বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি: স্থাপত্যদর্পণে সমাজ প্রতিকৃতি

আবেশ কুমার দাস

 

Thus the midday halt of Charnock—more’s the pity!
Grew a City.
As the fungus sprouts chaotic from its bed,
So it spread—
Chance-directed, chance-erected, laid and built
On the silt—
Palace, byre, hovel—poverty and pride—
Side by side;

(A Tale of Two Cities/Rudyard Kipling)

নিমতলা ঘাট স্ট্রিট ধরে যাচ্ছিলাম মিনার্ভা থিয়েটারের দিকে। বিডন স্কোয়ারের পাঁচিলের লাগোয়া ফুটপাথে বেওয়ারিশের ঢঙে পড়েছিল টিয়াপাখির খাঁচাটা। আসনের কায়দায় বিছানো সবুজ একফালি ময়লা কাপড়ের একধারে। রংবেরঙের একরাশ সস্তা পাথরও সাজানো ছিল কাপড়ের ওপর। আকছার না হলেও উত্তর কলকাতার পথঘাটের এক পরিচিত ছবি। জানি না দশ-বিশ টাকার বিনিময়ে পথচলতি মানুষের ভবিষ্যৎ বাতলে দেওয়া সাধুসন্ত গোছের মানুষগুলোর কাছে কেন প্রায়শই থাকে এমন একটা করে টিয়াপাখি।
পাখির মালিককে চোখে পড়েনি ধারেকাছে। মিনিটখানেকের জন্য বেসাতি ছেড়ে হয়ত উঠে গিয়েছিল সে আশেপাশে কোথাও। কিন্তু পুরনো কলকাতার এমন হাজারো অনুষঙ্গে ওয়াকিবহাল আমি সেদিন সেই পাখির খাঁচাখানা আর সার সার পাথরগুলোকে একঝলক দেখেই বুঝে নিয়েছিলাম যা বোঝার। জন্মসূত্রে কলকাতার মানুষ না হলেও সওয়া তিনশো বছরের প্রাচীন এই শহরটার এক একটা পাড়া, এক একটা গলি, এক একটা রাজপথের হৃদস্পন্দন যে বেশ পরিচিত আমার।
নিমতলা থেকেই যেমন সোজাসুজি পুবমুখো হাঁটতে থাকলে আশপাশের পরিবেশের বদল বেশ ধরা যায়। পরের পর পেরোতে হয় স্ট্র্যান্ড রোড, রবীন্দ্র সরণি (সাবেক আপার চিৎপুর রোড—কলকাতার প্রাচীনতম সরণি), সেন্ট্রাল অ্যাভেন্যু, বিধান সরণি (সাবেক কর্নওয়ালিশ স্ট্রিট) এবং আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রোডের (সাবেক আপার সার্কুলার রোড) ক্রসিং। আরও পুবে এগোতে চাইলে এরপর রাজা দীনেন্দ্র স্ট্রিটকে আড়াআড়ি পেরিয়ে থামতে হয় গিয়ে খালপাড়ের ক্যানেল ওয়েস্ট রোডে। জোড়াবাগানের সাবেকিয়ানার রেশ ফুরোতে না ফুরোতেই ইতিমধ্যে শুরু হয়ে যাওয়া হেদুয়ার বনেদিয়ানার। আবার মানিকতলার ব্যস্ত চৌমাথায় এসে পড়তেই যেন একনিমেষে যাবতীয় মোহগ্রস্ততার ঘোর কেটে যাওয়া। আর খালপাড়ে গিয়ে দাঁড়ালে তো মেলানোই যাবে না একই শহর কলকাতার পশ্চিম থেকে পুবে মাত্রই কয়েক মাইলের তফাতে নাগরিক বহিরঙ্গের অভিজাত থেকে মধ্যবিত্ত হতে হতে শেষে একেবারেই হতশ্রী হয়ে পড়াকে।
কিন্তু শ্রীময়ী থেকে ক্রমশ এভাবে শ্রীহীনা হয়ে পড়া কি শুধুই ভৌগোলিক দূরত্বে বিচ্ছিন্ন এই শহরের এক একটি স্বতন্ত্র্য জনপদের? নিছক কিছু ঘরবাড়ির স্থাপত্যরীতির? কিছু মানুষজনের অন্তরঙ্গের পুরভাবনার? নাকি সাদাচোখে দেখতে পাওয়া বহিরঙ্গের এই বদলটুকুর নেপথ্যে আসলে ক্রিয়াশীল নেই বৃহত্তর ঐতিহাসিক পটভূমির নিরিখে একটি জাতির অভিজাত থেকে কালেদিনে একেবারে অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়ার বাস্তব ইতিবৃত্তটুকুর ইন্ধনও?
