সে এক অপ্রচলিত দীপাবলি

সরোজ দরবার

 

'সবার ঘরে আলো জ্বলবে আর আমরা পাবুনি?', একরকম বিরক্ত হয়েই বলল ললিত মাস্টার। গ্রাম প্রধান অনিল তার ছোটবেলার বন্ধু। ললিতের কাঁধে হাত রেখে সে বলল, ‘শোন মাস্টার এত উতলা হসনি। এতটা যখন হয়েছে তোরটাও হবে। আমি তো কাজ করছি, করছি কি না বল?’
অনিল বলল বটে হবে, তবে কবে যে ললিতের ঘর আলো হবে, তা সে নিজেও জানে না। তাদের পার্টি ক্ষমতায় আছে বহু বছর। হ্যাঁ, হিসেব করলে তো বছর কুড়ি হবেই। এই তুলসিপুর গ্রামে এই এক পার্টি ভিন্ন আর কিছু এই সেদিন পর্যন্তও ছিল না। তবু কেন কে জানে, তাদের তুলসিপুরে কিছুতেই বিদ্যুৎ আসেনি! আশেপাশের গ্রামে এসেছে বেশ কয়েকবছর। শুধু বলির পাঁঠা তুলসিপুর। প্রতিবারই কিছু না কিছু করে কেঁচে যায়। এই তুলসিপুরে হিন্দুদেরই বাস। তবে একেবারে পূব সীমানায় দু-এক ঘর মুসলমানও আছে। তারপর থেকে মুসলিম পল্লি শুরু। গ্রামের পশ্চিমে অবশ্য পরপর হিন্দু গ্রাম। ওদিকে ইস্কুল আছে। হাটও বসে ওদিকেই। কারেন্টও আছে। শুধু এই পূবের দিকটা অন্ধকার। আর মাঝখানে পড়ে গেছে তুলসিপুর। গ্রামের লোক অবশ্য মাথা খাটিয়ে এত জটিল কিছু ভাবেনি। মাটির রাস্তায় ইট পড়েছে, বিধবা সরলার ঘর হয়েছে সরকারের টাকায় এই ঢের। আর পাশেই খানকয়েক ইটভাটা আছে। চাষ ছাড়াও রোজগার আছে। সুতরাং বেশি ভাবনার কিছু নেই। দিনরাত খাটলে এমনিই ঘুম পায়। জটিল চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খাওয়ার ফুরসত পায় না। গ্রামের লোক তাই হারকিন- লন্ঠন জ্বালিয়েই বেশ ছিল।

তবে অনিলকে এসব ভাবতে হয়। সবদিকে তার কড়া নজর। সোজা দিকেও যেমন, জটিল দিকেও। তবে না সে গ্রাম প্রধান। এবার অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে কারেন্ট স্যাংশন হয়েছে। তুলসিপুরের কপালেও ক’টা পোস্টার জুটেছে। মুশকিল হল, তাতে গোটা গ্রাম আলো পাবে না। তবু নেই মামার থেকে কানা ভাল। কিন্তু প্রশ্ন হল, কানা মামা যাদের হতে হচ্ছে, তারা মানবে কেন? এই যেমন ললিত মাস্টার আপত্তি তুলেছে। তার পিছনে কানাই, প্রশান্ত, আনন্দরাও আছে। কিন্তু অনিলের উপায় কী!
উপায় যে নেই তা বাকিরাও বুঝেছে। হতাশায় ফিরতে ফিরতে ললিত মাস্টার বলছে, ‘শালা কবে থেকে শুনছি আসবে আসবে, আর এই তার ছিরি! গেলবার বায়নায় গিয়ে টুনির আলোও কিনে আনলুম, সব বেকার গেল।’
ঘরে ফিরতে মাস্টারের বউ বলল, ‘কিগো কিছু হল?’ ললিত খিস্তি করে দোষারোপ করল। অদৃষ্ট না সরকারকে নাকি বউকে কে জানে!

