তোমার প্রেম হত যে মিছে

জয়দীপ চট্টোপাধ্যায়

 

রামমোহন রায়ের হাত ধরে যে ব্রাহ্মধর্ম বাংলা সমাজে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিল, ওনার জীবনাবসানের পর দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের হাতে সেই ব্রাহ্মসমাজ একটা অন্যমাত্রায় বিকাশ পেতে শুরু করে। এবং আরও কিছু দশক পর তার পরিচিতি হয় ‘আদি ব্রাহ্ম সমাজ’, যা কিনা উলটোদিকে দাঁড়ানো নবজাগরণের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব কেশব চন্দ্র সেনের ভারতবর্ষীয় ব্রাহ্মসমাজ (নবিবিধান) থেকে নিজেকে পৃথক সংগঠন হিসেবে চিহ্নিত করারই সফল প্রয়াস। কেশব সেন এবং মহর্ষির (ও তাঁদের অনুগামীদের) মধ্যে যে একটা আদর্শগত বিভেদ ছিল (সংঘাতও) তা উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে অনেকেই প্রত্যক্ষ করেছেন। কিন্তু এত কিছুর মধ্যেও আদি ব্রাহ্মসমাজের নিজস্ব শেকড় ছিল অটল এবং মহর্ষিই আমৃত্যু পৌরহিত্য করে যান সমাজের সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করে। তবে ব্রাহ্মসমাজের এই মেকিং আর ব্রেকিং নিয়ে এখানে বিশেষ কিছু বলব না। এসব থেকে বেরিয়ে আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিৎ ব্রাহ্মসমাজের সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক অবদানকে খোঁজা, চেনা। কারণ এই ব্রাহ্মসমাজের একটা ধারায় যেরকম এসেছে উৎকৃষ্ট সাহিত্যচর্চা, সংবাদপত্রে অথবা সাময়িক পত্রিকায় প্রবন্ধের মাধ্যমে সামাজিক চেতনার বিস্তারের প্রয়াস; অন্য দিকে তেমন এসেছে ব্রহ্মসঙ্গীত। হ্যাঁ, ব্রাহ্মসমাজের যে উপাস্য ঈশ্বর এবং ঈশ্বরবোধ, তার উপাসনার জন্য যে সঙ্গীত (ব্রহ্মের উদ্দেশ্যে নিবেদিত গান), তা-ই ব্রহ্মসঙ্গীত হিসেবে পরিচিত হয়। আর সাহিত্য বা প্রবন্ধের থেকে অবশ্যই অনেক বেশি করে মানুষের কাছাকাছি যেতে পারে গান। সকল ধর্মীয় এবং ভক্তি মার্গে (সে পদাবলী, সুফি, কবীরের ভজন যা-ই হোক) গান অনেক বেশি করে ভক্ত বা উপাসকের মনে প্রবেশ করেছে। গান যে ভাবে মনকে স্পর্শ করতে পারে, আর কিছুই বোধহয় তা পারে না।
রামমোহন রচিত প্রথম ব্রহ্ম সংগীত সম্ভবতঃ 'কে ভুলালো হায়' যা ১৮১৬ খ্রীষ্টাব্দে 'আত্মীয় সভা'-তে প্রথমবার গাওয়া হয়। এই আত্মীয় সভা তিন বছর পর, ১৮১৯ সালে বন্ধ হয়ে যায়। এর অনেক পরে ১৮২৮ খ্রীষ্টাব্দে রামমোহন রায়ের ব্রহ্ম সংগীতগুলি সংকলিত হয়ে প্রকাশ পায় 'ব্রহ্ম সংগীত' নামক একটি গ্রন্থে। ব্রহ্ম সংগীতের প্রচার ও সমাদর লাভও আনুমানিক সেই সময় থেকেই। এই আদি ভক্তিরসের ধারা ব্রাহ্মসমাজে ছুঁইয়েছিলেন রামমোহন নিজেই। অথচ ব্রহ্মসঙ্গীত বলতেই, আমাদের চোখের সামনে অবশ্যম্ভাবী ভাবে ভেসে ওঠে রবীন্দ্রনাথের সৌম্য মূর্তি। কিন্তু ব্রহ্মসঙ্গীত মানেই যে কেবল রবীন্দ্রনাথ তা তো নয়! রামমোহন রায়, দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ত্রৈলোক্যনাথ সান্যাল, অতুলপ্রসাদ সেন, উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী, কালীনারায়ণ গুপ্ত এমন অনেকেই ব্রহ্মসঙ্গীত রচনা করেছেন, এবং সেই সব গান বেশ সমাদরও লাভ করে। এই কথাটা মনে পড়লে সত্যিই ভাবতে বসতে হয়, সব কিছুকে ছাপিয়ে সেই রবীন্দ্রনাথই ব্রহ্মসঙ্গীতের প্রতিভূ হয়ে উঠলেন কীভাবে? তা কি কেবলই রবীন্দ্রনাথের সেই বিশাল ব্যাপ্ত কর্মজীবন এবং ব্যক্তিত্বর জন্যই... যার জন্য ওনার কর্মযজ্ঞের সবকিছুই একটা বাড়তি আগ্রহ লাভ করে? নাকি এর বাইরেও কিছু আছে যা রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্ম-চেতনা বা ব্রহ্মসঙ্গীত রচনার গোড়ায় থাকা আধ্যাত্ম চিন্তাকে প্রভাবিত করেছে প্রতি নিয়ত? মনে হয়, সেই চিন্তনের ফসলই সেই সব গান। এবং শুধু গানই নয়, তা রবীন্দ্রসাহিত্যের অনেকটাই প্রভাবিত করে - এ আমরা রবীন্দ্রনাথের চিন্তা এবং জীবনবোধের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বহু কবিতায়, প্রবন্ধে, চিঠিতে দেখতে পাই। এবং হয়ত, এমন আন্তরিক ভাবে ব্রহ্ম সঙ্গীতে রচিত মূল জীবনমন্ত্র গ্রহণ করার জন্যই অনেক বেশি করে জায়গা করে নিয়েছে রবীন্দ্রনাথ রচিত ব্রহ্মসঙ্গীতগুলি... অনেক বেশি মর্মস্পর্শী হয়েছে তারা।

জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং জ্যোতিরীন্দ্রনাথের মত অন্যান্য অগ্রজদের প্রভাবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও একসময় ব্রাহ্মসমাজের জন্য সঙ্গীত রচনা শুরু করেন। তাঁর রচিত প্রথম ব্রহ্মসঙ্গীত 'গগনের থালে রবি চন্দ্র দীপক জ্বলে' [২৫ জানুয়ারি, ১৮৭৫ খ্রীষ্টাব্দ] মাত্র ১৩ বছর বয়সে লেখা, আদি ব্রাহ্মসমাজের ৪৫তম সাংবৎসরিক মাঘোৎসবে সন্ধ্যাবেলার উপাসনায় পরিবেশিত হয়েছিল। তবে জেনে রাখা ভাল - এই গানটি অনুবাদকৃত একটি শিখভজন (সে অর্থে মৌলিক নয়)। এর অনেক পরে, ১৮৮৫ খ্রীষ্টাব্দে ‘রবিচ্ছায়া’ নামক গীতিগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থে ৭৪টি ব্রহ্মসঙ্গীত স্থান পেয়েছিল। প্রথমদিকের গ্রন্থগুলিতে রবীন্দ্রনাথের রচিত ব্রহ্মসঙ্গীতগুলো আলাদা শিরোনামে থাকতো। এই গ্রন্থগুলোর মধ্যে রয়েছে গানের বহি ও বাল্মীকি প্রতিভা (১৮৯৩), কাব্যগ্রন্থাবলী (১৮৯৬), কাব্যগ্রন্থ (১৯০৩), রবীন্দ্রগ্রন্থাবলী (১৯০৪) গান (১৯০৮)। ‘গান’ গ্রন্থের ১৯০৯ সংস্করণে ভাবের বিচারে গানগুলোকে সাজানোর প্রথম উদ্যোগ নেন রবীন্দ্রনাথ। ১৯১৪ খ্রীষ্টাব্দে এই গ্রন্থের দ্বিতীয় সংস্করণে ব্রহ্মসঙ্গীত অংশের নতুন নাম দেওয়া হয়েছিল 'ধর্মসঙ্গীত'। ঠিক এই সময়তেই রবীন্দ্রনাথের আধ্যাত্মিক চেতনা এক অন্য দিগন্ত লাভ করে। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের মৃত্যুর পর এমনিতেই ব্রাহ্মসমাজ ধীরে ধীরে দুর্বল হ’তে শুরু করে। এদিক রবীন্দ্রনাথ নিজেও অনুভব করতে শুরু করেন পরমাত্মাকে চেনার ইচ্ছে, বা মানুষের অসীমকে অনুভব করার সাধনা – এ কখনওই কেবল ‘ব্রহ্মসংগীত’ শব্দের খিলানের মধ্যে আবদ্ধ থাকতে পারে না। আসতে আসতে রবীন্দ্রনাথ ‘রিলিজিয়ন অফ ম্যান’ কে উপলব্ধি করতে শুরু করেন। ব্রহ্ম হয়ে ওঠে ধর্ম। এবং আরও পরে সব একত্রিত হয়ে থেকে যায় শুধু ‘পূজা’। অসীমের সামনে আত্মনিবেদনের যে রবীন্দ্রচেতনা, তা-ই থেকে যায় গানে গানে। রবীন্দ্রনাথের সকল গান নিয়ে যখন গীতবিতান তৈরি হলো, তখন 'ব্রহ্মসঙ্গীত' বা 'ধর্মসঙ্গীত'-এর কোনোটিই রইলো না। গীতবিতান-এর 'পূজা' পর্যায়ে অধিকাংশ ব্রহ্মসঙ্গীত গৃহীত হলেও, অনেক গান ভিন্ন শিরোনামে অন্তর্ভুক্ত হয়েছিল। রবীন্দ্রনাথ গীতবিতানের প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ডের (১৯৩১ সংস্করণ) পূজা পর্যায়ের গানগুলোকে এক সাথে রেখেছিলেন বটে, কিন্তু তিনি নিজেই এই ব্যবস্থায় ঠিক সন্তুষ্ট ছিলেন না। ফলে গানগুলোকে আরও কিছু উপভাগে বিভক্ত করেছিলেন। এই ভাগগুলো হলো- গান, বন্ধু, প্রার্থনা, বিরহ, সাধনা ও সংকলন, দুঃখ, আশ্বাস, অন্তর্মুখে, আত্মবোধন, জাগরণ, নিঃসংশয়, সাধক, উৎসব, আনন্দ, বিশ্ব, বিবিধ, সুন্দর, বাউল, শেষ, পরিণয় (আনুষ্ঠানিক)। মানে, এক কথায় বলতে গেলে... এক কালে ‘ব্রহ্মসংগীত’ রবীন্দ্রনাথ নিজেই ছড়িয়ে দিলেন মানুষের চেতনার আলাদা আলাদা রঙে।