পুরনো কলকাতাকে নিয়ে আমার যাবতীয় অনুসন্ধিৎসার মূলে রয়েছে আদতে এই প্রশ্নটুকুই। বলে রাখা প্রয়োজন বিমল মিত্রের ‘সাহেব বিবি গোলাম’ বা সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘প্রথম আলো’-র মতো উপন্যাস প্রাথমিক কিছু উৎসাহের ইন্ধন জুগিয়েছিল সূচনায়। আরও বলি, লেখক হিসেবে সত্যজিৎ রায়ের বিশেষত্বও হয়তো এখানেই—‘গোরস্থানে সাবধান’-এর মতো এক আপাদমস্তক অন্যধারার কাহিনির মাধ্যমেও তিনি পুরনো কলকাতার রসে মজিয়ে ফেলতে পেরেছিলেন আমার মতো আরও অনেককেই। শহরতলির আর পাঁচটা ছেলের মতোই আমারও কলকাতার সঙ্গে পরিচয়ের সূত্রপাত শিয়ালদা স্টেশন, মহাত্মা গান্ধী রোড বা কলেজ স্ট্রিট চত্বরের সুবাদে। সেইসব দিনে আহিরীটোলা, পাথুরিয়াঘাটা বা গরাণহাটার মতো নামগুলো বইয়ের পাতা থেকে উঠে এসে যেন কতদূরের এক এক স্বপ্নলোকের ইঙ্গিত বয়ে আনত। মনে হত আমার প্রথম পরিচয়ের এই কেজো কলকাতার সঙ্গোপনেই যেন কোথায় কোথায় লুকিয়ে আছে সেই বিত্তশালী ইতিহাসে সম্পৃক্ত জনপদেরা। নৈহাটি থেকে সওয়া তিনটেয় ছাড়ত সেই লোকাল ট্রেনটা (এখনও ছাড়ে) দমদমের পর পাতিপুকুর দিয়ে ঘুরে চিৎপুর (অধুনা কলকাতা স্টেশন) হয়ে যে পাড়ি জমাত পুরনো কলকাতার গঙ্গাতীর ছুঁয়ে ছুঁয়ে। দুপুরবেলার সেই নৈহাটি লোকালকেই করে নিলাম পুরনো কলকাতার সঙ্গে আমার প্রাথমিক আলাপপর্বের বাহন। কোনওদিন বাগবাজার, কোনওদিন শোভাবাজার-আহিরীটোলা, কোনওদিন বড়বাজারের টিকিট কেটে চেপে বসতাম গাড়িতে। নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছনোর পর পুরনো কলকাতার অলিতে গলিতে, রাস্তায় ঘাটে হেঁটে বেড়াতাম স্বপ্নাবিষ্টের মতো। তখনই কালের হস্তাবলেপ গায়ে মেখে শহরটার পাড়ায় পাড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা বনেদি বহিরঙ্গের সেই পুরনো পুরনো বাড়িগুলো আমাকে মোহাচ্ছন্ন করেছিল তাদের গাম্ভীর্যময় স্থাপত্যে। এরকমই একটা সময় হাতে আসে আনন্দ থেকে প্রকাশিত ও অলক মিত্রের আলোকচিত্রে অলঙ্কৃত দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি’ বইটি। ইতিহাসে অধিকার যে কেবল বিগতেরই নেই—নিজ গুরুত্বে সেই চির চলমান ইতিবৃত্তে যে প্রতিদিন সম্পৃক্ত হয়ে চলে ঘটমান বর্তমানও—জীবনে প্রথমবার উপলব্ধি করেছিলাম বইটির পাতা উল্টোতে উল্টোতেই। শহর জুড়ে গড়ে ওঠা একটি বিশেষ সময়ের বাড়িঘরের স্থাপত্যশৈলী থেকে সেই কালপর্বের সমাজমনের আঁচ করা এবং কেবল সেই অতীতচারিতার বৃত্তেই আবদ্ধ না থেকে পরবর্তী যুগের পরিবর্তনশীল স্থাপত্যভঙ্গিমা থেকে একটি জাতির ভবিষ্য গতিমুখকে চিহ্নিত করে নেওয়া বইটির বিশেষত্ব।
বাগবাজার-চিৎপুর অঞ্চলের একটি পাড়ার নাম মদনমোহনতলা। এই নামকরণের পূর্ব প্রেক্ষাপট শুনিয়েছেন লেখক। আঠারো শতকে লবণের ব্যবসা করে রাতারাতি অবস্থা ফিরে গিয়েছিল গোকুলচন্দ্র মিত্রের। সমাজের মান্যগণ্য ব্যক্তিত্বরাও অধমর্ণ হিসেবে এসে দাঁড়াতেন তাঁর দুয়ারে। বিষ্ণুপুরের রাজা চৈতন্য সিংহকেও রাজবাড়ির বিখ্যাত মদনমোহন বিগ্রহ বন্ধক রেখে তাঁর কাছে টাকা ধার নিতে হয়েছিল। এই মদনমোহনের নামেই গোকুলচন্দ্র মিত্রের বাসগৃহের সন্নিহিত অঞ্চলটির নাম হয়ে যায় মদনমোহনতলা। গোটা বইতে এমন অজস্র পাড়া, গলি বা রাজপথের নামের পূর্ব প্রেক্ষাপট যেমন ছড়িয়ে আছে তেমন সখেরবাজার বা নাপতেহাটার মতো অনেক হারিয়ে যাওয়া জায়গার সন্ধানও মিলবে বিভিন্ন সূত্রে। তবে তথ্যগত বিভ্রান্তি যে একেবারে নেই তা নয়। লালদিঘি নামকরণেরই যেমন দু’ রকম নেপথ্য কাহিনি পেয়েছি দু’টি ভিন্ন ভিন্ন নিবন্ধে। ‘সাবর্ণ রায়চৌধুরী পরিবার’ নিবন্ধের বক্তব্য অনুযায়ী কলকাতার এই সুপ্রাচীন বংশের কোনও এক পুরুষ লক্ষ্মীকান্তের ইঁটের তৈরি কাছারিবাড়ি ছিল আজকের বিবাদী বাগ এলাকায়। ছিল শ্যামরায়ের মন্দির।
"শ্যামরায়ের মন্দির-প্রাঙ্গণে মহাসমারোহে আবির ও কুমকুম সহযোগে খেলা হ’ত দোল। তারপর সবাই স্নান করত দিঘিতে। দিঘির জল আবির-কুমকুমে লাল হয়ে যেত। সেই থেকে দিঘির নাম হয়েছে লালদিঘি।"
আবার ‘শেঠ বাড়ি’ নিবন্ধে বলা হচ্ছে মুকুন্দরাম শেঠ কালীক্ষেত্র থেকে তাঁর বসতি গুটিয়ে নিয়ে অধুনা বিবাদী বাগের সংলগ্ন কোনও এক জায়গায় উঠে আসেন। জঙ্গল কেটে বসতি গড়ে তোলেন। মুকুন্দরামের ছেলে লালমোহন সেখানে যে পুকুর খনন করেন সেই পুকুরই নাকি আজকের লালদিঘি। আর সংলগ্ন এলাকায় যে বাজার তিনি গড়ে তুলেছিলেন তাই আজকের লালবাজার। স্পষ্টভাবে কিছু বলা না থাকলেও সন্দেহ জাগে যেন লালমোহনের নাম থেকেই লালদিঘি ও লালবাজার নামের উৎপত্তি।
