নয়নিকার প্রেমিক

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

(১)

নয়নিকা,
ছোটবেলা থেকেই, কিম্বা বলা যায় প্রায় জন্মলগ্ন থেকেই আমার চোখে লাগানো পুরু কাঁচ। মধ্যে মধ্যে শুধু ফ্রেম পালটে পালটে গেছে।
আমরা এইট্টিজের সন্তান। মানে যখন আমাদের জন্ম, তখনো সচিন টিনএজার, লোকে সাদা পোশাকের ক্রিকেট খেলা দেখতে যেত টিকিট কেটে। লোকজন লাল কোকাবুরা বলে খেলতো, আর বোলার হওয়ার মানে ব্যাটসম্যানদের সামনে বাঁধা পাঁঠার চেয়ে বেশি কিছু ছিলো।
তখন আমাদের এই দক্ষিণ কোলকাতার শহরতলিতে, পাড়ায় পাড়ায় অধুনা সল্টলেকের মতো সাজানো পার্ক ছিলোনা, কিন্তু একটা আধটা ফাঁকা এবড়ো খেবড়ো মাঠ থাকতো। যার জায়গায় জায়গায় ঘাসের গোঁজামিল থাকতো, আর মাঠগুলো বেজায় উচু নীচু হতো। পাড়ার ছেলেদের কাছে ওটুকুই টেন্টব্রিজ-টনটন হয়ে যেতো। আমাদের উত্তর কোলকাতার দু’বাড়ির ভাঁজে উইকেট সাজিয়ে গলি ক্রিকেট খেলার প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়নি।
এতো কথা লিখছি তার কারণ, এগুলোর কোনোটাতেই আমি ছিলাম না। মোটাফ্রেমের চশমা পরে অনেক পরে বিজয় ভরদ্বাজ নাইরোবিতে ইন্ডিয়াকে ফাইনালে তুলেছিল। সে অনেক পরের কথা। গাঙ্গুলি তো কন্ট্যাক্ট লেন্স পরেই খেলে গেলো সেদিন অবধি।
আমি নিজের মতে মোটের উপর মাঝারি মানের বোলার হতে পারতাম, শর্ট হ্যান্ড ক্রিকেটে। বাড়ির দেওয়ালে বল করে করে করে রাবার ডিউসে যা যা আবিষ্কার, পাড়ার মাঠে সেগুলো আমাকে হেল্প করেনি। খেলাতেই নিতোনা। চশমা পরে নাকি খেলা যায়না। মাও নিমরাজি ছিলো, চশমা ভেঙে টেঙে একাকার হবে বলে।
তাই যা হয়, আমার পাড়ার মাঠে বিজয় ভরদ্বাজ হওয়া হোলোনা। আম্পায়ার হতাম, টুর্নামেন্ট থাকলে স্কোরারও হতাম। কিন্তু ক্রিকেটটা থেকে গেলো। তখন কেবল টিভি এসে গেছে,সেট টপ বক্সের ঝামেলা ছিলোনা। নাইন্টিনাইন ওয়ার্ল্ড কাপের আগে বাবাকে ধরে তাই ইএসপিএন -স্টার স্পোর্টস লাগিয়েই নিলাম।
ওয়ার্ল্ড কাপ গেলো, ইন্ডিয়া – আজহারের ইন্ডিয়া, জিম্বাবোয়ে -নিউজিল্যান্ড সব্বার কাছে হেরে গেলো। কিন্তু স্টিভ ওয়া আমার হিরো হয়ে গেলো। আমার কেবল টিভি, আর অস্ট্রেলিয়া মোটামুটি একই সময় থেকেই দৌড়োনো শুরু করে বলা যেতে পারে।
তারপর থেকে, বলতে নেই , কিন্তু ক্লাস এইট নাইনের পড়ার মধ্যে নিউজিল্যান্ড জিম্বাবোয়ে ট্যুর করলেও দেখতাম।
আহ ক্রিকেট, ক্রিকেট নিয়ে লিখতে লিখতে আদ্ধেক পাতা শেষ করে ফেললাম। হাতে বেশি সময় নেই। আর বেশি ভ্যাজর ভ্যাজর করার এনার্জিও পাচ্ছিনা।
নয়নিকা, যারা বেসিক্যালি একা হয়, লোনার হয়, মানে পাড়ার টুর্নামেন্টে স্কোরার হয়ে চলে বছরের পর বছর, তারা – আশির দশকে জন্মালে লাইব্রেরী মেম্বারশিপ নিতো। এখন হয়তো টিন্ডারে অ্যাকাউন্ট খোলে।
দুটো স্টপেজ পরেই সুন্দর লাইব্রেরীটা ছিলো।
আমাদের অঞ্চলে সবই প্রায় সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের তৈরী। মানে প্রত্যেকটা পাড়া, প্রত্যেকটা গলি – ওদেরই কোনো বাগান, কোনো ভেট দেওয়া জমি ইত্যাদির থেকে জন্মেছে। এই লাইব্রেরিটা খোদ ওদের পাড়াতেই – তো নিশ্চয়ই পিছনে রায়চৌধুরীদের কেউ না কেউ আছে বলেই আমার ধারণা।
যাগগে সে কথা, লম্বা বড়ো লাইব্রেরিটা ছিলো, কালো কালো মলাট দেওয়া বই, তা’তে সোনার জলে নাম লেখা। আস্তে আস্তে বুঝতে পারলাম, ক্রিকেট না চালিয়ে ওই কালো কালো বইগুলোতে সময় যাচ্ছে বেশি। মোটা চশমা, বিজয় ভরদ্বাজ হতে দেয়নি – কিন্তু ইংলিশ অনার্সটা আটকায়নি তাতে।
কলেজে ওয়াল ম্যাগাজিন হতো একটা। সেখানেই একটা গপ্পো লিখে দিয়েছিলাম, জীবনে প্রথমবার – জায়গা ভরছিলোনা পুরোটা। গোলাপী রঙের কাগজে করা পুরোটা। ইংলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে বাঙলায় ম্যাগাজিন হয়েছে বলে এইচ-ও-ডি খুব রাগারাগি করেছিলো মনে আছে।