“আমার বেশ মনে আছে ‘ভুর্ভুবঃ স্বঃ’ এই অংশকে অবলম্বন করিয়া মনটাকে খুব করিয়া প্রসারিত করিতে চেষ্টা করিতাম।” ‘জীবনস্মৃতি’তে এই কথাগুলোর মধ্যে দিয়েই রবীন্দ্রনাথ জানিয়ে গেছিলেন বাবা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের প্রভাব ঠিক কোন সময় থেকে আর কী ভাবে কিশোর রবির মনে ব্রাহ্মধর্মের চেতনা ধীরে ধীরে প্রবেশ করতে থাকে। দেবেন্দ্রনাথ নিজে বেদ এবং উপনিষদ দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। এও বিশ্বাস করতেন যে হিন্দু (সনাতন) ধর্মের আদিতেই পরমাত্মাকে চেনার নির্যাস থেকে গেছে। বেদ এবং উপনিষদের মধ্যে দিয়ে সর্বশক্তিমানকে যে ভাবে চেনা যায়, তার যে আভাস পাওয়া যায়... তা আর কোথাও সম্ভব নয়। গায়ত্রী মন্ত্রর সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয়েও সেই মহর্ষির হাত ধরেই। এই গায়ত্রী মন্ত্র রবীন্দ্রনাথের অন্তরে এমন ভাবে প্রবেশ করেছিল যে উনি নিভৃতে এই মন্ত্রের ধ্যান করতে করতে অশ্রুবিসর্জনের কথাও স্বীকার করে গেছেন জীবনস্মৃতিতেই। সনাতন ধর্মে আস্থাশীল এবং বিশিষ্ট পণ্ডিত দেবেন্দ্রনাথ স্বয়ং ব্রাহ্মসমাজের প্রধান হয়ে যে রবীন্দ্রনাথ আধ্যাত্মচেতনাকে বিশেষ ভাবে প্রভাবিত করেছিলেন, এবং রবীন্দ্রনাথও যে সেই ‘মহর্ষি’ চরিত্রের প্রতি ভীষণ রকম নিষ্ঠাশীল ছিলেন, তা বোঝাই যায়। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথ জানিয়েছেন –
“যে মুক্তির বাণী তিনি (দেবেন্দ্রনাথ) তাঁর জীবন দিয়ে প্রচার করে গিয়েছিলেন তাঁকেই আমরা গ্রহণ করব – সেই তাঁর দীক্ষামন্ত্রটি : ঈশাবাস্যমিদং সর্বম। ঈশ্বরের মধ্যে সমস্তকে দেখো। সেই মন্ত্রে তাঁর মন উতলা হয়েছিল। সর্বত্র সকল অবস্থায় আমরা যেন দেখতে পাই তিনি সত্য, জগতের বিচিত্র ব্যাপারের মধ্যে তিনি সত্যকেই প্রকাশ করেছেন।”
[শান্তিনিকেতন - মুক্তির দীক্ষা (রবীন্দ্ররচনাবলী, দ্বাদশ খণ্ড)]
অথচ মহর্ষির চেনানো অদ্বৈতবাদ, ব্রহ্মসঙ্গীতের জ্ঞানভিত্তিক প্রকাশকে ভক্তিবাদে পরিণত করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ তাঁর চেতনার বিবর্তনের সাথে সাথে। ঠাকুরবাড়ির ঘনিষ্ট বিষ্ণু চক্রবর্তী, যদুভট্ট, রামপতি বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধিকাপ্রসাদ গোস্বামীদের মত শিল্পীদের হাতে ব্রহ্মসঙ্গীত পৃথকধারায় ধ্রুপদ সঙ্গীতে পরিণত হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে সমৃদ্ধ করেছিলেন গোপেশ্বর বন্দ্যোপাধ্যায় এবং সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মত গুণীজনেরা। এঁরা খেয়াল আঙ্গিকে গান করলেও ব্রহ্মসঙ্গীতে সেই ধ্রুপদের গম্ভীর চালটা বজায় রেখেছিলেন (যা স্বামী বিবেকনান্দ রচিত এবং সুরারোপিত গানগুলির মধ্যেও খুব স্পষ্ট)। অথচ রবীন্দ্রনাথের ব্রহ্মসঙ্গীতে ধ্রুপদের চলনে রাগাশ্রয়ী ব্রহ্মসঙ্গীতের পাশাপাশি লোকসঙ্গীতের সুরও এসেছে। সেই লোকসঙ্গীত, যেখানে গম্ভীর শাস্ত্র চেতনার বাইরে এক নিরহংকার, নিষ্পাপ ভক্তি ফুটে ওঠে।