কিন্তু বইটির বিশেষত্ব অন্য জায়গায়। পাদটীকার মতো ইতিহাসের অলস বিহারেই থমকে থাকেনি দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখনী। বরং সাবর্ণ রায়চৌধুরীর পরিবার, চোরবাগানের মিত্র পরিবার, হাটখোলার দত্ত পরিবার, চোরবাগান ও পাথুরিয়াঘাটার মল্লিক পরিবার, জগদ্‌বিখ্যাত ‘টেগোর’ পরিবার (যাদের আবার একাধিক বাড়ি ছড়িয়ে ছিল পাথুরিয়াঘাটা, জোড়াসাঁকো, বেলগাছিয়া এবং কয়লাহাটায়), কর্নওয়ালিশ স্ট্রিটের লাহা পরিবার, শোভাবাজারের দেব পরিবার, বড়বাজারের শেঠ পরিবারের মতো বহু বনেদি বংশের বাসগৃহের সাবেক ও সাম্প্রতিক অঙ্গসজ্জার, কোনও কোনও ক্ষেত্রে প্রায় মিথ হয়ে যাওয়া আড়ম্বরবহুলতার পরিচয় দিতে দিতে লেখক নিঃসাড়ে কখন ঢুকে পড়েন বৃহত্তর বাংলার সামাজিক জীবনের ভূত ভবিষ্যতের রন্ধ্রে রন্ধ্রে।
"৭৮ নিমতলা ঘাট স্ট্রিটের বাড়িতে ঢুকে প্রথমেই চোখে পড়ল একটি ঢেঁকি। গ্রামের বাড়িতেও আজকাল ঢেঁকি সচরাচর চোখে পড়ে না। এদিক থেকে শহর কলকাতার বুকে একটি ঢেঁকি দেখে রীতিমত অবাকই হতে হয়। হাটখোলার বিখ্যাত দত্তবাড়ির পক্ষে এটা কিন্তু মোটেই বিস্ময়কর ঘটনা নয়। কলকাতার অন্যতম প্রাচীন এই পরিবার এখনও বৈশাখে তিথি-নক্ষত্র মিলিয়ে ঢেঁকি পুজো করেন, তারপর সেখানে কোটা হয় কাসুন্দি ও গোটা মসলা।"
সুতানুটি, গোবিন্দপুর ও কলকাতা পল্লিত্রয়ের সমন্বয়ে গড়ে ওঠা নগর কলকাতার পরিচয় ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর হিসেবে। কিন্তু এই শহরের প্রথম যুগের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে সম্পৃক্ত হয়ে থাকা বিখ্যাত পরিবারগুলির উদ্ভব যে আদপে গ্রামীণ সভ্যতায় উক্ত ঐতিহাসিক সত্যকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় হাটখোলার দত্তবাড়ির দৃষ্টান্ত। বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে কলকাতার প্রতিষ্ঠাপ্রাপ্তির নেপথ্যে পরোক্ষ অবদান যে আজকের দিনে প্রায় খালে পরিণত হওয়া সপ্তগ্রামের (অধুনা হুগলি জেলার আদিসপ্তগ্রাম) সরস্বতী নদীর সে ইতিহাসই বা মনে রেখেছেন কতজন?
"সপ্তগ্রামের কাছে কলকাতার ঋণ অনেক। সপ্তগ্রামের মজা সরস্বতীর কূল ছেড়ে শেঠ-বসাকরা কলকাতায় এসে ব্যবসাবাণিজ্য শুরু করেছিলেন। তাঁদের মতো বাঙালি বণিকদের ব্যবসাবাণিজ্যের সুবাদেই বন্দর ও শহর কলকাতার সমৃদ্ধির সূচনা হয়।"
শুধু শেঠ-বসাকরাই নয়, অষ্টাদশ-ঊনবিংশ শতকীয় বঙ্গীয় রিনেইস্যঁসের প্রথম পুরোধা পুরুষ ভারতপথিক রাজা রামমোহন রায়ের আদি নিবাস ছিল হুগলি জেলার রাধানগরে। কৃষ্ণকান্ত নন্দীর আদিবাড়ি ছিল কাশিমবাজারে। লাহাদের আদি নিবাস সপ্তগ্রামের চিত্রপুর গ্রামে। নস্করদের সাবেক বসতি সোনারপুরের কাছে বিদ্যাধরী তীরের খেয়াদহ গ্রামে। এহেন সামাজিক প্রেক্ষিতের বিচারে হাটখোলার দত্তবাড়ির সেই ঢেঁকিটির অস্তিত্বকে বেশ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে হয়। এই বইয়ে সংগৃহীত নিবন্ধগুলি প্রকাশিত হতে শুরু করেছিল ১৯৮১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকার পাতায়। রচনাকাল হিসেবে বইতে নির্দেশিত হয়েছে ১৯৮১-১৯৮২ সময়কাল। অর্থাৎ সাড়ে তিন দশক হতে চলল নিবন্ধগুলির প্রথম প্রকাশের। জানি না হাটখোলার দত্তবাড়িতে আজও সেই ঢেঁকিটির অস্তিত্ব রয়েছে নাকি। সবটাই নির্ভর করছে বর্তমান বংশধরদের রুচির উপর। যেমন খবর নিয়ে জেনেছি বইতে উল্লিখিত বসাকবাড়ির ‘শৃঙ্গার লেডিজ বিউটি পার্লার’-টি অনেকদিন হল বন্ধ হয়ে গেছে। তবু ১৯৮১-৮২ সালেও শহর কলকাতার বুকে একটি ঢেঁকির অস্তিত্বশীলতা নিঃসন্দেহেই একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।
এই বই থেকেই জানা যাচ্ছে শহর কলকাতার প্রথম যুগের স্থাপত্যে ছিল অনুভূমিক রীতির গ্রাহ্যতা। যার দরুণ দোতলা বা বড়জোর তিনতলার বেশি উঁচু ঘরবাড়ি সচরাচর চোখে পড়ত না। বিশালতা ছিল পারিপার্শ্বিক আয়তনে (শোভাবাজার রাজবাড়িই যেমন একটা সময় প্রায় তিরিশ বিঘা জমি জুড়ে বিস্তারলাভ করেছিল)। যুগের বদলের সঙ্গে সঙ্গে মান্যতা পেল উলম্ব রীতির স্থাপত্য। গোটা শহরের বুক জুড়ে গজিয়ে উঠল শয়ে শয়ে হাইরাইজ। এই পরিবর্তনের ভেতর স্পষ্টই এক জাতিগত অবক্ষয়ের আভাস খুঁজে পান লেখক।
"মাটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ওপরে উঠে যাওয়ার মধ্যে যে ছিন্নমূল মানসিকতা এবং স্বার্থপরতা ও নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে, এখনকার উঁচু-উঁচু বাড়িঘরের মধ্যে অভ্রান্তভাবে পড়েছে তার ছায়া।... কালোবাজারের ব্যবসায়ী ও শিল্পী একই ছাদের নীচে পাশাপাশি ফ্ল্যাটে থাকছেন এ-দৃশ্য বোধহয় আজ আর খুব একটা বিরল নয়। তাঁদের বাড়ির ভেতরেও খুব একটা তফাত খুঁজে পাওয়া যায় না।"
স্থাপত্যকলা ও সমাজমানস এভাবেই মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের দর্শনে। ‘বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি’ যার দরুণ নিছক আরামকেদারার অতীতবিলাস হয়েই থাকেনি। সাবেক আভিজাত্যকে বিসর্জন দিয়ে বাঙালি কেমন করে নিজেকে নামিয়ে আনল মাঝারির গোত্রে—বইটি পড়তে পড়তে বারেবারে তার অবশ্যম্ভাবী ব্যাখ্যা খুঁজে পাওয়া যাবে।
আসলে শহর কলকাতার যে কালপর্বের স্থাপত্যশৈলী বিষয়ে কলম ধরেছেন লেখক সেই যুগে পঁচিশ-তিরিশ ইঞ্চির পুরু দেওয়াল ছিল ঘরবাড়ির নেহাত সাধারণ বৈশিষ্ট্য। সাবর্ণ রায়চৌধুরীদের বসতগৃহের প্রসঙ্গেই যেমন একটি পঁয়তাল্লিশ ইঞ্চি পুরু দেওয়ালের প্রসঙ্গ উল্লিখিত হয়েছে। ভদ্রাসনের এহেন পাকাপোক্ত গাঁথনির সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই যেন সেই যুগের মানুষজনের ব্যক্তিত্বও হত মজবুত। রাজা রামমোহন রায়ের বাসগৃহ প্রসঙ্গেই যেমন প্রসঙ্গক্রমে বলছেন লেখক,
"... সমকালীন কলকাতার ধনী ব্যক্তিদের মতো নাচ, গান, পার্টিও ছিল তাঁর জীবনের একটা অংশ। ফ্যানি পার্কস তাঁর ভ্রমণকাহিনীতে রামমোহনের বাড়ির এরকমই একটি পার্টির বর্ণনা দিয়েছেন। আলোর রোশনাই ও বাজি পোড়ানো থেকে শুরু করে নর্তকী নিকির নাচ—আয়োজনের কোনও ত্রুটি ছিল না।"
জীবনরসিক রামমোহনের আভিজাত্য যে তাঁর বাড়ির শক্তপোক্ত গাঁথনির প্রতিটি ইঁটে অস্তিত্ববান হয়ে আছে তা বুঝে নিতে পাঠকের বিলম্ব হয় না। যুগের বদলের সঙ্গে সঙ্গে বসতবাড়ির স্থাপত্যরীতিতে যেমন এসেছে পাঁচ-দশ ইঞ্চির পাতলা দেওয়াল তেমনই বাঙালির ব্যক্তিত্বও হয়েছে ক্ষয়িষ্ণু। টেগোর প্যালেস, টেগোর ক্যাসল, মার্বেল প্যালেস বা বেলগাছিয়া ভিলা প্রসঙ্গেও লেখকের বর্ণনায় পাঠক প্রতি মুহূর্তে অনুভব করতে পারে মহারাজা যতীন্দ্রমোহন ঠাকুর, রাজা রাজেন্দ্র মল্লিক বা প্রিন্স দ্বারকানাথ টেগোরদের পরিশীলিত পাশ্চাত্য মনোভঙ্গির উর্বরতা। টেগোর ক্যাসল প্রসঙ্গে যেমন লেখকের মূল্যায়ন,
"যে-দুর্গ স্কটিশ হাইল্যান্ডের পরিবেশে মানানসই তারই মতো একটি দুর্গ যে গাঙ্গেয় কলকাতায় তৈরি করা যায় তা বোধ করি যতীন্দ্রমোহনের পক্ষেই কল্পনা করা সম্ভব ছিল। ধর্মাচরণে গোঁড়া হিন্দু যতীন্দ্রমোহন ম্লেচ্ছ ভাবাদর্শে বাড়ি তৈরি করতে পিছপা হননি।"
এই মনোভঙ্গি, এই কল্পনাশক্তিই একটি জাতিকে টেনে নিয়ে চলে সভ্যতার পথে। শিশ্নোদরজীবীতার দিনগত পাপক্ষয়ে হয়তো সার্থক হতে পারে হোমো সেপিয়েন্স নামধারী কোনও বিশেষ জীবের জীবনচক্র। কিন্তু কেবল প্রয়োজনের নিবৃত্তিতেই চরিতার্থ হতে পারে না বৃহত্তর মানবজীবনের সার্থকতা।
এই টেগোর ক্যাসলের সূত্রেই এসে পড়ে বাঙালির জাতিগত আত্মবিস্মরণপ্রবণতার প্রসঙ্গ। দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বর্ণনা থেকে জানা যাচ্ছে ১৯৫৪ সালে দীর্ঘ একানব্বই বছরের জন্য বাড়িটি লিজ নিয়ে নেয় এস বি হাউস অ্যান্ড ল্যান্ড প্রাইভেট লিমিটেড। যদিও সামান্য তথ্যগত বিভ্রান্তির সম্ভাবনা রয়ে যাচ্ছে এই স্থলে। যেহেতু ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ সংবাদপত্রে ৫ এপ্রিল, ২০১০ তারিখে প্রকাশিত সৌমিত্র দাসের একটি প্রতিবেদনের সূত্রে পাওয়া যাবে অন্যতর তথ্য।
“...Prabirendra, had leased out Tagore Castle to Tulsidas Mundra for 56 years and the rent was a princely sum of Rs 3,000 a month. Prabirendra’s adoptive son, Sreejit Tagore, sold off Tagore Castle about six to seven years ago to Mundra’s daughter, Veena Lohia.”
