ওয়ার্ল্ডকাপ

কৌস্তভ ভট্টাচার্য

 

(১)
আবার শুরু হয়েছে।
এবার আবার সোনায় সোহাগা। এই সবে মাসখানেক আগে ভোট শেষ হয়েছে। ভোটের সময় দেওয়াল লেখা এখন অনেক কমেছে। কিন্তু এখনো পাড়ার মাথায় মাথায় ঝুলছে সিপি(আই)এম-তৃণমূল। নিয়োগীদের বাড়ির তেতলার ছাদটা দেখাই যাচ্ছেনা প্রায়।
এর মধ্যে আবার পাড়ার আদ্ধেকটা ব্রাজিল তো বাকি আদ্ধেকটা আর্জেন্তিনা। ইএসপিএন-স্টার স্পোর্টসের কল্যাণে দু’একটা স্পেন-ফেনও দেখা যাচ্ছে আজকাল কোলকাতায়। তবে গ্রাহামস রোডে এখনো তারা ভ্রূণেই রয়েছে – ভূমিষ্ঠ হয়ে খাপ খোলেনি।
বিশ্বকাপের সময় দেওয়াল লেখা বারণ নেই। তাই বাড়ির সামনেটায় সযত্নে নেইমার, অস্কার, ফ্রেড আর অগতির গতি, নির্ধনের ধন – পেলেরও একটা ছবি আঁকা।
আগের দুবার – এই পাড়ায় আসার পর থেকে, পাড়ার ছেলেগুলো এসব ছবিটবি আসার আগে একবার জিজ্ঞেস করে নিতো। কিন্তু দু’বারই না বলায় এবার আর ওসবের ধার মাড়ায়নি – রাতারাতি কাজ সেরে দিয়েছে। যদিও পেলে নিজের প্রতিকৃতিটা দেখলে চিনতে মিনিট পাঁচেক সময় নিতেন বলেই বোধ হয়।
শারদ্বতের আর ভাল্লাগেনা। প্রত্যেক চারদিন অন্তর দুমদাম করে পটকা ফেটে ঘুমের থেকে ধড়ফড়িয়ে জেগে ওঠা, ব্রাজিল কি আর্জেন্তিনা ম্যাচ জিতলে বাড়ির সামনেটায় রাতবিরেতে চিলচিৎকার, এও ঠিক ছিলো।
তার সাথে যোগ হয়েছে ফেসবুক।
শারদ্বতের একটা গভীর সন্দেহ হয় – ডাউন দ্য লাইন – বছর তিরিশ চল্লিশ পরে খবরের কাগজ-নিউজ চ্যানেল সব মিউজিয়ামে ঢুকে যাবে, অথবা পৃথিবীতে লাইভ নিউজ রিপোর্টিংটাই একমাত্র পেশা হিসেবে বেঁচে থাকবে।
এই যখন মাস খানেক আগে লোকসভা ভোট হচ্ছিল – তখন চারপাশে সে কি গাঁক গাঁক রাজনৈতিক সচেতনতা, সবাই নিজেদের ডিপি চেঞ্জ করে ফেললো – ভোটের রেজাল্ট বেরোবার দিন জাতিধর্মনির্বিশেষে ভারতসন্তান চারপাঁচটা ওয়েবসাইট খুলে ভোটের রেজাল্ট চেক করছে মিনিটে মিনিটে – সে যা অ্যাটেনশন – এতো অ্যাটেনশন নিয়ে শেয়ার মার্কেট ব্রোকাররাও নিফটির চড়াই উৎরাই দেখেনা।
তাও ঠিক ছিলো না দেখছিস দেখ – সেখান থেকে আবার ডেটা তুলে তুলে ফেসবুকে কপি পেস্ট।
‘এই বিজেপি এগোলো – পশ্চিমবঙ্গে তো তৃণমূল ক্লিন স্যুইপ – ওরে না রে মুর্শিদাবাদে এখনো টক্কর দিচ্ছে’ – ইলেকশন হচ্ছে না শনিবার শনিবার করে রেস হচ্ছে – আবার রেজাল্টটাও বেরোলো শুক্রবার – তো শনিবার শারদ্বত উঠে দেখলো ফেসবুক ওয়ালে মোটামুটি কোন কেন্দ্রে কোন প্রার্থী কোন বুথে ক’টা ভোট পেয়েছে – সেটার খবরও পেয়ে যাচ্ছে – খবরের কাগজ খোলার দরকারই পড়লো না।
তো ভোট হয়ে গেছে। এখন প্রথম দু’দিনের ম্যাচের পর শারদ্বত এক মিনিটও টিভি না খুলে জেনে গেছে ব্রাজিল সেমসাইড গোল করেছে, ফান পার্সি উড়ে এসে হেডে গোল দিয়েছে, স্পেন পাঁচ গোল খেয়েছে শেষমেষ, জাপানের রেফারি বাজে পেনাল্টি দিয়েছে (দিয়েছে কি? ফেসবুক দেখে আবার দু’রকম গপ্পোই পাওয়া যাচ্ছে) – ইত্যাদি ইত্যাদি।
নাহ খবরের কাগজটা বন্ধ করে দিলেই হয় – ফালতু বাজে খরচ।

(২)
‘আচ্ছা তুমি লাস্ট কি সিনেমা দেখেছো? আই মিন হলে গিয়ে।’
‘সিনেমা? এর সাথে সিনেমার কি সম্পর্ক?’