**************

ললিত অবশ্য ইস্কুল মাস্টার নয়। বাজনদার। গানের গলাও আছে অল্পবিস্তর। এ গ্রামের সবাই জানে সে কলকাতায় গিয়ে গান শিখেছে। ব্যাপারটা আসলে সত্যি নয়। পড়াশোনা হল না দেখে বাপ একজনের সংগে পাঠিয়ে দিয়েছিল মিষ্টি দোকানের কাজে। সেটা সাঁতরাগাছি ছাড়িয়ে। ওই কলকাতার প্রায় গায়ে গায়ে বলে গোড়ার দিকে ‘কলকাতার কাছাকাছি থাকি’ বলত ললিত। পরে ‘কাছাকাছি’টা বাদ দিয়ে শুধু কলকাতাই বলত। তো দোকানের কাজপাট সেরে ওখানের একটা ক্লাবে বেশ যাওয়া-আসা জমিয়েছিল সে। আর গানের ঝোঁক তো বরাবরই ছিল। ক্লাবে আবার একটা মাস্টার গান শেখাতে আসত। ললিত হপ্তায় দুদিন সে দলে ভিড়ে গেল। বেশ রগড়ে রগড়ে হারমোনিয়ামটা আয়ত্ত করল। হাতের রসগোল্লা, সিঙারা যেমন ঠিক আকার পায়, তেমনই সুরও লাগতে থাকল বেশ। গান অবশ্য তেমন শেখেনি। এভাবেই বেশ কয়েক বছর চলছিল, তারপর একদিন মিষ্টি দোকানের কাজে ইস্তফা। গানের টানে ভিড়ে গেল একটা ফাংশন পার্টিতে। সেখানে বাজনার হাত আরও পাকা হল। গানও গাইত টুকটাক। এদিকে গ্রামের মধ্যে ললিত মোটামুটি শিল্পী বনে গেল। তা কষ্টও করত বটে। গ্রামের মানুষ দেখেছে, ললিত একটানা অনেকদিন ডিম খেত না, টক নয়, দই ছুঁত না। যে ওকে গান শিখিয়েছিল সেইই নাকি বারণ করেছিল এ সব খেতে।

কিন্তু এসব বেশিদিন টিকল না। গান-বাজনায় লোকে হাততালি দেয়, পয়সা দেয় না। ফাংশন পার্টিতে নাকি বিস্তর বেলেল্লাপনা চলে, কার মুখে শুনে ললিতের বাপ বেজায় খাপ্পা। এভাবে চললে ছেলে উচ্ছন্নে যাবে। ফলে রফা দাঁড়াল এরকম, সিজনে সিজনে বাজনায় যাবে ললিত। ভাসানের সময়ই এই বাজনার ডাক পড়ে। মিনি একখানা কি-বোর্ড বাজায় সে। আর মদ গিলে ছেলে-বুড়ো-বউ উদ্দাম নাচে। যেই নাচ একটু ঝিমিয়ে পড়ে, ললিত নাগিনের সুর ধরে। অমনি মন দোলে, তন দোলে, নেশাও দুলে ওঠে। এটাতেই মজা ললিতের। পাকা বাজনদার জানে, কখন কোনটা বাজাতে হবে। কোন সুরের সুতো কখন ছাড়লে পাব্লিক ভোকাট্টা হবে সে সব তার আঙুলে বসানো। পোষা পাখির মতো কি-বোর্ডে তার হাত চলে, আর নিজেকে বেশ শিল্পী শিল্পী লাগে ললিতের। বছরের বাকি সময়টা চাষের কাজ। যদিও তাতে একটুও মন লাগে কই!

দুর্গাপুজোর ভাসানে সেবার কলকাতা গিয়ে বেশ কিছু চিনে আলো কিনে এনেছিল। শুনেছিল, গ্রামে কারেন্ট আসছে। কিন্তু সে আর তার কপালে জুটল না। সেই প্রদীপ, মোমবাতি। সেই কুপির আলো। ধুর ধুর, এই গ্রামের জীবনে ঘেন্না ধরে গেল ললিতের। একরাশ বিরক্তি নিয়ে কালীপুজোর বায়নায় হলদিয়া চলে গেল সে।