কলেজের প্রায় গোটাটাই মনে আছে – শেষবারের দোলে বাঁদুর রঙ আমার চোখে ঢুকে গেছিলো, চশমা পরেও একটা ব্লারি ভিশন নিয়ে ঘুরেছিলাম দুটো দিন। সেকেন্ড ইয়ারে বাঙলা ব্যান্ড গাঁজা খেয়ে স্টেজে উঠে মাইকের স্ট্যান্ড ভেঙে ফেলেছিলো।
অনেকটাই মনে আছে, শুধু তোমার সাথে আলাপের দিনক্ষণ আমি অনেক চেষ্টা করেও মনে করতে পারিনা। আমার শুধু এটাই বারবার মনে পড়ে যে তুমি অনেকটা পিঠ খোলা একটা ব্লাউজ পরে, ফেস্টে আবৃত্তি করতে যাবে বলে ওয়েট করছো। আর মল্লারদা, পাসআউট কিন্তু তখনো জিএস মল্লারদা তোমাকে খালি বলে যাচ্ছে এই নাচটা শেষ হলেই তোমার টার্ন।
তুমি গড়পড়তা বাঙালির মতোই আব্রিতি বলতে আবৃত্তিকে। যদিও সংস্কৃতে গ্র্যাজুয়েশান ছিলো তোমার। প্রথম দিন কথা বলার সময় আমি বেশ রুডলিই ব্যাপারটা পয়েন্ট আউট করেছিলাম। তুমি দেখলাম বেশ স্পোর্টিংলি নিলে। দু’দিন পর বললে তোমাদের তখন মৃচ্ছকটিম পড়াচ্ছে। আমি বইটা চেষ্টা করেও পড়তে পারিনি, কিন্তু গিরিশ কাড়নাডের উৎসবটা দেখেছি। বেশ ছবি।
এসবই অবশ্য তুমি ইউনিয়নের থেকে প্লেসমেন্ট কোঅর্ডিনেটর ঠিক হবার আগে। তারপর থেকে মল্লারদা আশেপাশে না থাকলে তোমাকে দেখাই যেতোনা সে’রকম। সে’বছর কিভাবে জানি মল্লারদাও আমাদের সাথে ক্যাম্পাসিঙে বসে গেলো – তুমি আর ও দু’জনেই একসাথে আইটিতে চাকরি পেয়ে গেলে। মৃচ্ছকটিমের সেখানেই ইতি।
সবই তো ঠিক ছিলো। যে’রকম হয় চশমার পাওয়ার বেশি হলে। যেরকম লাইব্রেরির গল্পে হয়, পাড়ার ম্যাচে স্কোরার হলে। মল্লারদা আর তুমি বিয়ের পর মুম্বই মুভ করলে – ফেসবুকে সব ছবিই দেখতে পেলাম।
বিশ্বাস করো সেক্সিস্ট কিম্বা ব্যাকডেটেড যাই ভাবো – তোমাকে হটপ্যান্টে খুব খাজা দেখায়। হটপ্যান্ট সবার জন্য না, সেরকম পিঠ খোলা ব্লাউজও সবার জন্য না। যাই হোক, ঠিকঠাকই চলছিলো। এই খবরের কাগজে দিনভর লিখেজুখে আমিও ততোদিনে প্র্যাক্টিক্যালি সেটলড। ইংলিশে এমএ করে বাঙলা কাগজে প্রথমে বেশ টিটকিরি খেতে হতো – সাম থিঙস নেভার চেঞ্জ।
হঠাৎ একদিন দেখি তোমার প্রোফাইল নেই। মল্লারদারটাও আর খুলতে পারছিনা।
আমার নাম্বার কার কাছে পেয়েছিলে জানিনা। ম্যাটারও করেনা। দেড় মাস ঝাড়া কথা বললাম – ঝাড়া সাড়ে পাঁচ বছর চুপচাপ থেকে। আর তোমার যদি মনে না থাকে, দেখা করতে আমি চাইনি তুমি চেয়েছিলে।
আমার ভালো লাগেনি নয়নিকা। আমার অ্যাদ্দিন পর তোমার প্রায় নিম্ফোম্যানিয়াক আঁকড়ে ধরা ভালো লাগেনি। তিনবছরের বিবাহিত জীবনের অজস্র ম্যারিটার রেপ আর ফেইল্ড প্রেগনেন্সির গল্প ভালো লাগেনি। আমার তোমার শিথিল গাউন ভালো লাগেনি। আমার পুরুষসঙ্গের চেয়ে রেইড ওয়াইন তোমার বেশি প্রিয়, সেই হেরে যাওয়াটা ভালো লাগেনি। শেষ চেষ্টাটুকু করার ইচ্ছেটার মনের ভেতরে চাগাড় না দেওয়াটাও ভালো লাগেনি।
আমাদের মতো দুঃখবিলাসী প্রজন্মের বেঁচে থাকতে একটা আনন্দের সোর্স লাগে। জাহির খান প্রায় শেষ পর্যায়ে, ভালো সিমার নেই এখন কেউ যে আইপিএলকে ক্রিকেটের পর্যায়ে তুলবে। সচিন, দ্রাবিড়, লক্ষণ, স্টিভ ওয়া সহ সমস্ত মানবসভ্যতার কেউ কেউ এখন কমেন্ট্রিবক্সে, কেউ কেউ ক্রিকেট প্রশাসক। সাদা পোশাক ব্রাত্য, আমাদের প্রজন্ম তোমার পিঠ খোলা ব্লাউজের আনন্দে আটকে ছিলো। শিথিল গাউনে লুটিয়ে যেতে যেতে হাত ফসকে আনন্দটাও চার ড্রপ খেয়ে বাউন্ডারির বাইরে।
রেড ওয়াইনেই ঘুমের ওভারডোজ ভরে দিলাম। হেরে যাওয়াটার মধ্যেও একটা গ্র্যাঞ্জার থাক। বিদায়ী টেস্টক্রিকেটসভ্যতার মতো।
পুনশ্চঃ তোমাকে বিরাট কোহলির দায়িত্বে রেখে গেলাম। পারলে ফিরো।
ইতি,
শোভন
(২)