লিজের সময়সীমা যত বছরের জন্যই ধার্য হয়ে থাক, সম্পত্তি হস্তান্তরের পরপরই মুন্দ্রাদের তরফ থেকে দফায় দফায় এই বাড়ি এবং সংলগ্ন জমির চেহারায় ও প্রকৃতিতে ঘটানো হতে থাকে ব্যাপক রদবদল। ক্লক টাওয়ার ও মিনারেটের সামান্য কিছু অংশ বাদে আজ (খেয়াল রাখতে হবে এখানে ‘আজ’ অর্থে লেখক ১৯৮১-৮২ সালের কথা বলেছেন) টেগোর ক্যাসলকে আর চেনবার জো নেই। এই রদবদলের সূত্রে কলকাতা পুরসভার ভূমিকা সম্পর্কেও সঙ্গত কারণেই বিষোদ্গার করেছেন লেখক। টাউন হল এবং মেটকাফ হল প্রসঙ্গেও তাঁর লেখনীতে ঝরেছে আক্ষেপ। টাউন হলের দক্ষিণের শ্বেতপাথরের বারান্দায় যে চা, সিগারেটের দোকান বসেছে জেনে চমকে উঠতে হয় রীতিমতো। শুধু তাই নয়, এই টাউন হলেই জন পামার ও চার্লস বেকেট গ্রিনল-এর দু’টি আবক্ষমূর্তির কপালে কারা যেন লাল তিলক এঁকে দিয়ে গেছে। ভারতবর্ষের তথাকথিত ‘সাংস্কৃতিক রাজধানী’র বুকে ঘটতে পারা এই ‘ছুটকোছাটকা’ ব্যাপারগুলিই সম্ভবত আভাস দেয়—আজ বাংলার সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে যে চরম শূন্যতা ও নৈরাজ্যের বাতাবরণ ছেয়ে গিয়েছে তার অশুভারম্ভটা বিগত শতকের সেই অষ্টম দশকেই (বা তার কিছু আগে) ঘটেছিল।
আর ঠিক এই প্রেক্ষিত থেকেই সমগ্র গ্রন্থের এক অন্যতম প্রাসঙ্গিক রচনা হয়ে ওঠে এই বইয়ের ভূমিকা অংশটি। গ্রিক কবি জর্জ সেফেরিসকে সার্থকভাবে উদ্ধৃত করা হয়েছে এই রচনায়—the statues are not the ruinsÎwe are the ruins। বাস্তবিক আজকের খর্বকায় বাঙালিই রামমোহন রায় বা দ্বারকানাথ ঠাকুরের সমকালীন কলকাতার অন্তিম ধ্বংসাবশেষ। ইতিহাস ক্ষমা করে না নিজের অমর্যাদাকারীকে। তাই যখন একদিকে টাউন হলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে চা-সিগারেট খাচ্ছে বাঙালি, বিনষ্ট হয়ে যেতে দিচ্ছে টেগোর ক্যাসলের ঐশ্বর্যকে, অন্যদিকে নিজেই তখন হয়ে পড়ছে সে প্রান্তিক। তার নিজেরই শৈশবের অযোধ্যা, যৌবনের বৃন্দাবন, বার্ধক্যের বারাণসী কলকাতার বুক থেকে।
সুখের কথা এই কলকাতারই মুক্তারামবাবু স্ট্রিটের ঠিকানায় আজও নিজের অস্তিত্বকে বহাল তবিয়তে টিঁকিয়ে রেখেছে মার্বেল প্যালেস। এবং এই আত্মবিস্মৃত জাতির শহরে বসবাস করেই সম্পূর্ণ পারিবারিক উদ্যোগে এই ‘টেম্পল অফ আর্ট’কে (মার্বেল প্যালেসের ভিজিটর্স বুকে সই করে যাওয়া খোদ বিদেশি পর্যটকদের কথায়) আজও সযত্নে বাঁচিয়ে রেখেছেন রাজা রাজেন্দ্র মল্লিকের বর্তমান বংশধরগণ। দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বই থেকে জানা যাচ্ছে মার্বেল প্যালেসের নির্মাণযজ্ঞে কারিগর এসেছিল ইটালি, ইংল্যান্ড, ফ্রান্স, জার্মানি ও চিন থেকে। মূল পরিকল্পনা ছিল স্যার জেমস উইয়ার হগের। ইটালিয়ান স্থপতিরা করেছিলেন মার্বেল ফ্লোরিং। ফরাসিরা করেছিলেন লে-আউট, ভেসটিবিউল, পোর্টিকো ও বাড়ির সামনের অংশের কাজ। ইংরেজদের লাগানো হয়েছিল আসবাবপত্র ও ফিটিংসের কাজে। গ্রিক রীতির বাড়িটিতে রোমান কারুকার্যের বৈভবের মিশেল ঘটেছিল। এমনকি বাড়ির ঠাকুরদালানটিও ফরাসি ওয়াটিউ রীতিতে নির্মিত। ‘বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি’ পড়ার পরে ব্যক্তিগতভাবে দু’বার ঘুরে এসেছি মার্বেল প্যালেস থেকে। গোটা বাড়ি জুড়ে অজস্র তৈলচিত্র এবং অমূল্য শিল্পসামগ্রীর সমাহার কখন যেন একবিংশ শতকের বাস্তবতা কাটিয়ে ঊনবিংশ শতকের মেঘলা প্রহরে নিয়ে চলে রসিক মনকে। পূর্ব পশ্চিমে দীর্ঘ দোতলার নাচঘরের উক্ত দুই দেওয়ালের আগাপাশতলা জুড়ে বিরাট দুই বেলজিয়াম কাচের আয়না। একতলার ঠাকুরদালানে শুক্লা পঞ্চমীতে হয় বাগ্‌দেবীর আরাধনা। গ্রিক ও রোমক পুরাণের বর্ণময় চরিত্রেরা অনুপম ভাস্কর্যের বেশে দালানের চারদিকে বিরাজ করেন বছরভর। শুক্লা পঞ্চমীর দিন একই দালানে হিন্দু ও গ্রিক দেবীর সহাবস্থান কত মনোমুগ্ধকর হয় ভাবতে ভাবতে তন্ময় হয়ে পড়েছিলাম।