****************************************
বলতে নেই কালীপুজো বেশ ভালই কাটল। ভাসানের বাজনায় লোকে নেচে পাগল হল। তবে এবার একটা উপরি ছিল। টাকায় যত না, সম্মানে ততটা। ভাসানের আগের দিন রাতেই পৌঁছে গিয়েছিল সে। সেদিন ওখানে জমজমাট ফাংশন। কতদিন এ সবের সঙ্গে সম্পর্ক নেই, তবু লোভও ছাড়তে পারে না ললিত। তাছাড়া ওখানে তার দূর সম্পর্কের এক পিসিও থাকে। সেখানেই উঠেছিল। আসলে পিসির সূত্রেই ওই এলাকায় অনেকদিনের জানাশোনা। সেই থেকেই কাজটাও এসেছিল।
পিসির সংগে দেখা করে, বিজয়ার প্রণাম ঠুকে আর এক প্যাকেট মিষ্টি দিয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছিল সে।
এদিকে সেদিনের ফাংশনের বাজনদার মাল খেয়ে টাল। যত তাকে উঠতে বলা হয়, তত সে বলে, শালা কারো গোলাম নাকি। এলাকার ছেলেরা ললিতকে চিনত। বলল, তুমিই বাজিয়ে দাও। ললিত একটু আমতা আমতা করছিল। ছেলেরা বলল, তোমাকে একটু বেশিই ধরে দেওয়া হবে। আর রাজি না হওয়ার কোনও কারণ নেই। অনেকদিনের পুরনো অভ্যেস ললিতের। রিহার্সাল ছাড়াই দিব্যি বাজিয়ে দিল।নিজেও অনেকদিন পরে খুশি হল। সে জানে, তার ভিতর একজন শিল্পী আছে। শালা চাষার দলই খালি তা বুঝল না!

কাজে কম্মে আনন্দেই ছিল। ভাসানের পরদিন ঘুমিয়ে, দুপুরে খেয়ে দেয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল। কার্তিকের সন্ধে ঝুপ করে নেমে আসে। যত বাড়ির কাছাকাছি আসছে তত মনটা চিরতা হয়ে যাচ্ছে। শহরে এত আলো। তার গ্রামও আলোয় আলো। শুধু তার ঘরটাই...। একটা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে মনে মনে সরকারকে একটা গালাগাল দেয় ললিত। তারপর রাগ গিয়ে পড়ে বাবার উপর। ফাংশন পার্টি নাকি খুব সস্তা ব্যাপার। বাপের জোরাজুরিতে তা ছাড়তে হয়েছিল। ললিত ভেবেছিল ছেড়েছুড়ে গান ভাল করে শিখে শিল্পী হবে। রেকর্ড বেরবে তার। স্টেজ কাঁপাবে। কত স্বপ্ন। গুণও তো তার কম নয়। পাঁচ গ্রামে ললিতের মতো শিল্পী ছেলে আর কটা ছিল? দোষের মধ্যে ছিল সন্ধে হলে একটু দেশি মদ। তা কত শিল্পীই তো পান করেন। সে সব নিয়ে কত গপ্পো। আর ললিত খেল তো পৃথিবী রসাতলে গেল। বাপ ধরে বেঁধে একটা কালো মেয়ের সংগে বিয়ে দিয়ে দিল। বলল, দেখ কত ধানে কত চাল। এর মধ্যে ভাইয়ে ভাইয়ে ভাগাভাগি হল। তাদের ভিটে ছাড়িয়ে দাসপাড়ার দিকে যে বাগানটা ছিল সেটা তার ভাগে পড়ল। সেখানেই এখন ললিতের বাস। তাদের ভিটেয় আলো এসেছে। কিন্তু ললিতের ঘর অবধি পৌঁছায়নি। ভেবেই গোটা গুষ্টির উপর যেন তেলে বেগুনে জ্বলে উঠল সে।

ঘরের সামনে এসে বউকে ডাক দিল ললিত। হ্যারিকেন হাতে বেরিয়ে এল ললিতের কালো বউ। খুশির আলো চোখেমুখে জ্বলজ্বল করছে। তাড়াতাড়ি ললিতের হাত থেকে ব্যাগটা নিল। কি-বোর্ডটা সাবধানে দাওয়ায় নামিয়ে রাখল ললিত। বউ বলল, যাও হাতমুখ ধুয়ে এসো। আমি চা বসাচ্ছি।