‘বলোই না’।
‘উমম – ডার্ক নাইট রাইজেস’।
‘ও বাবা সে তো দু’বছর আগের গল্প! তারপর হলেই যাও নি?’
‘উমম – গিয়েছি কি? নাহ – মনে পড়ছে না। ওটাই হবে’।
‘গ্র্যাভিটি দেখোনি?’
‘ডিভিডি কিনেছিলাম। আদ্ধেক দেখে বন্ধ করে দিয়েছি’।
‘কেন?’
‘ওই ন্যাশানাল জিওগ্রাফিকে না ডিসকভারিতে একটা প্রোগ্রাম হতো না – আই শুড নট বি অ্যালাইভ – আমার ওটার আউটার স্পেস ভার্সন মনে হচ্ছিলো সিনেমাটা’।
‘বাপ রে। আচ্ছা লাস্ট কি গানের সিডি কিনেছো?’
‘গানের – সিডি? কেন বলোতো?’
‘আহা এতো প্রশ্ন করলে কাউন্সেলিং হয়না’।
‘উমম ওই নচিকেতা আর রশিদ খান মিলে যাত্রা বলে একটা অ্যালবাম করেছিলো – ওইটা’।
‘সে তো ২০১০ না ২০১১’।
‘হুমম’।
‘তুমি কি বুঝতে পারছো শারদ্বত?’
‘কি?’
‘তোমার আসলে এন্টারটেইনমেন্টে একটা ইনডিফারেন্স চলে আসছে। সেটা শুধু ওয়ার্ল্ড কাপ রিলেটেড নয়’।
কথা হচ্ছিল অফিসের ক্যাফেটেরিয়াতে লাঞ্চ করতে করতে।
অফিসে যে ওয়ার্ল্ড কাপের সময় খুব একটা শান্তি আছে তা নয় –এখানে এসেও মেসি-মুলার জপে যাচ্ছে লোকে লাস্ট ক’দিন ধরে।
শারদ্বত প্রথম প্রথম একটু দূরে দূরে থাকার চেষ্টা করছিলো। কিন্তু তাতে লোকে একটা ‘ইটি দেখছি-ইটি দেখছি’ রিঅ্যাকশন দেওয়াতে আজকাল সকালে উঠে ভালো করে ফেসবুকে গতকালের রাত্তিরের আপডেটসগুলো পড়ে নেয় – কাজ হয়ে যায়।
অফিসে বলতে গেলে মিহিরই শারদ্বতের বন্ধু বলা যায় – কলিগসমুদ্রে।
একই দিনে অফিস জয়েন করেছিলো ট্রেইনি হিসেবে – তাও নয় নয় করে বছর ছয়েক আগে। এক প্রোজেক্টেও ছিলো প্রথমে – এখন যদিও আলাদা বিজনেস ইউনিট হয়ে গেছে। শারদ্বতের ইনসিওরেন্স আর মিহিরের ট্র্যাভেল অ্যান্ড হসপিটালিটি।
কিন্তু লাঞ্চটা এখনো খুব অসুবিধে না থাকলে দু’জনে একসাথেই করে।
সেখানেই কথাগুলো হচ্ছিলো।
মিহিরের মুখে নিজের এই এন্টারটেইনমেন্টে অস্বস্তির গল্প শুনে শারদ্বত বোধহয় কিঞ্চিৎ অবিশ্বাসী জেশ্চার করেছিলো – তাই মিহিরই বললো।
‘আচ্ছা তোমার কি ছোটোবেলা থেকেই ফুটবল ওয়ার্ল্ড কাপ ভাল্লাগেনা?’
