্ত্রিক কর্মসূচি হয়ে উঠবে।
সরস্বতী বুঝতে পারে, কেন তার বাবাকে সবাই চারমাথার এক লোক বলে। অব্যর্থ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। আজ তার খারাপ লাগছে ঠিকই, তবু ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই কেউ বুঝতে পারবেন, কোন দায় স্বীকার করে বাপ-কাকার বয়সী একজনকে স্বামী হিসেবে মেনে নিচ্ছে সে।
৫)
তারপর অনেকদিন কেটে গিয়েছে। সরস্বতীর স্বামীই এখন সৃষ্টিকর্তা পদে বহাল। দারুণ জমে উঠেছে এ সভ্যতা। সরস্বতী আন্দাজ করতে পারে, এমন সভ্যতা আর দুনিয়ায় নেই। আর যে শিক্ষা এই সভ্যতার ভিৎ গড়ে দিয়েছে, ভবিষ্যতে যত ঝড় ঝাপটাই আসুক না কেন, সে ঠিক মাথা তুলে দাঁড়াবে। সেখানেই তার সাফল্য। তার জীবনের সকল কুসুম ঝরানো এক সিদ্ধান্তের সাফল্য।
তবু মাঝে মধ্যে এ সব ছেড়ে তার খুব পালাতে ইচ্ছে করে। সে জানে, সভ্যতা যত এগোবে, তত পাঁক জমবে। তার ভাবনাচিন্তাকে ঘিরেও রাজনীতি নিজের মতো ডানা মেলবে। এই যে মেঘমল্লার শুনতে তার এত ভালো লাগে। কোথাও এই সুর বাজলেই সে হাজির হয়ে যায়। অথচ রাজনীতি বলবে সেখানে তার যাওয়া উচিত নয়। কিন্তু সে তো এতদিন নদীর মতো উছলধারা ছিল। কেন সে নিজেকে বন্দি করবে? কিংবা ওই মেঘমল্লারের টোপ দিয়েই যদি কেউ তাকে বন্দি করে রাখে। আবার কোন ভালোবাসার মূল্যে তাকে ফিরতে হবে কে জানে! তারথেকে কোথাও চলে যাওয়া ভাল। নিজের মতো, চলতে মিলিয়ে যাওয়া। শুকনো বালির বুকে যেমন মিলিয়ে যায় জলধারা। থেকে যায় তার প্রবাহের দাগ।
সেই দাগ ধরে ধরে কেউ কি তাকে কোনওদিন খুঁজতে আসবে? এক সৃষ্টিকর্তার মানসকন্যা, আর এক সৃষ্টিকর্তার স্ত্রীর বাইরে, সরস্বতীকে কি কেউ খুঁজবে? কে জানে! সত্যিই আর কিছু জানে না সরস্বতী। যেতে যেতে একলা পথে বাতিখানা নিজেই নিভিয়ে দিল সরস্বতী। বাবার নির্দেশে সে নিজেকে অকাতরে বিলিয়ে দিয়েছে। কাজে হোক বা জীবনে। কিন্তু এতটাই সহজ নাকি সে? সত্যিই কোনও সাধনার প্রয়োজন নেই তাকে পেতে! সমস্ত রাজনীতির বাইরে গিয়ে, প্রয়োজন পেরিয়ে, একমনে উদ্ভ্রান্তের মতো কেউ কি কোনদিন তাকে চাইবে না? আজ চিরকালের মতো অধরা হয়ে যেতে যেতে মনে মনে তাই অস্ফূটে সে শুধু বলল, খোঁজো সভ্যতা, খোঁজো।

আপনার মতামত জানান