১৯০৯ সালে প্রকাশিত ‘নৈবেদ্য’ উৎসর্গ করেন পিতা দেবেন্দ্রনাথকে। সেই সালেই প্রকাশিত ‘ঔপনিষদ ব্রহ্ম’। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্ম বিশ্বাস ছিল শঙ্কর (আদি শঙ্করাচার্য) বিরোধী, বরং দেখা যায় হিন্দু ধর্ম প্রসঙ্গে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি রামানুজপন্থী। রামানুজের দর্শনে চিৎ এবং অচিৎকে জগতের পৃথক সত্ত্বা বলে মেনে নিয়েছিলেন। আমি এবং তুমির মধ্যে এক ব্যবধান স্থাপিত করা, বা সেই ব্যবধানকে প্রাসঙ্গিক করার থেকেও ওনার বেশি আস্থা ছিল আমি আর তুমিকে মেনে নিয়েই বিশ্বাস করা ‘আমি-র যোগে তুমি’। অন্তে সব সত্ত্বাই এক হয়, সব আমি-তুমি মিলে একটা বিশাল আমি। অসীম। রবীন্দ্রনাথের দ্বৈতবোধ এর দ্বারা প্রভাবিত হলেও, এর থেকে কিছুটা পৃথক ছিল স্বকীয় ভাবেই। রবীন্দ্রনাথের আমি আর তুমি দুজনেই ভীষণ ভাবে একে অপরের প্রিয় হতে চায়। “আমার এই চিরবিকাশমান ‘আমি’র সঙ্গে ‘তুমি’ও নিত্যকালের সত্য হইয়া উঠিতেছে।” [উপনিষদের পটভূমিকায় রবীন্দ্রমানস – শশীভূষণ দাশগুপ্ত]
পরবর্তীকালে ‘রাজা’ নাটকের মধ্যে ‘আমি’ এবং ‘তুমি’র মধ্যে আরও বড় কিছুর খোঁজ যেন এই ভাবেই ফিরে এসেছে। রাজার বিশেষ রূপ এই পার্থিব জগতে (মেটারিয়াল ওয়ার্ল্ড) দেখতে চেয়েছিল সুদর্শনা, তার বিশ্বরূপ দর্শন অধরা।
রাজা বলছেন - তোমারই মধ্যে আমার উপমা আছে
সেখানে সুদর্শনার মুখে আসছে এই কথাগুলো –
“যদি থাকে সেও অনুপম। আমার মধ্যে তোমার প্রেম আছে, সেই প্রেমেই তোমার ছায়া পড়ে, সেখানেই তুমি আপনার রূপ আপনি দেখতে পাও। সে আমার কিছুই নয়, সে তোমার।”
[রাজা, রবীন্দ্ররচনাবলী ষষ্ঠ খণ্ড]
অবশেষে সুদর্শনার উপলব্ধি – বিশ্বরূপ আর বিশেষ রূপের দুইয়ের মিলনেই সত্য ভাস্বর হয়ে ওঠে।
ভারতের প্রাচীন ঐতিহ্য (উপনিষদের স্পর্শ) এবং মহর্ষির এই দর্শনে প্রভাবিত ‘নৈবেদ্য’। ব্রাহ্মধর্মের প্রভাবে যে ব্রহ্মচেতনার বিকাশ, তা এই ভাবেই উৎসর্গ করে দিয়েছেন সবার আগে নিজের পিতৃদেবের শ্রীচরণেই, ‘নৈবেদ্য’ নামে।
রবীন্দ্রজীবনের মধ্যযুগে বা পরীক্ষা নিরীক্ষার যুগে (১৯০০ – ১৯২০) রবীন্দ্রনাথ রচিত 'ধর্মসঙ্গীত'গুলিতে কাব্যধর্মী চরিত্র ক্রমশ বিকশিত হতে থাকে। কবির স্নেহধন্য শ্রী প্রমথনাথ বিশী রবীন্দ্রকাব্যের বিবর্তনের কথা বলতে গিয়ে তার সূত্রপাত হিসেবে ‘নৈবেদ্য’ কাব্যগ্রন্থকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁর মতে ‘নৈবেদ্য’ থেকেই গান এবং কবিতার কাছাকাছি আসার সূত্রপাত। নৈবিদ্যের প্রথম থেকে একুশটি এবং শেষতম, এই বাইশটি কবিতা সঙ্গীতের আকার লাভ করেছে, বাকি আটাত্তরটি সনেট।

ব্রাহ্মসমাজের একজন উজ্জ্বলতম নক্ষত্র হয়ে থাকা সত্ত্বেও ব্রাহ্মবোধের সেই রামমোহন-দেবেন্দ্রনাথ প্রতিষ্ঠিত একেশ্বরবাদ এবং অদ্বয়বোধের মধ্যে কিন্তু রবীন্দ্রনাথ আবদ্ধ থাকলেন না। ঠিক যেভাবে তাঁর সঙ্গীত ‘ব্রহ্মসঙ্গীত’ থেকে ক্রমে ‘ধর্মসঙ্গীত’ হ’ল, এবং অবশেষে প্রকৃতির নানা রঙে ছড়িয়ে গেল... সেরকমই বিবর্তন হয়েছে তাঁর আধ্যাত্ম চেতনার, ঈশ্বরকে অনুভব করা দৃষ্টির। অদ্বয় এবং দ্বয় বোধের মধ্যে একটা সাম্য বজায় রেখেছেন তিনি, এই দুই বিশ্বাসই সমান শ্রদ্ধা পেয়েছে তাঁর কাছে (ঠিক যেমন পরমহংসদেব শ্রী মহেন্দ্রগুপ্তকে বলেছিলেন – “নিরাকারে বিশ্বাস, তাতো ভালই। তবে এ-বুদ্ধি করো না যে, এইটি কেবল সত্য আর সব মিথ্যা। এইটি জেনো যে, নিরাকারও সত্য আবার সাকারও সত্য। তোমার যেটি বিশ্বাস, সেইটিই ধরে থাকবে।”)
তৈত্তিরীয় উপনিষদের একটি শ্লোকে দেখা যায় জগত এবং জগতের সকল জাগতিক আনন্দের মধ্যেই ঈশ্বরের অস্তিত্বের কথা –
“আনন্দাদ্ধ্যেব খল্বিমানি ভূতানি জায়ন্তে
আনন্দেন জাতানি জীবন্তি।।”
অর্থাৎ - আনন্দময় ব্রহ্ম হতেই বস্তু জগতের সৃষ্টি, আনন্দের মধ্যেই তারা জীবিত।
আর এই আনন্দের প্রতি আস্থাশীল থেকেই রবীন্দ্রনাথের সৃষ্টিতে পাই অদ্বয়বোধের মধ্যে দ্বয়ের প্রতিষ্ঠা। তিনি মায়াবাদে বিশ্বাস করেন নি। জগত-সংসার প্রভৃতি সব অনিত্য মায়া ভেবে, সব ভুলে পরমশক্তিমানের পায়ে আত্মনিবেদন করতে বাধ সেধেছে তাঁর মন। এ যেন ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং ঈশ্বরের আশিস থেকেই নিজেকে বঞ্চিত করে নিঃস্ব হয়ে যাওয়া! তার থেকে সকলের আনন্দের মাঝে সেই আনন্দময়কে মেনে নেওয়াই পরম তৃপ্তি। সীমা এবং অসীম উভয়ই সত্য।
সীমার মাঝে অসীম তুমি
বাজাও আপন সুর
আমার মধ্যে তোমার প্রকাশ
তাই এত মধুর।
[গীতাঞ্জলী]
আবার ঈশোপনিষদের এক জায়গায় আছে –
“তদন্তরস্য সর্বস্য তদু সর্বসাধ্য বাহ্যতঃ”
অর্থাৎ - তিনি অন্তরে, বাইরে সর্বময়, এই তত্ত্বের প্রতিধ্বনি শোনা যায়।
এই একই আলোয় রবীন্দ্রনাথেরও উপলব্ধি যে পরমাত্মার উপলব্ধি অশেষ। কারণ তিনি অসীম। এই অসীমকে চেনার যতই চেষ্টা চলবে, যতই পিপাসা বাড়বে মনের ততই আমার বুঝব যে সে আমাদের থেকে কত দূরে। ঠিক যেমন উপনিষদেই গুরু শিষ্যকে বলেন যে প্রকৃত ব্রহ্মজ্ঞানী সেই যে ব্রহ্মকে দেখেছে বলে দাবী করেনি কখনও। যতই চেনাজানা, ততই পার্থক্যের দূরত্ব।
‘তোমার আমার এই বিরহের অন্তরালে
কত আর সেতু বাঁধি সুরে সুরে তালে তালে’
[পূজা – রবীন্দ্ররচনাবলী, ৪র্থ খণ্ড]
এবং এই প্রচেষ্টা যে খুবই সচেতন, তা বোঝা যায় রবীন্দ্রনাথের নিজের কথাতেই, যেখানে ‘জীবনস্মৃতি’-তে উনি নিজের কর্মপ্রয়াসকে বলছেন “সীমার মধ্যে অসীমের সহিত মিলন সাধনের পালা”।

