কাক

দেবব্রত কর বিশ্বাস

 


“ওই যে, এসে গেছে।”
পুরোহিত রাজেশের কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালো সুমন্ত। একটি কাক লাফাতে লাফাতে এসে পাঁচিলের ওপরে রাখা অবশিষ্ট পিণ্ড মুখে দিয়েই উড়ে গেল। সেই দিকে তাকিয়েই রইল সুমন্ত। কাকটা গাছের আড়ালে মিলিয়ে যেতেই সে ফিসফিস করে বলে উঠল- ‘বাবা!’

বাবা চলে গেছে বেশ কিছুদিন হয়ে গেল। এখন ঘরদোর অনেক শান্ত। নিরিবিলি। শোক নামক মায়া সব কেমন শান্ত করে দেয়। তেমনই শান্ত হয়ে আছে বাড়ির উঠোন। কলাগাছ। কুয়োতলা। সবাই বলেছে, ধীরে ধীরে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়। জীবন অফিস করতে বেরোয়। এসি থেকে বেরিয়ে গরমে ঘেমে যায়। অটোর লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার সময় জীবন মাঝে মাঝে ভুলে যায়, বাবা চলে গেছে। আর কখনও ফিরবে না। যে ফেরে না, সেই দিকে ফিরে তাকানোর নিয়ম নেই জীবনের। সামনের দিকে তাকানোই তার স্বভাব। আর সেই সামনের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছিল সুমন্ত। পাশের বাড়ির অ্যাসবেস্টসের চাল ব্লটিং পেপারের মতো বৃষ্টিগুলো শুষে নিচ্ছে। শুষে নিতে নিতে একসময় সে ভিজে গেল। তারপর, ভিজতেই থাকল। এমন সময় পরমা হাত রাখল সুমন্ত-র কাঁধে। বলল- “বৃষ্টির ছাট এসে তোমাকে তো পুরো ভিজিয়েই দিল। এমন অন্যমনস্ক হয়ে থাকলে চলবে?” সুমন্ত কিছু বলল না। এমনকী মৃদু হাসলও না। শুধু তাকাল। পরমা কী বুঝল কে জানে, সরে গিয়ে জানলাটা বন্ধ করতে গেল। সুমন্ত বলল- “জোর করে বন্ধ করে দিলে বৃষ্টিটা নাহয় ঘরে আসবে না, কিন্তু বৃষ্টিটা থেমে যাবে কি?” সুমন্তর কথা শুনে পরমা হাসল। জানলাটা খোলাই ছেড়ে দিল। পরমার হাত ধরে টেনে সুমন্ত নিজের কাছে বসালো। পরমা ভালো মেয়ে। সুমন্তর মনের আলোছায়াগুলো চিনতে তার অসুবিধে হয় না। সে বুঝতে পারছিল, সুমন্ত এখন একটু একা থাকতে চায়। কিন্তু সে স্বভাবের বশেই তার হাত ধরে টেনেছে। তাই হাত ছাড়িয়ে নিল সযত্নে। বলল- “এখন বসতে পারব না। কাজ আছে। তুমি স্নান করে নাও।” বলে রান্নাঘরের দিকে এগোচ্ছিল পরমা। এমন সময় পিছন থেকে সুমন্ত বলল- “আরেকবার ওই কাকের ঘটনাটা বলবে পরমা?”