বড়বাজারের বুকে আজও দাঁড়িয়ে রয়েছে বসাকবাড়ি। বসাক পরিবারের বর্তমান প্রজন্মের জনৈক বংশধর অভিষেক বাইস্যাক (সাহেবদের দাক্ষিণ্যে যেভাবে ঠাকুরদের Tagore হয়ে ওঠা সেই একই প্রক্রিয়াতে বসাকরাও একদিন হয়ে উঠেছিলেন Bysack) কর্মসূত্রে ছিল আমার বছরখানেকের সহকর্মী। কবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রিয়তম বান্ধব গৌরদাস বসাক ছিলেন এই বংশেরই মানুষ। ১৯৫২-র হেলসিঙ্কি অলিম্পিক্সে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে একদিন এই বাড়ি থেকেই সুদূর স্ক্যান্ডিনেভীয় দেশে পাড়ি দিয়েছিলেন সাইক্লিস্ট নিতাইচন্দ্র বাইস্যাক (২১.০৩.১৯২১—০৫.১২.২০০৫)। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দুর্দিনে আর্থিক সহায়তা করে সাহেবদের কৃপাধন্য হয়ে ওঠা এই বংশের অন্যতম প্রবাদপুরুষ শোভারাম বসাকের নামে বড়বাজার অঞ্চলে আজও অস্তিত্বশীল রয়েছে একটি নাতিদীর্ঘ সরণি। কলকাতার অন্যতম বনেদি এই পরিবারটির ঠাকুরঘরে রয়েছে একটি শতাব্দীপ্রাচীন নিমকাঠের মূর্তি। এই বংশেরই জনৈক পুরুষ রাধাকৃষ্ণ বসাক জীবিতাবস্থায় শিল্পী নিয়োগ করে নির্মাণ করিয়েছিলেন এই আত্মপ্রতিকৃতিটি। ২০১০ সালে অভিষেকের আমন্ত্রণে তাদের বাড়ির নবমী পুজোয় অতিথি হয়ে গিয়ে দেখে আসার সৌভাগ্য হয়েছিল কলকাতার অন্যতম প্রসিদ্ধ এই পরিবারের পুজো। সাবেক অষ্টধাতুর অধিষ্ঠিত বিগ্রহে পুজো হয় বসাকবাড়িতে। পুজোর পাঁচদিন হেঁসেলে থাকে না আমিষের ছোঁয়া। সন্ধিপুজো চলাকালীন অনেকক্ষণ থেকেই খেয়াল করছিলাম ঠাকুরঘরের এককোণে দাঁড়িয়ে ধুতি-উত্তরীয় পরিহিত জনৈক প্রৌঢ় করজোড়ে একাগ্র দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন অধিষ্ঠিত বিগ্রহের প্রতি। বসার ঘরে গিয়ে কথায় কথায় পরে জানতে পারি একটু আগে দেখে এসেছি আসলে রাধাকৃষ্ণ বসাকের নিমকাঠের মূর্তিটি। এবং বসাকবাড়ির অনেক অতিথিই ইতিপূর্বে মূর্তিটির জৈবনিক বিভায় বিভ্রান্ত হয়েছেন।
টেগোর ক্যাসল এবং তার পরবর্তী নিয়তি যেমন পীড়িত তেমনই উৎসাহগ্রস্ত করেছিল আমায়। বন্ধু আলোকচিত্রী প্লাবন দাশকে সঙ্গে নিয়ে একদিন নিমতলা ঘাট স্ট্রিট ধরে টেগোর ক্যাসল স্ট্রিট হয়ে চলে গেলাম প্রসন্নকুমার ঠাকুর স্ট্রিটের সেই ২৬ দাগের (বর্তমানে অনেক বাই নম্বরে বিভক্ত) ঠিকানায়। মূল অট্টালিকাটিকে তো বটেই সংলগ্ন উদ্যানটিকে পর্যন্ত আজ আর চিনবার জো নেই। দর্জির বিপণি, পান-সিগারেটের স্টল আর ফটোকপির দোকানের ভিড়ে জায়গাটির সাবেক মাহাত্ম্য একেবারেই অবলুপ্ত হয়ে গিয়েছে। ব্যক্তিগত বসবাসের জন্য যে সুবিশাল দুর্গের পরিকল্পনা একদিন ছকেছিলেন যতীন্দ্রমোহন সেই অতীত আভিজাত্যকে ব্যঙ্গ করেই যেন আজ পুরনো স্থাপত্যটিকে জায়গায় জায়গায় ভেঙেচুরে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এক একফালি পায়রার খোপে ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে ঘরকন্নায় মেতে রয়েছে একালের মানুষ। আচমকা তাকালে এক নিছক সাধারণ বহুতল মনে হওয়া অট্টালিকাটির দেওয়ালের জায়গায় জায়গায় আজও জেগে থাকা মিনারেটের কারুকার্য খানিকটা ইঙ্গিত দিয়ে যায় স্থাপত্যটির অতীত গরিমার। ক্লক টাওয়ারটির দশা বেহাল হয়ে পড়লেও তার ভাস্কর্যের উৎকর্ষতা থেকেই পলকে অনুভব করে নেওয়া যাবে টেগোরদের সেই প্যালেস বা ক্যাসলে বসবাস করার নীল অহমিকাময় দিনগুলির দীর্ঘশ্বাসকে।