ব্রাহ্মসমাজের সূচনার অনেক আগেও রামমোহন রায়ের একটা প্রবল ইচ্ছে ছিল, তা হ’ল সমাজ সংস্কার। সেই সময়ের সনাতন ধর্মের এক বড় অংশের দাপট বাড়তে বাড়তে যে সংকীর্ণতার আবহাওয়া তৈরী হয়েছিল... সেই জাতি-বর্ণভেদ, ছুঁতমার্গ, অশিক্ষা, সামাজিক নিপীড়নের হাত থেকে মানুষের মুক্তি – এই ছিল রামমোহনের অভিপ্রায়। যখন দেখলেন, তদানীন্তন প্রচলিত হিন্দুধর্মের আচার-আচরণের মধ্যে সনাতন ধর্মের উৎকৃষ্ট দিক সব হারিয়ে যেতে বসেছে, তখনই সংস্কারের এই ইচ্ছে রামমোহনের মধ্যে জাগে। ধর্মের ভাল দিক বা ইতিবাচক দিক তুলে ধরা, এবং লোকশিক্ষা এই দুইয়ের মধ্যে দিয়েই সংস্কার করা যায় বলে তিনি মনে করেন। তাঁর সেই আদর্শেই গড়ে ওঠে ব্রাহ্মসমাজ। ব্রাহ্মসমাজের মধ্যে যে সমাজের প্রতি এক নৈতিক দায়িত্বের প্রকাশ ছিল, একটা অঙ্গীকার ছিল তা তাদের কাজের মধ্যেও দেখা যায়। কেশব সেনের সময় এই প্রক্রিয়ার মধ্যে কিছুটা পরিবর্তন হলেও, যা হয় তা উৎকর্ষের পথেই হয়। দুটি লক্ষ্য খুব পরিষ্কার ছিল ব্রাহ্মসমাজের কাছে –
১) জাতিভেদ এর ব্যবধান লোপই সমষ্টিমুক্তির উদ্দেশ্য
২) জনসেবার জন্য গণমুক্তির বাণী
এবং এর ফলে বহুক্ষেত্রেই বিতর্ক এবং গোঁড়া হিন্দুসমাজের কোপের মুখে পড়তে হ’ত তাঁদের।
ব্রাহ্মসমাজের পুরো ধর্মচিন্তাটাই ভীষণরকম প্র্যাকটিকাল অ্যাপ্রোচের মধ্যে থেকে যায়। পুরোটাই কর্তব্যমুখর। আধ্যাত্মিক চেতনা খুব ধর্মালোচনার অনেক ঊর্দ্ধে ছিল সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সমাজকল্যানমূলক কাজ। এমনকি শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেবের আশীর্বাদধন্য বিবেকানন্দ এবং ওনার সতীর্থরাও সকলে এই ‘শিব জ্ঞানে জীব সেবা’-কেই সব কিছুর ওপরে স্থান দেন। সেখানে ধর্মালোচনার গুরুত্ব থাকলেও, কোনও কিছুই জনসেবার ঊর্দ্ধে নয়, সংঘের কর্তব্যের ঊর্দ্ধে নয়। অথচ, এই একই সময়ে ব্রাহ্ম পরিবারে বড় হয়ে, এই সামাজিক নবজাগরণ বা বিবর্তনের সাক্ষী হয়েও রবীন্দ্রনাথের ধর্মচেতনা এবং কর্তব্যবোধ দুটোই এসবের থেকে কিছুটা পৃথক হয়ে গেল। এবং এই পৃথক থাকা, একেবারেই কাকতালীয় নয়। বরং, প্রতিটা সিদ্ধান্তই বেশ সচেতন তা ঘটনাবলীর দিকে তাকালেই বোঝা যায়। সমষ্টিমুক্তির বোধ (বা সমাজের সংস্কারবদ্ধ মানুষদের মুক্তি) রবীন্দ্রনাথের মনেও ছিল, কিন্তু তা কেবল নীরস কর্তব্য এবং সেবাকাজের আবেগে নয় (বিবেকানন্দ এই কর্তব্যের জন্য অন্য অনেক কিছুকে দূরে ঠেলে দিয়েছেন, প্রয়োজনে আঘাতও করেছেন। ওনার শিষ্যদেরও একই কথা বলেছেন কর্তব্যের প্রতি ন্যায়নিষ্ঠ থাকার শপথ করে)। রবীন্দ্রনাথ যেখানে ধর্ম চেতনা বা আধ্যাত্মিক চেতনার সামনে দাঁড়িয়েছেন, বা বলা ভাল নতজানু হয়েছেন... সেখানে তাঁর ব্রত হয়েছে এই আধ্যাত্মিক চেতনা এবং আত্মসম্মানের অধিকারী একসঙ্গে হয়ে ওঠা। এই দুই একত্রিত হয়েই কল্পিত কর্মসম্পাদন করার জন্য মানুষ এগোতে পারে বলে তিনি বিশ্বাস করতেন। এবং এই বিশ্বাসের মধ্যেও ব্যপিত ছিল সেই ব্রহ্মজ্ঞানের শুরুর অধ্যায়ন, সেই উপনিষদের বাণী যা মহর্ষির কাছ থেকে একটু একটু করে পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এবং অবশ্যই অনুভব করেছিলেন জীবনে, চারিদিকে। তাঁর নিজের কথাতেই –
“আসল কথা, যিনি সত্যস্বরূপ সেই ব্রহ্মকে ত্যাগ করতে গেলেই আমরা বাঁচিনে। তাঁকে অন্তরেও যেমন আশ্রয় করতে হবে বাইরেও তেমনই আশ্রয় করতে হবে।”
[কর্মযোগ- শান্তিনিকেতন, রবীন্দ্ররচনাবলী দ্বাদশ খণ্ড]
কোনওরকম লৌকিক আচার বা সম্প্রদায়গত ভাবে মানবতার আদর্শকে পালন করা যায় না। আদর্শের প্রতি আনুগত্য ক্রমে সেই লৌকিক আচারের দিকেই হেলতে থাকবে ধীরে ধীরে (ঠিক যেমন সব মহৎ আদর্শে জন্ম নেওয়া সংঘেরই এক সময় হয়, হয়েছে)। রবীন্দ্রনাথের এই উপলব্ধিই এসেছে ওনার সাহিত্যে (গোরা উপন্যাসের একাধিক জায়গায়) এবং কবিতায় –
চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত, যেথা গৃহের প্রাচীর
আপন প্রাঙ্গণতলে দিবসশর্বরী
বসুধারে রাখে নাই খণ্ড ক্ষুদ্র করি,
যেথা বাক্য হৃদয়ের উৎসমুখ হতে
উচ্ছ্বসিয়া উঠে, যেথা নির্বারিত স্রোতে
দেশে দেশে দিশে দিশে কর্মধারা ধায়
অজস্র সহস্রবিধ চরিতার্থতায়--
যেথা তুচ্ছ আচারের মরুবালুরাশি
বিচারের স্রোতঃপথ ফেলে নাই গ্রাসি,
পৌরুষেরে করে নি শতধা; নিত্য যেথা
তুমি সর্ব কর্ম চিন্তা আনন্দের নেতা--
নিজ হস্তে নির্দয় আঘাত করি, পিতঃ,
ভারতেরে সেই স্বর্গে করো জাগরিত।