কাকের ঘটনা: সুমন্তর বাবা সমীরণবাবু। পাড়াতে পরিচিত সমীর নামে। খুব ভালোমানুষ। সাদাসিধে। কর্মঠ। সৎ। দোষের মধ্যে একটিই, খেতে ভালোবাসতেন। খেতে ভালোবাসাটা যদিও সাধারণ অর্থে দোষের কিছু নয়। কিন্তু খাওয়া সংক্রান্ত লোভ সামলাতে না পারাটা অবশ্যই দোষের। তাও আবার একজন হার্টের রোগীর ক্ষেত্রে। সমীরণবাবু হার্টের রোগী ছিলেন দীর্ঘ একুশ বছর ধরে। হার্টে ব্লকেজ ছিল তার। বাইপাস সার্জারি করানোর সামর্থ্য ছিল না বলে ওষুধ খেয়ে বেঁচে ছিলেন। ডাক্তার বলেছিলেন, নিয়ম মেনে চললে আর পরিমিত আহার করলে কোনও সমস্যা হবে না। দুটোর কোনওটাই মেনে চলতেন না তিনি। ক্ষমতার অতিরিক্ত পরিশ্রম করতেন আর পরিমিত আহার বলে কোনও বস্তুতে তিনি বিশ্বাস করতেন না। সুমন্ত নিয়মিত বকাবকি করত। তিনি শুনতেন না। অলস হয়ে বসে থাকা জীবন তাঁর পছন্দ ছিল না একেবারেই। তাও এক অপূর্ব জীবনীশক্তিতে তিনি একুশ বছর বেঁচে ছিলেন। ভালোই চলছিল সব। সুমন্তও বিয়ে করল। পরমাকে খুব ভালোবাসতেন সমীরণবাবু। একেবারে নিজের মেয়ের মতো। কিন্তু বাধ সাধল একটা কাক। রোজ সকাল থেকে বিকেল অবধি সে সুমন্তদের বাড়ির ছাদে এসে ডাকতে লাগল। কাক তো অনেক ডাকে। কিন্তু এই কাকের ডাক ছিল কেমন কর্কশ। কেমন একটা অশুভ এবং মনে ভয় ধরিয়ে দেওয়ার মতো সেই ডাক। ব্যাপারটা মোটেই ভালো লাগছিল না পরমার। যদিও সে উদার মনের মেয়ে। কোনওরকম কুসংস্কার সে পাত্তা দেয় না। তবু কেন কে জানে তার ভালো লাগছিল না। মনে কু ডাকছিল। এই ডাক শুরু হওয়ার এক সপ্তাহ পরেই হঠাৎ এক রাতে সমীরণবাবুর সেরিব্রাল অ্যাটাক হয়। তারপর পনেরো দিন যমে-মানুষে টানাটানির পর এক মেঘলা রাতে সমীরণবাবু চলে যান। নার্সিং হোমে ভর্তি থাকার সময়েই একদিন পরমা সুমন্তকে এই কাকের ঘটনাটা জানায়, এবং বলে এটা নিশ্চয়ই তার মনের ভুল। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার এটাই সমীরণবাবু যতদিন হসপিটালে ছিলেন তখনও কাকটা ডাকত। কিন্তু চলে যাওয়ার পর কাকটা আর ডাকে না। কাকটা আর আসেও না। পরমা এসব মানে না। এটাকে কো-ইনসিডেন্ট হিসেবেই সে দেখতে চায়, কিন্তু পারেনা।

“কাকটা আর সত্যিই আসেনা, না?”
“নাহ। অন্তত আমি তো আর শুনিনি। দেখিওনি।”

সুমন্ত আবার বলল- “ব্যাপারটা বেশ গোলমেলে, তাই না? একটা কাক একটা সংসারের সব এলোমেলো করে দেবে? এত ক্ষমতা?” উত্তরে পরমা বলল- “দ্যাখো, এটা বিশ্বাস অবিশ্বাসের বিষয়। তবে হিন্দু শাস্ত্রমতে কাক হল আমাদের পূর্বপুরুষের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগের প্রতীক। কাক পাখিদের মধ্যে অন্যতম বুদ্ধিদীপ্ত পাখি। তাই তাকে হয়তো শাস্ত্রকারেরা পিতৃকূলের মেসেঞ্জার হিসেবে বেছে নিয়েছেন। যেসব পূর্বপুরুষেরা পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাঁরা কাকের মাধ্যমে মর্ত্যলোকে বার্তা পাঠান। ‘ক’ এই শব্দটি সংস্কৃত ভাষার প্রথম ব্যঞ্জনবর্ণ। একটা ধারণা অনুযায়ী কাক যখন ‘কা কা’ করে ডাকে তখন এই ‘কা’ ডাকটিকে ‘কেন?’ হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। পিতৃপূরুষ যেন এই ডাকের মাধ্যমে উত্তরপুরুষের কাছে বার্তা পাঠান যে ‘কেন’ তারা এখনও এই পৃথিবীতে থেকে যাচ্ছে? এই ডাক আসলে পিতৃপুরুষের কাছে চলে আসার ডাক। সেই চলে যাওয়া মানেই মৃত্যু। তাই আগেকার দিনের লোকেরা কাকের ডাককে অশুভ বলে মনে করত। হিন্দুশাস্ত্রমতে যদিও এই ডাক অশুভ নয়। এমনকী মৃত্যুও অশুভ নয়। অন্যদিকে আরেকদল মানুষ বলেন, কাকের ডাক মানেই তা পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার ডাক নয়। অনেক সময় অন্য কোনও বার্তাও পাঠান পূর্বপুরুষেরা। আর আমরাও সেই কাকের মাধ্যমেই পিতৃলোকের সঙ্গে যোগাযোগস্থাপন করি। তাই শ্রাদ্ধের সময় যে কাক পিণ্ডতে মুখ দেয়, ধরে নেওয়া হয় সেই কাকই হল পিতৃলোকের প্রতিনিধি।”
সুমন্ত অবাক হয়ে বলল- “এসব তুমি বিশ্বাস করো পরমা?”
পরমা হেসে ফেলল- “বিশ্বাসের অবিশ্বাসের প্রশ্ন নেই। নেটে সার্চ করে এই তথ্যগুলো পেয়েছি, তুমি জানতে চাইলে তাই জানালাম। তবে একটা কথা কী জানো, বিশ্বাস করো আর নাই করো, এটা কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, বাবার মৃত্যুর পরে ওই কাকটা কিন্তু আর আসেনা।”
চুপ করে গেল সুমন্ত। পরমা আবার রান্নাঘরের দিকে চলে গেল।