- ‘এতোদিনের কেরিয়ারে এ’রকম সুইসাইড নোট বাপের জন্মে দেখিনি ভাই। এই নয়নিকাটা কে?’
- ‘কে জানে স্যার’।
- ‘শোভনটাই বা কে?’
- ‘নো আইডিয়া’।
- ‘পুরো ঘরের সমস্ত জিনিস নিয়ে যাও এভিডেন্স হিসেবে আর কি’।

(৩)
-‘সকাল সকাল ইয়ার্কি মাড়াতে এসেছেন এখানে? এটা পুলিশ স্টেশন, আপনার ভাঁটের ম্যাগাজিন নয়’
-‘মাইরি বলছি স্যার এটাই নিশ্চয়ই লাস্ট গল্পটা, ত্রিদিব মিত্তিরের’।
-‘মানে?’
-‘মানে উনি শোভন বলে এই ক্যারেক্টারটা নিয়ে একটা সিরিজ লিখছিলেন। এই নয়নিকা রায় শোভনের কলেজের ইয়ে। তো সেটার শেষ গল্পটা লিখে সিরিজটা শেষ করার কথা ছিলো। এইটাই শালা সেই গল্পটা। হেব্বি হিট সিরিজ স্যার, ম্যাগাজিনের কাটতি বেড়ে গেছিলো লাফিয়ে। টিন এজাররা হেবি খাচ্ছিলো। কি কান্ড!’

আপনার মতামত জানান