সত্যই ব্রহ্ম, রবীন্দ্রনাথের এই বিশ্বাসও এসেছে সেই উপনিষদ থেকে পাওয়া জ্ঞানের মধ্যে থেকেই। রবীন্দ্রসাহিত্যের এক একটা স্তর যদি দশকের পর দশক ভেঙে দেখা যায়, অবশ্যই বোঝা যায় যে পরম সত্যকে চেনা এবং তার বিশ্লেষণই রবীন্দ্রসাহিত্যের ব্রত। এবার কেউ বলতেই পারেন - সেই সত্যের উপলব্ধির সঙ্গে এক মত হওয়া, কিংবা সেই সত্যকেই সত্য বলে মেনে নেওয়া পাঠকের নিজের ব্যাপার, এবং সেই নিয়ে বিতর্ক হতেই পারে। কিন্তু সেই সত্য বা উপলব্ধিকে ঘিরে বিতর্ক কিন্তু রবীন্দ্রনাথের সচেতন প্রয়াসগুলোকে মিথ্যে করে দেয় না। তিনি নিজেই এক জায়গায় লিখছেন -
“কাঠকে দগ্ধ করে আগুন যেমন জ্বলে আমাদের অজ্ঞানকে অবিদ্যাকে মায়াকে দগ্ধ করেই কি সত্যের জ্ঞান জ্বলছে না! আমাদের পক্ষে সেই মায়ার ইন্ধন জ্ঞানের জ্যোতিলাভের জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু মিথ্যা কি ব্রহ্মে আছে?”
[মত- শান্তিনিকেতন রবীন্দ্ররচনাবলী দ্বাদশ খণ্ড]
হৈমন্তী গল্পে হৈমন্তী এবং তার বাবা, আবার অপরিচিতা গল্পে কল্যাণী এবং কল্যাণীর বাবা দুজনেই সত্যের পথ থেকে সরতে চায় নি। তাদের জীবনে যা ভাল মন্দ ঘটেছে তার মাঝেই তারা সত্যের পথেই অবিচল থেকে গেছে। এমন কি রামকানাইয়ের নির্বুদ্ধিতা গল্পেও রামকানাইয়ের বিবেকে সেই সত্যের দংশনই দেখা গেছে, যার কানাকড়ি মূল্য সেই পরিবারে অন্য কারো কাছে ছিল না। এমন উদাহরণ রবীন্দ্রসাহিত্যের বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, যেখানে সত্যের পথ থেকে সরে গিয়ে একজনের জীবন ঘুরে গেছে, আবার কেউ কেউ সত্যের পথে থেকেই জীবনের মুখোমুখি হয়েছে। অন্তে বার বার পাঠকের সামনে এই সার কথাই তুলে ধরা হয়েছে যে সত্যই থেকে যাবে। ঠিক যেন সেই ব্রাহ্ম দীক্ষা বলছে সত্য, অর্থাৎ ব্রহ্মই সার। এবং যে সমাজে সত্যের আসন অটল থাকে, যে সমাজে মানুষের মনে সত্যের ছবি সব সময় উজ্জ্বল থাকে সেখানে বিবাদ থাকতেই পারে না। উপনিষদের শিক্ষা এ ব্রহ্মবাদ (যেখানে ব্রহ্ম সত্য এবং আনন্দের স্বরূপ) তার প্রতিফলন সমাজে পড়লে সকল বিবাদ লুপ্ত হ’তে পারে, এবং সকল সম্প্রদায়ের সমন্বয় হতে পারে, এই ছিল রবীন্দ্রনাথের আন্তরিক বিশ্বাস। এখন এই ব্রহ্মবাদ কে যদি কেউ ব্রাহ্মণ্যবাদ কিংবা মনুবাদের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলে তাহ’লে তার সঙ্গে কোনও এঁড়ে তক্ক করে পেরে ওঠা মুশকিল। আবার এই ভুল বোঝার মানসিকতার মধ্যেই লুকিয়ে আছে সেই ভ্রান্ত সামাজিক বিবর্তন, যেখানে ব্রহ্মবাদের আনন্দঘন সত্যকে ভুলে ব্রাহ্মণ্যবাদ এবং মনুবাদের সংকীর্ণতা ক্রমে সনাতন ধর্মকে গ্রাস করে ফেলে। ভুল বোঝা আর ভুল বোঝানো এটা চলবেই। আর এমনটা চলে বলেই, রবীন্দ্রনাথের সামাজিক এবং আধ্যাত্মচেতনায় ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব এত বেশি করে প্রাসঙ্গিক। আমাদের জন্য রেখে যাওয়া তাঁর সৃষ্টিগুলো এত বেশি মূল্যবান। কেবল সাহিত্য নয়, এক অতি প্রয়োজনীয় সামাজিক সম্পদ।