পরমা সব জানে, কিন্তু এটা এখনও জানে না একটা কাক সুমন্তকে ফলো করছে রোজ। অফিস যাওয়ার সময় অটোতে উঠে সে দ্যাখে পাশের দোকানের মাথায় বসে সেই কাকটা তাকে দেখছে। অফিসের ব্যালকনিতে গিয়ে দ্যাখে গ্রিলে একটা কাক বসে আছে। এমনকী একা একা রাস্তায় হেঁটে যাওয়ার সময়েও সে দেখেছে গাছে গাছে উড়ে উড়ে বসে একটা কাক তাকে ক্রমাগত ফলো করে চলেছে। চেঁচামেচি করছে না। ডাকছে না। চুপ করে তাকে দেখছে। কেমন একটা অস্বস্তি লাগে সুমন্তর। আবার ভালোও লাগে। মনে হয় বাবা তাকে দেখছে। বাবা সবথেকে বেশি ভালোবাসত সুমন্তকেই। অথচ সুমন্তর সঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মতবিরোধ ছিল সমীরণবাবুর। দু’জনে একসঙ্গে থাকলে অবধারিত ছিল ঝগড়া। আবার এমনটাও হত, কোনওদিন সমীরণবাবুর সামান্য শরীর খারাপ হলে সবচেয়ে বেশি টেনশনে পড়ে যেত সুমন্ত। বাবাকে কষ্ট পেতে দেখলেই বুকটা ধড়াস করে উঠত তার। একদিন বাবা বারান্দায় ইজিচেয়ারে শুয়ে ছিল। বুকের ওপর রাখা ছিল সেদিনের খবরকাগজ। বিকেলের হাওয়া দিচ্ছিল বাইরে। সন্ধে হয়ে এসেছিল তখন। হাওয়াতে বাবার মাথার চুলগুলো উড়ছিল। সুমন্ত ব্যালকনির দিকে তাকিয়ে চমকে গেছিল, বাবা এত চুপচাপ কেন? ভয়ে ভয়ে সমীরণবাবুর দিকে এগিয়ে গেছিল সুমন্ত। মাথা ঝুঁকিয়ে দেখেছিল বুকটা ওঠানামা করছে কিনা। ঠিক তখনই বাবা চোখ খুলে তার দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলেছিল, বলেছিল- "কী দেখছিস? এত তাড়াতাড়ি আমি চিরকালের জন্য চোখ বুজবো না।" এই তো, মাত্র কয়েকমাস আগের কথা। আজ বাবা আর নেই। এটা ভাবলে কী যেন একটা অনুভূতি হয় সুমন্তর। যেন একটা শান্ত বিরাট সরোবর আর তার পাশে গাছের দল একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে জলের দিকে। হাওয়া দিচ্ছে, অথচ একটাও পাতা নড়ছে না। বাবা ছিল সুমন্তর কাছে একটা গোটা ঘর, যেখানে যখন খুশি সে ঢুকে পড়তে পারে। প্রবল গরমের দিনেও এসি চালিয়ে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়তে পারে। আজও তার মনে হয় ঘরটা এখনও আছে। একইরকম আছে। কিন্তু নানা ব্যস্ততার মধ্যে সেখানে আর যাওয়া হচ্ছে না। এমন তীব্র যার অস্তিত্ব সে কখনও একটা কাকের রূপে দেখা দিতে পারে? ঠিক তখনই পরমার বলে যাওয়া কথাগুলো মনে পড়ল সুমন্তর। মেসেঞ্জার! এই কাক আসলে বার্তা নিয়ে আসে। কিন্তু কী সেই বার্তা? কোনও ডাক নেই। শুধু তাকিয়ে থাকা কি কোনও বার্তার সংকেত? ভেবে পায় না সুমন্ত।