নিমতলা ঘাট স্ট্রিট ধরে আমাদের সেদিনের যাত্রাপথেই দেখা পেয়েছিলাম আরও এক সুবিশাল অট্টালিকার। ১৯২০—১৯৮৮ সময়পর্বে জোড়াবাগান পুলিশ স্টেশন হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া বাড়িটির হাল আজ সঙ্গিন। গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর বৈশিষ্ট্যগত সেই উঁচু উঁচু থাম থেকে জীবনরস সংগ্রহ করে সেই কবেই আকাশপানে মাথা তুলেছে অশ্বত্থের শরীর। মথুর সেন গার্ডেন লেন লাগোয়া এই বাড়ির প্রাচীরবেষ্টিত সংলগ্ন চৌহদ্দিটিও ঝোপঝাড় আগাছায় আজ জঙ্গলের চেহারা নিয়েছে। পুলিশ বিভাগ থেকে আটক করে রাখা কিছু গাড়ির কঙ্কাল কবে থেকে ইতস্তত ছড়িয়ে রয়েছে সাপখোপের আড়তের রূপ নেওয়া সেই জংলা জমিতে। পাঁচিল আর সদর ফটকে বসানো বর্শার মতো লোহার ফলাগুলোতে জমেছে বহুযুগের মরচে। শোনা যায় অগ্নিযুগের সশস্ত্র বিপ্লব দমনে কুখ্যাত চার্লস টেগার্টের বহুবিধ নারকীয় অত্যাচারের সাক্ষী হয়ে আছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মেরও আগে নির্মিত এই বাড়িটির অভ্যন্তরের একটি কক্ষ।
ফিরে আসি দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইটির কথায়। স্থাপত্য সম্পর্কে আলোচনা করতে করতেই বনেদি পরিবারগুলির প্রসঙ্গে তৎকালীন বঙ্গজীবনের সামাজিক চালচিত্রে বহুবার উঁকি দিয়েছেন লেখক। আর আঠারো ঊনিশ শতকের কলকাতায় ইঙ্গ বঙ্গ মিলিয়ে গুণি মানুষের যে অভাব হয়নি সে-কথা আজ নিশ্চয় আর নতুন করে বলার অপেক্ষা রাখে না। সমাজ সংস্কারের সূত্রে রাজা রামমোহন রায়ের নাম তো এমনিতেই বহুচর্চিত। দাতা গৌরী সেনের নামটিও বাঙালির মুখের প্রবাদবাক্যে নিজের জায়গা করে নিয়েছে। দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের বইটি থেকে জানতে পারছি রাধানাথ বসুমল্লিক আড়পুলিদের জঘন্য বৃত্তি (ছেলেধরার ব্যবসা) থেকে সরিয়ে এনে নিজের ব্যবসার কাজে লাগিয়েছিলেন। হীরালাল শীল ১৮৬৪ সালের আকালের সময় অন্নসত্র খুলে দৈনিক তিন হাজার মানুষের অন্নসংস্থানের বন্দোবস্ত করেছিলেন। কালাপানি পার হয়ে সেই যুগের রক্ষণশীল হিন্দু সমাজে একঘরে হয়েছিলেন যাঁরা ১৮৭৫ সালের ২২ ডিসেম্বর চোরবাগানের মদনমোহন মিত্রের মায়ের শ্রাদ্ধানুষ্ঠানে বিশেষ ভাবে আমন্ত্রণ জানিয়ে আনা হয়েছিল তাঁদের।
শিক্ষা-সংস্কৃতি থেকে সমাজ সংস্কার, সাহিত্য থেকে চিত্রকলা, শিল্প-বাণিজ্য থেকে রাজনীতি—বাঙালির অনন্য কৃতির স্পর্শ একদা ছুঁয়ে গিয়েছে সমাজ জীবনের প্রতিটি দিগন্তকেই। কিন্তু দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের আক্ষেপ স্থাপত্যের ক্ষেত্রটিতেই যেন এই জাতির নিজস্বতা অবহেলিতই রয়ে গিয়েছে বরাবর। আসলে বনেদি কলকাতার হর্ম্যরাজির যাবতীয় ঐতিহাসিক মূল্যকে শিরোধার্য করে নিয়েও বলতেই হয় আদপে সবটাতেই যেন ফুটে উঠেছিল সেই গ্রিক ঘরানার থাম, রোমক ঘরানার খিলান এবং ইটালিয়ান ধাঁচের ভিলার অনুকৃতির আদল। চোরবাগানের মিত্রবাড়ির সংস্কার সাধিত হয়েছিল ম্যাকিনটশ বার্নের পরিকল্পনায়। ধূর্জটি ধামের স্থাপত্যকলায় রয়ে গিয়েছে ভিক্টোরিয়ান আর্কিটেকচারের নিদর্শন। হেদুয়ায় কবি কাশীপ্রসাদ ঘোষের বাড়িটি নির্মিত হয়েছিল মিনি গ্রিক টেম্পলের ধাঁচে। টেগোর ক্যাসলের নির্মিতিতেই আগাগোড়া