একের পর এক রবীন্দ্রসাহিত্যে ব্রাহ্মধর্মের প্রভাবের উল্লেখ দেখতে দেখতে মনে হতেই পারে, রবীন্দ্রনাথ কি তাহলে ব্রাহ্মধর্মটাকেই অন্যদের থেকে আলাদা চোখে দেখেছিলেন? নিজের মত করে একটা জায়গা করে নিয়েছিলেন ব্রাহ্মসমাজে তাঁর কর্মযজ্ঞের মধ্যে দিয়ে? অথবা... মহর্ষী দেবেন্দ্রনাথের অবর্তমানে ব্রাহ্মসমাজকে নিজের মত করে একটা অক্সিজেন দিয়ে আরও বহু দশক টিকিয়ে রাখার একটা চিন্তা কাজ করছিল ওঁর মনে? এই প্রশ্নগুলোর ভিত্তিতেই যে অস্তিত্বটি থেকে যায় তা হ’ল ‘ব্রাহ্ম রবীন্দ্রনাথ’। অথচ রবীন্দ্রনাথের একাধিক প্রবন্ধ এমন কি সাহিত্যেও দেখা যায় রবীন্দ্রনাথের ব্রাহ্মসমাজের প্রতি বিশেষ পক্ষপাত ছিল না। বরং বয়স বাড়ার সাথে সাথে সেই মূল সমাজের কার্জবিধি থেকে নিজেকে ক্রমে দূরেই সরিয়ে নিয়েছেন তিনি। যেমন হিন্দু ধর্মের গোঁড়ামির বিরুদ্ধে তিনি সোচ্চার ছিলেন, তেমন ‘গোরা’-র মত উপন্যাসে তৎকালীন ব্রাহ্মসমাজের দোষগুণও সমালোচনার জন্য পাঠকের চোখের সামনে নিয়ে আসেন। ‘রবীন্দ্রসাহিত্যের ভূমিকা’-এ নীহাররঞ্জন রায় লিখছেন – “ ‘গোরা’য় ব্রাহ্ম ও হিন্দুধর্মের তত্ত্বালোচনায় পক্ষপাত লেশহীন দৃষ্টির পরিচয় ততটা নাই। ব্রাহ্ম সমাজ ও ধর্মের স্বপক্ষীয় যুক্তিগুলি যুক্তিই রহিয়া গিয়াছে, সে যুক্তিতে যেন প্রাণাবেগের স্পর্শ লাগে নাই। পানুবাবু ও বরদাসুন্দরীকে ব্রাহ্ম সমাজের মুখপাত্র বলা চলে না। পরেশবাবুকেও নয়, তিনি ত কোনও বিশেষ সমাজেরই নহেন। হিন্দুধর্ম, হিন্দু ইতিহাস ও সভ্যতার স্বপক্ষীয় যুক্তিই লেখকের সহানুভূতি আকর্ষণ করিয়াছে, সেই সব যুক্তির পশ্চাতেই লেখকের অন্তর্দৃষ্টির প্রেরণা প্রাণাবেগের স্পর্শ লাগিয়াছে।” আবার রবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ও রবীন্দ্রনাথের হিন্দু ধর্মীয় সংস্কারের প্রতি অনুগত থেকে যাওয়ার ব্যাপারে বয়ান দিয়ে গেছেন একাধিক ঘটনার উল্লেখ করে – যেমন, বড় ছেলে রথীন্দ্রনাথের উপনয়ন, ছোট মেয়ের বিয়ের সময় ব্রাহ্মধর্মের জামাইয়ের উপনয়ন করাতে চাওয়া এবং সনাতন ধর্মের প্রাচীন মন্ত্রাদী (আর তার মধ্যে থাকা দর্শন) এর প্রতি অসীম শ্রদ্ধা। ভীষণ ভাবেই হিন্দু রীতি বা সংস্কারের মধ্যে থাকা ঠাকুর পরিবারে ‘ব্রাহ্ম ব্যাপারটা ঠিক কী এবং কোথায়?’ এই প্রশ্নই মানুষকে দ্বিধাগ্রস্ত করত যদি না রবীন্দ্রনাথ নিজেই নিজের মনের ভাবটা বুঝিয়ে দিয়ে যেতেন -
“বস্তুত ব্রাহ্মসমাজের আবির্ভাব সমস্ত হিন্দুসমাজেরই ইতিহাসের একটি অঙ্গ। হিন্দু সমাজেরই নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যে তাহারই বিশেষ একটি মর্মান্তিক প্রয়োজন বোধের ভিতর দিয়া তাহারই আন্তরিক শক্তির উদ্যমে এই সমাজ উদ্বোধিত হইয়াছে। ব্রাহ্মসমাজ আকস্মিক অদ্ভুত একটা খাপছাড়া কাণ্ড নহে।” [আত্মপরিচয় – পরিচয়, রবীন্দ্ররচনাবলী ত্রয়োদশ খণ্ড]
এবারে, এই সূত্র ধরেই এক এক করে কিছু উদাহরণ দেখে নেওয়া যায়, যেখানে উপনিষদের শ্লোক থেকেই উদ্বুদ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথের জ্ঞানচক্ষু জীবনকে চিনছে ব্রহ্ম আলোকে।