শ্যাওলা পড়া একটা সিমেন্টের বসার জায়গা। জ্যোতিষ, যৌনরোগ বিশেষজ্ঞ, টিউটোরিয়াল হোম, প্যাকেজ ট্যুর সহ বিভিন্ন বিষয়ের পোস্টার সাঁটানো একটা শ্যাওলা পড়া সিমেন্টের বসার জায়গা। পাশে চায়ের দোকান। ওই বেঞ্চে বসেই চা খাচ্ছিল সুমন্ত। আপনমনে। সে খেয়ালও করেনি একটা কাক এসে তার পাশে বসেছে। ডিসটার্ব করেনি। ডাকেনি। শুধু পাশে এসে বসেছে। সুমন্তও খেয়াল করেনি। চায়ের দাম মিটিয়ে সে হাঁটা দিয়েছে তার গন্তব্যের দিকে। হাঁটতে হাঁটতে তার মনে পড়ে গেছে এই তো সেই রাস্তাটা। যে রাস্তা দিয়ে বাবার সঙ্গে সে লেকে বেড়াতে এসেছিল একবার। অনেক ছোটবেলায়। মনে আছে, বাবা তাকে সেবারই প্রথম লেবুজল খাইয়েছিল। তারপর এমনই একটা বেঞ্চে বসে আয়েশ করে চা খেয়েছিল বাবা, আর পাশে বসেছিল সুমন্ত। আর আজ? তার পাশে কেউ বসেছিল? মনে পড়ল না। আসলে সে খেয়াল করেনি। ফুটপাথে দাড়িয়েই সুমন্ত মাথা উঁচু করে আকাশের দিকে তাকালো। কালো মেঘে ছেয়ে থাকা পর্দা যেন। দুলছে। কালবৈশাখীর হাওয়ায়। সুমন্ত, চোখ বুজল। বাবার মুখ মনে করল। বাবার হাসিহাসি মুখ। ঠিক যেমন মরে যাওয়ার পর বাবার মুখে হাসি লেগেছিল। যেন অনেকদিনের চেনা কারোর সঙ্গে আবার দেখা হয়ে গেছে, এমন সেই হাসি। বাবার সেই মুখ মনে আসতে ঝরঝর করে জল এলো সুমন্তর চোখে। অথচ বাইরের কেউ বুঝল না। সবাই ভাবল, মহা আনন্দে ছেলেটা বৃষ্টিতে ভিজছে।

অনেকক্ষণ ধরে যে কাকটা তাকে ফলো করছিল, সে এবার উড়ে গিয়ে বসল একটা বড় গাছের ডালে। পাতার আড়ালে। উচ্চস্বরে ‘কা কা’ করে ডাকতে লাগল। কিন্তু এমন প্রবল জোরে বাজ পড়ছিল আর বৃষ্টি পড়ছিল যে সেই আওয়াজ সুমন্ত শুনতে পেল না। চোখবুজে অকাতরে ভিজতে ভিজতে, কাঁদতে কাঁদতে সে দেখল বাবা তার সঙ্গে কথা বলছে। বলছে- “ঠাণ্ডা লেগে যাবে তো! ‘কেন’ এভাবে ভিজছিস তুই?” চোখ খুলল সুমন্ত। গাছের যে ডালে কাকটা বসেছিল সেই দিকে চোখ চলে গেল। অথচ এমন ধোঁয়ার মতো ঘন হয়ে বৃষ্টি পড়ছিল যে সুমন্ত এবং ওই কাক কেউ কাউকে দেখতে পেল না। তবু কেন কে জানে, সুমন্ত হাসল। যেন অনেকদিনের চেনা কারোর সঙ্গে দেখা হয়ে গেছে, এমন সেই হাসি। ঠিক তার বাবার মতো।

আপনার মতামত জানান