‘না গো – ছোটোবেলায় বাবার সাথে খুব বলতে গেলে উৎসাহ নিয়েই দেখতাম। সেই নাইন্টি এইটে ফ্রান্স চ্যাম্পিয়ন হলো। ব্রাজিলের সাপোর্টার ছিলাম – হেব্বি মন খারাপ হয়েছিলো। আবার টু থাউজ্যান্ড টুতে ব্রাজিল জেতায় প্রচুর নেচেওছিলাম। ওটা মাধ্যমিকের বছর ছিলো। মাধ্যমিক শেষ হবার পরেই হয়েছিলো ওয়ার্ল্ড কাপ। খেলার টাইমিংগুলোও ভালো ছিলো কোরিয়া জাপানে খেলা হয়েছিলো তাই। প্রায় গোটা ওয়ার্ল্ড কাপটাই দেখেছিলাম প্রায়’।
‘তো এই বিরক্তিটা কবে থেকে?’
‘ওই টু থাউজ্যান্ড সিক্স, দুর্গাপুর থেকে কোলকাতায় এঞ্জিনিয়ারিং পড়তে চলে আসার পর। আর তুমি যে ব্যাপারটা গান-সিনেমা না দেখার সাথে রিলেট করছো, তাই কি? আমি তো তখন খুব সিনেমা দেখতাম’।
‘তাহলে এখন দেখছো না কেন?’
‘জানিনা – সত্যি কথা বলতে গেলে খুব ইচ্ছেও করছেনা’।
‘আমি বলি কি! কাল জার্মানি-পর্তুগাল ম্যাচ আছে। টাইমিংটাও ভালো সাড়ে ন’টা আইএসটি। বসেই পড়ো না। দেখো ইচ্ছেটা ফেরৎও এসে যেতে পারে’।
‘দেখি’।
(৩)
শারদ্বত সেদিন গুছিয়েই বসেছিলো।
একাই থাকে। তাই আর সেদিন রান্নাবান্নার ঝামেলায় না গিয়ে ডমিনোজ থেকে পিৎজা এনে গুছিয়ে টিভির সামনে বসেছিলো খেলাটা দেখতে। জার্মানিকে শারদ্বতের মন্দ লাগতো না। খেলাটা শুরু থেকেই ওরাই ডমিনেট করছিলো।
কিন্ত কিছুক্ষণ পর শারদ্বত বুঝতে পারলো মুলার-পেপের মাথা ঠোকাঠুকির থেকে ওর পিৎজাটা বেশি ভালো লাগছে।
আরো কিছুক্ষণ পর যখন ঘুমটা ভাঙলো তখন দেখলো গৌরব কাপুরের মুখ টিভি স্ক্রিণ জুড়ে। বুঝলো ম্যাচটা শেষ হয়ে গেছে।
টিভিটা চলছিলো।
শারদ্বত টিভিটা বন্ধ না করেই প্রথমে অনেকক্ষণ না সাফ করা পিৎজার ধ্বংসাবশেষ কিচেনে গিয়ে ডাস্টবিনে ফেলে এলো, হাত মুখ ধুলো, বিনব্যাগটাতেও একটু গুঁড়ো গুঁড়ো পড়েছিলো – সেগুলো পরিষ্কার করলো।
তারপর টিভিটা বন্ধ করতে গেলো।
টিভিটায় তখন চিয়ার লিডার টাইপের দেখতে কয়েকটা মেয়ে ফুটবল নিয়ে ফাঁকা মাঠে নাচানাচি করছে – ওই ব্রাজিলিয়ান মেয়েই হবে – মাথায়, মাথার পেছনে পেখম লাগানো।
শারদ্বত টিভিটা বন্ধ করতে গেলো। কিন্তু রিমোট টিপে দেখলো টিভিটা বন্ধ হলোনা।
ব্যাটারি শেষ হয়ে গেছে বোধহয়। বেশ দু’একবার টিপলো কিন্তু কিস্যু হলোনা।
ব্যাটারিটাই গেছে।
শারদ্বত গিয়ে তারপর টিভির স্যুইচটা টিপে বন্ধ করতে গেলো।
তাও দেখলো টিভিটা বন্ধ হলোনা।
‘কি হলো রে বাবা’।
টিভির ভেতর থেকে সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটাই বললো – ‘আমরা এখন নিরবিচ্ছিন্ন সম্প্রচার করছি শারদ্বত। এখন টিভি বন্ধ হবেনা’।
ব্রাজিলের মেয়ে বাঙলায় কথা বলছে!
পিৎজাটায় গাঁজা-চরস কিছু মেশানো ছিলো নাকি?
আবার মেয়েটা বললো – ‘কিচ্ছু ছিলোনা মেশানো শারদ্বত, তুমি স্বপ্ন দেখছো। একটা আদ্যন্ত নিপাট যৌনস্বপ্ন’।
বলে মেয়েগুলো আবার নাচতে শুরু করে দিলো যথাযথ লাস্য নিয়ে।
শারদ্বত এবার ফাঁপরে পড়ে গেলো।
স্বপ্নের মধ্যে যদি বুঝে যাওয়া যায় – যে একটা লোক স্বপ্ন দেখছে তাহলে তো ঘুম ভেঙে যাওয়ার কথা। কিন্তু এখানে দিব্যি স্বপ্নটা চলেই যাচ্ছে – মেয়েগুলো না শারদ্বত কে চালাতে চায় সেটাই বোঝা যাচ্ছেনা।
‘আচ্ছা শারদ্বত তুমি শেষ কবে শুয়েছিলে?’