(১)
ন তত্র চক্ষুর্গচ্ছতি ন বাগ্‌গচ্ছতি ন মনঃ
ন বিদ্মো ন বিজানীমো যথৈতদনুশিষ্যাৎ ।।
[কেনোপনিষৎ]
যার অর্থ - যেখানে নয়ন গমন করে না, বাক্য গমন করে না, মনও গমন করে না, ব্রহ্ম কী রূপ তাহা জানি না। সুতরাং তাকে কী রূপে অপরের জ্ঞানের বিষয়ভূত করতে হয় – তাও জানা নেই।

“নয়ন তোমারে পায় না দেখিতে, রয়েছ নয়নে নয়নে।
হৃদয় তোমারে পায় না জানিতে, হৃদয়ে রয়েছ গোপনে ॥”
গীতবিতানের পূজা পর্বের এই গান যেন একদম সেই উপনিষদের কথা কেই আবার আমাদের মনে প্রবেশ করিয়ে দিচ্ছে।


(২)
ন তত্র সূর্যো ভাতি ন চন্দ্রতারকং নেমা বিদ্যুতো ভান্তি
কুতোহয়মগ্নিনঃ।
তমেব ভান্তমনুভাতি সর্বং তস্য ভাসা সর্বমিদং বিভাতি।।
[কঠোপনিষৎ]
যার অর্থ - সেই ব্রহ্মকে চাঁদ সূর্য তারা বিদ্যুৎ কেউ প্রকাশ করে না। এই অগ্নি আবার কী ভাবে কি করবে?
তিনি প্রকাশমান বলেই সব কিছু দীপ্তিমান হয়।

রবীন্দ্রনাথের দেখায় তা ঠিক এই রকম রূপ নিয়ে নিচ্ছে -
শুধু এই চেয়ে দেখা, এই পথ বেয়ে চলে যাওয়া,
এই আলো, এই হাওয়া,
এইমতো অস্ফুটধ্বনির গুঞ্জরণ,
ভেসে-যাওয়া মেঘ হতে
অকস্মাৎ নদীস্রোতে
ছায়ার নিঃশব্দ সঞ্চরণ,
যে আনন্দ-বেদনায় এ জীবন বারেবারে করেছে উদাস
হৃদয় খুঁজিছে আজি তাহারি প্রকাশ।
[বলাকা – রবীন্দ্ররচনাবলী, ২য় খণ্ড]

(৩)
যত্র নান্যত্পশ্যতি নান্যচ্ছৃণোতি নান্যদ্বিজানাতি স
ভূমাথ যত্রান্যত্পশ্যত্যন্য চ্ছৃণোত্যন্যদ্বিজানা তি
তদল্পং যো বৈ ভূমা তদমৃতমথ যদল্পং তন্মর্ত্যঁ স
ভগবঃ কস্মিন্প্রতিষ্ঠিত ইতি স্বে মহিম্নি যদি বা
ন মহিম্নীতি
[ছান্দোগ্য উপনিষদ]

যার অর্থ – যেখানে মানুষ দেখতে পায় না, কিছু শুনতে পায় না, কিছু উপলব্ধি করে না, তা-ই ভূমা... যা ভূমা তা-ই অমৃত, যা অল্প তা-ই মৃত্যু।

সেই ভূমা’র কথাই স্পষ্ট আসছে রবীন্দ্রনাথের বোধে, ঠিক এই ভাবে –

ধূলির আসনে বসি ভূমারে দেখেছি ধ্যানচোখে
আলোকের অতীত আলোকে ।
অণু হতে অণীয়ান মহৎ হইতে মহীয়ান ,
ইন্দ্রিয়ের পারে তার পেয়েছি সন্ধান ।
ক্ষণে ক্ষণে দেখিয়াছি দেহের ভেদিয়া যবনিকা
অনির্বাণ দীপ্তিময়ী শিখা ।
[বর্ষশেষ - পরিশেষ, রবি রচনা ৩য় খণ্ড]

এভাবে দেখতে দেখতে, আনাচে কানাচে লুকিয়ে থাকা ওনার ব্রহ্মজ্ঞানের হীরক খণ্ড এবং রবীন্দ্রসাহিত্যে ব্রাহ্মধর্মের প্রভাব বিস্তারে খুঁজতে গেলে রবীন্দ্রনাথের প্রতিটা পর্বই ছুঁয়ে যেতে হবে। স্বল্প পরিসরে তা সম্ভব নয়। বরং একটা কথা আবার আমাদের মনে করে নেওয়া দরকার যে রবীন্দ্রনাথকে এই ব্রাহ্মধর্মে আবদ্ধ রাখলে এক বিরাট ভ্রান্তির মধ্যে থেকে যেতে হবে। ব্রাহ্মধর্ম, ব্রহ্মজ্ঞান বা উপনিষদ... পরবর্তীকালে বৈষ্ণব পদাবলী, বাউল, সুফি... এসব কিছুর হাত ধরেই রবীন্দ্রনাথের একটাই অন্বেষণ ছিল – রিলিজিয়ন অফ ম্যান। সত্য এবং আনন্দে পরমেশ্বরকে পাওয়া। সেই ‘তোমার মাঝে আমি’ হয়ে থাকার আনন্দই সার।
“I was anxious never to miss a single morning, because each one was precious to me, more precious than gold to the miser. I am certain that I felt a larger meaning of my own self when the barrier vanished between me and what beyond myself.” [The Religion of Man – Rabindranath Tagore]

[১৪২২, স্বপ্ন উড়ান পত্রিকায় প্রকাশিত]

আপনার মতামত জানান