ছিল স্কটিশ হাইল্যান্ড ক্যাসলের স্থাপত্যশৈলী। প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর দু’ লক্ষ টাকার অধিক অর্থব্যয়ে নির্মাণ করিয়েছিলেন যে বেলগাছিয়া ভিলা তার স্থাপত্যেও অনুসৃত হয়েছে ইউরোপীয় রীতি। বৈঠকখানায় শোভা পেত আধুনিক ইউরোপীয় আসবাব, চিত্রকলা ও ভাস্কর্য। দেওয়ান-ই-আম ও দেওয়ান-ই-খাসের অনুকরণে শোভাবাজার রাজবাড়ির দেওয়ানখানার নির্মিতিতে স্থপতি আনা হয়েছিল দিল্লি থেকে। প্রদ্যোতকুমার ঠাকুরের মরকতকুঞ্জের লোহার ফটকটির বহিরঙ্গ বাকিংহাম প্যালেসের অনুকরণে কল্পিত এবং ঢালাই হয়েছিল রাশিয়ায়। এই প্রসঙ্গেই দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের পর্যবেক্ষণ,
চালাঘর ও মন্দির ছাড়া বাঙালির নিজস্ব স্থাপত্যরীতি নেই কেন, যুগ পরম্পরায় কেন সেই ঐতিহ্য গড়ে ওঠেনি তার উত্তর পাওয়া মুশকিল। বাঙালি এত কিছু করল, এত কিছু ভাবল, কিন্তু কোথায় আমাদের নিজস্ব স্থাপত্যরীতি? সাহিত্যে, শিল্পে, এমনকী বিজ্ঞানের জটিল কিছু শাখা-প্রশাখাতেও আমাদের নিজস্ব পরিচয় গড়ে উঠেছে। বাদ গিয়েছে স্থাপত্যের দিকটাই। এই শূন্যতার দায়ভাগ আমরা এখনও বহন করে চলেছি।
এমনকি স্থাপত্যে বাঙালির নিজস্বতার ছোঁয়া থেকে বঞ্চিত হয়েছে ভারতবর্ষের ‘সিটি অফ প্যালেসেস’-এর মহাতীর্থ জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়িও। বস্তুতপক্ষে, আলোচনার সূত্রে এমন মন্তব্যও এসেছে লেখকের কলমে যে বনেদি কলকাতার স্থাপত্যশৈলীকে উপলব্ধি করতে হলে স্থাপত্যরসিককে আগে চিনতে হবে ষোড়শ শতক থেকে বিংশ শতাব্দীর প্রথম দশক অবধি সময়কালে লন্ডন শহরে নির্মিত হওয়া যাবতীয় গথিক, ব্যারোক, রিজেন্ট ও ক্লাসিক্যাল ঘরানার স্থাপত্যের ঠিকুজি কুষ্ঠি।
আর এখানেই—দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতে—বাঙালির সংস্কৃতিতে পুনর্বার প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছেন সেই মহামানব যাঁকে ব্রাত্য রেখে এই জাতির কৃষ্টি সংক্রান্ত কোনও আলোচনাই সম্পূর্ণ হতে পারে না। ‘বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি’র পাতা থেকে আবার উদ্ধৃত করছি লেখককে,
"রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর পুত্র রথীন্দ্রনাথ যে-স্থাপত্যরীতি নিয়ে রীতিমত চিন্তাভাবনা করেছিলেন তার প্রমাণ শান্তিনিকেতনের ‘উত্তরায়ণ’ কমপ্লেক্স। এ ব্যাপারে রবীন্দ্রনাথ পেয়েছিলেন নন্দলাল বসু, রামকিঙ্কর ও বিশেষ করে সুরেন কর মশাইকে। নিঃসন্দেহে ‘শ্যামলী’-ই হল বাঙালির স্থাপত্যরীতির মডেল। যা কলকাতায় করা সম্ভব হয়নি, রবীন্দ্রনাথ তাকেই রূপ দিয়েছেন শান্তিনিকেতনে।"
যে মানুষটি যৌবনে নিজের প্রিয়তমা বউঠান কাদম্বরী দেবীর মধ্যে খুঁজে পাচ্ছেন গ্রিক পুরাণের দেবী হেকেটির আদল, ‘ভগ্নহৃদয়’ উৎসর্গ করছেন ‘শ্রীমতী হে’-কে, সেই মানুষটিই আবার বাঙালির নিজস্ব স্থাপত্যরীতিরও জনক!
‘বনেদি কলকাতার ঘরবাড়ি’-তে এভাবেই স্থাপত্যশৈলীর দর্পণে বাঙালির নিজস্ব সামাজিক জীবনের প্রতিকৃতিটিকে সন্ধান করে করে ফিরেছেন দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়। মনে হয়, যতদিন বাঙালি নামক কোনও জাতির অস্তিত্ব থাকবে এই সসাগরা ধরিত্রীর বুকে ততদিনই তার নিজস্ব কৃষ্টির প্রেক্ষিতে প্রাসঙ্গিকতা বজায় রয়ে যাবে বইটির। আর যদি কখনও সে ভুলে যায় বইটিকে তবে যেন আরও একবার প্রমাণিত হবে সেফেরিসের যাথার্থ্য— the statues are not the ruins— we are the ruins।


আপনার মতামত জানান