দাওয়ার দড়িতে ঝোলানো গামছাটা টেনে নিয়ে পুকুরঘাটে নামল ললিত। বাড়ির লাগোয়া ছোট্ট পুকুর। নারকেল গাছের গুঁড়ি দিয়ে ঘাট বাঁধানো। প্রায় ডোবাই বলা যায়। কার্তিকের রাতের জল ঠাণ্ডা। চোখেমুখে দিতেই ক্লান্তি ধুয়ে গেল। আর এতক্ষণের বিরক্তিও। কী করে যেন অনেকখানি শান্ত হয়ে গেল ললিতের মন। তৃপ্তি করে হাতমুখ ধুয়ে পিছনে ফিরল সে। কিন্তু এটা কী দেখছে সে! একবার চোখ কচলে নিল ললিত। নাহ সত্যি। তার ঘর থেকে বেরচ্ছে ধবধবে সাদা আলো!
দু-লাফে ঘরের ভিতর ঢুকে ললিত চারিদিক তাকিয়ে দেখল। নাহ, কারেন্ট আসেনি। বদলে মেঝের উপর জ্বলছে একটা ছোট্ট বিজলি হ্যারিকেন। শহরে কারেন্ট চলে গেলে একরকম আলে জ্বলে, কী যেন বলে তাকে, ললিত এক্ষুণি মনে করতে পারল না। কিন্তু এটা সেরকম নয়। অনেকটা যেন বাবুইয়ের বাসায় অনেকগুলো জোনাকি জ্বলছে। একটা লন্ঠনের গায়ে ছোট ছোট অনেকগুলো সাদা টুনি লাগানো। আর তীব্র চকচকে একটা আলোয় তাদের ছোট্ট চৌখুপিটা আলোয় আলোয় হয়ে আছে। বাইরে তো এখনও অমাবস্যার ঘোর কাটেনি। সেই আলোয় বউয়ের দিকে তাকায় ললিত। বলে, এ জিনিস কোথায় পেলে? তক্তপোশের উপর বসে ললিতের বউ তখন খুশিতে বাচ্চা মেয়ের হাসছে। বলে, অত জেনে কী হবে? কেমন আলো হয়েছে সেটা বলো?
-আহ এল কোত্থেকে বলবে তো?
-অনিল ঠাকুরপো এসছিল। বলল, কারেন তো এনে দিতে পারলুমনি, এই একটা জিনিস আছে। আমার থেকেই কিনতে পার। শহর থেকে এনেছি। অল্প অল্প করে দাম মিটিয়ে দিলেই হবে।
ললিত চোখ বড়বড় করে বলে, শালা ধান্দাবাজ। কত টাকা দিতে হবে। ললিতের বউ মুখে আঙুল দেয়। সসস আওয়াজ করে বলে, চুপ, ও তোমায় ভাবতে হবেনে। আমি দেখে নেব।
কথা বলে না ললিত। দেখে সত্যিই কারেন্ট নেই বলে মনে যে ক্ষোভটা ছিল, কেটে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। যেন মেঘের ফাঁক থেকে একফালি চাঁদ উঁকি দিচ্ছে। ছোট্ট ঘরটা যে এত কম আলোয় এত বেশি ভরে উঠতে পারে কে জানত! ললিত বুঝতে পারে, মন ভালোর থেকে ভাল আলো আর কিছু নেই। আর তার মন ভালো করতে পেরে কী খুশিই না হয়েছে বউটা। অনেকদিনের পুরনো জমাট ক্ষোভগুলো একটু একটু করে যেন উবে যাচ্ছে। নিজের ঘরে বসে থাকতেই বেশ ভাল লাগছে ললিতের। মুখ তুলে সে দেখে, তক্তপোশের উপর তখনও বসে আছে তার বউ। পা দুটো দোলাচ্ছে আনন্দে। আর কালো মেয়েটার পায়ের কাছে কত আলোই না আজ হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। নিজের অজান্তেই বাতাসের উপর আলগোছে আঙুলগুলো খেলে যায় ললিতের। কী সুর বাজছে বাতাসে! নিজেই চমকে ওঠে সে। আর তার চমক ভাঙিয়ে বউ বলে, কী গো আলো দেখে ভোলেবাবা হয়ে গেলে যে, যাই চা নিয়ে আসিগে...। ললিত সে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থাকে, আর ভাবে, কে যায়!


আপনার মতামত জানান