শারদ্বত এবার উত্তর দিলো – ‘শুয়েছিলে মানে? সেক্স করেছিলাম?’
‘হ্যাঁ’
‘আমি ভার্জিন’
একটা মেয়ে জিভ কেটে বললো – ‘উপস’ আরেকটা মেয়ে বললো – ‘ওলে বাবা লে’ – বলে আরো খানিকটা নেচে নিলো।
শারদ্বত বুঝলো এই স্বপ্নটা বেশ খানিকক্ষণ চলবে – দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখার চেয়ে বিনব্যাগটায় বসে বসেই দেখা ভালো।
‘আচ্ছা তোমার চলে কি করে?’ – আবার একটা মেয়ে জিজ্ঞেস করলো টিভি থেকে। বলা হয়নি মোট চারটে মেয়ে ছিলো।
‘চলে কি করে মানে?’
‘মানে এই যে তুমি আঠাশ বছর বয়েসেও ভার্জিনিটি অক্ষুণ্ণ রেখে ঘুরে বেড়াচ্ছো – অসুবিধে হয়না। ব্রাজিলে তো আঠাশ বছরে ভার্জিন ভাবাই যায়না – সে ছেলেমেয়ে যেই হোক’।
‘ওহ’।
‘তুমি খুব পর্ণ দেখতে না একসময়?’
‘হ্যাঁ – কলেজে – অ্যাডিক্টেডের মতো’।
‘এখন দেখোনা?’
‘এই বয়েসে কেউ আর ওইসব দেখেনা?’
‘কেন – মা বকবে?’ – বলে মেয়েগুলো খিল খিল করে হেসে নিলো।
‘নাহ মানে’।
‘ওই জন্যই তোমার যৌনস্বপ্ন আসছে বুঝলে, ভার্জিন রয়ে গেছো, পর্ণ দেখোনা – তার মানে স্বমেহনও করোনা। জিনিসটা তো অনন্তকাল ফসিলের মতো জমে থাকতে পারেনা’।
‘তাহলে?’
‘তাহলে আবার কি? এটা যেহেতু স্বপ্ন তাই তোমার স্বমেহনের প্রয়োজন নেই’।
‘আচ্ছা এই বয়েসে এসে যৌনস্বপ্ন কি স্বাভাবিক?’
‘স্বাভাবিক?’
‘হ্যাঁ – না মানে ওয়েট ড্রিম বয়ঃসন্ধিতে হয় না?’
‘তা হয়’।
‘আর এইসব পর্ণ টর্ণের মধ্যে মেয়েদের একটা সেক্স অবজেক্ট হিসেবে দেখার প্রবণতা থাকে’।
‘আর যে দেখে দেখে অসহায়ের মতো মোচন করছে সে বুঝি খুব ব্যাক্তিত্ত্ব প্রকাশ করে? মেয়েগুলো ক্যামেরার সামনে অবজেক্টিফাইড হয়, যে দেখছে সে ল্যাপটপ স্ক্রিণের সামনে – আর কেউ কেউ সিনেমা দেখে, বই পড়ে চাহিদা মেটায়, কেউ ফুটবল দেখে, কারো কাছে সেটা পর্ণোগ্রাফি’।
‘চাহিদা?’
‘হ্যাঁ চাহিদা – চাহিদা আর জোগান। আর বাজারটা সেটা খুব ভালো বোঝে বলেই প্রত্যেকের জন্য আলাদা আলাদা বাকেট আছে’।
শারদ্বতের খেয়াল হলো মেয়েগুলো কথা বলতে বলতে টিভি থেকে বেরিয়ে ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
সবচেয়ে সুন্দরী মেয়েটা তার সমগ্র উদ্ভিন্নতা নিয়ে শারদ্বতের কাছে এসে বললো – ‘রিল্যাক্স শারদ্বত, আমরা জাস্ট তোমার বিনোদন। ইওর ফর্ম অফ এন্টারটেইনমেন্ট’।
স্বপ্নটা পরদিন সকালেই ভেঙেছিলো। শারদ্বতের খেয়াল হলো এই চারটে মেয়ের ছবি ফেসবুকেই কারো পোস্টে দেখেছিলো।
(৪)
আজকাল শারদ্বত রোজ ওয়ার্ল্ড কাপ দেখছে।
খেলার স্কোরটা অবশ্য ফেসবুক থেকেই জেনে নেয়।

আপনার মতামত জানান